Tuesday, 24 March 2015

“আমার মল্লিকা বনে”

 ( একটি ছোট গল্প )

- নারায়াণ রায়

সুকমল ঘোষ, মাত্র একমাস হ’ল চাকরী থেকে অবসর নিয়েছেন ইতিমধ্যেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। এখন মনে হয় এর চেয়ে চাকরীতে থাকাটাই ভালো ছিল। আসলে দীর্ঘ পয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছরের ছকে বাঁধা জীবনে মানুষ এমন অভ্যস্থ হয়ে ওঠে যে অবসরের পর পরই যেন একটা বিরাট শূন্যতা। ছেলে মেয়েদের সঙ্গে একটা বয়সের পর কেমন যেন একটা দুরত্ব তৈরী হয়ে যায়, তারা তাদের মত থাকে। সে সারাজীবন তার স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়াকে সব সময় পাশে পাশেই পেয়েছে এ ব্যাপারেও তার কোন ক্ষোভ নেই। একটা সময় বরং বিষ্ণুপ্রিয়ারই অভিযোগ ছিল যে সুকমল তাকে ঠিকমত সময় দেয় না, সুকমল রসিকতা করে বলতো ‘অবসরের পর সব সুদে আসলে মিটিয়ে দেব’ কিন্তু মাত্র এক মাসেই যেন সব কথা ফুরিয়ে গেছে। আর ঠিক এই সময়ে মেয়ে মৌটুসি বলল ‘বাবা তুমি একটা ফেসবুক একাউন্ট খোল, দেখবে দারুন সময় কেটে যাবে, আমার প্রায় সব বন্ধুদের বাবা মায়ের ফেসবুক একাউন্ট আছে, সেদিন তনিমার মা বলছিল ওর বাবাকে নাকি ঠেলে ঠেলে বাজার পাঠাতে হয়, এমন ফেসবুকের নেশা হয়ে গেছে’ ।
অফিসে থেকে অবসর গ্রহনের বছর দুই আগে কোম্পানী একটা পি সি দিয়ে ছিল তবে তাতে কোন নেট কনেকশন ছিল না। শুধু চিঠি টাইপ করা আর সে গুলোকে সেভ করে রাখা, কপি পেস্ট এই রকম সামান্য কিছুই জানে সে, তবে অফিসার হয়েও এক সময়ে টাইপের হাত খুব ভালো ছিল বলে খুব শিঘ্রই ব্যাপারটা সড়গড় হয়ে গেছিল ওর কাছে। যাইহোক মেয়ের সাহায্যে একটা ফেসবুক একাউন্ট খোলা হ’ল, প্রথম দু এক সপ্তাহ যেতেই এবং বন্ধুর সংখ্যা একটু বাড়তেই ব্যাপারটা আস্তে আস্তে সুকমলের বেশ ভালো লেগে গেল। কত রকমের মানুষ, নারী, পুরুষ, বয়স, দুরত্ব সব মিলে মিশে একাকার…. এ যেন এক স্বপ্নের জগৎ, বেশ সুন্দর হাসি মুখের একটি প্রোফাইল পিকচার আর নেট থেকে বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর ছবি ডাউনলোড করে নিজের পেজটাকে যতোটা পারলো আকর্ষনীয় করে তুললো। সুকমল সবার কাছে মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ভালো বলেই পরিচিত হলেও বরাবরই একটু লাজুক স্বভাবের, নিজে হতে যেচে কারও সঙ্গে ঘনিষ্টতা করতে এগিয়ে যেতে পারে না, অথচ এখানে সবার সঙ্গে কত সহজেই মনের কথা খুলে চ্যাট, মানে গল্প করতে পারছে। সমবয়সী শুধু নয়, এখন কত অল্প বয়সী ছেলে মেয়েরাও ওর ফ্রেন্ডলিস্টে যুক্ত হয়েছে, তাদের কেউ ওকে দাদা বলে কেউ ওকে কাকু বলে। সে ব্যাপারটাকে ও বেশ উপভোগ করে, তাছাড়া আর একটা জিনিস ও লক্ষ্য করেছে এখনকার ছেলে মেয়েরা সাহিত্য সঙ্গীত নাটকের মত কলা শাস্ত্রে যথেষ্ঠ ওয়াকিবহাল। তাছাড়া এরা কত সহজেই সবাইকে আপন করে নিয়ে কি সুন্দর প্রথম থেকেই ‘কাকু’ এবং ‘তুমি’ সম্পর্ক পাতিয়ে নেয়, ওর ফ্রেন্ড লিস্টে তেমনই একজন হ’ল শতরূপা সাহা। সুকমলর ছাত্রাবস্থায় একসময়ে পাড়ার লিট্ল ম্যাগাজিনে একটু আধটু লেখার অভ্যেস ছিল, এতদিন পরে এখানে অনককে লেখালিখি করতে দেখে মাথার পোকাটা আবার নড়ে উঠলো। যেটুকু যা পারে একটু আধটু লেখার চেষ্টা করে, ফেসবুকের একটা সবচেয়ে বড় সুবিধা কোন কিছু পোস্ট করলে ভালো খরাপ যাই হোক হাতে হাতে ফল, তবে বেশীরভাগই “বা বেশ হয়েছে” গোছের। একমাত্র শতরূপা সহজে ছেড়ে দেবার পাত্রী নয়, “কাকু এই যায়গাটায় তুমি ব্যাপারটা আর একটু বিস্তারিত বললে আরও ভালো হ’ত, কিম্বা কাকু অমুক যায়গায় তুমি দুম করে তুমি ওটা বলে দিলে কেন? ওখানে সাসপেন্সটা আর একটু ধরে রাখলে গল্পটা জমতো ভালো।” সুকমল পরে চিন্তা করে দেখে শতরূপা ঠিকই বলেছে, আস্তে আস্তে তার লেখার পরিমান বাড়তে থাকে আর ‘লেখক’ সুকমলের একমাত্র ফ্যান শতরূপা তাকে নানা ভাবে তাকে উৎসাহ দিয়ে যায়। হ্যা সত্যি, সুকমল মজা করে শতরূপাকে একথাই বলল একদিন ইনবক্সে ,
“লেখক সুকমল ঘোষের একমাত্র এবং একনিষ্ঠ ফ্যান কুমারী শতরূপা সাহা হা হা হা” আর তার উত্তরে শতরূপা জানালো “না গো কাকু আরও একজন আছে,”
সুকমল জানতে চায় কে সে?
“আমার মা” জানায় শতরূপা,
“তোমার মায়েরও কি ফেসবুক একাউন্ট আছে নাকি?” জিগ্যেস করে সুকমল।
“না আমিই পড়ে শোনাই কিম্বা মা কে প্রিন্ট বার করে দেই, মা ছোট গল্প পড়তে খুব ভালো বাসে, আর তোমার লেখা পড়তে নাকি মায়ের খুব ভালো লাগে” বলে শতরূপা।
সুকমলের নিজেকে সেদিন বেশ অপরাধী বলে মনে হ’ল, এতদিন হল মেয়েটির সঙ্গে আলাপ হেয়ছে, নাইবা হল সামনা সামনি দেখা, কিন্তু কোনদিন ও মেয়েটির বাবা মা বাড়ি ঘরের খবর নেয়নি। আর সেদিনই প্রথম সুকমল জানতে পারলো যে বছর দুয়েক হ’ল শতরূপা ইতিহাস নিয়ে এম এ পাশ করেছে, টুক টাক টিউশনি করে নিজের হাত খরচাটা জোগাড় করে নেয় সে। শতরূপা বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান ওর বাবা নেই, পাঁচ বছর আগে একদিন সকালে হটাৎ এক ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মূহুর্তের মধ্যেই সব শেষ। মা ও গত বছর দুয়েক অস্টো-আর্থাইটিসে আক্রান্ত হয়ে এক প্রকার শয্যাশায়ী। তবে আর্থিক অসুবিধা নেই, বাবা একটা উচ্চ পদে সরকারি চাকরি করতেন, বারুইপুরে একটা ছোট্ট দুই কামরার একতলা বাড়িও করে দিয় গেছেন, আর মা মাসে পনের হাজার টাকার মত ফ্যামিলি পেনশন পান।
এদিকে সুকমলও ফেসবুকের সঙ্গে বেশ ভালো ভাবেই জড়িয়ে পরেছে। দু তিনটে গ্রুপেরও সদস্যও হয়েছে, কেমন যেন নেশা হয়ে গেছে, সকালে কোন রকমে বাজার করে এসে টিফিন করেই বসে পরে। আবার দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে একটু ভাত ঘুম দিয়েই আবার বসে পরে, আস্তে আস্তে বন্ধুর সংখ্যাও এখন বেড়ে প্রায় দুশো ছাড়িয়েছে। এখন আবার সেই ছাত্র বয়সর মত নিজের অন্তর থেকেই যেন কিছু একটা লেখার তাগিদ অনুভব করে। অবসর সময়ে আস্তে আস্তে তিন চার দিন ধরে লিখল একটা ছোট গল্প ‘রায়কতপাড়ার রূপকথারা’ আর পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গেই ভালোই সাড়া পেল। অনেকেই কমেন্ট দিল ‘বা! বেশ হয়েছে’ বা ‘সুন্দর লিখেছেন’ গোছের। গল্পটা আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগের একটা ঘটনা, জলপাইগুরি শহরের রায়কতপাড়ার একটা ডানপিঠে মেয়েকে নিয়ে, যে সেই সময়ে মেয়ে হয়েও গাছে উঠে আম পাড়তো, সাইকেল চালাতো, পুকুরে সাঁতার কাটতো আর ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলত। যথারীতি সবাই কমেন্টও দিল, অথচ দুদিন হয়ে গেল তার ফ্যানের কোন খবর নেই কেন? মনে মনে ভাবে সুকমল। শতরূপার ফোন নাম্বার টাও নেয়নি ও কোনদিন। চারদিন পরে শতরূপাকে অনলাইনে পেয়েই জিগ্যেস করল “কি খবর রে তোর? কদিন ধরে দেখাই নেই?” ততক্ষনে অপর প্রান্ত থেকেও মেসেজ চলে এসেছে “মায়ের শরীরটা একটু খারাপ হয়েছে, তাই কদিন বসতে পারিনি তবে ডাক্তার বলেছেন চিন্তার কিছু নেই…… একে তো শরীর খারাপ, তারপর বারবার মা তোমার লেখা ঐ গল্পটা পড়তে চাইছে, যখনই তোমার লেখাটা পড়ছে, মায়ের চোখ মুখ যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে, আর চোখ দুটো ছল ছল করে উঠছে। আমি আড়াল থেকে দেখি মা কাঁদছে।” সুকমল অবাক হয়ে যায়, লেখাটা তো পুরোটাই কমেডি, চোখের জল পরবে কেন? তাছাড়া সে এমন কিছু লেখক নয় যে তার লেখা কাউকে হাসাবে, কাঁদাবে বা ভাবাবে। শতরূপাকে একথা জানাতেই ওদিক থেকে আবার মেসেজ এল
“না গো কাকু, যখনই তোমার লেখাটা পড়ছে, মায়ের চোখ মুখ যেন কেমন হয়ে যায়, মা বলছিল যদি ভদ্রলোকের সঙ্গে একবার দেখা করা যেত… কাকু, তোমার কি একটু সময় হবে? একবার আমাদের বাড়িতে এস না প্লিজ।” সুকমল কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না যে তার মত একজন অতি নগন্য লেখকের লেখা এভাবে কাউকে নাড়া দিতে পরে। জীবনে এই প্রথম, এই পৃথিবীতে কেউ একজন ‘লেখক সুকমল ঘোষের’ সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছে। ও ঠিক করল ও অবশ্যই যাবে, ওর উপস্থিতি যদি একজন অসুস্থ মানুষেকে কিছুক্ষনের জন্যও আনন্দ দেয় তাহলেই ও নিজেকে কৃতার্থ্য মনে করবে। সেই অনুযাই ওরা পরস্পরের ফোন নম্বর নিয়ে নিল এবং ঠিক হ’ল আগামী রবিবার বেলা চারটের সময় শতরূপা বারুইপুর স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাড়িয়ে থাকবে।
যথা সময়ে ডাউন প্লাটফর্মে নেমে ওভার ব্রীজ দিয়ে এক নম্বর প্লাটফর্ম দিয়ে বেরোতে গিয়েই দেখলো শতরূপা কাউন্টার থেকে হাসতে হাসতে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। দুজনেই দুজনের বিভিন্ন ছবি ফেসবুকে এত দেখেছে যে পরস্পরকে চিনতে সামান্য অসুবিধাও হ’ল না। স্টেশন থেকে বেরিয়ে ওরা একটা রিকশায় উঠলো, যেতে যেতে একথা সেকথার মধ্যে শতরূপা বললো, “মায়ের কাছে শুনেছি মা তার ছোটবলায় একটা সময় কয়েক বছর জলপাইগুরিতে ছিলো। তোমার গল্পে হয়তো সেই শহরটাকে মনে পরে যায়, আর ছোটবেলার সেই স্মৃতি মনে পরতেই হয়তো তার চোখ দুটো ভিজে যায়”, সুকমল চমকে ওঠে কিন্তু শতরূপাকে জানতে দেয় না, মনে মনে ভাবে সে নিজেও তো ছোটবেলায় একসময় জলপাইগুরি শহরেই ছিল। মিনিট দশেক লাগলো। শতরূপা বললো “নামো কাকু এই সাদা বাড়িটা”, একতলা ছোট্ট বাড়িটাতে মালিকের রুচির ছাপ স্পষ্ট । কলিং বেল বাজাতেই কাজের মেয়েটি এসে দরজা খুলে দিল। ভিতরে ঢুকতেই কেমন যেন মন ভালো করা পরিবেশ, খুবই পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর ভাবে সাজানো। ড্রইং রুম পার হয়ে পরদা ঠেলে একটা ঘরে ঢুকতে গিয়ে শতরূপা বলে, “কাকু এই ঘরে এসো।” পিছন পিছন পরদা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই বিছানায় আধশোয়া এক মধ্য বয়সি ভদ্রমহিলা অসুস্থ শরীরে মুখে ম্লান হাসি এনে বললেন, “আয় বুচান…, না না ওখানে নয় এই বিছানাতেই বোস।” বু… চা… ন ? মা মারা যাওয়ার পরে এই পৃথিবীতে ওকে বুচান বলে ডাকার বা তুই বলে সম্বোধন করার তাহলে এখনও একজন আছে ?
“মল্লিকা তু…ই” শতরূপা অবাক হয়ে যায় ওর মা’র নাম তো মল্লিকা নয়!
“তোমরা গল্প করো, আমি চা করে নিয়ে আসি” শতরূপা বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
“কতদিন পরে তোকে দেখলাম, নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না, আসলে তোকে বুচান বলেই ডেকেছি বরাবর, তোর আসল নামটাই ভুলে গেছি, কিন্তু এই গল্পটা পড়ার পরই তোর পরিচয়টা আমার কাছে পরিস্কার হয়ে গেল” বলে মল্লিকা।
চুপ করে সব শুনে যায় সুকমল। কত দিনের পুরনো সব কথা, অথচ এখনও সব কিছু যেন সিনেমার মতো পরিস্কার সব চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।
“এক সময় তুই তো আমার কম চোখের জল ফেলাস নি ? তুই ভালো করেই জানিস, আমাকে সব ছেলেরাই ভয় পেতো একমাত্র, তোকেই আমি কেন জানিনা কিছু বলতে পারতাম না, তোর হাতে মার খেয়ে চোখের জল ফেলেও চুপ করে থাকতাম।”
এবার মল্লিকা বেশ জোরে হেসে বলল, “আচ্ছা আমার মল্লিকা নামটা কি করে হ’ল তোর মনে আছে? তখনকার দিনে মেয়েরা পনের বছর বয়স হলেই শাড়ি পরতো, আমি কিন্তু তখনও ছেলেদের মতো প্যান্ট শার্ট পরে যাচ্ছি, সেবার সরস্বতী পূজোয় আমাকে শাড়ি পরতে দেখে তুই বলেছিলি .. ‘আমার মল্লিকা বনে যখন প্রথম ধরেছে কলি’ সেই থেকে তুই আমকে ‘আমার মল্লিকা’ বলে ডাকতিস, মনে আছে সেকথা ?”
“আজ সকালে কি দিয়ে ভাত খেয়েছি জিগ্যেস করলে বলতে পারবো না, কিন্তু সেদিন তুই তোর মা’র একটা নীল রঙ্গের শিল্কের শাড়ি পরেছিলি সেকথা আজও মনে আছে”
এই সময়ে শতরূপা চা নিয়ে ঘরে ঢুকে,অনেকদিন পর মাকে বেশ জোরে জোরে প্রান খুলে হাসতে দেখলো।
“শ্রী কুঞ্জ বিহারী সিংহ”

( একটি ছোট গল্প)

--নারায়ণ রায়

বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। রমেনের বয়স তখন মাত্র ২৪ কি ২৫ বছর। বি কম পাশ করে সবে একটা সওদাগরি অফিসে ‘অ্যাকাউন্টস এসিসট্যান্ট’ হিসেবে চাকরীতে ঢুকেছে । ওর অফিসটা শহর থেকে একটু দুরে কলকাতার উপকন্ঠে। প্রায় দশ-বারো একর জমির উপর একটা ছোট খাটো রেডিমেড পোশাকের কারখানা। অবশ্য কারখানা বলতে আমাদের চোখের সামনে যে ছবিটা ভেসে ওঠে এই অফিসের পরিবেশটা ঠিক সেরকম নয় । এই অফিসের পরিবেশটা রমেনের বেশ ভালো লাগে। মূল কাখানায় আলাদা কয়েকটা শেড আছে, কাটিং সেকশন, স্টিচিং সেকশন, প্যাকেজিং, স্টোর ইত্যাদি। এছাড়া একটি অফিস বিল্ডিং, ক্যান্টিন, গেস্ট হাউসও আছে। আর রয়েছে ক্যাম্পাসের মধ্যেই একটি বাঁধানো ঘাট সমেত পুকুর ও বেশ কিছু ফল ও ফুলের গাছপালা। পরিবেশটা এতোটাই মনোরম যে শীতকালে মালিকের জানাশোনা অনেকে এখানে পিকনিক করে আসে। রমেনের বাড়ি কলকাতা থেকে বেশ কিছুটা দুরে একটা জেলা শহরে, তাই অফিসের কাছেই স্টেশনের পাশে ওরা অফিসরই ক’জনে মিলে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে মেসের মত করে থাকে। রমেনের বাড়ির আর্থিক অবস্থা মোটামুটি খারাপ নয় অর্থাত তার আয়ের উপর সংসার নির্ভরশীল নয়। তাই সংসারের প্রতি সেই অর্থে কোন দায়িত্ব পালন করার প্রয়োজন হয় না। আর সেই জন্যই বোধ হয় রমেনের মত ছেলেদের চাকরীর এই প্রথম জীবনটাই সব চেয়ে সুখের। একলা মানুষ, আর্থিক স্বাধীনতা আছে অথচ ঘাড়ের উপর সংসার নামক জোয়াল টানার দায় নেই। বয়সটাও আনন্দ করারই বয়স, যাকে বলে মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলরের জীবন।
অল্প দিনের চাকরীতেই রমেনের বেশ সুনাম হয়েছে অফিসে। শান্ত, নম্র, ভদ্র রমেনকে ওর বড়বাবু নিতাইবাবু কিম্বা উপরওয়ালারা যখনই যা কাজ দেন নিষ্ঠার সঙ্গে তা পলন করে রমেন।
অফিসে ঢুকে প্রথম বড় ঘরটির চার পাঁচটি চেয়ার টেবিলের প্রথমিতেই বসে রমেন, পাশা পাশি ওর কয়েক জন সহকর্মী ও একটি কিউবিক্লের মধ্যে বসেন বড়বাবু নিতাই চন্দ্র জোয়ারদার। এহেন রমেন একদিন যখন অফিসের কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ওর সামনে এসে দাঁড়ালো সেই লোকটি। রমেন মাথা তুলে লোকটিকে দেখেই বুঝতে পারলো সে অফিসের কোনও কর্মী নয়, তাই রমেন মুখ তুলে ভালো করে একবার লোকটিকে দেখে নিলো তারপর জিজ্ঞেস করলো- “কি চাই বলুন?” পৃথিবীতে কিছু কিছু লোক থাকেন যাদেরকে কোনমতেই সুন্দর দেখতে বলা যাবে না, অথচ তাদের দুটি চোখ আর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হওয়াও যায় না। লোকটির গাত্রবর্ণ বেশ কালো, শীর্ন ও ছোটখাটো চেহারার, অতি সাধারন পোষাক পরিহিত এবং সাতদিনের না কামানো কাঁচা পাকা দাড়ি শোভিত মুখে একাদশীর চাঁদের ন্যায় একফালি দাঁত বার করে, অদ্ভুত একটি মায়াবি হাসি হেসে হাত দুটি জোড় করে বললো, “আজ্ঞে আমার নাম শ্রী কুঞ্জ বিহারী সিংহ।” রমেন কোনরকমে তার হাসিটি চেপে জিগ্যেস করলো “কিন্তু এখানে কি চাই?” কুঞ্জবিহারীর চটপট জবাব “ আজ্ঞে কাজ।” কথাটা লোকটা এত সহজ ভাবে বলল যেন এক গ্লাস জল খেতে চাইল। রমেনের মত একজন অতি নবীন কর্মচারীর পক্ষে এইরকম একজন ব্যক্তিকে অফিসের চাকরী সংক্রান্ত ব্যাপরে কি বলা উচিত যখন এইসব ভাবছে, ঠিক তখনই বড়বাবু নিতাই চন্দ্র জোয়ারদার মশাই তার ঘর থেকে বেরিয়ে সাহেবের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন। নিতাইবাবু কিছু বলার আগেই লোকটি হাত দুটি জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলল “আজ্ঞে আমি শ্রী কুঞ্জ বিহারী সিংহ।” নিতাইবাবু উভয়ের কাছ থেকে ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে বললেন “দেখ বাপু আজকাল চাকরী কি এতই সহজ? আমাদের কাজ আছে এখন তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় নেই, তুমি এখন এসো বাপু।” “আঙ্জ্ঞে আমি সব কাজ পারি, রান্না করা, জামা কাপড় কাচা থেকে শুরু করে সব রকমের কাজ…. ছেলেমেয়ে গুলো আমার না খেতে পেয়ে মরতে বসেছে বাবু…. একটু দেখুন না বাবু!” নাছোড়বান্দা কুঞ্জবিহারীকে বোঝাতে হিমসিম খেয়ে দুজনায় যখন নাজেহাল তখন খোদ বড় সাহেব বেরিয়ে এলেন তাঁর ঘর থেকে। একটা সময় তারা সবাই বুঝতে পারলেন যে কুঞ্জবিহারীকে পরাস্ত এক কথায় অসম্ভব। তখন সাহেব ঠিক করলেন, নিয়মিত চাকরী দেয়া যেহেতু সম্ভব নয়, তাই কুঞ্জবিহারী প্রতিদিন অফিসে এসে অপেক্ষা করবে এবং যেদিন যেমন প্রয়োজন সেইমত ওকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া হবে আর সপ্তাহান্তে ওকে দৈনিক ভিত্তিতে ভাউচারে পেমেন্ট করা হবে। সেই অনুযায়ী কুঞ্জবিহারীকে দিয়ে কয়েকটি কাগজ-পত্রে সই করিয়ে নেয়া হ’ল এবং সর্বত্র সে একই ভাবে সাক্ষর করল …. শ্রী কুঞ্জ বিহারী সিংহ।
যথারীতি কুঞ্জবিহারী পরদিন বেলা দশটার অনেক আগেই অফিসে এসে হাজির…. দুই-চার দিনের মধ্যেই অফিসের সবাই বুঝতে পারলো যে কুঞ্জ বিহারী সত্যিই বেশ কাজের লোক, মোটামুটি সব ধরনের কাজই সে জানে। বেশ চটপটে, কোন কাজেই তার না নেই, এই ফিল্টারে জল ভরে দিচ্ছে তো পরক্ষনেই ক্যান্টিন থেকে বাবুদের চা বিস্কুট এনে দিচ্ছে। এমনকি ঝাড়ুদার না এলে পুরো অফিসটা ঝাঁট দিয়ে দেয় এক নিমেষে। এখন আর দুপুরে বাবুরা ক্যান্টিনে খেতে যান না, কুঞ্জ বিহারীই সবার খাবার বয়ে নিয়ে আসে ক্যান্টিন থেকে। আসলে টিফিন কিম্বা দুপুরের খাবার যাই হোক না কেন, সবার খাবার থেকে একটু করে ভাগ পেলেই ওর নিজের খাবারটা হয়ে যায়। আর সপ্তাহান্তে অফিস থেকে পাঁচ-সাতশো যা পায় সেটা তো আছেই। তেমন সুযোগ পেলে কোন কোন দিন ক্যান্টিনের বাড়তি খাবার চেয়ে নিয়ে বাড়ি নিয়ে যায়, কেউ কিছু জিগ্যেস করলে বলে, “কি করব? অনেকগুলো ছেলেপুলে!” যদি কেউ বলে-“এ যুগে এত ছেলে পুলে নিয়েছ কেন, কুঞ্জ বিহারী?” কুঞ্জ তার উত্তর দেয় –“কি আর করব বলুন সবই ভগবানের দান।” আস্তে আস্তে তার সদা হাস্যময় মুখ আর কাজের প্রতি নিষ্ঠার জন্য কুঞ্জ বিহারী অফিসে সবার কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল, আবার অন্যদিকে সবার কাছে এটা ওটা, অর্থাৎ টাকা পয়সা, পুরানো জামা-কাপড়, খাবার-দাবার চেয়ে বেরানোটাও অনেকের বিরক্তির কারণ হয়ে দাড়ালো। অনেকেই বলতে লাগলো কুঞ্জর অনেক গুন আছে বটে কিন্তু ওর এই উঞ্ছবৃত্তিটা মোটেও ভালো লাগে না। কুঞ্জ বিহারীর কানে এসব কথা গেলেও সে তার ওই মায়াবি হাসিটা দিয়ে বলে “কি করব বলুন? অনেকগুলো ছেলেপুলে!” তবে ইদানিং কুঞ্জর প্রায়ই অফিসে আসতে দেরী হয়, একদিন বড় সাহেব বকাবকি দেয়ার ফলে বলল, “কি করব বলুন স্যার একটা চাকরীতে এতবড় সংসার আর টানতে পারছি না, তাই সকালে একটা বাড়িতে কাজ নিয়েছি, সেখানে সকালে ঝাঁট দেয়া, পাম্প চালিয়ে জল ভরে বাবুদের ফাইফরমাস খেটে আসতে আসতে একটু দেরী হয়ে যায়। কি করব বলুন অনেকগুলো ছেলেপুলে!”
দেখতে দেখতে প্রায় দুবছর হ’ল, আজকাল রমেন বুঝতে পারে কুঞ্জর শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না, কাজে কর্মে সেই উৎসাহটাও যেন আস্তে আস্তে হরিয়ে ফেলেছে, কেমন যেন অন্যমনস্ক ভাব, একমাত্র রমেনই ওকে সন্মান করে কুঞ্জদা বলে, তাই একদিন রমেন বলল, “কুঞ্জদা এবার তুমি অবসর নাও, তোমার বয়স হয়েছে, চিরদিন তো আর মানুষ খাটতে পারে না? তোমার তো অনেকগুলো ছেলেপুলে? বড় সাহেবকে বলে তাদের একজনকে এই কাজে লাগিয়ে দাও।” কুঞ্জ ম্লান হেসে উত্তর দেয় “আসলে ছেলেগুলো বড্ড ছোট, তাদেরতো এখনও কাজ করার বয়সই হয়নি।” রমেনের কাছে কথাটা কেমন যেন হেঁয়ালী বলে মনে হয়, একজন ষাট পঁয়ষট্টি বছরের লোকের সন্তানরা কতই বা ছোট হতে পারে? কিন্তু এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার মনে করে রমেন আর এ ব্যাপারে এগোতে চাইলো না। এর কদিন পর থেকেই হটাৎ দেখা গেল কুঞ্জ বিহারী আর অফিসে আসছেই না। একদিন গেল, দুদিন গেল, চারদিন গেল… না কুঞ্জর কোন দেখা নেই। অফিসেরও এ ব্যাপারে কোন দায় নেই কারণ কুঞ্জ ছিল একেবারে ক্যাজুয়াল কর্মী, কাজ করলে পয়সা নইলে নয়, বরং হিসেব করে দেখা গেল কুঞ্জই অফিসের কাছে পাঁচদিনের টাকা পাবে। অফিসের অনেকে তো খোলাখুলি বলতেই লাগলো যে, যাক পাগলটা এতদিনে বিদায় হয়েছে। একমাত্র রমেনের কেন জানিনা কুঞ্জর প্রতি একটা মায়া পড়ে গেছে, রমেনের কাছে ওর একটা ঠিকানা আছে, শ্যামবাজার এলাকার একটা ঠিকানা। রমেন মনে মনে ভাবলো, ‘এই সপ্তাহটা দেখা যাক, সামনের সোমবার নাগাদ গিয়ে একটু খবর নেবার চেষ্টা করব।’
সোমবার সকাল, আবার একটা সপ্তাহ সুরু হ’ল, প্রতিদিনের অভ্যেস মত চান করতে যাবার আগে চা-এর কাপটা নিয়ে খবরের কাগজটা হাতে তুলে নেয় রমেন। ‘দুর দুর…. আজকাল খবর মানেই যত্ত সব খুন ধষর্ন’ কাগজের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আপন মনে বিড় বিড় করে রমেন। যাই হোক ওদিকে আবার বাথরুমে একজন ঢুকেছে সে না বের হলে রমেন চান করতে যেতেও পারছে না। হটাৎ তার চোখ আটকে যায় কাগজের ছয়ের পাতায়। ‘এ কি? এ তো কুঞ্জর ছবি?’ খবরের শিরোনাম.. “চলে গেলেন পথ-দাদু” – উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর এলাকায় অসংখ্য পথশিশুর দায়িত্ব নিতেন যিনি হাসিমুখে, এলাকায় পথ-দাদু নামে পরিচিত কুঞ্জ বিহারী সিংহ (৬৫)গতকাল আর জি কর মেডিকেল কলেজে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। গত এক সপ্তাহ তিনি অসুস্থ ছিলেন। অকৃতদার প্রবীন কুঞ্জবাবু সারাদিন বিভিন্ন দোকানে বাড়িতে বা অফিসে কাজ করে যে অর্থ উপার্জন করতেন তার সবটাই এলাকায় পথশিশুদের খাবার, পোশাক ও পড়াশুনার জন্য খরচ করতেন। এলাকায় তিনি সবার ‘পথ-দাদু’ নামে পরিচিত ছিলেন। শ্রী কুঞ্জবিহারী সিংহের ইচ্ছানুযায়ী এন আর এস হাসপাতালে তাঁর চক্ষু ও দেহ দান করা হয়েছে।
“"পটাইবাবুর নিরুদ্দেশ যাত্রা"”

( একটি রম্য রচনামূলক ছোট গল্প )

-- নারায়ণ রায়

পটাইবাবু গত কদিন ধরে নিখোঁজ, কিম্বা নিরুদ্দেশ বলা যেতে পারে। সাতদিন অপেক্ষার পর অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্বেও, নিতান্তই বন্ধুদের পরামর্শে তার পুত্র অনাদীচরণ স্থানীয় কোতোয়ালিতে গিয়ে একটা নিখোঁজ ডায়েরী করে এলেন। আসলে সবাই তাকে বোঝালো যে, ডেথ সারটিফিকেটের ন্যায় নিখোঁজ ডায়েরীর কপিও ভবিষ্যতে অনেক সময়ে, বিভিন্ন বৈষয়িক কাজে ভীষন ভাবে প্রয়োজনে লাগতে পারে। তবে এতকিছু ঘটার পরেও পাড়ার লোকজন কিন্তু কেউই সেভাবে জানতে পারলো না যে, তাঁর বাড়িতে এতবড় একটা অঘটন ঘটে গেছে। সেদিন পটাইবাবুর সব চেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু লাটাইবাবু, অনাদীচরণকে তার পিতৃদেবের এই আকস্মিক অনুপস্থিতির কারন জানতে চাওয়ায় উত্তর পেলেন, পটাইবাবু তীর্থ দশর্নে গেছেন। এ কথা শ্রবণ করে লাটাইবাবু যার পর নাই বিষ্মিত হলেন, যে পটাইবাবু পাড়ার মন্দিরে কদাপি পঞ্চাশ পয়সাও প্রনামী দেননা, তার এহেন ঈশ্বর ভক্তির কারন কি, সেটি অনেক চেষ্টা করেও লাটাইবাবুর বোধগম্য হ’ল না । এদিকে অনাদীচরণ যথারীতি তার ঘরে, মিউজিক সিস্টেমে ‘ধানী-পটকা’ ব্যান্ডের ‘শশ্মানে অশান্তি’ অ্যালবামটি তারস্বরে চালিয়ে দিয়ে দুবাহু এবং পদযুগল আন্দোলিত করে অবিরাম নৃত্ত করে চলেছেন। পটাইবাবুর একমাত্র কন্যা রটন্তীও যথারীতি জিনস্ আর টপ পরিধান করে, অধর এবং মুখমন্ডল রঞ্জিত করে, নিয়ম মত অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে সিটি সেন্টার, আইনক্স কিম্বা সাউথ সিটিতে হাজিরা দানের কতর্ব্য পালন করে চলেছেন। পটাইবাবুর স্ত্রী পুটিরানী মনে মনে ভাবছেন, যাক ক’দিনের জন্য অনন্ত কিপ্টে বুড়োটার হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেছে, দুবেলা কাঁচা পেপের তরকারি খেয়ে খেয়ে মুখটা একেবারে হেদিয়ে গেছে, এবং মনের আনন্দে রসুই কক্ষে দুইবেলা পাঁঠার মাংস, লুচি ও পলান্ন রন্ধনে ব্যস্ত রয়েছেন। এমতাবস্থায় নিরুদ্দেশের নবম দিবস সকাল ন’টা নাগাদ পটাইবাবু, বড়ই প্রফুল্ল চিত্তে ঘন্টুরানীকে সঙ্গে নিয়ে হাওড়া স্টেশনে অবতরন ক’রলেন। এমন আনন্দদায়ক সকাল তিনি তাঁর জীবদ্দশায় পূর্বে কখনো দেখেছেন বলে স্মরন করতে পারলেন না। স্বল্প বয়সে শরীর এবং মনে বারংবার পুলক জাগলেও, প্রেম নামক বস্তুটির সঙ্গে কদাপি পরিচিত হ’বার সুযোগ পান নি। কিন্তু এই বৃদ্ধ বয়সে একজন পরনারীর সঙ্গে স্ত্রীর চক্ষু ফাঁকি দিয়ে সমুদ্র দশর্নের যে এইরূপ আনন্দ, তাহা আবিস্কার ক’রে যুদ্ধ জয়ের আনন্দে ঘন্টুরানীকে নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে, ঘন্টুরানীর কাঁধে হাত রেখে সকালের কলকাতা দশর্ন করতে করতে গৃহ অভিমুখে রওনা দিলেন। অবশেষে রাসবিহারীর মোড়ে পৌছে যথারীতি ট্যাক্সিটি ছেড়ে দিলেন, অবাঙ্গালী ট্যাক্সি চালক যখন বললেন, “বাবু আপ পঁচাস রূপাইয়া য্যাদা দে দিয়া”, চিরকালের কিপ্টে বলে পরিচিত পটাইবাবু তার উত্তরে বললেন, “ইয়ে তুমহারা বকশিস হায়।” ঘন্টুরানীর বাড়ি এসে গেছে, তাঁকে বিদায় দেবার কালে পটাইবাবুর সম্প্রতি ইংরাজী সিনেমাতে দেখা দৃশ্যের ন্যায় ঘন্টুরানীকে দুহাত বাড়িয়ে হাগ করবেন ভেবে, দুহাত বাড়াতেই ঘন্টুরানী টা টা বাই বাই বলে সুরুৎ ক’রে ছিটকে গিয়ে গলির মধ্যে মিলিয়ে গেলেন। অগত্যা পটাইবাবু তার গৃহের উদ্দেশ্যে একটি বেহালা গামী বাসে উঠে বসলেন। পাড়ায় পৌছতেই একটা ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন যে, নয়দিন আগে এই পাড়াকে যে অবস্থায় তিনি দেখে গিয়েছিলেন, বতর্মানে তার বিশেষ কোন উনিশ বিশ হয়নি। তাঁর গৃহের নিকট পৌছতেই বুঝতে পারলেন যে তাঁর স্ত্রী, পুত্র এবং কলত্র বেশ আনন্দেই আছেন। বাইরে থেকেই একতলার ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলেন যে তাঁর কন্যা রটন্তী, মুখে আপেলের খোসা এবং শশা বাটার প্রলেপ লাগিয়ে চক্ষু বুজে ত্বক চর্চায় ব্যস্ত। পুত্রের ঘর থেকে নিগর্ত ‘ধানি পটকা’ ব্যান্ডের ‘শ্মশানে অশান্তি’ অ্যালবামের উচ্চ নাদ শ্রবণ করে তিনি যার পর নাই পুলকিত হলেন। মনে মনে ভাবলেন, যাক--তাহলে তিনি যে এই কদিন ঘন্টুরানীকে সঙ্গে নিয়ে পুরী ভ্রমনে গিয়েছিলেন, সেটা তাহলে বাড়ীর লোকেরা কেউ টেরটি পায় নি। তখন পটাইবাবু মনের আনন্দে গুন গুন করে “মন চলো নিজ নিকেতনে..” গানটি গাইতে গাইতে আস্তে আস্তে পিছনের দরজা দিয়ে এক পা এক পা করে গৃহে প্রবেশ করলেন এবং দেখে অবাক হয়ে গেলেন যে … সমগ্র গৃহে একমাত্র তাঁর অধার্ঙ্গিনী পুটিবালাই অধোবদনে ফোস ফোস করে চোখর জল ফেলে ক্রন্দনরত অবস্থায় কাজ করে চলেছেন। এই দৃশ্য দশর্ন করে পটাইবাবুর নিজেকে বড়ই অপরাধী বলে মনে হ’ল। তাঁর এইরূপ সতী লক্ষ্মী স্ত্রীর প্রতি তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, তাঁর নরকেও স্থান হওয়া উচিৎ নয়। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম তিনি আবিস্কার করলেন পুটিরানী তাকে কতোটা ভালোবাসেন, আর এতদিন তার এই সতী লক্ষ্মী অর্ধাঙ্গিনীকে ভূল বোঝার জন্য মনে মনে তিনি নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলেন। হটাৎ পুত্রের ঘরে অ্যালবাম থেমে গেল, চারিদিক নিস্তব্ধ, ইংরাজিতে যাকে বলে ‘পিন ড্রপ সাইলেন্স’, সেই মুহূর্তে সমগ্র গৃহে এক শোকের পরিবেশ, পুটিরানী তখনও নিরবে অশ্রুবষর্ন করে চলেছেন। ঠিক সেই সময়ে তাঁর পুত্র অনাদীচরণ তার জঠর জ্বালা নিবারনের জন্য রসুই কক্ষের দিকে ধাবিত হচ্ছিলেন, এমন সময়ে তার পিতৃদেবকে অঙ্গনে দন্ডায়মান দেখে ভূত দশর্নের ন্যায় চমকিত হলেন এবং সোচ্চারে বলে উঠলেন “বাবা তুমি….. ?” পুটিবালার কর্ণে এই কথা যাইবা মাত্র, গৃহে যেন একটি তিনশো ডেসিবেলের বোমা বিস্ফোরিত হ’ল। -- “ওরে, মুখ পোড়া মিনসে….তুই ফিরে এসেছিস?” সজোরে এই কথা বলে হাতের নিকটে থাকা রুটি বেলার বেলনটাকে ধাইইইই করে ছুড়ে মারলেন পটাইবাবুকে লক্ষ্য করে। পটাইবাবু কোনক্রমে নিজের মাথাটি সরিয়ে নিয়ে সে যাত্রায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়ে ভাবলেন, আহা স্বামীর বিরহে বেচারী পুটিরানীর মাথাটাই বুঝি গেছে, আর মুখে বললেন, “এ কি করো গিন্নী? এখনই তো তুমি বিধবা হয়ে যাচ্ছিলে ?” পুটিরানী ততোধিক উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আমি তো সেটাই চাই রে মুখপোড়া, আমি ভাবলাম তুই ঘন্টুকে নিয়ে পুরীতেই ঘর বেঁধে থেকে যাবি, আর আমারও হাড়ে বাতাস লাগবে। নেহাত পাঁঠার মাংস রান্নার জন্য পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে চোখদুটো জলে ঝাপসা হয়ে গেছিল, তাই বেলনটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হ’ল, তা না হলে আজ তোকে আমি খুনই করে ফেলতাম।”
““পরাণের দাম””
ভোর পাঁচটা বাজে, অন্য দিনের মত পঞ্চা দোকান খুলে ঝাট দিয়ে, উনুন জ্বেলে উনুনের উপর তিনদিকে তিনটে জলভর্তি কেটলি চাপিয়ে মিনিট দুই জিরিয়ে নিল। এবার বিস্কুট, পাউরুটি আর ডিমের জায়গা গুলো ঠিক ঠিক জায়গায় সাজিয়ে নিল। এরপর আর একবার হাত ধুয়ে ধূপ জ্বেলে দোকানে বসেই হাতটা আরতি করার মত কয়েকবার ঘুরিয়ে নিল তারপর ছোট্ট লক্ষ্মী মূর্তিটার নীচে গুঁজে দিয়ে প্রায় মিনিট খানেক হাত জোড় করে চোখ বুজে বসে থাকলো। আস্তে আস্তে দিনের আলো পরিষ্কার হচ্ছে, এদিকে জলও ফুটতে শুরু করেছে।
সকাল বেলার পরিচিত দৈনিক খরিদ্দাররা একে একে আসতে সুরু করেছে। এলাকার প্রতিটি খদ্দেরের নাড়ী নক্ষত্র পঞ্চার মুখস্থ, যেমন ঐ যে ছোটখাটো চেহারার লুঙ্গি পরা ছেলেটা? ওর নাম হরেন, ও এক কাপ চা আর একটা টোস্ট বিস্কুট খাবে তারপর এক প্যাকেট এরোপ্লেন ছাপ বিড়ি নিয়ে একটি বিড়ি ধরিয়ে চলে যাবে ঐ বহুতল নির্মানের সাইটে। ওখানে হরেন কাঠমিস্ত্রীর জোগাড়ের কাজ করে। হরেনের চা শেষ হওয়ার আগেই নিয়ামত এসে হাজির।
“কি রে নিয়ামত ? তুই আজ এত তারাতারি?” পঞ্চার প্রশ্নের উত্তরে নিয়ামৎ বলে, “ভুলে গেলে পঞ্চাকাকা, আজ শনিবার নারকেলডাঙ্গার খাসির হাট” এ কথা বলে পঞ্চার দোকানের বাঁদিকের চেরাই বাঁশের তৈরী বেঞ্চিটাতে দুটো পা তুলে আরাম করে বসতেই পঞ্চা একটা কেক ধরিয়ে দিল হাতে, কেকটায় যখন শেষ কামড় দেবে তখনই হাতে চায়ের গ্লাসটা এগিয়ে দেবে, আর চা টা শেষ করেই নিয়ামতও আট টাকা মিটিয়ে দিয়ে শহরের দিকে দৌড় লাগাবে, নিয়ামৎ ধুমপান করে না। কিন্তু আজ আর চা খেয়েই উঠে যাওয়া হ’ল না।
ঠিক সেই সময়ে ঝড়ের বেগে রতন চলে এল। এখানে রতনই একমাত্র লোক যে ওই বহুতল নির্মানের কোম্পানিতে সরাসরি মাস মাইনের চাকরী করে। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ রতন ছোটখাটো রং মিস্ত্রির ঠিকাদার হিসেবে জীবন সুরু করে নিজ যোগ্যতায় এখন ঐ কোম্পানীর সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত। তবে এখনও মিস্ত্রিদের সঙ্গে ভাড়ায় উঠে নিজে হাতেও কাজ করে। পৃথিবীতে সর্বত্রই এমন কিছু লোক থাকে তারা যেখানেই যায় মুহূর্তেই সবার নজর কেড়ে নেয় ইংরাজীতে যাকে বলে ‘Steals the show’। বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান, বছর পঁয়ত্রিশ বয়সের রতন এই পাঁচ বছর হ’ল বিয়ে হয়েছে, বছর তিনেকের একটা ফুটফুটে মেয়েও আছে। সব সময় ফুর্তিতে থাকা সেই রতন সাইকেলটা একটা খুটিতে ঠেস দিয়ে রেখেই ঝড়ের বেগে চিৎকার শুরু করল, “কি গো পঞ্চাদা তারাতারি একটা ডাবল ডিমের টোষ্ট বানাও তো!” বলে নিজেই বয়েম থেকে একটা পাউরুটি বের করে চাকু দিয়ে দু ফালা করে রুটির মধ্যে চাকুটা গুজে দিয়ে উনুন থেকে একটা কেটলি সরিয়ে রুটিটা সেঁকতে শুরু করে দিল। তারপর নিয়ামতের দিকে তাকিয়ে.. চিৎকার করে বলে উঠল,“আরে নিয়ামত ভাই যে? তা আজ এত তারাতারি? ও আজ শনিবার, হুমমম তাইতো বলি আমাদের নিয়ামত ভাই একবার ছাগলের গলায় চাকু বোলায় আর একবার আমাদের পকেটে চাকু বোলায় আর দেখতে দেখতে নিয়ামতের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে” এই বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করে হেসে উঠলো। নিয়ামত বলল, “দুনিয়াটা অত সহজ না, এ তোমার ঐ ফ্লাট বাড়ির রং-এর কাজ নয় যে, কোন রকমে দু পোচ মেরে দিয়েই দশ হাজার টাকার বিল করে দিলাম, আর লোক ঢোকার আগেই রং উঠে গেল।” হা হা হা করে উচ্চ স্বরে হেসে রতন নিয়ামতকে বলল, “তুই চারশো পঞ্চাশ টাকা কেজি তে তো মাংস বিক্রি করিস, মানে কুড়ি কেজি মংসের একটা খাসির দাম নয়হাজার টাকা? তা তোর নিজের পরাণের দাম কত?” বলেই আবার হো হো করে হেসে উঠলো রতন, আবার জিগ্যেস করে, “তা তুই খাসি কত করে কেজি কিনিস?”
এবার নিয়ামতের হাসির পালা, রতনকে তুচ্ছ করে হাসতে হাসতে বলল, “কথায় বলে না যে, যার কাজ তারেই সাজে অন্য লোকে লাঠি বাজে, তোমার ঐ দেওয়ালের রং নিয়েই তুমি থাকো… আরে বাবা জ্যান্ত খাসি ওজনে বিক্রি হয়না। আমরা থামকো কিনি, তাই অনেক সময় লসও হয়।” হরেন এতক্ষন কোন কথা না বলে ফুক ফুক করে বিড়িতে সুখ টান দিয়ে যাচ্ছিল, সে এতক্ষনে একটু নড়ে চড়ে বসে বলল, “এটা তুমি জব্বর বলেছো রতনদা, নিয়ামতের একটা খাসির পরাণের দাম নয় হাজার টাকা হলে নিয়ামতের নিজের পরাণের দাম কত?...” বলেই হরেন আবার তার সুখটানে নজর দিল। একে একে খগেন, গনশা, আকিব সবাই হাজির। তারাও যে যার মত আলোচনায় অংশ নিচ্ছিল। যাই হোক আলোচনা ভালই এগোচ্ছিল, তবে ঘড়ি ধরে যার যার কাজে বেরিয়ে যেতে হবে… তাই সাইকেলে উঠতে উঠতে রতন বলে গেল….. “ঠিক আছে নিয়ামত, আজ তোর একটা খাসির পরাণের দাম জানলাম নয় হজার টাকা, কাল তোর নিজের পরাণের দাম কত হিসেব করব।”…. আস্তে আস্তে পঞ্চার দোকান একটু ফাঁকা হ’ল। এখন যারা বসে আছে তাদের তেমন কোন তাড়া নেই, ওদের উদ্দেশ্য পঞ্চার দোকানে বসে পাঁচটা গল্প করে সময় কাটানো।
পঞ্চা কাপ ডিস গুলো পরিস্কার করে নিয়ে, আর দোকানটা একটু গুছিয়ে নিয়ে একটু আরাম করে বসল। তারপর হটাৎ কেমন যেন ভাবুক হয়ে গেল…মনের মধ্যেও কত কথা এসে একে একে ভীড় করতে শুরু করল…..আস্তে আস্তে এলাকাটার কি দ্রুত পরিবর্তন হয়ে গেল। এই এলাকাটার একটা অদ্ভুত মিশ্র চরিত্র আছে, পূব দিকের জলা ভেরী গুলোতে এখনও নিয়মিত মাছের চাষ হয়, সকাল বেলায় মাছ ধরা আর তার কেনা বেচা এসব নিয়ে হুরোহুরি পড়ে যায়। ওই দিকটায় সারাদিন কেমন একটা আঁশটে গন্ধ। একটু দুরেই বিশাল বিশাল বহুতল নির্মিত হচ্ছে, এলাকার বেশ কিছু লোক ওখানে কাজ কর্ম করে খাচ্ছে। দেখতে দেখতে কিছুদিনের মধ্যেই ঐসব এলাকায় একটা অন্য জগৎ তৈরী হবে, যেখানে পঞ্চাদের মত মানুষের প্রবেশ নিষেধ। পঞ্চার মনে পড়ে ছোটবেলায় ওর বাবা বলতো কলকাতা যাচ্ছি, ভালো করে খেয়ে দেয়ে পায়ে চটি গলিয়ে ফতুয়াটা গায়ে দিয়ে ছাতা বগলে নিয়ে দুগ্গা দুগ্গা বলে বেরিয়ে পরতো। ফিরে এসে দোতলা বাস, রাস্তার ভীড়, কত বড় বড় বাড়ি এসব গল্প করত, অথচ সেই কলকাতাই এখন রাক্ষসের মত তার আসে পাশের গ্রাম গুলোকে গ্রাস করতে করতে একেবারে পঞ্চাদের গ্রামের নাকের ডগায় চলে এসেছে। তবে খালের এপারটা এখনও গ্রাম, জমির দালালরা এখনও খালের এপারটায় তেমন যাতায়াত শুরু করেনি। অনেকে বলে মাঝখানের ভেরীটাই তার কারণ, অতবড় ভেড়ীটাকে বোজানো নাকি আজকাল আর সম্ভব নয়, পরিবেশ দফ্তর এখন জনগনের চাপে একটু সজাগ হয়েছে। তাই এদিকটা এখনও পুরোপুরি গ্রাম, এলাকায় সবার ঘরে ইলেক্ট্রিক পর্যন্ত আসেনি, তবে অনেকেই বিদ্যুত চুরি করে ঘরে আলো জ্বালে, টি ভি চালায়, মোবাইলে চার্জ দেয়। এখনও বেশিরভাগ লোকের বাড়িতে হাঁস মুরগী চরে, অনেকের বাড়িতেই গরুও আছে।
তবে হ্যাঁ, এলাকার লোকেদের হাতে দুটো পয়সাও হয়েছে। গ্রামে এখন ঘরে ঘরে বাইক, সবার হাতে মোবাইল, মেয়েরা সল্ট লেকে সুপার মার্কেটে যায়, রং বে রং-এর ঘড়ি, চুড়ি, ফুলপ্যান্ট পরে। দেখতে দেখতে চেনা যায়গাটা কেমন যেন অচেনা হয়ে যাচ্ছে। আর এত কিছু পাওয়ার মধ্যেও সর্বদা সেই ভয়টা কাজ করে, মাঝে মাঝেই দলাদলি, হানাহানি, খুনোখুনি। গ্রামের অনেক ছাপোষা ঘরের মেয়েদের সঙ্গে কলকাতার অনেক বড়লোক ছেলেদের বন্ধুত্ব হয়েছে। রাত্রের দিকে প্রায়ই দামি দামি সব গাড়ি আসে গ্রামে, গ্রামের মেয়েদেরকে তাদের বন্ধুরা বাড়ি পৌছে দিয়ে যায়। অনেকে একেবারে রাত কাবার করে সকালে ফেরে। এই তো কদিন আগে একটা বেশ দামি গাড়িকে তেঁতুল তলায় তিন চার ঘন্টা এক যায়গায় ঠায় দাড়িয়ে থাকতে দেখে গ্রামের ছেলেদের সন্দেহ হয়। কাছে গিয়ে কালো কাঁচে চোখ লাগিয়ে দেখে পিছনের সীটে একটা মেয়ে ঘুমচ্ছে, অনেকক্ষন ডাকাডাকি করেও কোন সাড়া না পেয়ে ছেলেরা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে গাড়ির দরজা ভেঙ্গে দেখে মেয়েটি পাঁচ-ছয় ঘন্টা আগেই মারা গেছে। পরেরদিন খবরের কাগজে জানা যায় যে মেয়েটি দক্ষিন কলকাতার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের।
টুকটাক খদ্দের সামলাতে সামলাতে আর এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে একটা বেজে গেছে খেয়াল করেনি পঞ্চা। এইসময় পঞ্চা দোকান বন্ধ করে একটু বাড়ি যায়, খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার চারটে পাঁচটা নাগাদ দোকান খোলে। আজও সেইরকম উনুনে জল দিয়ে ঝাপ নামিয়ে সবে একটা তালা লাগিয়েছে তখনই আকিব সাইকেলে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবরটা দিল। ‘রতন কাজ করতে করতে পাঁচ তলার ভাড়া থেকে একদম নীচে পড়ে গেছে। ওকে কোম্পানীর লোকেরা বাইপাশের ধারে একটা হাসপাতালে নিয়ে গেছে।’ খবরটা শুনেই পঞ্চা কিছুক্ষণের জন্য কেমন যেন স্থবির হয়ে গেল, তারপর সম্বিৎ ফিরে পেতেই আকিবের সঙ্গে তার সাইকেলের পিছনে বসে হাসপাতালের দিকে রওনা দিল। এটা একটা বেসরকারী হাসপাতাল, বেশ পরিচ্ছন্ন, হাসপাতালের বাইরেই একটা গাছতলায় খগেন, গনশা, হরেন আরও বেশ কিছু লোক মুখ ভার করে বসে আছে। পঞ্চা আর আকিবও তাদের সঙ্গে বসে বসে পরস্পরের দিকে কেমন যেন এক অসহায় মুখ করে তাকিয়ে থাকে। পঞ্চা জানার চেষ্টা করে ঠিক কি হয়েছিল, শরীরের কোথায় কতোটা চোট পেয়েছে এইসব, পঞ্চা এও জানলো যে ওর বাড়িতে এখনও খবর দেওয়া হয়নি। অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে এল সেই চরম সংবাদ। সবাই একসঙ্গে কেঁদে উঠল। কোম্পানীর একজন লোক ওদেরকে হাসপাতাল সীমানার বাইরে নিয়ে গিয়ে এক জায়গায় বসালো এবং ওদের চা বিস্কুট খাওয়ানোর ব্যবস্থা করল। কিন্তু চা খাবার ব্যাপারে কেউ তেমন উৎসাহ দেখালো না।
কিছুক্ষন পরে কোম্পানীর এক বাবু বাইরে এসে বলে গেলেন “আপনারা আর বসে থেকে কি করবেন? আপনারা বরং আজ সবাই বাড়ি চলে যান। রতনের দেহ পেতে আরও ঘন্টা দুই লাগবে, পুলিশ ওর দেহ মর্গে নিয়ে যাবে, পোষ্ট মর্টেমের পর বডি আমাদের হাতে আসতে কাল বেলা এগারোটা-বারোটা হয়ে যাবে, তখন আমরাই ওকে ওর বাড়িতে নিয়ে যাবো।” এ কথা শুনে দুই-একজন চলে গেলেও বেশীরভাগ সবাই বসে রইল।
পরদিন গ্রামের কেউ কোন কাজে যায়নি, গ্রামের কয়েকজন মাতব্বর গোছের ছেলে মর্গে গেছে রতনের দেহ আনতে। কারও বাড়িতে উনুন জ্বলে নি, সবাই রতনের বাড়ির অদুরে কিন্তু একটু আড়াল রেখে গোল হয়ে ছল ছল চোখে বসে আছে। গ্রামের কিছু উৎসাহী ছেলে রতনের ছবি সমেত একটা ব্যানার টাঙ্গিয়ে দিয়েছে-“ আমাদের গ্রামের গৌরব রতন কুমার দাস অমর রহে।” বাড়িতে রতনের বউ ঘন ঘন মূর্চ্ছা যাচ্ছে, ওর অসুস্থ মাকে নাকি এখনও খবরটা দেয়াই হয়নি। নিয়ামত মাঝে মাঝেই ডুকরে কেঁদে উঠছে, “কাল রতনদা যাবার সময় শেষ কথা বলেছিল আজ আমার পরাণের দাম জানতে চাইবে।” বলেই আবার কেঁদে উঠল। কান্না জিনিসটা বড়ই সংক্রামক, নিয়ামতকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে পঞ্চাও হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। কখন কাঁচের গাড়িতে শুয়ে রতন গ্রামে ফিরবে তার অপেক্ষায়। অবশেষে সেই বহু প্রতিক্ষিত গাড়িটকে আস্তে দেখেই গোটা গ্রাম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। গ্রামের সবচেয়ে প্রাণচঞ্চল বর্ণময় ছেলেটির নিথর দেহ আজ কি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে ঐ কাঁচের গাড়ির ভীতর। রতনের বউকে দুই প্রতিবেশী মহিলা ধরে ধরে নিয়ে আসছে, সে এক অসহনীয় দৃশ্য। পাশের বাড়ির এক কাকীমার কোলে থাকা তার তিন বছরের শিশু কন্যাটি এইসব দেখেশুনে কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে।
এবার যাওয়ার সময়, সঙ্গে একটা গাড়িতে কয়েকজন রতনের অফিসের লোক এসেছেন, এখনও পর্যন্ত তারাই সব খরচ-খরচা দিয়ে যাচ্ছেন। গ্রামের লোকেরা কিছু ফুল আর অফুরন্ত চোখের জলে বিদায় দিল তাদের প্রিয়জনকে। প্রথমে শবযানটি, তার পিছনে কোম্পানীর গাড়িতে রতনের অফিসের লোকজন এবং সবশেষে একটি ম্যাটাডোরে গ্রামের পনের-কুড়িজন লোক। এই সময়টাই সবচেয়ে বেদনাদায়ক। কাঁদতে কাঁদতে সবাই গাড়ির পিছন পিছন হাঁটছে… নিয়ামত উচ্চস্বরে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় পড়েই গেল, তাকে তুলতে গিয়ে পঞ্চাও পড়ে গেল। ততক্ষনে শবযানটি শেষবারের মত রতনকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে আস্তে আস্তে দুর থেকে আরও দুরে চলে গেল।
পরদিন সকাল, গ্রাম আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছে, তবে পঞ্চা আজও দোকান খোলেনি, নিয়ামতের মনটা আজও কেমন ছটফট করছে, থেকে থেকে কেবলই রতনের কথা মনে পরছে আর চোখ দুটো ছল ছল করে উঠছে। দুজন সঙ্গে কিছু টাকা নিয়ে রতনের বাড়ির দিকে যাচ্চছে, রতনের বউ, মা আর মেয়েটার আপাতত খাওয়া দাওয়ার কি ব্যবস্থা হয়েছে তাই জানার জন্য। ঠিক এমন সময় একটি দামি গাড়ি এসে দাঁড়ালো রতনের বাড়ির সামনে, গাড়ি থেকে দুজন ভদ্রলোক নেমে রতনের বাড়ি কোনটা জানতে চাইলো। পঞ্চা আর নিয়ামত ওদের দুজনকে রতনের বাড়ি নিয়ে যেতেই ওদেরকে দেখে রতনের বউ আবার চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কান্না একটু থামতেই দুজনের মধ্যে যিনি বয়স্ক তিনি রতনের বউকে নমস্কার করে নিজের পরিচয় দিলেন রতনের অফিসের একজন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে, এবং রতনের মত একজন কাজের লোকের এইভাবে হটাৎ চলে যাওয়ায় তাঁর কোম্পানীর যে কি বিরাট ক্ষতি হ’ল তাও বললেন। আগামীকাল রতনের স্মরণে অফিসে একটি শোকসভার আয়োজন করা হয়েছে, তিনি সেই সভায় যাওয়ার জন্য রতনের স্ত্রী ও মাকে আহ্বান জানালেন। এও বললেন যে ওদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোম্পানী গাড়ী পাঠিয়ে দেবে। এটুকু বোঝা গেল যে রতনের বউ-এর তখন অত কথা শোনার মত মানসিকতা নেই, সে শুধু কেঁদেই চলেছে । ঠিক এই সময় ঐ অফিসার ভদ্রলোক পকেট থেকে একখন্ড কাগজ বের করে রতনের বউ-এর হাতের কাছে ধরে বললেন-“আসলে রতনের মত মানুষের প্রাণের দাম তো আর টাকা দিয়ে বিচার করা যায়না, তবু তার অনুপস্থিতিতে আপনাদের সাময়িক আঘাতটা সামাল দেবার জন্য কোম্পানী আপনাকে এই দুলাখ টাকার চেক টা দিচ্ছে।” রতনের বউ তখনও কেঁদেই চলেছে, হাত বাড়িয়ে চেকটা নেওয়ার মত অবস্থা তার নেই, তাই তার হয়ে নিয়ামত চেকটা হাতে নিয়ে ডুকরে কেঁদে বলে উঠল “হায় আল্লা, এটাই বুঝি রতনদার পরাণের দাম?”
““জ্যোতিষার্ণব ঘনাইশাস্ত্রী””
-- নারায়ণ রায়।
পটাইবাবুর বাড়ির রকে আমাদের চারজনের আড্ডাটা দিনে দিনে ভালই জমে উঠেছে, তবে ইদানিং ঘনাইবাবুকে আড্ডায় সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। টানা একমাস আড্ডায় ঘনাইবাবুর অনুপস্থিতি আমাদেরকে বেশ চিন্তায় ফেলল। ব্যাপারটা কি? জানার জন্য আমরা তিনজন অর্থাত আমি, পটাইবাবু এবং লাটাইবাবু, ঘনাইবাবুর বাড়ি যাওয়া মনস্থ করলাম। এতদিনের পুরানো বন্ধু, আমাদের অবশ্যই উচিত তাঁর খবরাখবর নেওয়া।
যথারীতি একদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে আমরা হাজির হলাম । কিন্তু এ আমরা কোন ঘনাইবাবুকে দেখছি? হটাৎ ঘনাইবাবু যেন কেমন পাল্টে গেছেন, আমাদের সেই আগেকার ঘনাইবাবু কোথায় গেলেন? ঘনাইবাবুর এ কি হ’ল? ঘনাইবাবু আমাদের দেখেও যেন চিনতে পারলেন না। মুখে অদ্ভুত সব কথাবার্তা। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলেই তার উত্তরে ওনার মুখ থেকে ‘কালসর্পযোগ’, ‘রাহুর বক্র দৃষ্টি’, ‘শনির সাড়ে সাতি’ এই ধরনের অবোধ্য সব শব্দ বেরোতে লাগলো। বেশ কিছুদিন ধরে চুল দাড়ি কাটা বন্ধ করে দিয়েছেন, কপালে বড় করে সিঁদুরের টিপ। গলায় ইয়া বড় একটা রুদ্রাক্ষের মালা আর পরনে গৈরিক বসন। ঘনাইবাবু ভীষন ভাবে জ্যোতিষ চর্চা শুরু করেছেন, বাড়ির বাইরের দেওয়ালে ইয়া বড় একটা সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন- ““জ্যোতিষার্ণব ঘনাইশাস্ত্রী—সন্তানের ভবিষ্যত? স্ত্রী কিম্বা স্বামী অন্যের প্রতি আসক্ত? মামলায় দুঃশ্চিন্তা?”” সকল সমস্যার সমাধনে—‘বাবা ঘনাই শাস্ত্রী’।””
বৈঠক খানা ঘরটিতে চেয়ার টেবিল সাজিয়ে চেম্বার খুলে বসেছেন। সঙ্গে কয়েকটি পুরানো পঞ্জিকা লগ্ন, রাশিফল ইত্যাদি বিচারের বই, একটি আতস কাঁচ আর রঙ্গীন কাঁচের মত দেখতে কয়েকটা টুকরো টুকরো পাথর। সহকারি এবং সর্বক্ষনের সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন পাড়ারই ছেলে কিচলুকে। কিচলু ঘনাইবাবুর কাছ থেকে বারোশ টাকা ধার নিয়েছিলেন তিন বছর আগে, সুদে আসলে সেটি এখন বত্রিশশো টাকার মত হয়েছে। বহু তাগেদা দিয়েও তাহা আদায় করতে ব্যর্থ হওয়ায় ঘনাইবাবু এখন ঠিক করেছেন কিচলুকে মাসে পাঁচশো টাকার বেতনের কর্মী হিসেবে রেখে মাসে মাসে তিনশো টাকা করে কেটে নেবেন। এমন সময়ে ঘনাইবাবুর অর্ধাঙ্গিনী ঘন্টুরানী আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
এ কি? ঘন্টুদেবীকে তো চেনাই যাচ্ছে না, মাত্র গত একমাসেই চেহারা অর্ধেক হয়ে গেছে। ইহার কারণ জিগ্যেস করায় জানা গেল, ঘনাইবাবুর অর্ধাঙ্গিনী দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপের রোগী, নিয়মিত তাকে দু’বেলায় পাঁচটি- করে ট্যাবলেট গলধঃকরন করতে হয়, কিন্তু Charity Begins at Home এই নীতি মেনে ঘনাইবাবুর নির্দেশে এক নিমেষে সেসব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে ঘনাইবাবু ঘন্টুরানীর সর্বাঙ্গে মোট সাতটি তাবিজ ও কবচ বেঁধে দিয়ে বলেছেন, “রাহু আর কেতু দুই শয়তানকেই এমন আষ্টে পৃষ্টে বেঁধে দিলাম যে কেউ আর তোমার কোন ক্ষতি করতে পারে না। বেটারা নিজেরাই এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে পালাবে।”
আমরা যখন ঘনাইবাবুর এই সব কীর্তিকলাপ দর্শনেব্যস্ত তখনই আমাদের মধ্যে উপস্থিত লাটাইবাবু সাহস সঞ্চয় করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘনাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনি এত বড় একজন জ্যোতীষ শাস্ত্রী হওয়ায় আপনার বন্ধু হিসেবে আমরা গর্বিত। তখন ঘনাইবাবু লাটাই বাবুকে জিগ্যেস করলেন ওনার রাশি ও লগ্ন কি? যখন জানলেন যে লাটাইবাবুর রাশি ‘কন্যা’ এবং লগ্ন ‘বৃশ্চিক’, অমনি গড় গড় করে বলে গেলেন, “আপনার রাশির অধিপতি বুধ, বর্তমান বছরটি আগের তুলনায় বেশ শুভ, আপনার আত্ম বিশ্বাস প্রবল থাকার ফলে যে কোনও অবস্থার সঙ্গে মোকাবিলা করার ক্ষমতা আপনার থাকবে।” একথা শ্রবন করে লাটাইবাবু নিতান্তই কাচু মাচু মুখ করে বললেন “কিন্তু আমি আত্মবিশ্বাসী ? একথা যে এই ভূভারতে কেহই বিশ্বাস করবে না” তখন ঘনাইবাবু বললেন “আপনি অবশ্যই আত্মবিশ্বাসী কিন্তু সেটি আপনার ভিতর হ’তে প্রকাশ পাচ্ছে না, আর এর জন্য চাই তিনরতি ক্যাটস্ আই কিম্বা সাত রতি গোমেদ। আর আপনার লগ্ন ‘বৃশ্চিক’ তাই লগ্নের অধিপতি মঙ্গল, এই লগ্নের জাতক-জাতিকারা সত্যবাদি ও নিষ্ঠাবান হয়ে থাকেন, অপরিসীম ইচ্ছা শক্তির বলে সব কাজেই অগ্রসর হয়ে থাকেন।” লাটাইবাবু আবার আমতা আমতা করে ক্ষীন স্বরে প্রতিবাদ করে বলেন-“বরং ঐ জিনিসটারই আমার জীবনে সর্বাপেক্ষা অভাব, আজ যদি আমার অপরিসীম তো দুরের কথা সামন্য একটু ইচ্ছা শক্তি থাকলেও থাকতো তাহলে আজ নিশ্চই আপনার মত প্রতিভাবান কেউ একটা হতাম।”
সে যাই হোক আমরা খবর নিয়ে জানলাম যে ঘনাইবাবুর প্রতিদিন দুই তিন জন করে খরিদ্দার হচ্ছে এবং দৈনিক দুই-তিন শত টাকা আমদানিও হচ্ছে।
তবে সেদিন একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, দুই একটি সৌজন্যমূলক বাক্য বিনিময় ছাড়া ঘনাইবাবুর বাড়িতে পুরো সময়টাই পটাইবাবু অদ্ভুত ভাবে শুধু নিশ্চুপ ছিলেন তাই নয়, ওনার চোখ মুখের মধ্যেও একটা অবিশ্বাস আর বিরক্তি ফুটে উঠছিল। যদিও ঘনাইবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার সময়ে রাস্তায় ব্যাপারটা পরিস্কার হ’ল।
আমরা তিনজনই বাঙালী তাই যথারীতি ফেরার সময়ে রাস্তায় নেমেই ঘনাইবাবুর নিন্দা সুরু হ’ল, আর এব্যাপারে পটাইবাবুই অগ্রনী ভূমিকা নিলেন। বললেন, “বুঝলেন রায়বাবু, জ্যোতিষী হওয়া মোটেই অতো সহজ ব্যাপার নয়, অনেক সাধ্য সাধনা এবং দীর্ঘদিনের তপস্যার দ্বারাই প্রকৃত জ্যোতিষী হওয়া যায়। ও ব্যাটা ভেকধারী জ্যোতিষী হয়ে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে, আর এই লাইনে এখন ইনকাম বেশ ভালই।” আমি পটাইবাবুর কথায় সম্মতি জানাতেই তিনি দ্বিগুন উৎসাহিত হয়ে বললেন, “তবে হ্যাঁ প্রকৃত জ্যোতিষী জীবনে আমি একজনকেই দেখেছিলাম, তিনি হলেন বাবা কনখলানন্দ মহারাজ!” এই কথা বলে পটাইবাবু দুইবার দুইহাত করজোর করে কপালে ঠেকালেন। আমি সভয়ে জিগ্যেস করলাম, “আপনি তার দেখা কেমন করে পেলেন?” উত্তরে পটাইবাবু বলে চললেন, “তিনি সুদুর হিমালয়ের কনখলে গভীর জঙ্গলে বর্হিজগৎ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একগুহার মধ্যে বসবাস করেন, আমি কৈশোরে একবার হিমালয় দর্শনে গিয়ে ঐ মহামানবের সাক্ষাত পাই এবং কেন জানিনা প্রথম দর্শনেই আমাকে বাবার খুব ভালো লেগে যায়।” আমি এবং লাটাইবাবু উভয়ে বললাম, “সত্যই তো এমন মহামানবের সাক্ষাত কয়জন পায়? আপনি প্রকৃতই ভাগ্যবান পটাইবাবু।” পটাইবাবু আরও বলে চলেন, “আমি বাবার কাছে কিছু না চাইতেই বাবা আমাকে বললেন, আমি তোর কপালে এক দেবজ্যোতি দেখতে পাচ্ছি, তুই একদিন এই পৃথিবীতে একটা বিরাট কিছু হ’বি। এবং আরও নির্দিষ্ঠ ভাবে বলেছিলেন বড় হয়ে আমি অবশ্যই একজন কেউকেটা হ’ব, হয় উত্তম কুমারের মত অভিনেতা কিম্বা ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের মত ডাক্তার, অথবা গোষ্ট পালের মত ফুটবল খেলোয়ার হবই হব। অত বড় একজন জ্যোতিষী তার কথা কখনো বিফলে যেতে পারে?”
আমরা আরও কৌতুহল প্রদর্শন করে পটাইবাবুর দিকে তাকাতেই পটাইবাবু এক গভীর তৃপ্তির হাসি হেসে বলে চলেন “এখন আমাকে দেখে আপনারা নিশ্চই বুঝতে পেরেছেন যে বাবা কনখলানন্দ মহারাজ কতবড় জ্যোতিষী ছিলেন। বাবা নিজেও বোধ হয় জানতেন না যে তার কথা এই ভাবে মিলবে, কারণ বাবা বলেছিলেন উপরের তিনজনের মধ্যে যেকোন একজনের গুন আমার মধ্যে বর্তাবে। কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা বাবার আশীর্বাদে এবং তাঁর শ্রী চরণের শ্পর্ষে উক্ত তিনজনের গুনই আমি পেয়েছি।” পটাইবাবুর একথা শ্রবণ করে আমি যার পর নাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যখন ভাবছি, তাহা কিরূপে সম্ভব? একজন মানুষ কি করে একই সঙ্গে বিধানবাবুর মত ডাক্তার, গোষ্টবাবুর মত খেলোয়ার আর উত্তমবাবুর মত অভিনেতা হবেন? আর তাছাড়া কনখলের গভীর জঙ্গলে বসবাস করে বহির্জগত থেকে সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন থেকে তিনি বিধান রায়, উত্তম কুমার কিম্বা গোষ্ট পালের মত বাঙালীদের চিনলেন কিরূপে? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে তাঁর মুখপানে তাকাতেই তিনি ব্যাপারটি খোলসা করলেন, “আসলে আপনারা নিশ্চই পারমিউটেশন-কম্বিনেশনের অংক করেছেন… ব্যাপারটা সেইরূপ। একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিলেই আপনার উত্তর পেয়ে যাবেন। আমি অবশ্যই উক্ত তিনজনের গুন পেয়েছি, তবে গুনগুলিকে সামান্য একটু ঘুরিয়ে নিলেই হবে। অর্থাত আমি উত্তম কুমারের মত ডাক্তার, বিধান রায়ের মত ফুটবলার এবং গোষ্ট পালের মত অভিনেতা অবশ্যই হয়েছি। ”
““ঘুষ””
একটি রম্যরচনা মূলক ছোট গল্প।
-নারায়ণ রায়।
গত বেশ কিছুদিন যাবত পটাইবাবুর মন মেজাজ তেমন ভাল যাচ্ছে না, কারও সঙ্গে তেমন প্রাণ খুলে কথাই বলতে পারছেন না। তার এ হেন অবস্থা দেখে তার বন্ধু লাটাইবাবুর খুবই খারাপ লাগলো, তাই সেদিন পটাইবাবুকে সরাসরি জিগ্যেস করলেন, “পটাইবাবুকে এমন ম্রিয়মান দেখাইবার কারণ কি?” উত্তরে পটাইবাবু জানালেন, “বড়ই আর্থিক অনটনের মধ্যে আছি
লাটাইবাবু, বাড়িতে মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, আজকাল চিকিৎসায় প্রচুর খরচা, সংসার চালিয়ে সব দিক সামলে ওঠা সত্যি অসম্ভব।” এ কথা শুনে, তাঁর কথায় সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে লাটাইবাবু বললেন, “তা যা বলেছেন, এই তো আমার ছোট ছেলেটার পেটে সামান্য একটু ব্যাথা হ’ল, ডাক্তরবাবু বললেন এক্ষুনি অপারেশন করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চাশ হাজার টাকা গলে গেল। ব্যাঙ্কের জমানো সব টাকাটাই বেরিয়ে গেল। আসলে আপিসে বাড়তি ইনকাম কিছু না থাকলে শুধু মাইনের টাকার উপর ভরসা করে সংসার চালানো এযুগে অসম্ভব।”
এ কথা শুনে পটাইবাবু বললেন, “সে সব তো আর আমাদের ভাগ্যে নেই, লাটাইবাবু, তাছাড়া চাকুরীতে এই অতিরিক্ত ইনকাম বলতে আপনি কি বলতে চাইছেন বলুনতো? ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত ভাবে বলবেন কি?” কিছুক্ষন চুপ করে থেকে পটাইবাবু আবার বলে উঠলেন, “আমার ভায়রা ভাই আমারই মত একটি সরকারী আপিসে কাজ করেন, আমার চেয়ে কম বেতন পেয়েও তার আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত ভালো কিরূপে হ’ল, তাহা আমার কাছে কিছুতেই বোধগম্য হয় না। একদিন আমি আমার সহধর্মিনীকে এই কথা জিগ্যেস করায়, তিনি আমাকে বললেন, ‘সাধে কি আর বলি আমার বাবা আমাকে একটি গাধার সঙ্গে বিবাহ দিয়াছেন?’ আচ্ছা লাটাইবাবু, আমাকে কি গাধার মত দেখতে ?”
পটাইবাবুর জীবনের এত দুঃখের কথা শুনে লাটাইবাবুর দুচোখ অশ্রু সজল হ’য়ে উঠল, এবং লাটাইবাবু একে একে পটাইবাবুর প্রশ্নগুলির উত্তর ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন- “পটাইবাবু, আপনার দুঃখের কারণ আমার কাছে প্রাঞ্জল হ’ল, এখন আমি একে একে আপনার প্রশ্নগুলির উত্তর দানের চেষ্টা করছি। যেমন প্রথমেই বলি আপনাকে মোটেও গাধার মত দেখতে নয়, আপনি যথেষ্ঠ সুদর্শন, এবার আপনার পূর্বের প্রশ্নের উত্তর দেই, চাকুরিতে ঐ অতিরিক্ত ইনকামকে ‘ঘুষ’ বলে, ঘুষের টাকাগুলিতে আর পাঁচটা টাকার মত মহাত্মা গান্ধীর ছবিই থাকে, কোন চোর বা ডাকাতের ছবি থাকে না, তবে ঐ টাকা সাধারণত বিনা আয়াসে একত্রে বেশ কিছুটা পরিমাণে পাওয়া যায় এবং মানুষও তাই সাধারণত স্বর্ণালঙ্কার, ভ্রমণ এই ধরনের কার্যে এই টাকা খরচা করে থাকে। আরও শুনেছি এই টাকার রং কিঞ্চিত কালো তাই ঐ টাকাকে মানুষ কালো টাকা বলে।” এই পর্যন্ত আলোচনার পর সেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার দরুন পটাইবাবু ও লাটাইবাবু যে যার মত নিজ নিজ বাড়ি ফিরে যান।
আস্তে আস্তে পটাইবাবুর মন কিঞ্চিত স্বাভাবিক হয়েছে, পটাইবাবুও নিয়মিত আপিস যাচ্ছেন। এর দুই চারদিন পর অফিসে বিল বাবু অর্থাৎ সমাদ্দারবাবু, যিনি কিনা ঠিকাদার কিম্বা সরবরাহকারীদের বিল গুলি দেখাশোনা করতেন তিনি এই গরমে সস্ত্রীক কাশ্মীর বেড়াতে যাবার জন্য দুই সপ্তাহ ছুটি নিয়েছেন, এদিকে পুজোয় ঠিকাদারদের বিল পেমেন্ট আটকে যাচ্ছে, তখন বড় সাহেব পটাইবাবুকে অনুরোধ করলেন যে সমাদ্দারবাবুর অনুপস্থিতিতে তিনি যেন বিল ফাইলগুলি প্রসেস করে বড় সাহেবের টেবিলে দিয়ে দেন। সাহেব একথাও বললেন যে তিনি বিলগুলি প্রসেস করে ওনার টেবিলে দেয়া মাত্রই উনি সই করে দেবেন যাতে ঠিকাদারেরা শীঘ্রই পয়সা পেয়ে ষায়। পটাইবাবুর এতদিনের চাকরী জীবনে এই প্রথম বড় সাহেব নিজে ডেকে তাঁকে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিলেন। সাধারণত পটাইবাবুর জন্য নির্ধারিত কাজ হ’ল, চিঠপত্র রিসিভ ও ডেসপ্যাচ। যাই হোক ফাইলগুলি পটাইবাবুর টেবিলে আসামাত্র তিনি দ্বিগুন উৎসাহে কাজ করতে শুরু করে দিলেন এবং লক্ষ্য করলেন ইতিমধ্যেই তার ঘরের বাইরে বেশ কয়কজন লোকের ফিস ফিস গুন গুন শুরু হয়ে গিয়েছে।
পটাইবাবু প্রথম ফাইলটি খুলে দেখলেন যে, সেটি তাদের পুরো আপিস বাড়িটি রং করার খরচ বাবদ তিন লক্ষ সত্তর হাজার টাকার একটি বিল। কিন্তু পটাইবাবুর মনে খটকা লাগলো এই ভেবে যে, তাদের তো এই একটিই আপিস এবং গত বিশ বছরে সেখানে কোন রং করা হয়নি তো? তিনি যখন বিলটি নিয়ে কি করবেন ভাবছেন তখন সুরুৎ করে তার ঘরের দরজা ঠেলে এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকেই তাকে বললেন “নমস্কার স্যার, ওটা আমার ফাইল, বড় সাহেবের সঙ্গে সব কথা হয়ে গেছে, আর আপনি এই খামটা রাখুন স্যার… ওতে তিনহাজার সাতশো টাকা আছে, এই সামান্য কিছু টাকা আপনাকে একটু মিস্টি খাবার জন্য…” এই কথা বলে লোকটি তার হাতদুটি বুকের কাছে জোড় করে হে হে করে হাসতে লাগলো। কিন্তু পটাইবাবু পরলেন মহা বিপদে, তিনি মনে মনে হিসেব করে দেখলেন যে এখন সন্দেশ বা রসগোল্লার যা দর তাতে ঐ টাকায় প্রায় পাঁচশ পিস সন্দেশ বা রসগোল্ল পাওয়া যাবে। কিন্তু পাঁচশ পিস মিষ্টি তিনি একা খাবেন কি করে? কিম্বা অফিসের বিল পাস করার জন্য তাকে এত মিষ্টিই বা খেতে হবে কেন? এ তো তার উপর রীতিমত অত্যাচার, সমাদ্দার বাবুও তো ছুটিতে, তা না হলে তাকে জিগ্যেস করা যেত যে তিনিও কি এই ভাবে এত মিষ্টি খেতেন?
পটাইবাবু তখনকার মত সংস্লিষ্ট ফাইলের মধ্যে খামটি রেখে পরের ফাইলটি খুললেন। দ্বিতীয় বিলটি এই আপিসে সমস্ত দরজা জানলা পরিষ্কার করা, নতুন পেলমেট ও নতুন পর্দা লাগানোর খরচা হিসেবে এক লক্ষ আশি হাজার টাকার একটি বিল। কিন্তু এক্ষেত্রেও পটাইবাবু লক্ষ্য করলেন উপরোক্ত কোন কাজই তো হয়নি, তাই সংস্লিষ্ট ঠিকাদারকে ডেকে সেকথা বলতেই তিনিও পটাইবাবুর হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন-“ওসব আপনাকে চিন্তা করতে হবে না স্যার, বড় সাহেবের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে, আপনি শুধু ক্যালকুলেশনটা চেক করে সাহেবের টেবিলে দিলেই উনি সই করে দেবেন, আর এইটা রাখুন স্যার এতে আপনার সিগারেট খাওয়ার জন্য এক হাজার আটশো টাকা আছে।” এমনিতেই পাঁচশো পিস মিষ্টির কথাটা মাথায় ঘুরছিল তার সঙ্গে সিগারেটের কথা শুনে পটাইবাবুর মেজাজটা আরও তিরিক্ষি হয়ে গেল। পটাইবাবু ধূমপান করেন না, তা সত্বেও একটা হিসাব করে ফেললেন। মোটামুটি একটা ভালো সিগারেটের দাম যদি আট টাকা হয় তাহলে একহাজার আটশো টাকায় দুইশো পঁচিশটি সিগারেট পাওয়া যাবে। কিন্তু একজন লোক বাইশ-তেইশ প্যাকেট সিগারেট একদিনে খাবে কেমন করে সেই চিন্তায় পটাইবাবুর শরীর আবার খারাপ হতে শুরু করল। সমাদ্দার বাবু সারাদিনে অনেকগুলি সিগারেট খান, তাকে জিগ্যেস করলে এর সদুত্তর পাওয়া যেত, কিন্তু তিনি ছুটি নিয়েছেন বলেই তো যত সমস্যা। পাঁচশো পিস মিষ্টি ও দুইশো পঁচিশ পিস সিগারেটের ধোঁয়ায় পটাইবাবুর যখন বিভ্রান্ত তখন ঠিক করলেন আপাতত এই ফাইলটাও থাক, দেখা যাক পরেরটাতে কি আছে? এই কথা বলে তিনি সংস্লিস্ঠ ফাইলের ভিতর টাকার খামটি রেখে সেটিকে একপাশে রেখে দিলেন। এবর তিনি তিন নম্বর ফাইলটিকে খুললেন।
এই বিলটিতে আপিসের বাথরুমগুলি মেরামতের কাজ দেখানো হয়েছে, বাথরুমের মেঝে ও দেয়ালে টালি লাগানো, কমোড, বেসিন ইত্যাদি পাল্টানো, জলের কল ও পাইপ সারানো ইত্যাদি কাজ হিসেবে এক লক্ষ ষাট হাজার টাকার একটি বিল জমা দেয়া হয়েছে। এবার পটাইবাবুর সত্য সত্যই অজ্ঞান হয়ে যাবার মত অবস্থা কারণ ইতিপূর্বে দুইটি বিল দেখার পর যখন তার শরীরটা বেশ খারাপ লাগছিল তখন চোখে মুখে একটু জল দেবার জন্য বাথরুমে গিয়ে বাথরুমের ভঙ্গুর দৈনদশা দেখে তিনি কোনক্রমে কাজ সেরে চলে আসেন। পটাইবাবু দুগালে হাত দিয়ে যখন এসব কথা ভাবছেন ঠিক তখনই ঐ কাজটির ঠিকাদার সটান তার ঘরে ঢুকে তার হাতে একটি খাম দিয়ে বলল, “স্যার, বড় সাহেবের সঙ্গে সব কথা হয়ে গেছে স্যার, আপনি এই খামটি রাখুন, এতে আপনার চা খাওয়ার জন্য এক হাজার ছয়শো টাকা আছে।” এতক্ষন তবু পটাইবাবু মাথাটা সোজা করে বসে ছিলেন কিন্ত এক কাপ চায়ের দাম চার টাকা ধরলে চারশো কাপ চা খেতে হবে শুনে ওনার মাথাটা ঘুরে গেল। পাঁচশো পিস মিষ্টি, দুইশো পঁচিশ পিস সিগারেট ও চারশো কাপ চা কিভাবে খাবেন তিনি? কারন তাকে এখন অনেকদিন বাঁচতে হবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে পটাইবাবু অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
অবশ্য দু-চার মিনিটের মধ্যেই তিনি সম্বিত ফিরে পেলেন। ঠিক এই সময়ে পটাইবাবুর কি করা উচিৎ তা বুঝতে না পেরে তিনি সকল বিল ফাইল ও টাকার খামগুলি নিয়ে বড় সাহেবের ঘরে ঢুকে তাঁর টেবিলে রেখে ধপাস করে সামনের একটা চেয়ারে বসে পরলেন। তারপর বড়সাহেবের টেবিলে মাথা রেখে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “স্যার, আমাকে বাঁচান, আমার অসুস্থ বৃদ্ধা মা, অবিবাহিতা কন্যা এবং বেকার পুত্রের জন্য আমি বাঁচতে চাই , আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে চাই” একথা বলে পটাইবাবু হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন। ইতিমধ্যে বড়সাহেবের ঘরের ভিতরে ও বাইরে কৌতুহলী সহকর্মীদর ভীর জমে গেছে। সবাই আলোচনা করে সাব্যস্ত করলেন যে পটাইবাবুর শরীর খুবই অসুস্থ, ওনার বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন। তবে আপাতত পটাইবাবুকে কয়েকদিন ছুটি দিয়ে বাড়ি পৌছে দেয়া হবে। সেইমত আপিসের একটি গাড়িতে পটাইবাবুকে তার বাড়ি পৌছে দেয়া হ’ল। ওদিকে পটাইবাবুর অর্ধাঙ্গিনী সুরবালা তার স্বামীকে এইভাবে বাড়ি ফিরতে দেখে যার পর নাই আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। পরে সব কথা শুনে আপিসের সহকর্মীরা বিদায় নেবার পর নিজের শরীরকে যতটা সম্ভব উচ্চ মার্গে তুলে এবং গলার স্বর উচ্চগ্রামে তুলে শুধু একটা কথাই বললেন “সাধে কি আর বলি, আমার বাবা আমাকে একটি গাধার সঙ্গে বিবাহ দিয়েছেন।।”
““হ্যাট-ট্রিক””
পটাইবাবুর ছেলে অনাদি চরণ হ্যাট-ট্রিক করেছে। এই নিয়ে পাড়ার চতুর্দিকে বিস্তর আলোচনা চলছে। কোন বিষয়ে পর পর তিনবার একই সাফল্য ধরে রাখা নিছক ছেলে খেলা নয়। ক্রিকেট খেলায় যখন কোন বোলার পর পর দুই বলে দুটি উইকেট পাওয়ার পর তৃতীয় বল করতে যান, কিম্বা ব্যাটস্ ম্যান পর পর দুই বলে দুটি ওভার-বাউন্ডারী মারার পর তৃতীয় বলটি যখন মারতে যান, অথবা স্ট্রাইকার দুটি গোল করার পর তৃতীয় বারের জন্য বল নিয়ে যখন অপর পক্ষের গোল সীমানায় পৌঁছান, তখন সমগ্র মাঠে যে টান টান উত্তেজনা দেখা দেয়, অনাদি চরণের ক্ষেত্রে অবশ্য সেরকম কোন অগ্রিম উত্তেজনার আঁচ পাওয়া যায়নি। মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর দেখা গেল ‘বিদ্যাধরী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে’র ফল গত কয়েক বৎসরের তুলনায় এবারের ফল অনেক ভালো হয়েছে এবং সেই আনন্দে সবাই যখন নৃত্যরত তখন প্রধান শিক্ষক মহাশয় নজর করলেন যে আগের দুইবারের ন্যায় এবারেও অনাদি চরণ অকৃতকার্য হয়েছে।
দিকে দিকে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে। যথারীতি বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ যার পর নাই আশ্চরয্যান্বিত হয়ে হাতে তিনদিন সময় নিয়ে এক জরুরী মিটিং ডাকলেন, আর সেই মিটিং-এ অনাদি চরণ ও তার পিতা পটাই বাবুকে আমন্ত্রণ জানানো হ’ল। কারণ শিক্ষকদের এতদিন একটি ধারণা ছিল যে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করা যেমন কিঞ্চিত কঠিন ব্যাপার, মাধ্যমিকে ফেল করা তদাপেক্ষা কঠিন কাজ। কিন্তু অনাদি চরণ পর পর তিনবার সেই কঠিন কাজটি করে হ্যাট-ট্রিক করেছে, তাই এ বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি মিটিং ডাকা অবশ্য কর্তব্য। যদিও সুকুমার রায়ের কবিতায় উনিশটিবার ম্যাট্রিকে ঘায়েল হওয়ার কথা বলা হয়েছে তবুও বিদ্যাধরী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এধরনের প্রয়াস এই প্রথম। তাই শিক্ষক ও ছাত্র মহলে রীতিমত সাড়া পড়ে গেছে। এদিকে বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় যারা স্টার পেয়ে কিম্বা উচ্চ নম্বর পেয়ে পাশ করেছে, তারা পড়ল মহা চিন্তায়, তাহলে এবার কি বিদ্যালয় থেকে তাদেরকে বই, গোলাপ ফুল, উত্তরীয়, মিষ্টির প্যাকেট এসব দিয়ে বরণ করা হবে না? বিদ্যালয়ের ইতিহাসে কঠিনতম কাজটি করার জন্য এসবই কি তাহলে অনাদি চরণকেই দিয়ে দেয়া হবে?
কথায় বলে, বায়ুর আগে বার্তা বয়, তাই এই খবরটাও মুহুর্তের মধ্যে চারিদিকে রটে গেল। পটাইবাবুর পরিচিত পরিজনেরা খবরটি সন্মন্ধে ওয়াকিবহাল থাকা সত্তেও পটাইবাবুর সঙ্গে দেখা হলেই তাকে খবরটি জিগ্যেস করে বিভিন্ন রকমের পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। পটাইবাবুও পড়লেন মহা চিন্তায়। কিন্তু যার জন্য এত চিন্তা তার কোন হেল দোল নেই। অনাদি চরণ যথারীতি তার ঘরে সারাদিন ধানি পটকা ব্যান্ডের ‘শশ্মানে অশান্তি’ সি ডি টা চালিয়ে প্রবল বিক্রমে নৃত্যরত, অথবা একটি পুরানো গীটার এবং ততোধিক পুরানো একটি হারমোনিয়াম ও তবলা সহযোগে সঙ্গীত চর্চায় রত। বিকেলে অনাদি চরণ তার সঙ্গীত চর্চা বন্ধ রেখে দোতলার ঘর থেকে নীচে নেমে এসে পটাই বাবুর মুখোমুখি হতেই পটাই বাবু অত্যন্ত ধীর ও শান্ত গলায় যেন কোন আপনজন বিয়োগের খবর দিচ্ছেন, সেইরূপ নীচু গলায় বললেন, “খবরটা শুনেছ ?” অনাদি চরণ ততোধিক বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, “তা আর শুনবো না কেন? কিন্তু তোমরা এমন ভাব দেখাচ্ছ যেন আত্মীয় স্বজন কেউ মরেছে।……… “আচ্ছা লেখাপড়া করে কে কোনকালে বড় হয়েছে শুনি ? চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণ, সিরাজদৌল্লা থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত কে কটা পাশ দিয়েছেন শুনি ? কিন্তু আমার ব্যান্ডের গান যখন লোকের ঘরে ঘরে বাজবে তখন তুমি তো রাস্তায় বেরোতে পারবেনা, সেটা একবার ভেবে দেখেছো কি ?” একথা শুনে পটাইবাবু বড়ই চিন্তায় পড়লেন, কারণ এমনিতেই এক হ্যাট-ট্রিকের ঠ্যালায় আজ সকাল থেকে তার পক্ষে বাড়ির বাইরে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিন্তু পুত্রের গানবাজনার সঙ্গে তার বাইরে বেরোনর কি সম্পর্ক তা বুঝতে না পেরে পটাইবাবু যখন মাথা চুলকাচ্ছেন ঠিক তখনই অনাদী চরণ ব্যাপারটা খোলসা করল-“তখন তুমি বাইরে বেরোলে সবাই বলবে—ঐ যে অনাদি চরণের বাবা যাচ্ছে …. তোমার চারিদিকে ভীড় করে তোমাকে পাগল করে দেবে। তোমার অটোগ্রাফ চাইবে, তুমি তখন ভি আই পি-র বাবা হবে, …. তা তুমি সেইটা চাও নাকি অনু কেরানীর বাবা হয়েই জীবনটা কাটাতে চাও….যত্তসব !”
পটাইবাবুকে এর পরেও ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে দেখে অনাদি চরণ যথারীতি বাবার অজ্ঞতা সম্মন্ধে নিস্চিন্ত হয়ে গট গট করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। এদিকে পটাইবাবু পড়লেন মহা বিপদে, স্ত্রী সুরবালার সঙ্গে বিস্তর আলোচনা করলেন কিন্তু কোন সমাধান খুজে পেলেন না। ছাপোষা পটাইবাবু কোনদিনই গান বাজনার বিরোধী নন, কিন্তু এই অর্বাচিনকে কে বোঝাবে যে সত্যিকারের সঙ্গীত সাধনা বড় কঠিন কাজ, তার চেয়ে সাধারন পরাশুনা করে কিছু করা অনেক সহজ। তাই মনে মনে ভাবলেন যেন তেন প্রকারেণ অনাদি চরণকে মাধ্যমিক পাশটা করাতেই হবে। মাধ্যমিক পাশ করার পর বড় সাহেবকে ধরে অনাদি চরণকে যদি একবার নিজের অফিসেই গুঁজে দেওয়া যায় তাহলে তো কেল্লা ফতে।
পরদিন সকালেই পটাইবাবু তাঁর পাড়ার বিলে ডাক্তারের চেম্বারে গেলেন, সবিস্তারে সকল ঘটনা বলা সুরু করার আগেই, ডাক্তার বাবু বললেন, “ঐ হ্যাট-ট্রিকের কথা বলছেন ?” পটাইবাবু বিনয়ের হাসি হেসে পাড়ার ছেলে বিলে ডাক্তারকে বললেন, “তা তুমি যখন সবই শুনেছ, তখন ছেলেটার একটা বিহিত করে দাও বাবা।” অনাদি চরণের পরীক্ষায় পাশের ব্যাপারে বিলেবাবু কি ভাবে সাহায্য করতে পারেন তা বুঝতে যখন বিলেবাবুর কিঞ্চিত সময় লাগছে তখন পটাইবাবু ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, “আজকাল তো কত রকমের ওষুধ, টনিক, দুধ এসব বেরিয়েছে টি ভি তে দেখেছি খাওয়ালেই ছেলেরা টপা-টপ ফার্স্ট সেকেন্ড হয়ে যাচ্ছে, তা তুমি নাহয় একটু কম তেজের ওষুধ দাও যাতে ফার্স্ট সেকেন্ডের দরকার নেই, কোনরকমে পাশটা করতে পারে।” উত্তরে বিলে ডাক্তার পটাইবাবুকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন যে “প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ মেধা নিয়ে জন্মায় এবং জন্মের পর সে যে পরিবেশে বড় হয় সেই পরিবেশের সহায়তায় এবং নিজ প্রচেষ্টায় তার মেধার বিকাশ ঘটে। মেধা ওষুধ খাইয়ে বৃদ্ধি করা যায় না, ওসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে লোকঠকানোর ব্যবসা। তার চেয়ে ওকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে বলুন।” বিলে ডাক্তার অল্প বয়সে লেখাপড়ায় এলাকার সেরা ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিল, তাই তার কথা পটাইবাবু কি করে ফেলে দেন ?
এদিকে অনাদিকে যেন তেন প্রকারে মাধ্যমিক পাশ করাতেই হবে, তা না হলে প্রতিবেশীদের কাছে মুখ দেখানোই দুস্কর। পটাইবাবু সহধর্মিনী সুরবালার সঙ্গে আলোচনা করে তাঁর অত্যন্ত পরিচিত জ্যোতিষী ঘনাই শাস্ত্রীর নিকট গেলেন। জ্যোতিষার্ণব ঘনাই শাস্ত্রী পটাইবাবুর কথামত একটি সাদা কাগজে অনেক দাগ কাটলেন, অনেক আঁক কষলেন, তারপর চশমাটি কিঞ্চিত নাকের ডগায় নামিয়ে নিয়ে এসে বললেন, “আসলে তোমার ছেলের এখন কাল-সর্প যোগ চলছে, খুবই মারাত্মক অবস্থা।” শেষের কথা ক’টি এমন ভাবে বললেন যেন অনাদি চরণ এখন ভেন্টিলেশনে আছে, কখন কি হয় বলা মুশকিল। একথা শুনে পটাইবাবু ছল ছল চোখে হাতদুটি জোড় করে বললেন, “তাহলে কি উপায় গুরুদেব?” …. গুরুদেব বললেন, “উপায় অবশ্যই আছে, আপনি এত ভেঙ্গে পরবেন না পটাইবাবু, বেশ কিছু যাগ-যজ্ঞ-হোম ইত্যাদির প্রয়োজন। আর সে সবের জন্য কিঞ্চিত খরচ তো হবেই….” পটাইবাবুর এখন এমন অবস্থা যে খরচের কথা চিন্তা করলে হবে না, ছেলেকে মাধ্যমিক পাশ করাতেই হবে, আর তার জন্য দু-চার-পাঁচশো টাকা খরচ হতেই পারে। তাই বললেন, “ঠিক আছে, কত খরচ হবে বলুন আপনি? খরচের জন্য আপনি চিন্তা করবেন না দয়া করে।” ঘনাই গুরুদেব বললেন দেখুন “এমনিতে এই ধরনের যজ্ঞের অনুষ্ঠানে হাজার ত্রিশ টাকা খরচা হয়, কিন্তু আপনি আমার বিশেষ পরিচিত, তাই খরচ-টা অর্ধেক অর্থাত পনের হাজার এক টাকা দিলেই হবে।” পনের হাজার টাকার কথা শুনে পটাইবাবু মুখে গোঁ গোঁ করে এক অদ্ভুত শব্দ করতে করতে ঘনাই শাস্ত্রীর চেম্বারেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
অবশ্য চোখে মুখে একটু জলের ছিটে দিতেই তাঁর জ্ঞান ফিরে এল, সম্বিত ফিরে পেতেই পটাইবাবু উঠে দাঁড়ালেন, এখন পটাইবাবুর কোনক্রমেই দমে গেলে চলবে না…ইয়ে ইজ্জত কা সওয়াল। জ্ঞান ফিরে পেয়েই তাই গুরুদেবকে কোনরকমে বিদায় জানিয়ে জোর কদমে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন।
হটাৎ রাস্তায় একজন বেশ শীর্ণ, অত্যন্ত কালো এবং স্বল্প দৈর্ঘের নেড়া মাথর লোক তাঁর পায়ের উপর হুমরি খেয়ে পড়ে তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, “বাবু ভালো আছেন?” প্রথমে তাকে চিনতে না পারলেও, স্মৃতির মনিকোঠায় একটু খোঁচা দিতেই পটাইবাবুর মনে পড়ে গেল, আরে এ তো সহদেব! এলাকার সিঁধেল চোর। সেবার দত্তদের বাড়িতে চুরি করে ধরা পড়ে গণপিটুনিতে মারাই যাচ্ছিল, পটাইবাবুই পাড়ার ছেলেদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেন। …. “তা তুই এখানে কি করছিস?” … “আজ্ঞে এই গতকালকেই জামিন পেয়েছি, তাই একটু পুরনো পাড়ায় ঘুরতে এলুম।” সহদেবের অকপট স্বীকারোক্তি। “শোন, তোর সঙ্গে আমার একটু দরকার আছে, চল চা খাবি ?” বললেন পটাইবাবু। সহদেব অবাক হয়ে ভাবে, এটা পটাইবাবুর কোন ফন্দি ফিকির নয়তো ? কারন সহদেবের সঙ্গে পটাইবাবুর মত লোকের কিইবা দরকার থাকতে পারে ? তাছাড়া জীবনে এই প্রথম কোন ভদ্রলোক তাকে তার সঙ্গে চায়ের দোকানে চা খেতে যেতে বলছে। যাইহোক যে লোকটি একদিন তার প্রান বাঁচিয়েছিলেন তাঁকে এটুকু বিশ্বাস করা যেতেই পারে ভেবে সহদেব তাঁ সঙ্গ নিল। পটাইবাবু সহদেবের সঙ্গে গল্প করতে করতে তাকে এক কাপ চা একটা টোস্ট বিস্কুট খাইয়ে তাকে আবার বিড়ি খাওয়ার জন্য দুটো টাকাও দিলেন। তারপর সহদেবও হাসতে হাতে ঘাড় নেড়ে নেড়ে বিদায় নিল।
তীব্র গরম, তারপর আবার অনাদি চরণকে নিয়ে দুশ্চিন্তা, কদিন রাত্রে ভালো করে ঘুমই হচ্ছিল না। গতকাল প্রথম রাত থেকেই বেশ কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়েছে, পটাইবাবুর মাঝ রাত্রে বাথরুম যাওয়ার জন্যও ঘুম ভাঙ্গেনি। হটাৎ ভোর রাত্রে চিৎকার চেঁচানিতে ঘুম ভাঙ্গতেই পটাইবাবু ধরফর করে উঠে বসলেন বিছানায়।
“হায়, হায় এ আমার কি হ’ল ?” চিৎকার করেই চলেছেন সুরবালা দেবী, তার পিছন পিছন অনাদি চরণ, মুখে তার কথা বলার ক্ষমতা নেই, মায়ের পিছন পিছন সেও বুক চাপরে চলেছে আর হা হুতাস করে চলেছে। ঘরে ঢুকে সুরবালার প্রথম কথা, “হ্যা গো কাল সদর দরজা ভালো করে বন্ধ করোনি?”
“কেন কি আবার হ’ল?” শুধান পটাইবাবু।
“আর হ’তে বাকি টা কি আছে?.... মাঝ রাত্রে বাড়িতে চোর ঢুকে আমার অনু সোনার ঘর একদম সাফ করে দিয়েছে, হারমোনিয়াম, গীটার, তবলা, মিউজিক সিস্টেম সবকিছু নিয়ে গেছে, আহা বেচারার এতদিনের সখের জিনিসগুলো…. আমার তখনই সন্দেহ হয়েছিল, মাঝ রাত্রে বাথরুম করতে উঠে দেখি, কালো মত নেড়া মাথার রোগা আর ছোটখাটো চেহারার একটা লোক আমাদের বাড়ির সমনে ঘুর ঘুর করছে। হ্যা গো, তা তুমি কি শুয়েই থাকবে, নাকি একটা কিছু করবে?” “তা চোর কি আমার সম্নন্ধী যে চুরি করা জিনিসগুলো দেখানোর জন্য আমাকে তার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে গেছে?... যাও যাও মা বেটায় মিলে আর জ্বালিও না, সকাল হতে এখনও দেরী আছে, যাও দরজা বন্ধ করে আবার শুয়ে পরো।” মুখে একথা বলেই পাশ ফিরে শুয়ে পরলেন পটাইবাবু আর মনে মনে ভাবলেন… যাক কাল সহদেবের বাড়ি গিয়ে একবার দেখা করে আসতে হবে। আর কথায় বলে চোর পালালে ….. বাড়ে, সামনের বছর নিশ্চই এই বাড়-বাড়ন্ত বুদ্ধি নিয়ে অনু আমাদের মাধ্যমিকটা উতরে যাবে।
""""""""একটা ছোট্ট পর্দায় সিনেমা কিম্বা যত বড় ঘর তত বড় টি ভি"""""""
( একটি ছোট গল্প )
১৯৭২ সাল, এপ্রিল মাস, পশ্চিম বঙ্গের একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে ২৩-২৪ বছরের এক গ্রাম্য যুবক কলকাতায় এসেছে চাকরি করতে। ছেলেটার নাম পল্টন ।পল্টন এতটাই গাঁইয়া যে একদিন কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকে একটা হাওড়া-গামী বাসে উঠে কন্ডাকটরকে দশ পয়সা দিয়ে বলল একটা শিয়ালদার টিকিট দিন তো? কনডাকর বাস থেকে নমিয়ে দিয়ে বলল, “শিয়ালদা উল্টোদিকে, এটা শিয়ালদা থেকেই আসছে।” তখন পল্টন কলেজ স্ট্রীট জংশনে নেমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আটতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে একটা জিনিস ঠিক করে নিল যে ডান দিকটা হাওড়া স্টেশন আর বাম দিকটা শিয়ালদহ স্টেশন। তবে বহুক্ষেত্রেই এই ধরনের মানুষের সরলতাকে লোকে মুর্খামি বলে মনে করে। পল্টন কিন্তু মুর্খ নয়, সে উচ্চ মাধ্যমিকে দ্বিতীয় বিভাগ এবং পলিটেকনিকে প্রথম শ্রেনী। তবে এতটাই সরল যে কলকাতায় ওকে মাত্র গত দু বছরের মধ্যেই বেশ কয়েকবার ঠকতে হয়েছে। অফিসেও ওর বন্ধুরা কারণে অকারণে ওকে নিয়ে মজা করে। এমনকি উপরওয়ালাও যতসব ঝামেলার কাজগুলো, যেগুলো কায়দা করে সবাই এড়িয়ে যেতে চায়, সেগুলোই ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। যেমন অফিস টাইমে একটা ব্যস্ত রাস্তার একদিক বন্ধ করে কাজ হচ্ছে, আর সারাদিন পথ চলতি হাজার হাজার লোকের গালা-গাল, টিপ্পনি সহ্য করে সেই কাজ সুপার ভাইজ করা সহজ কথা নয়। এমনও হয়েছে যে জামা ধরে টানা টানি, এমনকি গায়ে দু-চারটে চড়-থাপ্পড়ও যে পরেনি তাও নয়। আর এই ধরনের কাজ দেখার জন্য অবধারিত ভাবে পল্টনের ডাক পড়বে।
১৯৭৪ সাল, পল্টনের প্রায় বছর দুয়েক চাকরী হল, সেদিনও তেমনই একটা ঝামেলার কাজের তদারকি করছিল পল্টন, দক্ষিন কলকাতার শরৎ বোস এভিনিউ-এ, সাউথ কলকাতা গার্লস কলেজর সামনে। রাস্তা খুড়ে ড্রেন পাইপ বসানোর কাজ হচ্ছে, এদিকে কলেজের ছুটি হয়েছে, পিল পিল করে মেয়েরা বেরিয়ে পড়েছে, এলাকাটা পুরো জ্যাম। আস্তে আস্তে পল্টনও একটু চালাক চতুর হচ্ছে, সে টুক করে ভীড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে একটা দোকানের সামনে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে গেল যে তাকে যেন কেউ ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত লোক বলে চিনতে না পারে। অথচ ওখান থেকেও ও ওর শ্রীময়ীকেও দেখতে পাবে। এত শত শত মেয়ের মধ্যে ওকে যেন পল্টনের চোখে অন্যরকম লাগে। শরীরের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভুতি, যেটা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মেয়েটির নাম অবশ্য ও জানে না, শ্রীময়ী তার দুই বন্ধুকে নিয়ে তিনজন একসঙ্গে বেরোয় তারপর বাসে বালিগঞ্জ স্টেশন আর সেখান থেকে দক্ষিনমুখি কোন ট্রেনে চাপে। একদিন পল্টন সেটা চুপি চুপি লক্ষ্য করেছে। ওই তিনজনের মধ্যে মেয়েটির বেশ নেতা নেতা ভাব আছে। শ্রীময়ী নামটি অবশ্য পল্টনেরই দেওয়া, ওর ধারনা এই ধরনের উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা সুমুখশ্রী মেয়ের নাম শ্রীময়ীই হওয়া উচিৎ। আর ওর বাড়ি নিশ্চই ধবধবি, সূর্যপুর কিম্বা দক্ষিন বারাসত স্টেশনের কাছে এক বৃক্ষরাজি শোভিত সবুজ গ্রামে। মুহুর্তেই পল্টন তার কল্পরাজ্যে চলে যায়। এই ঘিঞ্জি শহর ছেড়ে একটি ছোট্ট স্টেশনে নেমে গাছ-পালা ঢাকা গঞ্জের রাস্তা ধরে কয়েক পা হেঁটে গেলেই একটি সুন্দর ছবির মত বাড়ি আর তার “ঐ জানালার ধারে বসে আছো তুমি করতলে রাখি মাথা…..।”
হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচিতে পল্টন সম্বিত ফিরে পেল। এদিকে তখন শরৎ বসু রোডে সাউথ কলকাতা গার্লস কলেজের বিপরীতে একটা রেডিও, গ্রামফোনের দোকানের সামনে বেশ জটলা। পল্টন যথরীতি কৌতুহলি হয়ে অনেক চেষ্টা করে ভীড় ঠেলে উঁকি মারতেই ….. উফ্ ফ্ ফ্ সে কি রোমাঞ্চ, উফ্ ফ্ ফ্ সমগ্র শরীরে সে কি শিহরণ। দোকানে শোকেসের ভিতরে একটা টি ভি চলছে, পল্টন জীবনে এই প্রথম টি ভি দেখল। ঠিক যেন একটু বড় সড় দেখতে একটা রেডিওর মত একটা চৌকো বাক্স, তার সামনের দিকে পর্দায় ঠিক যেন একটা সিনেমা চলছে। এ যেন হলে দেখা সিনেমারই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। তখন টি ভি তে টেবিল টেনিস খেলা দেখানো হচ্ছিল।
বেশ কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল কলকাতায় এবার টেলিভিশন আসছে। জানা গেল সে বছর অক্টোবরে কলকাতায় “ওয়ার্ল্ড টি টি চাম্পিয়নশিপ” হবে, আর ঐ খেলার সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে কলকাতায় টেলিভিশনের উদ্বোধন হবে। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী রেডিওতে আর খবরের কাগজে তাই নিয়ে কত বিবৃতি দিলেন। ধনী, দরিদ্র, আবাল বৃদ্ধ বনিতা, সকলের মধ্যে একটা দারুণ কৌতুহল। অবশেষে কলকাতায় সেইদিনটি এল এবং প্রথম দিনেই পল্টন তার সাক্ষী হয়ে থাকতে পেরে এতটাই আনন্দে আত্মহারা হ’ল যে উপস্থিত আর পাঁচজনের মত পল্টনও হাতদুটোকে মাথার উপর তুলে জোরে জোরে হেসে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। আর ঠিক সেই সময়ে ঐ ভীড়ের মধ্যে তার পাশ দিয়ে দুই বন্ধু সহযোগে যেতে যেতে পল্টনকে শুনিয়ে শ্রীময়ী বলে গেল, “হাঁদারামর মত টি ভি দেখে অত লাফা লাফি করার কি আছে? একটা ছোট্ট পর্দায় সিনেমা হচ্ছে ভেবে নিলেই হয়!”
১৯৮৪ সাল, পল্টনের ইতিমধ্যে বিয়ে হয়েছে, এবং একটি চার বছরের কন্যাকে নিয়ে সুখের সংসার। পল্টনের স্ত্রী ভাগ্য সত্যিই খুব ভালো, যেমন দেখতে শুনতে তেমনই কাজে কর্মে, ছন্নছাড়া পল্টনের সংসারটির শ্রী ফিরিয়ে দিয়েছে সে। বছর খানেক হ’ল কিস্তিতে একটা সাদা-কালো টিভিও কিনেছে। তখন টিভিতে সারাদিনে বাংলা অনুস্ঠান বলতে একটা মাত্র চ্যানেলে সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে আটটা। তার মধ্যে আবার সপ্তাহে একদিন চিত্রমালা আর একদিন বাংলা সিনেমা ছাড়া বাকী সব অনুষ্ঠানই প্রায় সরকারী প্রচারমূলক। তবে একটা জিনিস ওরা স্বামী স্ত্রী লক্ষ্য করেছে যে ওদের চেয়ে টিভির প্রতি ওদের চার বছরের মেয়ের আকর্ষণটাই বেশী। টিভি খুললেই সামনে বসে পড়ে আর হাঁ করে ধান চাষ থেকে রাগপ্রধান গান সবই গোগ্রাসে গিলে যায়। ঐ বয়সের বাচ্ছাদের ভাত খাওয়ানো এক সমস্যা, কিন্তু টিভি চালিয়ে দিলে টিভির সামনে বসিয়ে ওর মা যা খাইয়ে দেয় তাই খেয়ে নেয়। পাশের ফ্লাটের আন্টি পর্যন্ত ওর নাম দিয়েছেন ‘টিভিগার্ল’।
এদিকে মেয়ের দুরন্তপনা বাড়ার পর অনেকদিন দুজনের একসঙ্গে হলে গিয়ে সিনেমা দেখা হয়নি, পাড়ার সিনেমা হলে সত্যজিৎ রায়ের “ঘরে বাইরে” এসেছে।একদিন পল্টন আর ওর স্ত্রী দুজনে ঠিক করলো যে দুজনে সিনেমা দেখতে যাবে। যেমন ভাবা তেমনই কাজ, সেই রবিবার সন্ধ্যাবেলায় মেয়েকে কোলে নিয়ে হলে ঢুকলো ওরা। এমনিতে ঐটুকু একটা বাচ্ছার কি ওই অন্ধকার ঘরে চুপ করে বসে থাকতে ভালো লাগে? তারপর আবার তেমন ছেলে ভোলানো বাচ্ছাদের বই হলে তবু কথা ছিল। হলে ঢুকে অব্দি কখনও জল খাবো, কখনও খিদে পেয়েছে, কখনও গরম করছে বলে বাবা মা কে পাগল করে দিতে আরম্ভ করলো।পল্টন বার বার মেয়েকে ভোলাবার জন্য হলের বাইরে নিয়ে চলে আসে, সিনেমাটা সেইভাবে দেখাই হ’ল না। যাই হোক অবশেষে শো শেষ হলে মেয়েকে কোলে নিয়ে দুজনে বাড়ি ফিরল। ওদেরকে বাড়ি ফিরতে দেখে পাশের বাড়ির আন্টি পল্টনের স্ত্রী শ্রীময়ীর কোল থেকে তার মেয়েকে কোলে নিয়ে জিগ্যেস করলেন, “কি রে টিভি গার্ল, কেমন সিনেমা দেখলি?” টিভিগার্ল উত্তর দিল, “জানো আন্টি, ওদের টিভি টা না কি বড়!” তারপর তার ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো দুদিকে প্রসারিত করে বলল, “যত বড় ঘর তত বড় টি ভি ।” হটাৎ শ্রীময়ী আর পল্টনের মনে পড়ে গেল দশ বছর আগের সেই দিনটির কথা, “ হাঁদারামের মত টি ভি দেখে অত লাফা লাফি করার কি আছে? একটা ছোট্ট পর্দায় সিনেমা হচ্ছে ভেবে নিলেই হয়!” আর এ কথা মনে পড়তেই দুজনের মনটা খুসিতে নেচে উঠল।
""""“ কেয়াফুলের গন্ধ ””””””
( একটি ছোট গল্প )
মানুষের কত রকমের নাম হয়, ছোট বেলায় আমাদের সেই দামোদর পাড়ের ছোট্ট গ্রামে আমার পরিচিত এক ভদ্রলোকের নাম ছিল নগরবাসী সমাদ্দার। পরে বড় হয়ে আমি ভাবতাম অমন একটা অজ গ্রামের একজন ব্যক্তির নাম নগরবাসী হ’ল কি করে? আমি প্রিয়দশর্ন সরকার নামে এক ভদ্রলোককে চিনতাম যিনি মোটেও সুদশর্ন ছিলেন না। আবার অপরাজিতা নামের একটি মেয়েকে আমি মাধ্যমিক পরীক্ষায় বার বার পরাজিত হতে দেখেছি। কিম্বা আমাদের পাড়ার মাধুরী বৌদির শরীরে বা মনে মাধুর্য্যর ছিটে ফোঁটাও ছিল না। অবশ্য কথায় বলে নামে কিই বা এসে যায় ? আজ সকালে অলস মস্তিস্কে এইসব হ য ব র ল চিন্তা করতে করতে একটা কথা আমার মাথায় এল, সেটা হ’ল একটা বিরাট সংখ্যক ছেলে মেয়েদের নাম ফুলের নাম দিয়ে। আমি সেই নামগুলো একটা একটা করে মনে করে একটা কাগজে লিখলাম। আমি মোট ৩০/৩২ টা ফুলের নাম মনে করতে পারলাম। দেখলাম ৩০/৩২টার মধ্যে ২২/২৩ টাই মেয়েদের দখলে আর মাত্র ৮/৯টার মত ছেলেদের দখলে। অর্থাৎ প্রথমেই ছেলেরা মেয়েদের কাছে ১৪ (২৩-৯) গোলে হেরে গেল। মেয়েদের দখলে তেমন কিছু ফুলের নাম আমি এখানে দিলাম যেমন :- অপরাজিতা, করবী, চাঁপা, মালতী, কামিনী, কৃষ্ণচুড়া, কেয়া, জবা, টগর, গোলাপ, দোলনচাপা, নয়নতারা, পদ্ম, বকুল, বেলী(বেলা), মাধুরী, যুঁই, যুথিকা, লিলি, শিউলি (শেফালী), হাসনুহানা । আর ছেলেদের দখলে তেমন ফুলগুলো হ’ল :- কাঞ্চন, নাগেশ্বর, নীলমণি, পলাশ, পারিজাত, বকুল, রঙন, শিরীষ।
ছোটবেলায় আমার অনেক বন্ধুর মধ্যে একজন বন্ধুর নাম ছিল কেতকী। আমি যখনকার কথা বলছি সেটা ছিল চোর-পুলিশ, কুমির-ডাঙ্গা খেলার বয়স। আমরা গ্রামের একই স্কুলে একই ক্লাশে পড়তাম। অজ গ্রামের পন্ডিত মশাই-এর পাঠশালার মত একটা খড়ের চার চালা প্রাইমারী স্কুল, স্কুলে যাবার পথে হেড স্যারের বাড়ি থেকে চাবি নিয়ে গিয়ে স্কুলের দরজা জানলা খোলা, ঝাট দেয়া, প্রত্যেক ক্লাশের কলসীতে খাবার জল ভরে রাখতে হ’ত। এছাড়া প্রত্যেক মাষ্টার মশাই-এর টেবিলে একটা করে হাত পাখা আর হাজিরা খাতা গুছিয়ে রাখতে হ’ত। তবে আমরা ইচ্ছে করেই কঞ্চির ছড়ি গুলোকে দরজার আড়ালে ঘরের কোনে লুকিয়ে রাখতাম। কাজগুলো ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই পালা করে করতে হ’ত। আর কেন জানিনা এই কাজটা করার ব্যাপারে আমাদের দুজনের দারুন উৎসাহ ছিল। গ্রামের স্কুলে ১১টার আগে কেউ আসতো না কিন্তু আমি আর কেতকী ১০টার মধ্যে স্কুলে পৌছে যেতাম। তারপর আমরা দুজনে পুরো স্কুলটা ঝাট দিতাম, টিউব ওয়েলে আমি পাম্প করতাম আর কেতকী একটা একটা করে কলসীতে জল ভরতো আর সেগুলো আমি একে একে ক্লাশে ক্লাশে রেখে দিয়ে আসতাম। তখন আমাদের দুজনের আট-দশ বছর বয়স, তখনও প্রেম বা যৌনতা কাকে বলে সেটা বোঝার বয়স হয়নি। তবু আজও আমার মনে আছে ও কাছে থাকলে আমার খুব ভালো লাগতো, আমি ওর শরীরের একটা অদ্ভুত গন্ধ পেতাম। এত বছর পরে আজও চোখ বুজলে সেই গন্ধটা পাই। ছোট্ট গ্রাম, আর আমাদের দুজনের বাড়িও ছিল কাছাকাছি, তাই স্কুলের বাইরেও আমাদের প্রায়শই দেখা হ’ত। বিকেলে আমরা সবাই আমাদের বাড়ির পাশে একটা সান বাঁধানো পুকুর পাড়ে পাকুর গাছের তলায় কুমির-ডাঙ্গা কিম্বা চোর-পুলিশ খেলতাম। খেলার নিয়মে স্বাভাবিক ভাবেই কেতকীও মাঝে মাঝে চোর কিম্বা কুমির হ’ত। কিন্তু পরবর্তী কালে একটা বয়সে এসে একটা অদ্ভুত জিনিস মনে পড়েছে যে ও যেদিন চোর হ’ত সেদিন কোন মতেই আমি ওকে ধরতে পারতাম না। অন্য কেউ না কেউ ওকে ধরত, কিন্তু আমি ওকে কোনদিন ধরতে পারিনি। আবার একই ভাবে কেতকী যেদিন কুমির হ’ত সেদিন কেতকীও কোনমতে আমাকে স্পর্শ করতে পারত না। অথার্ত দলের মধ্যে আমরা দুজন পরস্পরের সব চেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্বেও আমরা একজন আর একজনকে কোনদিন স্পর্শ করতে পারতম না। কিন্তু ওকে স্পর্শ না করলেও কেতকী কাছে এলেই ওর গায়ের ঐ মিষ্টি গন্ধটি আমি ঠিক পেতাম।
ঠিক এই সময়ে আমি বেশ কিছুদিনের জন্য অসুস্থ হয়ে পড়লাম। আমার স্কুল যাওয়া, খেলা ধূলো সব বন্ধ। কবিরাজ মশাই বললেন ‘টাইফয়েড’, খুব সাবধানে থাকতে হবে। লাল রঙের গোলা ওষুধ আর কাগজে মোরানো পুরিয়া ওষুধ দিলেন। মুখে রুচি নেই, তার উপর ঐ বিশ্রি ওষুধ গুলো খেতে একদম ভালো লাগতো না। আমার বাবা মা আদর করে কিছু বলতে এলেও আমি তাদের উপর রেগে গিয়ে উল্টো-পাল্টা বকে দিতাম। একমাত্র কেতকী আমার কাছে এলেই আমার মনটা খুসিতে ভরে উঠতো। ও আমার বিছানার পাশে এসে বসলেই আমি ওর গায়ের সেই মিষ্টি গন্ধটা পেতাম আর আমার সব রোগ এক নিমেষে সেরে যেত। তখন কেতকী বলত, “কাল আমি তোর জন্য খামারডাঙার মাঠে গিয়ে বনকুল এনে দেব, তোকে লুকিয়ে কৎবেলের আচার এনে দেব, খেয়ে দেখিস একদিনেই তোর জ্বর সেরে যাবে।”
এর পর আমি আস্তে আস্তে সেরে উঠলাম। আবার আমাদের দুজনের স্কুলে সেই ঝাট দেওয়া জল ভরা সুরু হ’ল। আবার সেই কুমির-ডাঙ্গা, চোর-পুলিশ। তারপর একদিন আমরা পাঠশালার পাঠ শেষ করে আমি ছেলেদের হাই স্কুলে ভর্তি হলাম আর কেতকী মেয়েদের হাই স্কুলে ভর্তি হ’ল।
আস্তে আস্তে আমার মনে হ’ল কেতকী কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। আগের মত আর তেমন আমাদের সঙ্গে কুমির-ডাঙ্গা কিম্বা চোর-পুলিশ খেলতে আসেনা। আমার সঙ্গে দেখা হ’লে আগের মত বক বক করে না শুধু হালকা দু-একটা কথা হয়। তবে যখনই আমার পাশ দিয়ে ও হেঁটে যেত একটা জিনিস লক্ষ করতাম, ওর গায়ের সেই গন্ধটা যেন আরও তীব্র আরও সুমধুর হয়েছে।
সেদিন কি একটা কারনে আমাদের দুজনেরই স্কুলের ছুটি। আমরা দুজনে এখন ক্লাশ সেভেনে পড়ি। গরম কাল তখন বেলা পাঁচটা হবে। কেতকীকে দেখলাম দুটি বেনী দুলিয়ে খালপাড়ে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যাচ্ছে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কেতকী বলল, “চল খামার ডাঙার মাঠে যাবি ?” আমি তো যাকে বলে এক পায়ে খাড়া, মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই এক যায়গায় এসে রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে, বাঁ দিকে আমাদের বাড়ি, আর ডান দিকে কেতকীদের বাড়ি। আমরা ডানদিক বাঁদিক ডানদিকে না গিয়ে সোজা জঙলের দিকের পায়ে হাঁটা রাস্তা বরাবর এগোতে লাগলাম। রাস্তা বরাবর ডানদিকে ভুবনডাঙ্গার খাল। আমি বললাম, “একদিন তোকে নিয়ে তালগাছের ডিঙ্গিতে চড়ে ঐ খাল দিয়ে অনেক দুরে শামুকপোতার বিলে গিয়ে নীল পদ্ম তুলে আনবো।” কেতকী বলল, “সেই ভালো, একটা তাল গাছের ডিঙ্গিতে দুজনের বেশী চাপলে তো ডুবেই যাবে, তাই শুধু তুই আর আমি চাপবো।”
এইসব কথা বলতে বলতে একটা যায়গায় পৌছে দেখলাম কেতকীর গায়ের গন্ধটা আরও সুতীব্র আরও সুমধুর লাগছে। এই প্রথম আমি কেতকীকে বললাম, “জানিস, আমি যখনই তোর পাশে আসি একটা সুন্দর গন্ধ পাই। এখন সেই গন্ধটা আরও সুতীব্র আরও সুমধুর লাগছে।” কেতকী বলল, “দুর, বোকা ডান দিকে তাকিয়ে দেখ।” আমি ডান দিকে তাকিয়ে দেখে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বললাম, “আরে এটা কেয়া ফুলের গাছ না?" আমি এর আগে কখনও কেয়া গাছ দেখিনি। তবে বইতে ছবি দেখেছি, বাবা মায়ের কাছে গল্প শুনেছি, কয়েকটা আখ গাছ যেন জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে, লম্বা লম্বা তলোয়ারের মত পাতা আর পাতার দুদিকে ধারালো কাঁটা। আর গাছটার মাথার কাছে সাদা মোচার খোলার মত খোলার ফাঁকে ফাঁকে ছোট্ট ছোট্ট সাদা ফুল।
আমি বললাম, “দাঁড়া আমি ঐ কেয়া ফুলটা তুলে আনি,” কেতকী বলল, “এই না না, যাস না, ঐ গাছের গোড়ায় সাপ থাকে, তাছাড়া ঐ কাঁটায় তোর হাত পা ছড়ে যাবে। তুই যাস না প্লিজ।” আমি তবু নাছোরবান্দা, আমি বললাম, “না না আমি কোন কথা শুনবো না, আমি যাবই, আমি জানতে চাই তোর গায়ের গন্ধ ঐ গাছটা পেল কোথা থেকে?” একথা বলে আমি ডান পা টা ঐ কেয়া গাছটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ডান হাত দিয়ে কাঁটাপাতা গুলো সরাতে যাবো ঠিক তখনই কেয়া আমার বাম হাতটা ধরে এক টান মারতেই আমরা দুজনেই টাল সামলাতে পারলাম না। উল্টোদিকের নরম ঘাসের উপর চিৎ হয়ে ছিটকে পড়ল কেয়া, আর আমি উপুর হয়ে পড়লাম কেয়ার উপর, তখন কেয়া তার দুহাত মুস্টিবদ্ধ করে আমার পিঠে দুমাদুম কিল মারতে মারতে বলল, “ওরে, হাঁদা গঙ্গারাম, তোর কেতকীর ই আর এক নাম যে কেয়া সেটা জানিস না ? কেয়া আর কেতকী কি আলাদা ?”
“প্রপিতামহ””
(একটি ছোট গল্প)
কলকাতা শহরের উপকন্ঠে এমন একটি স্থান স্ব-চোক্ষে না দেখলে প্রত্যয় হবে না। এলাকাটির একদিকে পতিতোদ্ধারিনী গঙ্গা, অপর দিকে বৃক্ষরাজি আবৃত সবুজ নিজর্ন প্রান্তর। মধ্যখান বরাবর পথ চলার রাস্তা। এলাকায় কয়েকটি মাত্র শতাব্দী প্রাচীন অট্টালিকা বিরাজমান। আজও যেন স্থানটি উনবিংশ শতাব্দীতেই স্থবির হয়ে আছে। নিকটেই একটি ভগ্নপ্রায় ত্রিতল অট্টালিকার সিংহ দরজায় আজও মলিন ভাবে বিরাজমান একটি লিপি- ““THIS IS THE RESIDENCE OF THE FIRST DUTCH GOVERNOR GENERAL IN INDIA””। গঙ্গার অপর প্রান্তে বেলুড় মঠের সুউচ্চ মিনার দৃশ্যমান। পথটির উত্তর দিক বরাবর হেঁটে গেলে বাগবাজার আর দক্ষিনে আলমবাজার হয়ে দক্ষিনেশ্বর।
ভাবলে অবাক হ’তে হয়... এই সেই পথ যাহা কিনা শত বৎসরেরও অধিক পূর্বে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ ও স্বামিজীর পদধুলি দ্বারা স্নাত হয়ে ধন্য হয়েছে। আজ ও যেন এই পথে সেই মহাপুরুষদের পদধ্বনি শুনতে পাই, আজও যেন নরেন্দ্র আপন মনে হেঁটে চলেছেন, সন্ধ্যা নেমে এসেছে বেশ কিছুক্ষন আগেই, নিজর্ন এবং অন্ধকার রাস্তায় শুধু কিছু শার্দুল ও শাপদ দিগের উচ্চরব এবং দুই একজন গেঁজেল কিম্বা মাতালের আনাগোনা। সেই যুগে কাশিপুরের এই দিকটায় রাস্তার দুই দিকে পাকা দালান বাড়ি প্রায় ছিল না বললেই চলে, বেশিরভাগই মাটির বাড়ি, খড়ের চাল... সন্ধ্যার পর অধিকাংশ বাড়িই অন্ধকারে নিমজ্জিত, সামান্য একটু রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বালানোও ছিল তাদের কাছে বিলাসিতা। দুই একটি বাড়ির দরজা বা জানালার ফাঁক দিয়ে সামান্য প্রদীপের আলো হয়তো বা দৃষ্টিগোচর হ’ত।
নরেনের সেসবদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই সে হেঁটেই চলেছে। গঙ্গাতীরে শশ্মানে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি কুন্ডে একটি শব দেহ দগ্ধ হয়ে চলেছ। শব যাত্রীদের বেশীরভাগই অত্যধিক মদ্যপান করে বেসামাল হয়ে চিৎকার করে খেউড়ে গান ধরেছে, “কে মরেছে কে মরেচে ঘোষাল বাড়ির বৌ মরেচে।...ছেরাদে খাবো হাত ডুবিয়ে...আবার বাবুর বে-তে খাবো কবজি ডুবিয়ে, আহা আহা আহা।” শশ্মানের ওই গান-টা শুনে নরেনের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, নরেন ভাবলো - এদেশের প্রতিটা মানুষ যেদিন প্রকৃত শিক্ষিত না হচ্ছে তত দিন এদেশের মুক্তি নেই ... নরেন তার হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিলো। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর শুরুর আগেই তাকে দক্ষিনেস্বর পৌছাতেই হবে...ঠাকুর যে আজ তার গান শুনতে চেয়েছেন।
এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে হটাৎ যেন সম্বিত ফিরে পেলাম। আষাঢ-শ্রাবণ মাসে ভোর চারি ঘটিকায় সুনসান এলাকাটি প্রাতভ্রমণের পক্ষে খুবই উপযুক্ত স্থান। অন্যান্য দিনের ন্যায় সেদিনও আমি প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছি, কিন্তু সহ ভ্রমণকারিদের কাহাকেও না পেয়ে একা একাই ঘুরছি । হটাৎ এক ভদ্রলোক গঙ্গা-প্রান্ত থেকে এমনভাবে আমার সস্মুখে আবির্ভূত হলেন, যেন তিনি তখনই গঙ্গা থেকে নেয়ে উঠে এলেন, অথচ লোকটির শরীরে সিক্ততার লেশ মাত্র চিহ্ন নাই। লোকটির পরণে হাঁটু অবধি চাপা খেটো ধুতি আর গায়ে ফতুয়ার ন্যায় একটি সাদা পরিধান, খালি পা এবং বেশ বলিষ্ঠ চেহারা, বয়স আন্দাজ ষাট বৎসর বলে আমার মনে হ’ল। লোকটি আমার মুখোমুখি হতেই একগাল হেসে, শুধালেন, “কি রায়বাবু, আপনার বাটির সকল খবর কুশল তো?” আমি অবাক হয়ে শুধাই, “আপনি আমাকে কিরূপে চিনলেন? আমি তো আপনাকে পূর্বে কদাপি দেখেছি বলেই স্মরণ হচ্ছে না।” এই কথা শুনে ভদ্রলোক আমাকে খুবই অবাক করে দিয়ে বললেন, “শুধু আপনাকে নয় আপনার পিতা, পিতামহ এবং প্রপিতামহ এদের সকলের সঙ্গেই আমার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল, আপনার প্রপিতামহ তো আমার বাল্যকালের বিশেষ সাথী ছিলেন।” এবং গড় গড় করে আমার সকল পূর্বপুরুষদিগের সঠিক নামও বলে দিলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম তাহা কিরূপে সম্ভব? আমার প্রপিতামহ জীবিত থাকলে আজ তাঁর বয়স হ’ত প্রায় ১৬০/১৬৫ বৎসর, জিগ্যেস করলাম,“আপনার নামটি দয়া করে বলবেন?” উত্তরে তিনি বললেন,“আমার নাম, শ্রীযুক্ত ষোরশী চরণ দেববর্মা, পিতা শ্রীযুক্ত ষোড়শাঙ্গ দেববর্মা, মাতা শ্রীমত্যা নগেন্দ্রবালা দেবী।”
আর একটু সাহস করে আমি তাঁকে বলি, “আমার প্রপিতামহ কিরূপে আপনার সাথী হবেন, তিনি জীবিত থাকলে আজ তাঁর বয়স হ’ত প্রায় ১৬০/১৬৫ বৎসর ?” উত্তরে তিনি বললেন, “আসলে আমাদের সময়ে তো লোকের ঘরে ঘরে এত বছর, মাস বা দিনের হিসেব রাখা সম্ভব ছিল না, তবে পিতৃদেবের মুখে শুনেচি, তোমাদের রবি ঠাকুর আমার চেয়ে বৎসর দশেকের ছোট ছিল।” তাঁর কথায় আমার কৌতুহলের সীমা থাকে না, আমি বলি, “তার মানে আপনি রবীন্দ্রনাথ, এবং বিবেকানন্দকে স্বচক্ষে দেখেছেন?” উত্তরে তিনি বলেন, “না না, তখন ঠাকুরবাড়ির ব্যাপারই ছিল আলাদা। ওরা ছিল কলিকাতার সত্যিকারের বনেদি পরিবার বলতে যা বোঝায় তাই, ওদের বাড়ির ছেলেরা সর্বদা পাইক, বরকন্দাজ, ভৃত্ত পরিবেষ্টিত হয়েই থাকতো। তাহারা আমাদের মত সাধারণ লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা করার কোন সুযোগই পেত না, তাই রবির সঙ্গে সেই ভাবে কোনদিন আলাপ হয়নি। তবে নরেন ছেলেটি সত্তিই খুব ভালো ছিল, অবশ্য একটু একরোখা গোঁয়ার ছিল, যেটা করবে মনে করত, সেটা করেই তবে ছাড়ত।” ,
আমি বলি, “আমি ভাগ্যবান তাই আপনার মত ব্যক্তির সাক্ষাত পেয়েছি। আপনার এমন সুঠাম চেহারা, আপনি কি সামরিক বাহিনীতেও ছিলেন ?” প্রশ্নটি শ্রবণ করে কিঞ্ছিত হ্লাদিত মুখে বললেন, “আপনার প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বলতে পারলে খুবই খুশি হতাম। যুদ্ধে যাওয়ার আমার খুবই ইচ্ছা ছিল, কিন্তু বয়স বাধা হয়ে দাঁড়ালো। ঠিক ১০০ বছর আগে যখন প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়, মনে করেছিলুম যুদ্ধে গিয়ে দেশ বিদেশ দেখব, কিন্তু ততদিনে আমি হয়ে গেছি একজন ৬৩ বছরের কিশোর। কিন্তু ওরা বললেন, ওই বয়সে আমাকে দিয়ে বাহিনীতে রাঁধুনীর কাজও হবে না। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তো আমি রীতিমত ৮৮ বছরের যুবক। যুদ্ধে যাবো বলে নাম লিপিবদ্ধ করতে গড়ের মাঠে লাইনে দাঁড়িয়েও ছিলুম তবু আমাকে ওরা বাতিল করে দিলে, এমনকি ১৮/২০ বছরের ছোকরাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় স্থান পাওয়া সত্বেও শুধু বয়সের কথা ভেবেই ওরা আমাকে নিল না।”
ইতিমধ্যে ক্রমশ দিনের আলো প্রস্ফুটিত হচ্ছে, তবু এলাকাটিতে কাহারও দেখা নাই। ভদ্রলোকও বেশ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, বললেন “আচ্ছা আসি।” এই কথা বলে, তিনি যেদিক থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেই দিকেই অর্থাৎ গঙ্গার দিকে একটি জঙ্গলাকীর্ন এলাকার ভিতর দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। এদিকে আমি লোকটির নিগর্মনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম এই দুনিয়ায় কত রকমের মানুষ থাকেন, কেউ নিজেকে রাজা-উজির ভাবেন, কেউ ভাবেন টাটা-বিড়লা, আর এই ভদ্রলোক ভাবেন ওনার বয়স ১৬০/৭০ বছর।
যাই হোক সকালটি আমার ভালই কাটলো, অভূতপূর্ব একটি অভিজ্ঞতা হ’ল, এবার আমিও যখন বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখনই আমার নিত্ত প্রাতভ্রমণের সঙ্গী রাধাকান্ত বাবু হাপাঁতে হাপাঁতে এসে পৌছলেন। আমি কিছু শুধোবার আগেই তিনি বলতে শুরু করলেন, “আসলে, গতকাল আপনাকে বলতে ভুলে গেছি যে আজ সকালে আমার বাড়িতে একটি পুজো আছে তাই প্রাতভ্রমণে আসতে দেরী হ’ল” আমি কিছুটা অবাক হয়ে বলি, “আজকের দিনটা তো তেমন কোন বিশেষ দিন নয়, যেমন মাঘী পূর্ণিমা বা বৈশাখি পূর্ণিমা ? তাহলে আপনার বাড়িতে কি এমন পুজা ছিল?” এ কথার উত্তরে রাধাকান্তবাবু বললেন, “প্রতিবছর শ্রাবণ মাসের শুক্ল পক্ষের একাদশীর দিন ভোর বেলায় আমাদের বাড়িতে শান্তিস্বস্ত্যয়ন সহ পুণ্যাহ গঙ্গা পূজা করা হয়ে থাকে।” আমি বললাম, “আসলে আমি সর্বত্র নাস্তিক বলেই পরিচিত, তাই এইসব পূজ-অচর্ণার কোন খবর রাখি না। এমন কি ভগবান বা ভূত উভয়েই আমার ঘোরতর অবিশ্বাস।
সে যাই হোক আপনি যেন আপনার বাড়ির পূজার ব্যাপারে কি বলতে চাইছিলেন?” তখন রাধাকান্তবাবু এক নিমেষে বলে গেলেন, “আমার এক পূর্বপুরুষ তাঁর দান-ধর্ম, এলাকার উন্নয়ন এইসব কারণে এলাকায় খুবই জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। আজকের মত এমনই এক শ্রাবণ মাসের শুক্ল পক্ষের একাদশীর দিন ভোর বেলায় প্রাতভ্রমণে বেরিয়ে ঠিক এই যায়গাটিতে তিনি গঙ্গায় পড়ে যাওয়া এক ডুবন্ত শিশুকে উদ্ধার করার জন্য গঙ্গায় ঝাঁপ দেন। তবে শিশুটিকে বাঁচাতে পারলেও তিনি নিজে তলিয়ে যান। অনেক খোজাখুজি করেও যে হেতু তাঁর কোন মৃতদেহ পাওয়া যায়নি, আমাদের আজও বিশ্বাস তিনি বেঁচে আছেন এবং নিশ্চই একদিন ফিরে আসবেন। আর সেই জন্যই প্রতি বছর এই দিনে আমরা তাঁর প্রত্যাবর্তন প্রার্থনা করে গঙ্গা মায়ের পূজা করি।” এই কথা শ্রবণ করে আমি রাধাকান্তবাবুকে শুধাই, “ভদ্রলোক আপনার কে ছিলেন?” উত্তরে রাধাকান্তবাবু বললেন, “তিনি ছিলেন আমার প্রপিতামহ, নাম শ্রীযুক্ত ষোরশী চরণ দেববর্মা ”

"""""""" অমলবাবুর রবিবারের দিনলিপি """"""

"""""""" অমলবাবুর রবিবারের দিনলিপি """"""
আজ রবিবার তারাতারি বিছানা থেকে উঠতে হবে, নাতনিকে নাচের স্কুলে নিয়ে যেতে হবে। অবশ্য অমলের এখন প্রতিদিন-ই ছুটির দিন। রান্না ঘর থেকে বৌমার লুচি ভাজার গন্ধ বেরোচ্ছে। রবিবার বাড়ির সবার সঙ্গে বসে অমলেরও লুচি আর কালো জিরে দিয়ে সাদা সাদা করে আলুর চচ্চড়ি এবং শেষ পাতে দুপিস কালাকাঁধ সন্দেশ খেতে খুব ইচ্ছে করে। অমলের আলু এবং ঘিয়ে ভাজা জিনিস খাওয়া বারন, আর মিষ্টি তো একেবারেই নিষেধ। বৌমা শুখনো মুড়ি আর শশা দিয়ে গেল...। এখন দাঁত টাও বেইমানি করছে শশা চিবতে আসুবিধা হয়। ছেলে সাত সকালে বাজারে গেছে, হাজীর মাংসের দোকানে বিরাট লম্বা লাইন। মনে পড়ে সেই সব দিনের কথা সেও ছিল রবিবার দুপুর। মিনতি খাসির মাংসটা রাঁধতো ভারী সুন্দর। রবিবার দুপুর মানেই কাগজি লেবু দিয়ে পাঁঠার ঝোল আর পুদিনার চাটনী। অবশ্য বেশ কিছুদিন হ'ল ডাক্তারবাবু অমলকে খাসির মাংস খেতে বারন করেছেন। ছেলের অবশ্য সেসব দিকে ভীষন নজর, বাবার জন্য চারা পোনা নিয়ে আসবে...বৌমার আবার নজর ততোধিক...। বাবার জন্য পেপে দিয়ে পাতলা করে চারা পোনার ঝোল করে দেবে।
বিকেলে অমল এক কাপ চিনি ছাড়া লিকার চা খেয়ে পাড়ার শীতলা মাতার মন্দিরে কির্তণ শুনতে যাবে। তবে ৭টা নাগাদ বৌমা গিয়ে নিয়ে আসবে... আজকাল সন্ধ্যার পর রাস্তা পার হতে ভয় হয়। বাড়িতে এসে অন্ধকার ঘরে চুপ করে শুয়ে থাকতে হয়, টি ভি দেখতে ইচ্ছে করলেও উপায় নেই...চোখ দুটো আজকাল বেশ জ্বালাতন করছে। নাতনির গানের গলাটি বেশ মিষ্টি, পাশের ঘরে বৌমা তার মেয়েকে গান শেখাচ্ছে, বৌমার গলাটিও বেশ মধুর.... ওরা দুজনে গাইছে
মধুর, তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হল শেষ--
ভুবন জুড়ে রইল লেগে আনন্দ-আবেশ ॥
দিনান্তের এই এক কোনাতে সন্ধ্যামেঘের শেষ সোনাতে
মন যে আমার গুঞ্জরিছে কোথায় নিরুদ্দেশ ॥
ড্রইং রুমে ছেলের ক'জন বন্ধু এসেছে, ওরা বর্তমান বাজার দর আর রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। ঘরের হালকা আলোয় অমলের চোখ গিয়ে পড়লো দেয়ালে টাঙ্গানো মিনতির ফটোর দিকে। মাত্র পয়তাল্লিশ বছর বয়সে চলে গিয়েছিল মিনতি, সত্যিই সুন্দরী ছিল মিনতি। ফটোতে মানুষের বয়স বাড়ে না.....কি সুন্দর হাসিমুখে তাকিয়ে আছে অমলের দিকে। ভাবখানা এমন যেন--- "কি গো কেমন জব্দ ?" অমল জবাব দেয়, "গিন্নি, তুমি ভেবেছিলে আমাকে আচ্ছা জব্দ করবে, আমি বিপদে পরবো? কিন্তু তুমি হেরে গেছো, এই দেখ আমি কেমন বিন্দাস আছি।" আর এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ দুটো ভিজে এলো।