Wednesday, 14 November 2018

"""" মোহর কুঞ্জ """"

পটাইবাবু মানুষটি বড়ই শান্ত শিষ্ট । তুলোনায় পটাইবাবুর স্ত্রী সুরবালার মেজাজ কিঞ্চিত উর্দ্ধমুখি। তবে দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া না হলে সে জীবন বড়ই সাদা মাটা, আর এই আপ্তবাক্যটি পটাইবাবুরা দুজনে বিশেষ ভাবে মান্য করেন। অন্যান্য দিনের ন্যায় সেদিনও পটাইবাবুর সঙ্গে তার স্ত্রীর সক্কাল বেলাতেই একটু একটু করে কিছুটা অম্ল-মধুর শুরু হয়ে গেল। আসুন আমরা আমাদের কান দুটিকে পটাইবাবুর বাড়িতে পৌছে দেই।
সকালে মুড়ি আর ভেলিগুড় দিয়ে টিফিন সেরে বেশ আয়েশ করে খবরের কাগজটা নিয়ে পড়তে পড়তে পটাইবাবু তার স্ত্রী-কে বললেন, “গিন্নী আজ বিকেলে আমাদের ফেসবুকের বন্ধুদের একটা গ্রুপ মীট আছে আর তাতে আমাকে আজ যেতেই হবে.........।”
সুরবালা তখন তার বিখ্যাত শিল-নোড়ায় ঘটর ঘটর করে ধনে পাতা বাটছিলেন তাই পটাইবাবুর কথাটা ঠিক মত শুনতে না পেয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কি মী...ট ? না না ও সব খিট-মিটে যায়গায় যাওয়া চলবে না।”
“ না না খিট মিটে নয় গিন্নী, গ্রুপ মীট, ফেসবুকের গ্রুপ মীট...। দেখ গিন্নি ওখানে পাঁচজন ভালো ভালো লোক আসেন পাঁচ রকম ভালো ভালো বিষয় আশয় নিয়ে আলোচনা হয়...... গেলে একটু জ্ঞান গম্যি বাড়ে। তাছাড়া সারাজীবন তো সরকারের কেরানীগিরি আর তোমার খিদমতগিরি করেই জীবনটা কেটে গেল, তাই এই বয়সে এসে ভাবছি একটু বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা একটু জনসেবামূলক কাজ এইসব করেই সময় কাটাব। বুঝলে গিন্নী কথায় বলে, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ!” আসলে এই কথাটা উচ্চারন করার পরেও পটাইবাবু বুঝতে পারলেন না যে তিনি তার অজান্তে একটি চকোলেট বোমায় অগ্নি সংযোগ করলেন, এখন শুধু ফাটার অপেক্ষা।
“ও তার মানে তুমি বলতে চাইছো যে আমি তোমার অসৎ সঙ্গ, আর ওই মুখ পোড়া মেয়েগুলো তোমার সৎ সঙ্গ ? হায় হায় হায় বেঁচে থাকতে এ কথাও শুনতে হল আমাকে? ছি ছি এর চেয়ে আমার মরণ হ’ল না কেন?” রাগে কাঁপতে কাঁপতে সুরবালা তার ধনেপাতা বাটার গতি দুই-তিন গুন বাড়িয়ে দেন।
“ছি ছি তুমি কেন আমার অসৎ সঙ্গ হবে ? তুমিই হচ্ছ আমার একম অদ্বিতীয়ম, বউ, গিন্নী, সহধর্মিনী, অর্ধাঙ্গিনী, ইংরাজীতে যাকে বলে ‘বেটার-হাফ’ অর্থাৎ আমাদের দুজনের মধ্যে আমি শুধু গুড আর তুমিই হচ্ছ বেটার।... বুঝেছ গিন্নী।” একথা বলে পটাইবাবু তার ডান হাতটা বাড়িয়ে সুরবালার থুতনি-টা ধরে একটু আদর করতে যেতেই, তার হাতটিকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে সুরবালা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন...। “ওরে 'মুখ পোড়া মিনসে', মনে করো আমি কিছুই জানি না... কিছুই বুঝি না...... তাই না ? সেদিন ছেলে আমাকে সব দেখিয়েছে...। কম্প্যুটার খুলে আমাকে দেখিয়ে বলল, মা এই দেখ বাবার ফেরেন্ড লিস্ট......। হায় হায় হায়! আমি দেখে অবাক ...। একটাও পুরুষ মানুষ নেই গা। শুধু ধুমসো ধুমসো মেয়ে ছেলেতে ভর্তি ...। একজন আবার লিখেছে ...। "আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা আমি যে পথ চিনি না।" ছি ছি ছি, ছেলের সামনে আমি লজ্জায় মরে যাই...। এসো আজ তোমাকে আমি পথ চেনাচ্ছি !!! আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন !!! আজ থেকে তোমার ঐ কম্পুটার-এ বসা বন্ধ...... এই হক কথা বলে দিলাম... হ্যা...।” ঘটর ঘটর করতে করতে সুরবালা বলে চলেন।
পটাইবাবু, আমতা আমতা করে তার অর্ধাঙ্গিনীকে বোঝাবার চেষ্টা করেন, “গিন্নী, ওটা আমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা নয়, ওটা একটা বিখ্যাত গান। আর এই বয়সে আমার হাত আবার কে ধরতে যাবে ?” কিন্তু মনে মনে ভাবলেন .....( আহা তেমন যদি কাউকে পাওয়া যেত...... কি ভালই না হত? ) তবে মুখে বললেন, “গিন্নী, এখন ফেসবুকে একাউন্ট না থাকলে তুমি সেকেলে হয়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী সবার ফেসবুক একাউন্ট আছে, এমন কি প্রেসিডেন্ট ওবামার মেয়েরা পড়াশুনায় কতটা কি এগোল কিম্বা রানী এলিজাবেথ আজ কি দিয়ে ভাত খেলেন এ সবই তুমি ফেসবুক থেকে জানতে পারবে।”
“তা আর একজন যে লিখেছে ‘আমি তোমাকে চাই’ ঐ মেয়েছেলেটা কে ?” সুরবালা তার চোখ দুটি বড় বড় করে জানতে চান।
“কে আবার কাকে চাইবে ? ও কাউকে চায় না, ঐটাই ওর নাম, ফেসবুকে অনেকেই আসল নাম না দিয়ে, ওই ভাবে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজের নাম লেখে, যেমন ধর, ‘আমি তোমাকে চাই’, ‘কোথায় তোমাকে পাই’, ‘বৃষ্টি-ভেজা মন’ কিম্বা ‘ছাতার তলায় আমরা দুজন’ এই রকম আর কি ? তাহলে ঐ কথাই থাকলো, আজ বিকেলে আমি মোহরকুঞ্জে যাচ্ছি।” পটাইবাবু গিন্নীর মেজাজ সম্মন্ধে ষোলআনা নিশ্চিন্ত হয়ে বেশ অনায়াসে কথাটা বলে দেন সুরবালাকে। কিন্তু মুখের কথা আর হাতের ঢিল একবার বেরিয়ে গেলে আর তো ফেরানো যায় না। পটাইবাবু বুঝতে পারেননি যে তিনি মুখ ফসকে তার গিন্নীর হাতে একটি মারাত্মক বোমা তুলে দিলেন, এবং যথারীতি সেই বোমাটিও সঙ্গে সঙ্গে ফাটলো।
“কি......? কুঞ্জে যাবে? এত দু-র-র-র ? তার মানে একটি রাধিকেও যোগাড় হয়েছে দেখছি ? ও-ও-ও মা-আ-গো-ও-ও এ আমার কি সব্বোনাশ হ’ল গো......? তা সঙ্গে গোপিনীরাও আছেন নিশ্চয়। হায় হায় হায় ...। এই বুড়ো বয়সে এতো দূর ? আমি এখন আত্মীয় পরিজন সবার কাছে মুখ দেখাই কি করে গো ও ও ও ।... বলে কিনা কুঞ্জে যাবে? তাই দেখি আজকাল সারাদিন কুম্পুটারে ঘাড় গুজে থাকে কেন?” সুরবালার কান্নার সুর আরও উচ্চগ্রামে ওঠে।
“দুত্তোর...। আরে এ কুঞ্জ সে কুঞ্জ নয়...! এ কুঞ্জ হচ্ছে এই কলকাতা শহরের একটা পার্কের নাম...। বলি এই পৃথিবীতে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে কারও নাম শুনেছ ?” এতক্ষন কথাগুলো জোরে জোরে বলে পটাইবাবু এবার আস্তে আস্তে টিপ্পনি কাটেন ‘তা আর শুনবে কি করে? বাপের তো ছিলো কয়লার ব্যাবসা’।
“কি তুমি আমার বাপ তুললে...... ? তোমার এত বড় সাহস ?”... প্রায় লাফিয়ে ওঠেন সুরবালা।
“তোমার বাপকে কি আমি তুলতে পারি? আমার সে ক্ষমতাই নেই, জীবদ্দশায় তার ওজন ছিল চার মন, এখন স্বর্গে গিয়ে আদেঔ কিছু কমেছে কিনা কে জানে?” কথাগুলো মিন মিন করে আপন মনে বলেই গিন্নীকে শুনিয়ে জোরে জোরে বললেন, ”আচ্ছা তুমি মোহর বলে কারও নাম শুনেছো?”
“ ও ও ও তাকে এখনও ভোলনি দেখছি ! বিয়ের পর থেকেই তো দেখতাম, আমার পিসতুত বোন মোহরকে দেখলেই ‘ও আমার দুষ্টু শালী... মিষ্টি শালী’ বলে তার সঙ্গে তোমার কতই না ফস্টি নস্টি আর আদিখ্যেতা। আর ছুড়িটাও তেমনি, জামাইবাবু বলতে এক্কেবারে অজ্ঞান। ছি ছি তাকে এখনও ভোলোনি তুমি ? হায় হায় এই না হলে পুরুষ মানুষের চরিত্র... ?” হতাস গলায় বলেন সুরবালা।
“ আরে দুত্তোর, এ মোহর সে মোহর নয় ইনি হলেন একজন বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। সারাটা জীবন তো শুধু রান্নাঘর, শোয়ারঘর, আর আঁতুরঘর, এর বাইরে তো আর কিছু চিনলে না............ !”
পটাইবাবুর কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সদর দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ শুনে দরজাটা খুলতেই হই হই করে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করলেন পটাইবাবুর পারিবারিক বন্ধু সদা হাস্যময় চিরকুমার লাটাইবাবু।
“কি গো বৌঠান কি ব্যাপার ? আজ সকাল থেকে কি এমন হল যে দুজনেরই মুখে আষাঢ়ের ঘন মেঘমালা?” রসিক বন্ধুর উপস্থিতি দুজনকেই যেন নতুন করে ঝগড়ায় উস্কানি দিল।
“আর বলিস না রে, তোর বৌঠানের ধারনা আমাদের ঐসব গ্রুপ মীটগুলোতে শুধুই শ্রীকৃষ্ণের লীলা খেলা চলে। একটু বুঝিয়ে বল তো, ওখানে গিয়ে আমরা কি করি?” পটাইবাবুর কথা শেষ না হতেই সুরবালা ঝাঝিয়ে ওঠেন, “দেখ ঠাকুরপো, ঐ মুখ পোড়াকে সমর্থন করে একটাও কথা বলবে না বলে দিচ্ছি। ওর একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না, অবশ্য তোমরা দুজনেই তো চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।”
“কি যে বল বৌঠান? তুমি থাকতে আমি কখনও ঐ বাঁদর টাকে সমর্থন করি? ওর কথা ছেড়ে দাও, বরং ও যেখানে যাচ্ছে যেতে দাও, আর চল আমরাও দুজনে কোথাও একটু ঘুরে আসি, ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে চল ‘পেয়ার মে দিয়ানা’ সিনেমাটা দুজনে এই সুযোগে দেখে আসি।”
লাটাইবাবুর মুখে একথা শুনে একেবারে লাফিয়ে ওঠেন পটাইবাবু, “ কি? এত বড় কথা? তোর সাহস তো কম না ? আমি থাকতে তুই আমার বউকে নিয়ে যাবি সিনেমা দেখতে?”
“তা তুই যদি কুঞ্জে গিয়ে অন্যের বউদের সঙ্গে লীলে খেলা করতে পারিস আর আমি একটু তোর বউকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতে পারব না?” এ কথা বলে লাটাইবাবু তার বন্ধুর কাছে গিয়ে কি যেন ফিস ফিস করে বললেন, আর বাইরে ভাবখানা দেখালেন যেন, বৌঠান তো ঠিকই বলেছেন।
এদিকে তার উত্তরে পটাইবাবুও সবাইকে শুনিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ... “যা যা তোরা যেখানে খুশি যা ... আজ আমি কুঞ্জে যাবই কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না”।
আর এটাতেই মন্ত্রের মত কাজ হ’ল। প্রতি উত্তরে সুরবালাও দ্বিগুন গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, “ঠিক আছে ঠাকুরপো... চলতো, তাহলে আমিও সত্যি সত্যি আজ তোমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবই।"
সকালের ঝগড়ার মধ্য দিয়ে যা যা ঠিক করা হয়েছিল সেই অনুযায়ী বিকেলের কাজগুলো হ’ল। পটাইবাবু বেলা তিনটে নাগাদই মোহর কুঞ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছেন। আর বেলা চারটে নাগাদ সেজে গুজে লাটাইবাবু এসে হাজির। মধ্য পঞ্চাশের সুরবালাকে পটাইবাবু এর আগে অনেকবার ফেসবুকের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে যে চাইলেও তিনিই কখনো কোথাও যেতেই চাননি, কিন্তু সেদিন পটাইবাবুর ফ্রেন্ডলিস্ট দেখার পর থেকে তার মাথার ঠিক নেই...। ছি ছি এই বুড়ো বয়সে এসে এসব কি? আজ একটা হেস্ত নেস্ত করে তবে ছাড়বেন তিনি।
তাই অনেক সঙ্কোচ অনেক লজ্জা সঙ্গে নিয়েও বিবাহিত জীবনে প্রথম একজন পরপুরুষের সঙ্গে বাইরে বেরলেন তিনি। মেট্রোতে ময়দান স্টেশনে নেমে লাটাইবাবু বললেন, “চলো বৌঠান এই ফাঁকা ময়দানে দুজনে বসে একটু সুখ দুঃখের গল্প করি।” ঠিক সেই মুহুর্তে সুরবালার নিজেকে খুব আপরাধী বলে মনে হতে লাগল। লাটাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “না, গো আমার ভালো লাগছে না, চল আমারা বাড়ি ফিরে যাই।” "সে কী ? তাহলে ঐ বাঁদরটার প্রতি প্রতিশোধ নেবে না তুমি?" লাটাইবাবু বলে ওঠেন। "না না তুমি বাড়ি চল ঠাকুরপো" মিনতি করে ওঠেন সুরবালা। তখন লাটাইবাবু তার হাতের আসল তাসটি বার করলেন। সুরবালাকে একটু দূরে একটা আলো ঝল মলে জায়গা দেখিয়ে বললেন, “ঐ যে সাজানো গোছানো, আলো ঝলমলে পার্কটা দেখছো, ওটাই সেই মোহর কুঞ্জ, চল তো বাঁদরটা ওখানে কি করছে একবার দেখে আসি।”
এই কথা শুনেই আবার সুরবালা যেন তার আসল তেজ ফিরে পেলেন, “ওহ! তাই! চল তো, আজ মুখপোড়াটাকে একেবারে হাতে নাতে ধরবো।” দুজনে ভিতরে প্রবেশ করে কিছুটা এগিয়ে এক যায়গায় পৌছিয়েই অবাক হয়ে যায় সুরবালা। কি সুন্দর সাজানো গোছানো গাছ গাছালি ও ফুলে ফুলে ভরা একটা পার্ক। রঙ্গিন জলের ফোয়ারা, কত নারী-পুরুষ এবং ছেলে-মেয়েরা ঘোরা ফেরা করছে, কিম্বা বসে বসে গল্প করছে। কলকাতায় যে একটা এত সুন্দর যায়গা আছে, লাটাইবাবু আজ জোর করে না নিয়ে এলে তার জানাই হত না, সত্যি প্রেম করবার উপযুক্ত যায়গাই বটে, ইশ্ তারমানে এতদিন তাকে ফাঁকি দিয়ে পটাইবাবু এখানে এসে এইসব করে বেরাচ্ছে ছি ছি ছি।
হটাৎ সুরবালার নজরে পড়ে একটা জায়গায় একটা উঁচু বেদীর উপর প্রায় পঁচিশ ত্রিশ জন পনের ষোল বছরের ছেলে মেয়ে, আর তাদেরকে ঘিরে আট দশ জন বয়স্ক মহিলা ও পুরুষের মধ্যমনি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন পটাইবাবু। পিছনে একটা ব্যানারে লেখা “”ফেসবুক পথ-শিশু গ্রুপ””। ততক্ষনে উদ্বোধনী সঙ্গীত শুরু হয়ে গেছে। উদ্বোধনী সঙ্গীতের পরে পরেই এক ভদ্রমহিলা ঘোষনা করলেন “এই কলকাতা শহরে কয়েক লক্ষ লোক এক শোচনীয় পরিবেশে ফুটপাথে বাস করতে বাধ্য হয়, কিন্তু ঐ পরিবেশেও কত পদ্মফুল নীরবে ফোটে আমরা তার কতটুকুই খবর পাই? আজ আমাদের এই ফেসবুক পথশিশু গ্রুপের পক্ষ থেকে এমনই ত্রিশজনকে সংবর্ধনা জানিয়ে আমরা ধন্য হতে চাই। এইসব ছেলে মেয়েরা ফুটপাথের প্রতিকুল পরিবেশে বাস করেও এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনীতে পাশ করেছে। এবার এদের প্রত্যেকের হাতে পুষ্প স্তবক, পুস্তক-সামগ্রী ও একটি করে মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে সংবর্ধনা জানাবেন, আমাদের গ্রুপের প্রবীন সদস্য শ্রী পটাই চন্দ্র খাসনবীশ। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে আজকের এই পুরষ্কারের যাবতীয় খরচ বহন করেছেন আমাদের গ্রুপের গর্ব পটাইবাবু। লাটাইবাবু লক্ষ করলেন সুরবালার চোখদুটি কেমন যেন ছল ছল করছে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছনে শুধু পটাইবাবুর দিকে। ছোট্ট অনুষ্ঠান, আধ ঘন্টার মধ্যে শেষ হয়ে গেল। দুই বন্ধুর পূর্ব পরিকল্পনা মত পটাইবাবুও দূর থেকে সবই লক্ষ করেছেন কিন্তু যেন কিছুই দেখতে পাননি এমন ভাব দেখিয়ে সুরবালার পাশ দিয়ে যাবার সময়ে হটাৎ সুরবালা কে দেখে অবাক হওয়ার ভান করে, জিজ্ঞেস করলেন "আরে, তুমি এখানে কি করে এলে ?", সুরবালা জীবনে এই প্রথম প্রকাশ্যে পটাইবাবুকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে বলে উঠলেন, “শুনেছি ছোটবেলায় তুমি খুব ভাল ফুটবল খেলতে, কিন্তু তুমি যে এত বড় অভিনেতা, সেটা জানতাম না গো।”

Tuesday, 13 November 2018

"""" গঙ্গাপ্রসাদ """"

বাকুড়া জেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম পলাশ ডাঙ্গা, আর সেই গ্রামের ছোট্ট একটি ছেলে গঙ্গাপ্রসাদ মুখার্জি। দামোদরের একদিকে বাকুড়ার পলাশডাঙ্গা আর অপর প্রান্তে বধর্মান জেলার কাঁকসা। গঙ্গা বড়দের কাছে শুনেছে দামদর নদ পার হয়ে ওপারে গিয়ে ঐ কাঁকসা থেকে রেল গাড়ি চেপেই যাওয়া যায় কলকাতায়। তখনও বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন চালু হয়নি। বাষ্প ওড়াতে ওড়াতে সে ট্রেন যন্ত্রের সাহায্যে ছুটে চলে। সেটা বিংশ শতাব্দীর মাঝা মাঝি। তখন ভারত সবে স্বাধীন হয়েছে।
গঙ্গাপ্রসাদের গ্রামের যারা কলকাতায় থাকে তাদের মুখে সে শুনেছে যে কলকাতায় নাকি হাওয়ায় টাকা ওড়ে শুধু ধরে নিতে জানতে হয়।
সেই কলকাতায় যাওয়ার জন্য গঙ্গা প্রসাদের যেন আর তর সয় না । গঙ্গা প্রসাদ তার সমবয়সি বন্ধুদের বলে, “জানিস একদিন আমি ওই নদ পার হয়ে কলাকাতায় চলে যাব। তারপর অনেক অনেক টাকা রোজগার করব।” তবে তার এই কথায় সমবয়সি ইয়ার বন্ধুরা কেউ তেমন উৎসাহ দেয় না। বরং সবাই তাকে উপহাস আর বিদ্রূপের করে; তবে কথাটি যখন তার খেলার সাথী দশ বছর বয়সের সুলতাকে বলল, তখন সুলতা বলল, “সেই ভা্‌ তবে আমাকে কলকাতায় নিয়ে যাবে তো?” গঙ্গা গম্ভীর মুখে বলে, “দূর বোকা কলকাতায় মেয়েরা যায় না সেখানে শুধু পুরুষ মানুষরা যায়।” বারো বছর বয়সের গঙ্গা-র মুখে পুরুষ মানুষ শব্দটা শুনে সুলতারও কেমন যেন হাসি পেল। সুলতার মা তার বাবা-কে বলে, ‘পুরুষ মানুষ সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে লজ্জা করে না’? বাইরে বেরিয়ে কিছু কাজ কর্ম তো করলে পার? কিন্তু সুলতার দাদাকে তো কোনদিন ওর মা পুরুষ মানুষ বলে না ? তাকে বলে ‘ছেলেরা সংসারে কত কাজ করে আর তুই সারাদিন শুধু ঘুরে ঘুরে বেরাস’?
সেই গঙ্গা একদিন আরো বড় হল, গ্রামের পাঠশালার পাঠ শেষ করে বাবার কাছে কিম্বা খুড়োর কাছে তাদের পৈত্রিক চাষ বাস সংক্রান্ত কাজকর্ম শিখে নিলো এখন সে ষোল বছরের তরতাজা কিশোর। কিন্তু এখনও সে মাথায় সযতনে দুটি জিনিস পোষন করে চলেছে। এক নম্বর হচ্ছে যত দিন যাচ্ছে সুলতা যেন তার মাথায় আরও বেশী করে চেপে বসছে। এমন কোনদিন নেই ওর মাথায় সুলতার মুখ-টা ভেসে ওঠে না। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে কলকাতা যাওয়ার সেই সুপ্ত বাসনা, এবং দিন দিন দুটি বাসনাই যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ইতিমধ্যে সুলতার বয়স চোদ্দ বছর হল, সেই যুগে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঐ বয়সের পরেও কুমারী রাখা আর সমাজে একঘরে হয়ে যাওয়া প্রায় সমার্থক। শেষে একদিন গঙ্গা ঠিক করেই ফেলল, আপাতত সে কলকাতাতেই চলে যাবে এবং কিছু পয়সা উপার্জ্জন করে গ্রামে ফিরে আসবে। গঙ্গা প্রভুত অর্থের মালিক হলে সুলতা নিশ্চই সব কিছু মেনে নেবে। সুলতারাও ব্রাহ্মণ, দেখতে ভাল ওর বাবার গ্রামে বেশ প্রতিপত্তি আছে তাই গঙ্গার আশা দুই পরিবারের তরফ থেকে কোন রকম বাধা আসবে না। শুধু একটা বছর কোনরকমে সুলতার বিয়েটা আটকে রাখা।
একদিন গঙ্গার মনের কথা সুলতাকে বলতেই, সুলতা চোখের জলে তাকে একটাই উত্তর দিল..., “তুমি আমাকে কেনার জন্য কত টাকা দেবে গঙ্গা-দা ?” গঙ্গা উত্তেজিত হয়ে বলে, “ছি! সুলতা, এ কথা তুই কি করে বললি ? তোকে কি আমি টাকা দিয়ে কিনব বলেছি? তুই কি জানিস কোন মেয়েরা টাকার বিনিময়ে বিক্রী হয় ?” সুলতা তার উত্তরে খুব শান্ত ভাবেই বলল, “বিলক্ষন জানি, আর জানি বলেই তো আমার মনে এত শঙ্কা। তোমরা ছেলেরা প্রেম, ভালবাসার সঙ্গে টাকাকে বড্ড গুলিয়ে ফেলো। তোমাদের কাছে প্রেম ভালবাসা মানে শুধুই টাকা আর শরীর।”
একথা শুনে আরও উত্তেজিত হয়ে গঙ্গা বলল, “ছি সুলতা ছি ! তোর এত অবনতি? তুই কি বলতে চাস যে আমি তোর শরীরটা একদিন পাব সেই আসায় প্রতিদিন তোর কাছে আসি?” হটাত উত্তেজিত গঙ্গা কাপতে কাপতে বলল, “একমাত্র বেবুশ্যে মেয়েরাই এই ধরনের কথা বলে, তা এই ব্যবসা তুই কতদিন হল শুরু করেছিস?” কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যাবার পরই গঙ্গাপ্রসাদ বুঝতে পারল কি মারাত্মক কথা ওর মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু তার উত্তরে সুলতা এতটুকুও উত্তেজিত না হয়ে বলল, “এখনও শুরু করিনি তবে যদি কোনদিন শুরু করি , জানবে সেদিন তুমিই হবে আমার প্রথম খদ্দের।”
সারা রাত এক সুতীব্র অনুশোচনা যেন গঙ্গা প্রসাদের শরীর ও মনকে জ্বালিয়ে দিতে থাকল। সারা রাত্রি এক ফোটা ঘুম হল না। অন্ধকার থাকতেই ভোর বেলায় সবার অলক্ষে গঙ্গা কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তখন ভারত সবে স্বাধীন হয়েছে, সীমিত ক্ষমতার মধ্যেই সরকার দেশ গঠনের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। তার উপর ওপার বাংলা থেকে এসেছে লক্ষ লক্ষ শরনার্থী, তাদের পুনর্বাসন দরকার। বিভিন্ন উদবাস্তু ক্যাম্প গুলতেও প্রচুর কাজ হচ্ছে। এক কথায় ঠিকাদার দের তখন পোয়াবারো। গঙ্গা তেমনই একটি ঠিকাদার সংস্থায় সামান্য বেতনের চাকরিতে ঢুকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বেশ কয়েক বছর চাকুরিতে রত থেকে বেশ কিছু অর্থের মালিক হল।
মনের জোরে ইচ্ছে করেই এত দিন গ্রামে ফেরেনি। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেও ভাল ছিল না, গ্রামের তার পিতা মাতা এবং গ্রামের অন্যান্য সকলে গঙ্গা চিরকালের জন্য নিরুদ্দেশ ধরে নিয়েই তার প্রত্যাবর্তের আশা ত্যাগ করে দেয়। শুধু সুলতা বিবাহের পরেও আজও প্রতিদিন গঙ্গা নাম জপ করে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে চলেছে। তবে কলকাতা শহরে সে নিজেকে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করে প্রায় পাঁচ বছর পরে প্রথম বার বাকুড়ায় নিজের গ্রামে ফিরল এবং আত্মীয় পরিজন দের সঙ্গে সাক্ষাত করে সুলতার বিবাহের খবর শুনে কিছুদিনের মধ্যেই আবার কলকাতায় ফিরে এল। এবার যেন আরও বেশী করে কাজকর্মে ঝাপিয়ে পড়ল এবং স্বীয় ক্ষমতায় অল্পদিনে নিজেই একটি ঐরূপ একটি ঠিকাদরি সংস্থা খুলে ফেলল। কিছুদিনের মধ্যেই প্রচুর টাকা উপার্জ্জন করে সে কলকাতা উচ্চবিত্ত সমাজে তার স্থান পাকা করে নিল। কলকাতা শহরে তার তখন তিনটে বাড়ি দুটি গাড়ি।
এই ভাবে চলতে চলতে একদিন মধ্য চল্লিশের গঙ্গা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ করল তার মাথার চুলে পাক ধরেছে । চোখের কোনে শরীরের উপর অত্যাচারের লক্ষণ স্পষ্ট। অত্যাচার বলতে শুধু কাজ আর কাজ, আর সন্ধ্যায় ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে বসে একটু মদ্যপান। পলাশ ডাঙ্গার সেই কিশোর গঙ্গাপ্রসাদ আজ অনেক পরিণত। সারাদিন পরিশ্রম করে কোম্পানীর সকল কাজ এখন নিজে একাই দেখাশোনা করে। সেই সুবাদে বড় সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা করে ইংরাজীটাও এখন মোটামুটি ভালই শিখেছে।
সারাদিন খাটা খাটনির পর অবিবাহিত গঙ্গা ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপান করতে বসে, তবে ইদানিং সে একটা জিনিস লক্ষ করেছে, মনে মনে সে যেন কারও সঙ্গ কামনা করে। তার মনে এখনও কি সুলতার সেই নিষ্পাপ মুখটাই উকি দেয় ? বন্ধুদের কাছে এ কথা বলতেই তারা উপদেশ দিল...... মনের আর দোষ কি? এই বয়সে শরীর ও মন দুই ই তো সঙ্গ কামনা করবে...... আর সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও গঙ্গা যেন সবাইকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারে না। এ সঙ্গ ঠিক সেই সঙ্গ নয়। এটা ঠিক স্ত্রীর সঙ্গ নয়। কোন নারী সঙ্গ নয়। এ যেন সারাদিন খাটা খাটনির পর বাড়ির কোন আপনজনের সঙ্গ। যা থেকে গঙ্গা আজ দীঘর্দিন বঞ্চিত।
তবু বন্ধুরা তাকে বোঝায় সারাদিন খাটা খাটনির পর সন্ধ্যাবেলায় একটু নাচ গানের আসরে গেলে মনটা দুদিনে অনেক হাল্কা হয়ে যাবে। কথায় বলে যেখানে টাকা ওড়ে, সেখানেই সুন্দরীরা ঘোরে। কিছুদিনের মধ্যেই গঙ্গার এক ঘনিষ্ট বন্ধু কানাই খবর দিল বউবাজারে একজন বাঙ্গালী বাইজী এসেছে, তার যেমন রূপ তেমন-ই গানের গলা। বন্ধুদের পরামর্শে পরদিন সদলবলে গঙ্গা সেখানে গিয়ে হাজির। অত্যন্ত সুদৃশ্য এবং সুসজ্জিত একটি ঘরে গঙ্গা সবান্ধব বসল। গঙ্গার একটু অস্বস্তি হচ্ছে। এই প্রথম সে এই রকম একটা পরিবেশে এসেছে। সঙ্গীতের বাজনদাররা যে যার নিজের নিজের জায়গায় এসে বসল। সুসজ্জিত রেকাবে ও পানপাত্রে অতিথিদের খাদ্য এবং পানীও পরিবেশন করা হল। আর তার সামান্য পরেই এক পরমা সুন্দরী তার দুই সখীকে নিয়ে ওই ঘরে প্রবেশ করল। অষ্টাদশী পরমা সুন্দরী মেয়েটি ঠিক গঙ্গার মুখো-মুখি বসতেই গঙ্গার নজর গিয়ে পড়ল তার মুখের উপর। সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার সমস্ত শরীরে যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত হয়ে গেল। সেই মুখ, সেই চোখ, এমনকি গলার স্বরও ঠিক তার মত। কিন্তু তা কি করে সম্ভব? এর বয়স খুব বেশী হলে আঠারো-কুড়ি বছর হবে আর সে তো......। গঙ্গা কৌতুহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “মা তোমার নাম কি?” বন্ধুরা অবাক... একজন বাইজিকে মা বলে সম্বোধন ? উত্তরে বাইজিটি বলল, “হুজুর বোধ হয় এই লাইনে প্রথম, হুজুরের জানা নেই যে বাইজীদের আসল নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করতে নেই?” গঙ্গা সবাইকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল, “আমার শরীর খারাপ লাগছে আমি এখন-ই বাড়ি যাবো।” বাড়িতে ফিরে গঙ্গা তার চব্বিশ ঘন্টার কাজের লোক কানাই-কে বলল, “যে করেই হোক, যত টাকা লাগে লাগুক ... মেয়েটির আসল পরিচয় খুজে বের করতেই হবে। যতদিন না ওর আসল পরিচয় জানা যাচ্ছে ততদিন ও কোন কাজ করবে না। মেয়েটি বাইজী হিসেবে প্রতিদিন যে টাকা রোজগার করে সেটা ওকে আমি-ই দেব।
দুইদিনের মধ্যেই কানাই খবর নিয়ে এল, মেয়েটির আসল নাম বিজয়া, বাবার নাম যাদব ভট্টাচায্য বাড়ি বাকুরার সোনামুখি গ্রামে। বাবাটি বড়ই চরিত্রহীন স্ত্রী কন্যার প্রতি তার কোন নজর নেই। গঙ্গা উত্তেজনায় কাপতে কাপতে চিৎকার করতে থাকে ...। “নিকুচি করেছে ওর বাবার নাম ঠিকানায়...। ওর মায়ের নাম কি? মামার বাড়ি কোথায় সেই খবর নিয়ে এস।” কানাই বলল, “আমি তাও এনেছি, ওর মামার বাড়ি পলাশডাঙ্গা, আর মা সুলতা সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন।” একথা শুনেই গঙ্গা পাগলের মত হাত পা ছুড়তে ছুড়তে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বাড়ির যত পরিচারক, পরিচারিকারা তঠস্থ হয়ে এ ওর মুখ চাওয়া চায়ি করতে লাগল।
পদিন সক্কালে উঠে গঙ্গা একাই দৌড়ে গেল সেই বাইজী বাড়িতে। উদভ্রান্তের মত ছোটা ছুটি করে খুজে বের করল বাড়ির মালকীন মাসীকে। বলল, “কোথায় তোমার বিজয়া? আমার এখন-ই ওকে চাই।” মালকীন ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতে এক টাকা দু টাকা নয় দশ হাজার টাকা গুজে দিয়ে বলল, “বিজয়াকে এখন-ই আমার চাই।” মাসী জীবনে একশো টাকার বেশী কখনো দেখেনি। সেই যুগে দশ হাজার টাকায় একটা ছোটখাটো দোতলা বাড়ি হয়ে যেত। এত গুলো টাকা হাতে পেয়ে কেমন যেন ভয় পেয়ে গিয়ে তখনই সাজিয়ে গুজিয়ে বিজয়াকে গঙ্গার হাতে তুলে দিল। গঙ্গা বিজয়াকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, “কিরে আমাকে চিনতে পারিসনি তো? আমি গঙ্গা মুখুজ্জে, পলাশডাঙ্গার গঙ্গা। আমার একার সংসারে এত সম্পত্তি কে দেখবে বলতো? চল তাই তোকে নিতে এলাম...পারবি না তোর এই বুড়ো ছেলেটাকে শাসন করে সংসারের হাল ধরতে ? আর এই সারাদিন খাটা খাটনি, আর মদ মাংস এসব আর ভাল লাগে না রে ? চল আমি তোকে নিয়ে যেতে গাড়ি নিয়ে এসেছি। তারাতারি চল আমরা মা আর বেটায় মিলে নতুন করে সংসারটা সুরু করি।” বিজয়া তার মায়ের কাছে অনেকবার গঙ্গা মুখুজ্জের নাম শুনেছে... তাই গঙ্গা-কে চিনে নিতে তার অসুবিধা হল না। সে তার বুড়ো ছেলের সঙ্গে গাড়িতে গিয়ে উঠল। ওদিকে এই প্রথম কুঠির মানুষরা তাদের দোর্দন্ড প্রতাপশালী মাসীর চখে জল দেখলো।

"""" গাড়ি কিনলেন পটাইবাবু """"

পটাইবাবুর বাঙ্কে একটিই মাত্র একাউন্ট। সেটা না থাকলেই নয় কারণ ওই একাউন্টেই তার অফিসের বেতনের টাকা জমা হয়, এবং মাসের শেষে তার পাশবুকে নীট ব্যালান্স বড়জোর জমার ঘরে বিশ-পঁচিশ হাজার টাকা। দুনিয়ার আর কোথাও আর কোন বাঙ্কেই তার কোন একাউন্ট নেই। তবুও ভারতের সমস্ত সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলি কি করে যে পটাইবাবুর মত অতি সাধারণ ব্যক্তিদের নাম ধাম পেয়ে যায় কে জানে? দিন রাত্রি তারা এই বিশ হাজার টাকার মালিককে ফোন করে করে পাগল করে দেয়। তারা পটাইবাবুকে গাড়ি কেনার জন্য ঋন দিতে প্রস্তুত। বাড়ি করার জন্য ঋন দিতে তৈরী, এমনকি তার বিবাহিত মেয়ের বিয়ের জন্যও ঋন দিতে ব্যস্ত। এই ভারতবর্ষে তারা বোধ হয় কাউকে গরীব থাকতে দেবে না।
সেদিন পটাইবাবু মন দিয়ে অফিসে কাজ করছিলেন এমন সময়ে তার মুঠো ফোনটি বেজে উঠল, “হেললো মে আই টক টু মিস্টার পটাই……” বার বার এই একই প্রশ্ন শুনে শুনে ক্লান্ত পটাইবাবু সেদিন নিতান্ত বিরক্ত হয়েই ও প্রান্তের বক্তাকে তার বক্তব্য শেষ করতে না দিয়েই বলে দিলেন, “ আ হা হা হা ভেরি সরি পটাইবাবু তো জাস্ট গতকাল সন্ধ্যায় মারা গেছেন।”
তবু ভবি ভোলবার নয়। ও প্রান্ত থেকে আবার ভেসে এলো। “ওহ, ভেরি সরি, ভেরি সরি, স্যার তবু কই বাত নেহি, আপনি কাইন্ডলি ওনার বাড়ির এক্সাক্ট ল্যান্ড মার্কটা একটু দেবেন, আমরা ওনার মিসেসের সঙ্গে একবার দেখা করব, আসলে আমরা একটা নতুন লোন স্কিম লঞ্চ করেছি যেটা শ্রাদ্ধের ক্ষেত্রে খুব কাজে দেবে...এই লোনটা হচ্ছে কোন ব্যক্তি যত বছর বয়সে মারা গেছেন তত হাজার টাকা তক্ষুনি একেবারে স্পট লোন হিসেবে দিয়ে দেয়া হবে। আমাদের লোকেরাই প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র নিয়ে ওনাকে দিয়ে সই-সাবুদ করিয়ে নেবে। আর ঘাটের দিন গঙ্গার ঘাটে গিয়ে ২০%, শ্রাদ্ধের দিন মৃতব্যক্তির বাড়িতে ৩০% আর নিয়ম ভঙ্গের দিন নির্দ্দিষ্ট অনুষ্ঠান বাড়িতে বাকি ৫০% লোন একেবারে নগদে ওনার স্ত্রীর হাতে দেয়া হবে। প্রয়োজনে আমরা নাপিত, ব্রাহ্মণ এবং ক্যাটারার ইত্যাদির ব্যবস্থাও করে দেব, তার জন্য আলাদা কোন চার্জও দিতে হবে না। আমাদের এই স্কিমের ই এম আই ও খুব সহজ। ওনার মিসেস যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন আস্তে আস্তে শোধ দিতে পারবেন। এমনকি ওনার স্ত্রীর মৃত্যুর পরে আর শোধ না দিলেও চলবে সে ক্ষেত্রে লোনটা আপনা থেকেই পটাইবাবুর স্ত্রীর শ্রাদ্ধের লোন এডভ্যান্স হিসেবে এডজাস্ট করে টাকাটা মরেটরিয়াম লোন করে দেয়া হবে। তাই এই লোনের ক্ষেত্রে পটাইবাবুর স্ত্রী যত তারাতারি মারা যান ততই মঙ্গল।”
এই কথা শোনার পর পটাইবাবুর সারা শরীর রাগে রি রি করতে লাগলো এ ব্যাটাদের আমাকে মেরে আমার শ্রাদ্ধ করেও শান্তি নেই আবার আমার জলজ্যান্ত বৌটাকেও পর্যন্ত মেরে ফেলতে চাইছে। তবে এত কথা শোনার পরও পটাইবাবুর মনটা কিঞ্চিত বিগলিত হ’ল, মনে মনে ভাবলেন অন্তত ব্যাঙ্কের নামটা জেনে রাখা ভাল। প্রয়োজনে তার মৃত্যুর পর তার অকর্মন্য ছেলে অন্তত এই ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে তার শ্রাদ্ধটা একটু ধুমধাম করে করতে পারবে। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন “আজ্ঞে আপনার নামটা একটু বলবেন? আর আপনাদের ব্যাঙ্কের নামটা কি যেন বললেন?” ও প্রান্ত থেকে টেলিফোনে জবাব এলো "আজ্ঞে আমার নাম 'ঢোল গবিন্দ গড়গড়ি' আর আমাদের ব্যাঙ্কের নাম R K G P Bank."
“দেখুন আমি ICICI, IDBI, HDFC, বাঙ্কের নাম শুনেছি কিন্তু R K G P Bank? পুরো কথাটা কি বলুন তো?” পটাইবাবু শুধালেন।
আজ্ঞে “ঋনং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত ব্যাঙ্ক”, ও প্রান্ত থেকে উত্তর ভেসে এল। একথা শুনে পটাইবাবু এমন চমকে উঠলেন যে তার হাত থেকে মূঠো ফোনটা ছিটকে পড়ে গেল, তার মাথাটাও কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগল। পটাইবাবু চক্ষু বুজে এমন ভাবে ধপাস করে চেয়ার-এ বসে পড়লেন যে তার সহ কর্মীরা সবাই দৌড়ে এসে তার চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে বাতাস করতে লাগলেন এবং কিছুক্ষন পরে পটাইবাবুর জ্ঞান ফিরে এল।
আর পাঁচটা দিনের মত এদিনও অফিস থেকে ফেরার পথে বাসে পটাইবাবু বসার যায়গা পাননি। সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত পটাইবাবু কাধে ব্যাগ নিয়ে দুহাত তুলে রড ধরে যেতে যেতে জানালা দিয়ে দেখেন তার বাসের পাশ দিয়ে হুস হুস করে ঝা চক চকে রঙ বে রঙের গাড়িগুলো ছুটে যাচ্ছে। পটাইবাবু চোখ বুজে ভাবতে থাকেন তাদের ছোটবেলায় শুধু বড়লোকেদের বাড়িতে গাড়ি থাকতো। আর তার সবই এম্বাসাডর এবং মাত্র সামান্য কিছু ছোট ফিয়াট গাড়ি। অল্প কিছু বনেদী বড় লোকেদের বাড়িতে অবশ্য আরও পুরানো দিনের মরিশ কিম্বা অস্টিন গাড়ি দেখা যেত। কিন্তু গাড়িগুলির স্থাপত্যে এত সৌন্দর্য ছিল না। আর দুনিয়ার সকল প্রাইভেট গাড়ির একটাই রঙ ছিল, সেটা হল কালো। পরে অবশ্য কিছু কিছু এম্বাসাডর গাড়ি সাদা রঙের দেখা যেতে লাগলো। কিন্তু এখন গাড়িগুলি স্থাপত্যে কত সুন্দর দেখতে। আর কি সুন্দর সুন্দর সব লাল নীল সবুজ হলুদ বিভিন্ন রং-এর বৈচিত্র। হটাৎ একটা ঝাকানিতে পটাইবাবুর তন্দ্রা ভাবটা কেটে যায়। আজ বাসটা যেন বড্ড আস্তে আস্তে যাচ্ছে। পাশ দিয়ে কি সুন্দর সব প্রাইভেট গাড়িগুলি চলে যাচ্ছে। ঝক ঝকে কাঁচের জানালার আড়ালে এই শহরের আমজনতার প্রতি একটা অবজ্ঞার ভাব নিয়ে চলন্ত ঠান্ডা ঘরের আরাম কেদারায় বসে আছেন যেন এক একজন স্বপ্নপুরীর রাজপুত্তুর রাজকন্যেরা।
তখন পটাইবাবুর ব্যাঙ্কের সেই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি মনে মনে হিসেব করতে লাগলেন, তিনি কেটেকুটে হাতে যা পান তার থেকে মাসে চার পাচ হাজার টাকা জমে যায়। আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, তার যেহেতু মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেও কলেজ পাশ করে গেছে তাই প্রভিডেন্ট ফান্ডে প্রতিমাসের তার প্রদত্ত টাকার পরিমানটা যদি কিছুটা কমিয়ে দেয়া যায়! আর সেই টাকায় মাসে মাসে গাড়ির ই এম আই টা বোধ হয়......। প্রচন্ড গরমে ঘামতে ঘামতে কাধে ব্যাগ, দুই হাত তুলে পটাই বাবু স্বপ্ন দেখতে থাকেন সামনের মাস থেকে তিনি ঐরকম একটি কাঁচের জানালায় আড়ালে এক চলন্ত ঠান্ডা ঘরে বসে অফিস যাচ্ছেন। আর ছুটির দিন গুলোতে গিন্নী সুরবালাকে পাশে বসিয়ে আজ ডায়মন্ড হারবার নয় তো কাল টাকি। ইস ভাবতেই তার সারা শরীরে শিহরণ জাগছে। হটাত কন্ডাক্টরের চিৎকারে তার হুশ ফিরলো।
বাড়ি ফিরে এক কথা দু কথায় গিন্নী সুরবালাকে সে কথা বলতেই সুরবালা তার চার মণ ওজনের দেহটাকে দুলিয়ে চিৎকার করে বললেন, “সে কথা আর আমাকে বলতে হবেনা। আমি কদিন ধরেই লক্ষ করেছি তোমার কথা বার্তা যেন কেমন কেমন! তোমার মতিগতি আমার ভালো ঠেকছে না......। নিশ্চই পেটের গ্যাসটা আবার মাথায় চড়েছে, হ্যাগো নিশ্চই বাইরে উলটো পালটা কিছু খেয়েছো। যে লোক বছরে এক বারের যায়গায় দুবার ঈলিশ মাছ কিনতে গেলে সাত বার ভাবে সে কিনবে গাড়ি! সেকথা যদি বলতে হয় তাহলে দেখ পাশের বাড়ির সান্যালবাবুকে। শুধু গাড়ি কেনাই নয়; প্রত্যেক মাসে বউকে নিয়ে আজ দীঘা তো কাল দার্জিলিং ঘুরে আসছে।”
একে বলে একেবারে সরাসরি পুরুষ মানুষের আঁতে ঘা। তাই যখন পটাইবাবু কিছুতেই তার ত্রিশ বছরের সহ ধর্মিনীকে বোঝাতে সক্ষম হলেন না যে তিনি সত্যি সত্যি একটি গাড়ি কেনার কথা ভাবছেন, আর ঠিক সেই সময়ে তার স্ত্রী পাশের বাড়ির ঘুষখোর ভদ্রলোকের সঙ্গে তার তুলনা করায় তার পৌরষত্ব দপ করে জ্বলে উঠল।
পরদিন পটাইবাবু অফিসে গিয়ে প্রথমেই ঋণং কৃত্বা বাঙ্কের ঐ নম্বরে ফোন করতেই মিঃ গড়গড়ি এক গাল হেসে বললেন, “গুড মর্নিং স্যার, আমি জানি আপনি আমাকে রিং ব্যাক করবেন স্যার। আমি এক্ষুনি সব কাগজ পত্র দিয়ে আমার লোককে আপনার অফিসে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমার নাম গড়গড়ি, ধরেই নিন গাড়ি আপনি সামনের সপ্তাতেই পেয়ে যাচ্ছেন, আর তারপর নতুন গাড়িতে চেপে গড়গড়িয়ে বেরিয়ে পরুন স্যার।”
বাড়ি ফিরেই গাড়ির সকল কাগজ পত্র দেখিয়ে পটাইবাবু তার সহধর্মিনীকে আগের দিনের অপমানের জবাব দিলেন। কি সুন্দর সব রঙ্গীন গাড়ির ছবি! তদোধিক সুন্দর সেইসব গাড়ির সওয়ারিরা। যে সুরবালার সঙ্গে তার জীবনের সকল রোমাঞ্চ বিয়ের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে সেই সুরবালা তার বিশাল দেহখানি পটাইবাবুর গায়ে লেপ্টে দিয়ে বড়ই আদরের সুরে বলে ওঠেন, “ হ্যা গো সত্যিই তুমি গাড়ি কিনবে, আমার কেন জানি কিছুতেই বিশ্বাসই হচ্চছে না যে আমি ঐ রকম একটা সুন্দর রঙ্গীন গাড়িতে তোমার পাশে বসে ফুর ফুর করে ঘুরে বেড়াবো ?”
সে যাই হোক সাত দিনের মধ্যে পটাই বাবু একটি নতুন গাড়ির মালিক হলেন। নতুন গাড়ি কিনলে নিজেকে বেশ বড় লোক বড় লোক মনে হয়। একটা রবিবার দেখে পটাইবাবু স্ত্রী সুরবালাকে নিয়ে একটু লং ড্রাইভে বেরবেন ঠিক করলেন। যেমন কথা তেমনি কাজ, পাড়ার ছেলে ভোম্বলের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে যখন যেমন ডাক অড়বে ভোম্বল পটাইবাবুর ড্রাইভারের কাজটি করে দেবে।
সেই অনুযায়ী একটি শুভ দিন দেখে এক রবিবার সাত সকালে কলকাতা থেকে দুজনে নম নম করে বেড়িয়ে পরলেন কলকাতার কাছাকাছি একটা জায়গার উদ্দেশ্যে। গাড়িতে উঠে যেন তার বিশ্বাসই হতে চাইছিল না যে গাড়িটা তার নিজের। নিজেকে যেন অফিসের ডিরেক্টর বলে মনে হতে লাগলো, পটাইবাবুর মনে হল নিজের গাড়িতে বসলে মুখটা একটু গম্ভীর করে রাখতে হয়। পটাইবাবু বাইরে মুখ খানি গম্ভীর করে রাখলেও অন্তরের এক অন্তঃসলিলা আনন্দে ফুর ফুরে হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে বহুদিন পরে আজ স্ত্রীর পাশে বসে কোথাও চলেছেন। আজ যেন পটাইবাবু নতুন করে তার স্ত্রীকে আবিষ্কার করলেন। সত্যিই তো পাশে তার স্ত্রী থাকলে যে মনের মধ্যে অমন পুলক জাগে সেটা তো তিনি এতদিন খেয়ালই করেননি?
এইভাবে স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে মনের আনন্দে কিছুদুর চলার পর তার ফুর ফুরে মেজাজটা হটাৎ ধাক্কা খেল। এক জায়গায় এসে দেখলেন একটা বাঁশ আড়া আড়ি করে রেখে রাস্তাটা বন্ধ করে দেয়া আছে, কাছা কাছি আসা মাত্র কয়েকজন ছেলে গাড়িটাকে ঘিরে ধরে ড্রাইভারের হাতে একটা চাঁদার বিল ধরিয়ে দিল, ভোম্বলের হাত থেকে সেটা পটাইবাবুর কাছে পৌছতেই পটাইবাবুর তো ভিরমী খাওয়ার মত অবস্থা। "বাবলাতলা শ্রী শ্রী ছিন্নমস্তা মায়ের পূজো উপলক্ষে চাঁদা বাবদ পাঁচ হাজার টাকা ধন্যবাদের সহিত গৃহীত হইল।" পটাইবাবু বাড়ি থেকে মাত্র চার হাজার টাকা নিয়ে বেরিয়েছেন তার মধ্যে পাঁচ'শ টাকার তেল কিনেছেন হাতে আছে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা। অনেক তর্কা-তর্কি করে পটাইবাবু যেখানে পাঁচ'শ টাকার উপরে কিছুতেই উঠতে পারবেন না সেখানে বাবলাতলারা নতুন ঝা চক চকে গাড়ি দেখে চার হাজারের নীচে কিছুতেই নামবে না। যাই হোক অনেক দর-দস্তুর করে একহাজারে রফা হল, এবং পটাইবাবুর হাতে রইল মাত্র আড়াই হাজার টাকা।
এরপর আরও কিছুক্ষন চলার পর পটাইবাবু যখন ঐ হাজার টাকার শোক ভূলে যাওয়ার চেষ্টা করছে তখন আবার কয়েকজন ছেলে হাত দেখিয়ে আবার গাড়িটিকে দাঁড় করালো। আবার কি হল? উদ্গ্রীব পটাইবাবু জানালার কাচ নামিয়ে বাইরে মুখ রাখতেই কয়েকজন স্থানীয় ছেলে গাড়িটিকে ঘিরে ধরে যথারীতি আগের মতই আর একটি বিল ধরিয়ে দিল। পরের রবিবার এলাকার মাননীয় বিধায়ক শ্রী বিটকেল চাঁদ সতপতির উপস্থিতিতে হালদারপাড়া রক্তদান শিবিরের জন্য দুইহাজার টাকা ধন্যবাদের সহিত গৃহীত হইল। রক্তদান শিবিরের বিল দেখে পটাইবাবুর মুখ রক্তহীন হয়ে গেল। আগের বারের মত এবারেও অনেক দরাদরি করে হাজার টাকায় রফা হল, এবং অবশিষ্ট দেড় হাজার টাকা পকেটে নিয়ে পটাইবাবু তৃতীয় দফার যাত্রা শুরু হ'ল।
এখন আর পটাইবাবুর স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখতে ইচ্ছে করছে না। কিছুক্ষন ম্রিয়মান মুখে চলার পর পটাইবাবু একটা যায়গায় দেখলেন রাস্তার একধারে লাইন দিয়ে পাট কেচে শুকোতে দেয়া হয়েছে, তারই মধ্যে আবার রাস্তার আর একটি ধার বরাবর ধান শুকোতেও দেয়া হয়েছে। রাস্তার উপর এই ধান ও পাটের সাঁড়াসী আক্রমণকে মোকাবিলা করার জন্য ড্রাইভার যখন সব কিছুকে বাঁচিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পনে গাড়ি চালাবার চেষ্টা করে চলেছে, তখন পটাইবাবু দেখলেন, আর এক বিপত্তি। রাস্তার উপর যত্র তত্র একগাদা হাঁস, মুরগী, ছাগল ও গরু চরে বেড়াচ্ছে।
ঠিক এমন সময়ে তার সাধের নতুন গাড়িটি জোর ব্রেক করে থেমে যেতেই একটা মুরগী ক্ককর ক্ককর করতে করতে তাদের গাড়ির গা ঘেসে দ্রুত বামদিক থেকে ডান দিকে চলে গেল। ড্রাইভার গাড়ি থেকে নামতেই সঙ্গে পটাইবাবুও নামলেন। তখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লোক যার হাতের দড়িতে আবার একটি ছাগল বাঁধা। সেই লোকটি পটাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনারা খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন দাদা। পটাইবাবুও বললেন, হ্যা মুরগীটা খুব বাঁচা বেঁচে গেছে। তবুও লোকটি বলল, না না আপনারা খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন, অন্তত দু হাজার টাকার ধাক্কা।
ব্যাপারটার অর্থ বোধগম্য না হওয়ায় পটাইবাবু ফের জিজ্ঞেস করলেন, তার মানে ? তখন ঐ ছাগল হাতে লোকটি তাকে রাস্তা থেকে একটু দূরে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিল। তিনি দেখলেন বেশ কয়েকজন লোক পাঁচটা সাতটা দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন গাছের তলায় বসে তাদের দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। তিনি আরও জানলেন রাস্তার উপরে যেসব হাঁস মুরগী গরু ছাগল ঘুরে বেরাচ্ছে ঐ লোকগুলিই তাদের মালিক। ইচ্ছা করেই জীবগুলিকে রাস্তার উপর ছেড়ে দিয়েছে এবং কোন গাড়ি এলেই ওরা মনে প্রানে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে তার মনোবাসনা যেন আজ পূর্ন হয়। অর্থাৎ তার হাঁস, মুরগী, ছাগল কিম্বা গরুর একটি অন্তত যেন আজ গাড়ি তলায় চাপা পড়ে।
তাদের এইরকম একটি অদ্ভুত ইচ্ছা কেন একটু পরে সেই ব্যাপারটিও খোলসা হল। এই রাস্তায় কোন মুরগী, হাস, ছাগল বা গরু গাড়ি চাপা পরলে ঐ দূরে বসে থাকা লোকগুলি দৌড়ে এসে গাড়িটিকে ভাংচুর ও যাত্রীদের মারধোর করার ভয় দেখিয়ে তাদের মৃত বা আহত প্রিয় জীবটির জন্য ক্ষতিপুরন দাবি করবে। এবং তাদের দাবি না মানলে যথারীতি যাত্রীদের মারধোর ও গাড়ি ভাংচুর করতে শুরু করবে অথবা গাড়িটিকে আটকে রেখে যাত্রীদের ছেড়ে দেবে যাতে তারা পরিমান মত টাকা নিয়ে এসে গাড়িটি ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। আর এই স্বঘোষীত খাপ পঞ্চায়েতের বিচারের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তাদের বেঁধে দেয়া মূল্য অনুযায়ী প্রতিটি আহত অথবা মৃত মুরগী ২ হাজার, হাঁস ৩ হাজার, ছাগল ২০ হাজার ও গরু ৫০ হাজার টাকা হিসেবে কর দিতে গাড়ির মালিক বাধ্য থাকবে।
এসব কথা শোনার পর পটাইবাবুর মুখটি এবার সত্যি সত্যি বড়ই করুন হয়ে এল। পটাইবাবু অত্যন্ত ম্লান মুখে লোকটিকে শুধোলেন, কিন্তু যদি মানুষ চাপা পরে তাহলে কত টাকা দিতে হবে? লোকটি উত্তরে বলল, না না আমাদের এই গ্রামের লোকেরা অতোটা অমানুষ নয় যে, মানুষ চাপা পরার জন্য টাকা-পয়সা চাইবে। বরং তখন আমরাই চাঁদা তুলে আহত লোকটির সেবা-শুশ্রুসার ব্যবস্থা করে দিয়ে থাকি।
এ কথা শুনে পটাইবাবু অত্যন্ত চিন্তিত মুখে গাড়িতে উঠে বসলেন এবং ভোম্বলকে অত্যন্ত সন্তর্পনে গাড়ি ছাড়তে বললেন। ঠিক এক মিনিটও হয়নি গাড়ি স্টার্ট নিয়েছে, অতি সন্তর্পনে চালানো গড়ির গতি তখন কুড়ি কি মি ছাড়ায়নি, এমন সময়ে গাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া সেই ছাগল হাতে লোকটি তার ছাগলটাকে হটাৎ এমন ভাবে ঠেলে দিল যে ভোম্বল সাবধান হওয়ার কোন সুযোগই পেল না।
চোক্ষের নিমেষে এলাকার চেহারাটাই পালটে গেল। হৈ হৈ করে চতুর্দিক থেকে সবাই ছুটে আসতে লাগলো। জীবনে এই প্রথম পটাইবাবু এতটুকও ঘাবড়ালেন না। শুধু এইটুকু মনে ছিল যে ছাগল চাপা পড়লে কুড়ি হাজার, আর তার কাছে আছে মাত্র দেড় হাজার টাকা। তিনি কারও সঙ্গে ঝগড়া বা বিবাদে গেলেন না। গাড়িটিকে একজন মুরুব্বি গোছের লোকের হাতে দায়িত্ব দিয়ে শুধু নীরবে গাড়ি থেকে নেমে স্ত্রী এবং ড্রাইভারকে নিয়ে রাস্তার অপর প্রান্তে কলকাতা ফেরার বাসে ওঠার চেষ্টা করতে করতে ভাবতে লাগলেন যে ঋনং কৃত্বা ব্যাঙ্ক গাড়ি কেনার জন্য চার লাখ টাকা লোন দেয় তারা নিশ্চই গাড়িটা ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যও কুড়ি হাজার টাকা নিশ্চই দেবে।

"""" এপার ওপার """"

(কাহিনীটির স্থান ও কালঃ-পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনার বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া একটি মফস্বল শহর।)
তখনও চব্বিশ পরগনা জেলা উত্তর দক্ষিন ভাগ হয়নি। সেই জেলার উত্তরে স্বাধীনদের ছোট্ট শহরটার একপাশ দিয়ে কুল কুল করে বয়ে চলেছে সুভদ্রা নদী। নদীর পাড় বরাবর নদীর সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে গেছে কালো পিচের রাস্তা। আর রাস্তার অপর দিকে ছোট্ট শহর অজন্তা নগর। ওদের বাড়ি থেকে সামান্য কয়েক মাইল গেলেই পুর্ব পাকিস্তান সীমান্ত। ছোট্ট স্বাধীন বাবার কাছে শুনেছে আগে নাকি একটাই দেশ ছিল, এমনকি ওর বাবা এই বড়িতে থেকেই সাইকেলে করে যাতায়াত করে পাশের সাতক্ষীরার একটি স্কুল থেকে মাট্রিক পাশ করেছে, সেই সাতক্ষীরা এখন বিদেশ।
তখন জমি-জমার মালিকানা ব্যাপারটা স্বাধীন বুঝত না। তার ধারনা ছিল তাদের ছোট্ট শহরটার আসে পাশে যত খালি জায়গা জমি পরে আছে তার কোন মালিক নেই, যে কেউ ইচ্ছে করলেই ওখানে একটা ঘর করে নিয়ে থাকতে পারে । এর একটা কারণও ছিল। সুভদ্রা নদী আর তার সংলগ্ন রাস্তার মাঝ বরাবর একটা লম্বা চর ছিল। আর ঐ চরের জমিটাতেই মাঝে মাঝে কোন একটা পরিবার এসে একটা টালির চাল দেয়া ছিটেবেড়া ঘর তুলে নিয়ে থাকতে শুরু করত।
স্বাধীনেরও খুব ইচ্ছে হত বড় হয়ে সেও ওই নদীর ধারে একটা বাড়ি করবে তাহলে ওর ঘুড়ি ওড়াতে খুব সুবিধা হবে। কারন স্বাধীনদের বাড়িটা ছিল রাস্তার অপর পাড়ে নদী থেকে একটু দূরে দখিন পাড়ায়। ওদের পাড়ায় সব বাড়িই ছিল পাকা দেয়ালের তবে বেশির ভাগই টিন কিম্বা এসবেসটসের চাল। পাড়ায় যারা বড়লোক বলে পরিচিত ছিল একমাত্র তাদের বাড়িরই মাথায় ছিল পাকা ছাদ। তখন ঐসব পাকা ছাদ ওয়ালা বাড়িকে দালান বাড়ি বলা হত। আর একমাত্র স্বাধীনদের বাড়িটাই ছিল পাকা দেয়ালের উপর খড়ের চাল। তবে ওদের বাড়িটা ছিল অনেকটা জায়গার উপর এবং বাড়িতে আম, জাম, কাঁঠাল ও নারকেল গাছ ছিল।
স্বাধীন বাবার কাছে শুনেছে ঐ চরের উপর যারা বাড়ি করে তাদেরকে রিফিউজি বলে। ওরা নিজেদের দেশের দীর্ঘ দিনের বাড়ি ঘর ছেড়ে এপারে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। তবে একই এলাকায় বসবাস করলেও স্বাধীনরা যেহেতু ঐ গ্রামেরই পুরানো লোক দেশ ভাগ হওয়ার অনেক আগে থেকেই এখানে আছে তাই ওরা রিফিউজি নয়। আস্তে আস্তে ওদের মধ্যে অনেকে রাস্তার এপারে স্বাধীনদের পাড়ায় পাকা বাড়ি ঘর করে ওদের ঘনিষ্ট প্রতিবেশী হয়ে যেত। তখন ওদের সঙ্গে স্বাধীনদের কোন পার্থক্যই থাকতো না। তবে তার মাথায় এটা কিছুতেই ঢুকতো না যে একই রকম দেখতে, একই রকম খাওয়া দাওয়া, একই পোষাক পরিচ্ছদ তবুও ওদেরকে বাঙ্গাল আর স্বাধীনদেরকে ঘটি কেন বলা হয়? আর মোহনবাগান ক্লাব যত খারাপই খেলুকনা কেন স্বাধীনদের বাড়ির সবাই মোহনবাগানকেই সমর্থন করে আর একই রকম ভাবে ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাব অত্যন্ত জঘন্য খেললেও ওরা কেন ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাবকেই সমর্থন করে?
এমনকি মুখের ভাষা বা পুজা-পার্বণ, আচার লৌকিকতা ইত্যাদী কোন ব্যাপারেই এই পিচ রাস্তার দুই দিকে থাকা দুটি পাড়ার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য ছিল না। স্বাধীনদের এলাকায় রিফিউজি হিসেবে যারা আসতেন তারা প্রায় সবাই খুলনা কিম্বা যশোরের লোক, তাই চব্বিশ পরগনার লোকেদের মতই তাদের মুখের ভাষাও একই। তবে পরে সে লক্ষ্য করেছে যে অনেক রিফিউজির মুখের ভাষা বুঝতে ওর বেশ অসুবিধা হয়, শুনেছে ওরা নাকি নোয়াখালি, সিলেট, কিম্বা চট্টগ্রামের লোক।
এই কাহিনীর যখন শুরু তখন স্বাধীন দখিন পাড়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে ক্লাশ ফোরে পড়ে। স্কুলে তার অনেক বন্ধুর মধ্যে একজনের নাম ছিল হিমু। আর এই হিমু ছিল তার খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু। আসলে ওর ঐ নামটি ওর ভারী পছন্দ ছিল, হিমুর আসল নাম ছিল হিমালয় সেনগুপ্ত। স্বাধীন ঐ নামের কাউকে আজ এত বছর বয়স পর্যন্ত দ্বিতীয়টি পাইনি। হিমুর বাবাও একদিন ঐভাবে ঐ চরে একটা ঘরে তুলেছিলেন। আর তখনই সে হিমুকে দেখেছিল। ওদের দুজনেরই বয়স তখন নয় দশ বছর হবে। সেই থেকেই ওরা বন্ধু হয়ে গেল।
স্বাধীন হিমুর কাছে সুনেছে ওর ঠাকুরদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে এম এ পাশ করে ওদেরই গ্রামের স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তাই ওদের বাড়িটা এলাকায় মাষ্টার মশাইএর বাড়ি বলে পরিচিত ছিল। হিমুর সেই ঠাকুরদা অবশ্য মারা গেছেন। পরবর্তী কালে হিমুর বাবা পরেশবাবুও কলকাতার জে বি রায় আয়ুর্বেদ হাসপাতাল থেকে আয়ুর্বেদ-ডাক্তারী পাশ করে গ্রামে প্রাক্টিস শুরু করেন, এবং অচিরেই খুলনা শহরে চিকিৎসক হিসেবে তার বেশ সুনাম ছড়িয়ে পরে। তবে দেশ ছেড়ে এপার বাংলায় এসে অনেক চেষ্টা করেও তেমন কিছু সুবিধা করতে পারছিলেন না। অবশেষে ঐ ছোট্ট শহরে গৃহশিক্ষকতা করে কোন রকমে সংসার চালাতেন। আবার তারই মাঝে নতুন করে ডাক্তারী প্রাক্টিসের চেষ্টাও শুরু করেন।
হিমুদের এমনও কোন কোন দিন যেত যেদিন ঠিকমত দুবেলা খাবারও জুটতো না, কিন্তু হিমুর আত্মমর্যাদা ছিল এতোটাই প্রবল যে, সে কোন দিন সেটা কাউকে জানতেও দিত না। তবে স্বাধীন সেটা ওর চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারতো, আর তখন সে ওকে কিছু একটা বলে যেমন--আজকে আমার বাড়িতে চল, আমি কয়েকটা নতুন ডাকটিকিট পেয়েছি তোকে দেখাব, এসব কথা বলে ওদের বাড়িতে নিয়ে যেত। তখন স্বাধীনের মা সামান্য কয়েকটা চিড়ে বা মুড়ির নাড়ু ওকে এনে দিয়ে বলত, "এই নে মুড়ির নাড়ু তৈরী করছি, তুই এলি ভালই হল গরম গরম কয়েকটা খেয়ে দেখ তো কেমন হয়েছে?"
কথায় বলে "misfortune never comes alone"। একদিকে হটাৎ সব কিছু ছেড়ে একেবারে রিক্ত অবস্থায় নতুন পরিবেশে এসে হিমুদের সংসারের সব কিছু যেন কেমন উল্টো পাল্টা হয়ে যাচ্ছিল। দাদা সাগর পড়াশনায় তেমন সুবিধা করতে পারছিল না এদিকে আবার একটা দীর্ঘদিনের গোছানো সংসার ছেড়ে এসে নতুন পরিবেশে হিমুর ঠাকুমা রীতিমত মানসিক রোগী হয়ে গেল। মাঝে মাঝেই চিৎকার করে কেঁদে উঠত আর বলত- "আমার সব গেল আমার সব গেল আমার সাজানো বাগান শুখিয়ে গেল।" শুধু স্বাধীনকে বড় ভালবাসতো। ওকে পাশে বসিয়ে বলত- জানিস আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে এমনই এক নদী বয়ে গেছে তার নাম বেতনা নদী। এলাকায় আমাদের পরিবারের কত নামডাক ছিল। হিমুর ঠাকুরদা সেইযুগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ বলে কথা! সবাই কত মান্যি গন্যি করত...।, এই পর্যন্ত বলেই হটাৎ কাঁদতে শুরু করে দিত, "আমার সব গেল আমার সব গেল, আমার সজানো বাগান শুখিয়ে গেল।"
এসব কথা শুনে স্বাধীন অবাক হয়ে যেত! স্বাধীনের বাবা ঘটি কিন্তু পড়াশোনা করেছেন সাতক্ষীরা হাই স্কুলে। আবার হিমুর বাপ-ঠাকুর্দারা বাঙ্গাল কিন্তু পড়াশনা করেছেন কলকাতায়। তাহলে আসল ঘটি কে আর আসল বাংলা কে? ওর কেমন সব গন্ডগোল হয়ে যায়।
এদিকে স্বাধীনের বড় দাদা স্বরাজ সদ্য কলেজ পাশ করে বাবার ব্যবসায়ে বসেছে। কিন্তু তার যেন বাবার ব্যবসায় মন নেই। বরং বেলা দশটা এগারটা পর্যন্ত রাস্তায় ঘাটে ঘুরে বেরানোটাই যেন তার কাজ। ইতিমধ্যে স্বাধীন একদিন দূর থেকে লক্ষ্য করল, হিমুর দিদি তিস্তা স্কুলে যাওয়ার পথে হেলা বটতলায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক কি যেন খুঁজে চলেছে। স্বাধীন দেখে অবাক হয়ে গেল হটাৎ গাছের আড়াল থেকে তার নিজের দাদা স্বরাজ বেরিয়ে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা ছোট্ট ভাজ করা কাগজ তিস্তার হাতে দিল, আর তিস্তা একটু মুচকি হেসে সেটা বই-এর ফাকে লুকিয়ে রাখল। সেই বয়সে স্বাধীন ব্যাপারটা তেমন কিছু না বুঝলেও এটুকু বুঝেছিল যে এটার মধ্যে এমন একটা গোপনীয়তা আছে যেটা প্রকাশ্যে পাঁচ কান করা উচিত হবে না।
স্বাধীন যথারীতি নিজের বাড়িতে আর পাঁচটা কথার মত হিমুদের বড়ির কথাও গল্পের ছলে বাবা, মা এবং দাদার কাছে বলত। কিন্তু একটা জিনিস সে লক্ষ্য করত, ওর বাড়ির লোকেরা ব্যাপারটাকে তেমন পাত্তা দিত না। বাবা চুপ করে থাকলেও মা তো বলেই দিত, "ওসব বাঙ্গালদের সঙ্গে বেশী মেলা মেশা করিস না। হিমু দুই একবার এ বাড়িতে এলো কিম্বা তুই ওকে দুই একটা বই দিয়ে সাহায্য করলি সেই পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু তার বেশী নয়।" তবে স্বাধীন অবাক হয়ে গেল,ওর দাদার ব্যবহার দেখে। দাদা রীতিমত ওকে শাসিয়ে বলল, "তোর ওই বাঙ্গালদের বাড়িতে অত ঘন ঘন যাওয়ার কি দরকার?" সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনের সেদিনের হেলা বটগাছ তলার কথাটা মনে পড়ল। যে দাদা নিজে তিস্তা দিদির সঙ্গে...... না থাক।
দুদিন পরে স্বাধীনের অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল। যেদিন সে দেখল, তার দাদা স্বরাজ হিমুর তিস্তাদিদি কে নিয়ে নদীর ধারে একটা গাছের আড়ালে......।
এরই মধ্যে একদিন হিমুর বাবা পরেশবাবু স্বাধীনদের বাড়িতে এসে হাজির কারন স্বাধীনের বাবা হেমন্তবাবু কথা দিয়েছেন, ওদের বাইরের ঘরটা পরেশবাবুকে তার ডাক্তারীর চেম্বার করার জন্য ভাড়া দেবেন। তবে ভাড়া এখন তেমন কিছু দিতে পারবেন না পরে প্রাক্টিশের পশার হলে আস্তে আস্তে বকেয়া সমেত ভাড়া শোধ করবেন।
কিন্তু এই ঘর ভাড়া দেয়া নিয়ে বাড়িতে কম ঝামেলা হল না। স্বাধীনের মা কিছুতেই একজন বাঙ্গালকে ঘর ভাড়া দেবে না। কিন্তু হেমন্তবাবু এলাকায় একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি ভেবে দেখলেন বাইরের ঘরটা তো পরেই আছে। তাতে যদি একটি পরিবারের কিছু উপকার হয় তো ক্ষতি কি?
সেইমত হিমুর বাবা পরেশবাবু একদিন দুই একটা চেয়ার টেবিল আর কিছু ওষুধ পত্র নিয়ে সেখানে বসতে সুরু করলেন। প্রথম প্রথম বিফল মনোরথ হলেও আস্তে আস্তে দু-চারটে রোগী হতে লাগলো। তখন ঐরকম মফস্বলে এম বি ডাক্তার তো চোখেই দেখতে পাওয়া যেত না। একজন এল এম এফ ডাক্তার এলাকায় দীর্ঘদিন অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চিকিতসা করতেন। কিন্তু তার মৃত্যুরপর পুরো এলাকাটি চিকিৎসকহীন হয়ে পড়ল। আর আস্তে আস্তে পরেশবাবু সেই শুন্যস্থানটি পুরোন করলেন।
এই ভাবে দু-তিন বছর কেটে গেল। হিমুদের বাড়িতে স্বাধীনের এখন আর তেমন যাওয়া হয় না। যদিও ওদের বন্ধুত্ব তেমনই অটুট আছে। এদিকে স্বাধীনের বাবার শরীরটা কিছুদিন ধরেই একদম ভাল যাচ্ছে না। শরীরটা আস্তে আস্তে এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে দোকানে বসা অসম্ভব। অথচ বড় ছেলে স্বরাজের দোকানে বসার ব্যাপারে কোন মন নেই, ইদানিং স্বরাজের সঙ্গে তিস্তার মেলা মেশাটাও বেশ বেড়েছে। সেযুগে ছেলে মেয়েদের এমন অবাধ মেলা মেশার সুযোগ ছিল না। কিন্তু তারই মধ্যে দুজনকে একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যেতে লাগলো। যদিও তিস্তা স্কুল ফাইনাল পাশ করে একটা স্থানীও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরীও পেয়ে গেছে। পরেশ বাবুরও এখন হাতযশের গুনে তার পশার বেশ কিছুটা জমে উঠেছে।
হটাৎ দেখতে দেখতে তিন চার বছরের মধ্যে চাকাটা যেন কেমন তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরে গেল। হিমুর বাবা এখন সংসারটাকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছেন। এখন মাসে শ'দুয়েক টাকা আয় তার অবশ্যই হয়। মেয়ে তিস্তাও মাসে পঞ্চাশ টাকা মাইনে পায়। নিতুদের বাড়ির কাছেই এক হাজার টাকা দিয়ে দুকাঠা জায়গাও কিনেছেন। ভগবান নিশ্চই মুখ তুলে চাইবেন আর ইচ্ছে আছে আগামী দু-এক বছরের মধ্যে একটা ছোট পাকা বাড়িও করতে পারবেন।
উল্টোদিকে স্বাধীনদের অবস্থা দিন দিন কেমন যেন অগোছালো হয়ে উঠছে। ইদানিং হেমন্তবাবু প্রায়শই শয্যাশায়ী থাকেন। স্বরাজ মাঝে মাঝে দোকানে যায় কিন্তু নিয়মিত ব্যবসার খোজখবর না রাখার ফলে কর্মচারীরা তাকে সহজেই ভুল বোঝাতে পারে এবং ঠকায়। কর্মচারীরা চুরি করার পর যা হোক দশ বিশ টাকা স্বরাজের হাতে দেয়, সে সেটাই বাড়িতে এনে বাবার হাতে দেয়। তবে এরই মধ্যে সম্প্রতি পরেশবাবুর চিকিৎসায় হেমন্তবাবু যেন একটু স্বস্তি পেতে সুরু করলেন। তিনি আস্তে আস্তে একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকলেন। স্বাধীনের এখন সংসারের এসব ঝুট ঝামেলা বোঝার বয়স হয়েছে। তাই ওর বাবা যখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে হটাৎ বলে ওঠেন "আমার সাজানো বাগান শুখিয়ে গেল", তখন তার হিমুর ঠাকুরমার সেই আক্ষেপের কথা মনে পড়ে। কি অসম্ভব মিল? অথচ ওরা তো রিফিউজি নয়?
এর মাত্র কদিন পরেই সন্ধ্যা বেলায় স্বাধীন ফুটবল খেলে ফিরছে, সঙ্গে হিমুও রয়েছে, হটাৎ ওদের বাড়ির কাছে আসতেই শুনতে পেল, বাড়িতে কোন প্রচন্ড গোলমাল হয়েছে। একটু কাছে আসতেই কথাগুলো স্পষ্ট হ'ল। ওর মা চিৎকার করে বলছে, "কতোবার বলেছিলাম বাঙ্গালদের ঘর ভাড়া দিও না, খাল কেটে কুমির এ্নো না। এখন হল তো? ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এই ছিল আমার ভাগ্যে?"
ভয়ে ভয়ে স্বাধীন আর হিমু ঘরে ঢুকে দেখে অবাক হয়ে যায়। স্বাধীনের দাদা স্বরাজ আর হিমুর দিদি তিস্তা ঘরের এক কোনে মাথা নিছু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্বরাজের পরনে অতি সাধারন একটি ধুতি আর পাঞ্জাবি এবং তিস্তার পরনে একটি টুক টুকে লাল শাড়ি, মাথায় এক মাথা সিদুঁর। পাশেই পরেশবাবু মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। বাইরের ঘর থেকে দুই একজন কৌতুহলী রোগীও দরজায় এসে ভীড় করেছে। ঘরে ঢুকে স্বাধীন আর হিমু ভয় পেয়ে গিয়ে বোকার মত ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে রইল আর তখনও ওর মা চিৎকার করেই যাচ্ছে।
তখন হেমন্তবাবু কোনরকমে বালিশ থেকে মাথাটা একটু উঁচু করে বললেন, "যাক, যা হয়ে গেছে সে তো আর ফেরানো যাবে না, ওরা পরস্পরকে ভালবেসে কালী মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে এসেছে এখন আমরা মেনে না নিলে সমাজে সবাই আমাদেরকেই ছিঃ ছিঃ করবে।" কিন্তু তাতে শৈলবালার চিৎকার যেন আরও বেড়ে গেল। "খুব বড় বড় লেকচার তো দিচ্ছো তা একটা পরের বাড়ির মেয়েকে খাওয়াবে কি শুনি? এদিকে নিজেদেরই তো পেট চলে না।"
"পরের বাড়ি কেন বলছো? ও তো আজ থেকে আমাদের বাড়ির মেয়ে।" হেমন্তবাবুর মুখে একথা শুনে পরেশবাবুর সাহস হ'ল একটু মুখ খোলার। তিনিও বললেন, "দেখুন বেয়ান, সম্পর্ক যখন একটা হয়েই গেল তখন আর ওসব নিয়ে চিন্তা করার কি আছে। আমি বলে দিলাম দেখবেন স্বরাজের এবার থেকে নিয়মিত দোকানের বসার প্রতি মন বসবে। তিস্তাও তো একটা চাকরী করে আর আমারও তো এখন মোটা মুটি ভালই চলছে ...... সেই সময় আপনারা এই ঘরটা না দিলে আমিও কোথায় ভেসে যেতাম বলুনতো? তাই আসুন না সবাই মিলে আমরা নতুন করে আমাদের এই সংসার দুটোকে আবার সাজিয়ে তুলি? যা মা গুরুজনদের প্রণাম কর।"
একথা শুনে স্বাধীন আর হিমু দুজনে এক দৌড়ে বেড়িয়ে গেল হিমুর মা আর ঠাকুরমাকে ডেকে আনতে।

"""" বড়দিন """"


ঋভুর ছেলেবেলায় ডিসেম্বরের শেষ মানেই ক্লাশের বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ, তাছাড়া এই গ্রীষ্ম প্রধান দেশে ক্ষনস্থায়ী শীতকালকে উপভোগ করার আলাদা একটা আনন্দ অবশ্যই আছে। যেহেতু বাৎসরিক পরীক্ষা হয়ে গেছে, পড়ার কোন চাপ নেই তাই সারাদিন মাঠে তিনটে কঞ্চি পুতে ক্যাম্বিস বলে ক্রিকেট খেলা আর খেলা। আর খেলতে খেলতে নিজেরাই কমল ভট্টাচার্য্য কিম্বা অজয় বসুর কন্ঠ নকল করে সেই খেলার ধারাবিবরনী দিয়ে নিজেরাই হাসা হাসি করা। একই সঙ্গে আসেপাশে কার বাড়িতে পিঠে পুলি তৈরী হচ্ছে সেসব খবর জোগাড় করে সুযোগ মত তাদের বাড়িতে ঢুকে যাওয়া।
সেইযুগে এইসব মফস্বলে আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী হিন্দু পরিবারের মতই ঋভুদের বাড়িতেও বড়দিন পালন করার কোন রেওয়াজ ছিল না বা কেক খাওয়ারও কোন প্রচলন ছিল না। তখন ঐসব প্রত্যন্ত এলাকাতে বিদ্যুতই ছিল না তাই এযুগের মত ঘরে ঘরে টুনি বাল্ব জ্বালিয়ে খ্রিস-মাস ট্রি তৈরী করার তো কোন প্রশ্নই ওঠেনা। তবে ওদের গ্রামের পাশেই মোয়ার জন্য বিখ্যাত জয়নগর। ঋভুর আজও মনে আছে বড়দিনে ওর বাবা খুব ভাল পরিচিত কোন দোকান থেকে মোয়া কিনে আনতেন। সেই মোয়ার স্বাদ ঋভুর জিভে যেন আজও লেগে আছে। বাবা ঋভুকে প্রভু যিশু সম্মন্ধে অনেক গল্প বলতেন।
বাবা বলতেন, মধ্য প্রাচ্যের এক দেশে একদিন রাজাকে কর দেওয়া ও নাম লেখানোর জন্য হাজার হাজার মানুষ বেথেলহেমে্র পথে চলেছেন। মরিয়মকে গাধার পিঠে বসিয়ে যোসেফও রওয়ানা দেন সেই বেথেলহেমের পথে। পথেই মরিয়মের গর্ভবেদনা ওঠে। রাজ্যের মানুষের ভিড়ে বেথেলহেমের কোনো সরাইখানায় জায়গা হয় না তাঁদের। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে সন্তান জন্মদানের জন্য মরিয়মকে এক গোয়ালঘরে ঠাঁই নিতে হয়। সেখানেই জন্ম দেন পুত্র যিশুকে। এভাবেই মহা আশ্চর্যরূপে মা মরিয়মের কোলে খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বীদের মুক্তিদাতা প্রভু যিশুর জন্ম হয়। বাবা প্রভু যিশুর কত অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলতেন। বলতেন প্রভু যিশু একজন কুষ্ট রোগীর ক্ষতস্থানে হাত বুলিয়ে দিতেন আর তার রোগ সেরে যেতো। ঋভু অবাক হয়ে সেসব কথা শুনতো।
ঋভুদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে আনন্দপুর নামের একটা জায়গায় একটা চার্চ ছিল।যে কোন চার্চের ন্যায় ঐ চার্চটিও ছিল অনেকটা জায়গার উপর বিভিন্ন প্রকারের ফুল ও ফলের গাছ গাছালি দিয়ে সুন্দর করে কেয়ারি করে সাজানো। আর তার মধ্যে ফুট ফুটে সাদা রঙের একটি চার্চ বিল্ডিং। সেই কারণে ওই চার্চের ঐ পরিবেশটা ঋভুর খুব ভাল লাগতো।ও মমে মনে ভাবতো আমাদের মন্দিরগুলো কেন এমন সুন্দর হয় না? ভিতরে ঢুকলেই কেমন ছবিতে দেখা বিদেশের কাউন্ট্রি সাইড বলে মনে হত। আসলে ঋভুর ঐ চার্চে যাওয়ার আর একটা কারণও ছিল। খুব ছোটবেলা থেকেই ঋভুর পেন ফ্রেন্ড আর দেশ বিদেশের ডাকটিকিট জমানোর সখ ছিল । ওই চার্চের ফাদার 'লয়েজ দেমসা'র তাকে দেশ বিদেশের ডাকটিকিট দিতেন, আর -- কি ঋভু বাবু তুমি কেমন আছো ... বলে বিদেশী টানে বাংলায় তার সঙ্গে কত কথা বলতেন। তবে ঋভুর সব চেয়ে ভাল লাগতো কোন সুদুর যূগশ্লভিয়ার এক গ্রাম থেকে কি ভাবে এই সুন্দরবন এলাকায় এসেছিলেন সেই গল্প শুনতে।
ঋভু অবাক হয়ে শুনতো সেসব কথা। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। একজন শরনার্থী হয়ে কিভাবে প্রাণটুকু হাতে নিয়ে পরিবারের আর সকল সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কখনো হেটে কখনো গাড়িতে কখনো জলপথে বহু দেশ ঘুরে এই ভারতে এসে পৌছে ছিলেন ফাদার সেই কাহিনী শুনতে শুনতে শিহরিত হয়ে উঠতো বালক ঋভু। অবশেষে আর বাড়ি গিয়ে মানচিত্র খুলে দেখত কোথায় সেই পূর্ব ইউরোপের যুগোশ্লভিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া আর হাজার হাজার মাইল দূরে কোথায় এই ভারতের পশ্চিম বঙ্গের সুন্দর বন লাগোয়া এক অখ্যাত গ্রাম। পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে ফাদার কি করে আমেরিকা ইংল্যান্ড না গিয়ে এই অজ গ্রামে এসে থেকে গেলেন সে কথা ভেবে ঋভু অবাক হয়ে যেত। ঋভু মাঝে মাঝে খবরের কাগজে যুগোশ্লাভিয়া দেশটার নামও খুব দেখতে পেত। ঋভু তখন অতসব বুঝতো না...... কি সব জোট নিরপেক্ষ না কি যেন! প্রেসিডেন্ট টিটো ইত্যাদী। ওর খুব ইচ্ছে হত একদিন ঋভুও অন্তত জাহাজের খালাসির চাকরী নিয়েও যুগোশ্লাভিয়ায় চলে যাবে। আর নিজের চোক্ষে দেখে আসবে ফাদারের দেশটাকে।
চার্চের ফাদার 'লয়েজ দেমসার' যেমন ঋভুকে বিদেশি ডাক টিকিট দিতেন, বিদেশি চকলেট খাওয়াতেন, তেমনই প্রভু যিশুর কথাও বলতেন। নিষ্পাপ ঋভু সরল মনে ফাদারকে জিজ্ঞাসা করতো, তোমাদের যিশু যদি এ্তই ভাল তাহলে তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কেন?
একথা শুনে এতটুকু ক্ষুব্ধ হতেন না ফাদার, বলতেন, তোমাদের পরমহংসদেব যেমন বলতেন, এই তোকে যেমন দেখছি, ঠিক তেমনি আমি ঈশ্বরকেও দেখতে পাই, তিনি যেমন গিরিশ ঘোষকে বলেছিলেন -- দে আমাকে তোর সকল পাপের বকলমা দে......। ঠাকুর যেমন সকলের পাপ কন্ঠে ধারণ করেছিলেন বলে তার সেই নীলকন্ঠ কর্কট রোগাক্রান্ত হয়েছিল। ঠিক তেমনই প্রভু যীশু সকলের পাপ নিজের স্কন্ধে নিয়ে ক্রুশ বিদ্ধ হয়েছিলেন।
ঋভু এমনিতেই প্রায় প্রতি সপ্তাহে ফাদারের সঙ্গে চার্চে দেখা করতে যেত। কিন্তু প্রতিবছর ফাদার ঋভুকে বড়দিনের জন্য চার্চে বিশেষ ভাবে আমন্ত্রন জানাতেন। খৃষ্টান না হয়েও ক্যারোলে যোগদান করত ঋভু। সবার সঙ্গে সমবেত কন্ঠে ঋভুও গলা মেলাতো। ফাদার পিয়ানো বাজাতেন। ......"" স্বর্গের দুতেরা জানালো বারতা রাখাল বালকদেরে/ জন্মিল শোন রাজাধিরাজ এক ক্ষুদ্র গোয়াল ঘরে।""
সঙ্গীতের পর ফাদার, যীশুর বানী এবং কার্য-কলাপ পাঠ করতেন, ঋভু সেসব বানী খুব মন দিয়ে শুনতো প্রভু যীশু কিভাবে আর্তের সেবা করতেন, কি ভাবে তিনি নিজ হাতে কুষ্ঠ রোগীর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে দিতেন । তারপর ফাদার যিশুর বিচারের নামে প্রহসনের কথাও বলতেন।
ফাদার বলে যেতেন, বিচার শেষে যিশু একটি পাথরখন্ডের উপর বসলেন। স্বর্গীয় যুবকের বসার ধরনটিও অপূর্ব। পরনে দীর্ঘ শুভ্র বসন। ঈষৎ লালচে দীর্ঘ চুল। নীলাভ চোখ। মুখময় ঈষৎ লালচে শ্মশ্রু । ভিড়ের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে যিশু বললেন, শক্রকে ভালোবেস। আর, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে অযাথা উৎকন্ঠিত হয়ো না। উপস্থিত জনতার ভিড়ে গুঞ্জন উঠল। তারপর তাঁর জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি কাঁটা তারের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হ'ল তাকে। অতঃপর তিনি নিজের ক্রুশটিকে নিজেই কাঁধে করে নিয়ে এলেন বধ্য ভুমিতে। ক্রুশবিদ্ধ অবস্থাতেও তার মুখে কোন কষ্টের চিহ্ন নেই, তার মুখমন্ডল এক স্বর্গীয় আনন্দে উদ্ভাসিত, আর তিনি বলে চলেছেন, ঈশ্বর তুমি এদের ক্ষমা কোর। এই ভাবে এক সময়ে বিদ্যুৎহীন সেই গ্রামের ছোট্ট চার্চের বড়দিনের বিশেষ অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যেত।
তারপর ফাদার ঋভুকে বলতেন, আজ তোমার মনের সকল অকথিত অপরাধ এবং প্রার্থনা প্রভু যিশুর কাছে নিবেদন কর। প্রভু নিশ্চই তোমার সকল অপরাধ মার্জনা করে তোমাকে নতুন জীবন দান করবেন। চার্চের ভিতরে মোমবাতির আলোয় এক স্বর্গীয় পরিবেশে ঋভুর মনে হত যিশু ক্রোড়ে মাতা মেরীর চক্ষু দুটি অশ্রুসজল। হাতজোড় করে সেই স্বর্গীয় মুর্তির দিকে তাকাতেই তার নিজেরও চক্ষুদুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠত। বালক ঋভুর দুই কপোল সিক্ত হয়ে ওঠে তার অশ্রু ধারায়। ঋভু কিছুই বলতে বা চাইতে পারতো না। সবশেষে ফাদার ঐদিন তার শত ব্যস্ততার মধ্যেও ঋভুকে আলাদা করে কাছে ডেকে তার মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করে তাকে একটা সুন্দর কেক, মিষ্টি, চকোলেটের প্যাকেট ও নিজ হাতে শুভেচ্ছা লিখে একটি ডায়েরি উপহার দিতেন। মফস্বলের বিদ্যুৎ হীন এলাকার ছোট্ট চার্চ। বেলা থাকতে থাকতেই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যেত। তবে বাড়ি ফিরেও আর পাঁচটা দিনের চেয়ে ঐ দিনটা ঋভুর কছে হত সম্পুর্ণ অন্যরকম। এর রেশ থাকতো পরবর্তী বেশ কয়েকদিন। ওর মনটা এক সুন্দর স্বর্গীয় আনন্দে যেন ভেসে যেত।
গত তিন চার বছর ধরে এটাই ছিল ঋভুর বড়দিনের রুটিন। কিন্তু এবার কি আর যাওয়া হবে? বড়দিনতো এসেই গেল। কিন্তু গত কদিন ধরেই ঋভুর বেশ জ্বর, সর্দি, কাশি, ভীষন ঠান্ডা লেগেছে। কবিরাজ মশাই বলেছেন টাইফয়েড। খুব সাবধানে থাকতে হবে। সেই মুঠো ফোনহীন যুগে প্রায় দশ বারোদিন হয়ে গেল ফাদারের সঙ্গে দেখা হয়নি। বাবা একটা ছোটদের বিবেকানন্দ বই কিনে দিয়েছেন। মাঝে মাঝে বইটা উলতে পালটে পড়ে। কোন কিছুই যেন ভাল লাগে না, তেমন মন দিয়ে বইটা পড়তেও ইচ্ছে করছে না। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হটাত এক জায়গায় ওর চোখদুটো আটকে যায়। সদ্য পিতৃ হারা নরেন যতই ভাবে দক্ষিনেশ্বরের ওই বূড়োটার কাছে আর যাবে না। তবুও কেন না গিয়ে থাকতে পারে না? কি এক অমোঘ আকর্ষণে বার বার ছুটে যায় ঠাকুরের কাছে।
গত কদিন শরীরটা বেশ সুস্থ লাগছে। কবিরাজ মশাইও অভয় দিয়েছেন। বড়দিনের এখনও দুদিন বাকী আছে। এবারেও তাহলে নিশ্চই চার্চে যেতে পারবে। সেই রাত্রে ঋভু এক আশ্চর্য্য স্বপ্ন দেখলো। ফাদার দেমসার...... কি অপরূপ তার রূপ, দীর্ঘ, অত্যন্ত গৌর বর্ণের শ্বেত শুভ্র শশ্রু শোভিত, সমগ্র শরীর শুভ্র গাউনে আচ্ছাদিত। এক হাতে বাইবেল অন্য হাতটি ঋভুর মাথায় বোলাতে বোলাতে ফাদার বললেন, কেমন আছো ঋভু? আজ বাদ কাল বড়দিন তো এসেই গেল। তোমাকে তো যেতেই হবে চার্চে। তুমি না গেলে প্রভু রাগ করবেন যে!
ঋভু ফাদারকে দেখে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে তার হাত দুটি ধরে বলতে গেল- হ্যা ফাদার আমার যতই শরীর খারাপ হোক না কেন আমাকে যে যেতেই হবে। তুমি নিজে এসেছ আমাকে নিমন্ত্রণ করতে, এ আমার কি সৌভাগ্য ! কিন্তু স্বপ্নের ফাদার আর অপেক্ষা করলেন না। বললেন, আমি চলি আমার যে সময় হয়ে এসেছে, এ কথা বলেই তিনি অন্তর্হিত হলেন। ঋভুর ঘুম ভেঙ্গে গেল,... আমার যে সময় হয়ে এসেছে মানে? চোখ খুলে দেখল ভোর হয়ে গেছে। আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু হয়েছে।
ঋভুর শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছে। উঠে চোখে মুখে জল দিয়ে আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষন পরে একটু সকাল হতেই ওদের সদর দরজাটায় কে যেন কড়া নাড়া দিল। ঋভুর বাবা দরজা খুলতেই এক ভদ্রলোক হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই... ঋভু উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠল- আরে এ তো চার্চের বাদলদা। ...... কি খবর বাদলদা? জানো আজ ভোর রাত্রে আমি ফাদারকে স্বপ্নে দেখেছি......। ফাদার কেমন আছেন, বাদলদা? কি ব্যাপার ... তুমি চুপ করে আছো কেন?
বাদল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো বাদলদা----- ফাদার আর নেই দাদাবাবু। গত কাল সন্ধ্যার সময়ে অন্য দিনের মতই প্রার্থণা করার সময়ে হটাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। পাড়ার পরাণ ডাক্তার দেখে বললেন সব শেষ।
সঙ্গে সঙ্গে আমরা কলকাতার বড় চার্চে খবর পাঠাই। ওরা এসে দেহ নিয়ে চলে গেল। কলকাতায় কোন এক গোরস্থানে নাকি গোর দেবে। আর বলে গেলেন দুই-এক দিনের মধ্যেই নতুন ফাদার চলে আসবেন। ফাদার অনেকদিন তোমার কোন খবরর না পেয়ে
গতকাল মৃত্যুর মাত্র ঘন্টাখানেক আগে আমাকে এই প্যাকেটটা তোমার বাড়িতে পৌছে দিয়ে তোমার খবর নিয়ে যেতে বলেছিলেন। গতকাল আর আসতে পারলাম কই?
হটাৎ ঋভু যেন পাথর হয়ে গেছে, ও কান্না ভুলে গেছে। নিতান্ত অনিচ্ছায় হাতটা বাড়িয়ে বাদলদার কাছ থেকে প্যাকেটটা নিল। তারপর খুলে দেখলো অন্যান্য বারের মত এবারেও ওকে একটা ডায়েরি আর একটা পেন পাঠিয়েছেন ফাদার। আর তার প্রথম পাতায় পরিষ্কার সুন্দর হস্থাক্ষরে লিখে দিয়েছেনঃ- My beloved Rivu...No need to go to church for god, God is omnipresent.... make your neighbour and your parents happy to reach the god........ with blessings from Fr. Loize Demsar
ঋভুর হটাৎ মনে পড়ল, কদিন আগে ওর বাবা ওকে 'ছোটদের বিবেকানন্দ' নামে যে বইটা কিনে দিয়েছেন, তাতেও তো স্বামীজী ওই একই কথা বলেছেন-- "জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর"। ...... কি অদ্ভুত মিল।

Monday, 12 November 2018

""""" গরম রসগোল্লা এবং একটি রেল লাইনের মৃত্যু """""


যে কোন মৃত্যুই দুঃখের, তবে কোন কোন মৃত্যু কেমন যেন মনটাকে নাড়া দিয়ে যায়। সম্প্রতি তেমনই একটি মৃত্যুর খবর পেলাম সংবাদ পত্রে, তবে এটা কোন মানুষের মৃত্যু নয়। সকালের খবরের কাগজে আজ একটা বড় খবর "বধর্মান-কাটোয়া লাইট গেজ রেল লাইনটি চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হ'ল"। ১৯১৫ সালে-এ চালু হওয়া এই রেলপথটিকে ঠিক শতবর্ষের মাথায় বন্ধ করে দেওয়া হ'ল এবং যুগের সঙ্গে তাল রেখে এরপর এই লাইন হবে ব্রডগেজ। আর বনগাঁ কিম্বা ব্যান্ডেল লোকালের মত এখানেও চলবে বিদ্যুত চালিত ই এম ইউ কোচ। সেদিনেরর কত কথা আজ মনে পড়ে, কথায় বলে বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, আর কেড়ে নিয়েছে আবেগ...আজ মনে পড়ে ওই ট্রেন-এর সাথে আমার বাল্যকালের কত স্মৃতি কত আবেগ জড়িয়ে আছে।
চোখ বুজলেই আজও যেন পরিষ্কার সব দেখতে পাই।
সে আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। বাবার চাকরি সুত্রে আমরা তাখন উত্তর চব্বিশ পরগনার একটা মহকুমা শহরে থাকতাম। আর বছরে একবার করে আমাদের গ্রামের বাড়ি-তে যেতাম। সে এক দারুন উত্তেজনা ।.. তবে সেবার আমরা যাচ্ছিলাম আমার নিজের এক জেঠতুতো দাদার বিয়েতে, তাই আনন্দ আর উত্তেজনা অন্যবারের চেয়ে চারগুন বেশী। ভোর ৪টে নাগাদ ঘুম থেকে উঠে পোটলা-পু্টলি গুছিয়ে নিয়ে দিনের প্রথম বাস-টিতে উঠতাম। তখন কলকাতা শহর দেখবো, দোতলা বাস-এ চাপবো এসব ভেবেই শিহরিত হওয়ার বয়স। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন এখনকার মত প্রাইভেট বাসের কলকাতা শহরের ভিতরে প্রবেশ করার অধিকার ছিলনা, ঐ বাসগুলো শ্যাম বাজার খাল ধার পযর্ন্ত আসতো আর ওখান থেকে বাবা আমাদের ট্যাক্সি করে নিয়ে যেতে চাইলেও আমরা ভাই-বোনেরা দোতলা বাসে চাপার জান্য বায়না করতাম। আমাদের মত মফঃস্বলের ছেলেদের দোতলা বাসের দোতলায় চাপার আনন্দই ছিল আলাদা।
তখনো হাওড়া থেকে ই এম ইউ কোচ চালু হয়নি। বিশাল দৈত্যের মত দেখতে কানাডিয়ান ইঞ্জিন ভস ভস করে বাস্প ছেড়ে যাচ্ছে আর লাল রং-এর বগির থার্ড ক্লাসে চেপে শশা আর ঝাল মুড়ি খেতে খেতে আমরা বর্ধমান পৌছতাম। সেখানেও জানলার ধারে বসার জন্য আমাদেরর ভাই বোনেদের মধ্যে মারামারি হত। কিন্তু যে ইঞ্জিনের দিকে মুখ করে জানলার ধারে বসতো সে ভীষণ ভাবে ঠকতো..কয়লার ইঞ্জিন, ...তাই খুব ঘন ঘন কয়লার গুড়ো উড়ে এসে চোখে পড়ত...। অবশেষে রেল কাম ঝমা ঝম করতে করতে বেলা ১ টা নাগাদ আমরা বর্ধমান এসে পৌছতাম। সেখানে পৌছে আর এক প্রস্থ দৌড় দৌড়ি। ওভার ব্রিজ দিয়ে স্টেশনের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে আবার নতুন করে ছোট লাইন এর ট্রেন-এ চাপতে হ’ত। সে এক মজার রেলগাড়ি, খুব-ই সাধারন ছোট ছোট কাঠের তৈরি বগি আর লম্বা লম্বি ভাবে চার সারি বসার যায়গা । কাগজে কলমে টাইম টেবিল একটা আছে বটে কিন্তু ট্রেন চলে তার নিজের মর্জি অনুযায়ি। তাই বেলা দুটোয় ছাড়ার কথা থাকলেও বেলা তিনটে পযর্ন্ত্য আমাদের সবাইকে গলদঘর্ম করে তবে তিনি নড়তে শুরু করলেন।
ইতিমধ্যে ভীড়ও ভালই হয়েছে, বসার জায়গাগুলো সব ভর্তি। তবে যাত্রির চেয়ে মালপত্রই বেশী। ওইটুকু একটা কামরায় চতুর্দিকে যাত্রীদের লটবহরের ঠেলায় যাত্রীদের দম বন্ধ হওয়ার মতন অবস্থা।
এ গাড়ির সামনে ছোটার চেয়ে পাশা পাশি হেলা দোলা যেন বড্ড বেশী। ফলে ট্রেন চলার সাথে সাথে যাত্রীরা বার বার একজন আর একজনের ঘাড়ের উপর ঢলে পড়ছে। তখন গ্রমাঞ্চলে জাতপাতের বিভাজন ভীষন ভাবে চালু ছিল তাই মেয়েরা ওরই মধ্যে চেষ্টা করত ছোঁয়া-ছুই যতোটা সম্ভব এড়ানো যায়।কিন্তু সব চেয়ে বিরক্তিকর ওই পরিবেশে অনেকের বিড়ি ধরানো...। ওই রকম ধীর গতি-তে চলা ট্রেন এর ভীড়ের ভিতর বিড়ির ধোঁয়ায় ভর্তি কামরায় সে এক নারকীয় পরিবেশ, তার মধ্যে আমার কোলে একটা ঢাউস ব্যাগ ...।
এই বেঞ্ছটাতে আমাদের পরিবারের আমি একা, সাম্‌নের সীটে আমার দিকে পিছন ফিরে আমার বাবা-মা এবং ভাই বোনেরা বসে আছে। আমার সামনের সীটে আমার মুখো মুখি দুজন বয়স্ক মহিলা মেয়ের বিয়েতে কত টাকা পণ দিতে হয়েছে তাই নিয়ে গল্পে মশগুল। কিন্তু আমার সব চেয়ে সমস্যা আমার সামনে কে একজন একটা ছাগল রেখেছে...তার-ও ঐ পরিবেশটি মোটেই ভাল লাগছ না তাই থেকে থেকে সেও ব্যা ব্যা করে ডেকে চলেছে। বিড়ির ধোয়া আর ছাগলের গন্ধে আমার তখন অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার মত অবস্থা। যাত্রীরা প্রায় সকলেই পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত। তাই ..."কিরে ভ্যাবলা কোথায় গেসলি,... আরে এটা তোর বেটা নাকি ...। কত বড় হয়ে গেছে রে ?" কিম্বা, "আরে নন্দোদা যে অনেকদিন পর দেখা হল, তা এবার আলুর ফলন কেমন ? আমাদের গাঁয়ে তো সব ধসায় মেরে দিলে" এই ধরনের আলোচনায় মুখর।
চলন্ত ট্রেনের দরজায় ঠেস দেয়া এক ভদ্রলোক খুব ঘন ঘন আমার মাথার উপর র্যাকেতে রাখা মুখ বন্ধ একটা চটের থলের দিকে তাকাচ্ছে। ঠিক সেই সময় ঝুপ করে ঐ থলেটা আমার কোলে রাখা ব্যাগের উপর পড়ে আপনা থেকেই নড়া চড়া করতে লাগলো আর তাই দেখে আমি ভয় পেয়ে চিৎকার শুরু করে দিতেই দরজায় ঠেস দেয়া ভদ্রলোক দৌড়ে এসে আমার কোল থেকে ব্যাগটা নিয়ে খুলতেই তার ভিতর থেকে একটা জ্যান্ত মুরগি কক কক করে ডেকে উঠল। তাই দেখে কামরার সবাই হই হই করে হেসে উঠে ঐ লোক টাকে উদ্দেশ্য করে বললে, “কিরে কামাল শেষ কালে শশুর বাড়ি থেকে জ্যান্ত একটা মুরগি-ই চুরি করে নিয়ে চলে এলি?” কামাল বললো, “ছি ছি কি যে বলো, শালা দিলে তার ভাগ্নের জন্য... তাই......।” তবে তারপর সারা পথ ঐ কামালভাই থলেটা আর নিজের হাত ছাড়া করেননি, আর ঠিক সেই সময় আমাদের কামরায় একজন চেকার ঊঠলেন, ৩৫-৩৬ বছর বয়সের এক ভদ্রলোক, ধুতির উপর একটা কালো কোট গায়ে আর হাতে একটা সাড়াশির মত যন্ত্র।
ভদ্রলোক নিজে থেকে কাউকে টিকিট চাইলেন না, গোটা কামরায় আমরা ছাড়া কেউ টিকিট দেখালোও না, বরং তিনি সবার সঙ্গে হই হই করে গল্প করতে শুরু করলেন। “আরে ভজা তোর ছেলে কেমন আছে র্যা ? কি রে কামাল তোর জামাইবাবুর সঙ্গে সেদিন বদ্দমানে দেখা হ’ল।” এদিকে আমাদের তিনটে টিকিট আমার, বাবার আর মা’র, টিকিটগুলো আমার পকেটেই ছিল, আমি সেগুলো দেখাতেই অনেকটা বিরক্ত হয়েই আমার হাত থেকে টিকিট গুলো নিয়ে পাঞ্ছ করে আমার হাতে ফেরত দেবার সময় জানতে চাইলেন আর দুজন কোথায়?
আমি সামনে আঙ্গুল দেখাতেই দেখি আমার বাবা পিছন ফিরে ঐ চেকারবাবুর দিকে তাকিয়ে হাসছে। আর ঐ চেকারবাবু তো একেবারে লম্ফ দিয়ে বলে উঠলেন, “আরে তিনু দা যে? আর আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে, বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এ তোমার বেটা না কি গো ? তা অনেক বড় হয়ে গেছে ত? তা হাবলার বিয়েতে যাচ্ছ নিশ্চই...। তা বউদি কেমন আছ গো?” মা ঘাড় নেড়ে বললো, “হ্যা ভালো আছি তুমি ভালো আছো তো? প্রতিমা কেমন আছে?” বুঝলাম প্রতিমা ওই চেকারবাবুর বৌএর নাম। কিন্তু এবার ঐ চেকারবাবু সবার সামনে সেই মোক্ষম কথাটি বললেন, “তা জানো তো এই লাইনে তোমার গদাই ভাইটি আছে, তা টিকিট কাটার কি দরকার ছিল? আমি না থাকলেও আমার নাম বললেই তো যথেষ্ট। তোমাদের আশীর্বাদে এই বদ্দমান কাটোয়া লাইনে এই গদাই সামন্তকে সবাই মান্যি গন্যি করে। এখনো পযর্ন্ত একদিন গদাই না থাকলে রেলের চাকাও ঘুরবে না।“ বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হা হা হা করে হাসতে লাগলেন। এতক্ষনে বাবা মুখ খুললেন বললেন, “তা তোর মত আর দু চারটে চেকার থাকলে এই রেলের চাকা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।”
ইতিমধ্যে পরের স্টেশন এসে গেছে চেকার বাবুটি হা হা হা করে উচ্চশ্বরে চিৎকার করে বললেন, “তা হলে ঐ কথাই থাকল, বিয়ে বাড়ীতে দেখা হচ্ছে ।“ ভদ্রলোক নেমে যাওয়ার পরে জানলাম উনি আমার বাবার নিজের পিসতুতো ভাই। এবার ট্রেন স্টেশন ছেড়ে সেই যে দাঁড়াল আর নড়াচড়ার কোন লক্ষন নেই। দুটি স্টেশনের মাঝখানে দুদিকে ধানের জমি আর মাঝে মাঝে ঝোপ ঝাড় জঙ্গল। চলন্ত ট্রেন থেকে সব সময় আসে পাশের সব কিছু খুব সুন্দর দেখতে লাগে। সবুজ ধানের ক্ষেত, কত রকমের গাছ পালা। গরমে প্রায় ১৫-২০ মিনিট কষ্ট করার পর হটাত লক্ষ করলাম লাইন থেকে একটু দূরে একটা ঝোপের ভিতর থেকে আমার সদ্য পরিচিত গদাইকাকু এক হাতে একটা লোটা আর এক হাতে ধুতির কাছা-কোছা ঠিক করতে করতে একটা ঝোপের আড়াল থেকে পট্টি করে বেরচ্ছেন। কিছুক্ষনের মধ্যে আমরা আমাদের স্টেশনে পৌছে গেলাম। স্টেশনে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য গরু কিম্বা মোষের গাড়ি আসতো, আর আমরা তাতে চেপে আমাদের গ্রামের বাড়ি পৌছে যেতাম।
সে যুগের গ্রামের বিয়ে বাড়ির পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। সব কিছুই নিজেদের বাড়িতে পাড়ার লোকেরাই ব্যবস্থা করতেন। বৌভাতের দিন চারিদিকে আত্মীয় কুটুম লোক লশকরে ভর্তি। সকাল থেকেই পুকুরে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলা হচ্ছে , মিষ্টি তৈরীর ভিয়েন বসেছে, উঠনে ৫/৭ জন মিলে শুধু তরকারি কেটেই যাচ্ছে। আমরা ছোটরা কি করবো ভেবে পাচ্ছি না, এক সঙ্গে আমরা কত দিক সামলাবো? এই বোধ হয় সব চেয়ে বড় কাতলা মাছটা জালে ধরা পরে গেল তো, ওদিকে আবার উনোন থেকে বোঁদের কড়াই নামানো হয়ে গেল, কিম্বা গরম রসগোল্লাগুলো এত ক্ষনে নিশ্চই খাওয়ার মত ঠান্ডা হয়েছে আমরা শুধু দৌড়েই বেড়াচ্ছি। আবার তারই মধ্যে মাঝে মাঝে মহিলা মহলে আমাদের নতুন বৌদিকে দেখে আসছি। ইতিমধ্যে নাপিত বৌ এসেছে সে আমাদের মা কাকিমা, জেঠিমাদের পায়ে আলতা পরিয়ে দিচ্ছে। আর এক জনকে দেখলাম বিনা কাজে আমাদের চেয়েও ব্যস্ত তিনি হলেন আমার গদাইকাকু। আমাদের মত তিনিও সর্বত্র দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। আর মাছ ঠিক মত ভাজা হয়েছে কিনা টেস্ট করে যাচ্ছেন। কখনো বিজ্ঞের মত বলছে মাংসটা একটু নুন কম হয়েছে। গদাইকাকুর মেয়ে মিনুর সঙ্গে আমার বেশ ভাব হয়ে গেল। ও নাকি একটা ঝি ঝি পোকা পুষেছে, তাকে কচি জাম পাতা খেতে দেয়। তার নাম দিয়েছে পতঙ্গিনী। বাবা মাঝে মাঝে গদাইকাকুর পিছনে লাগছে,” কিরে গদাই, আজকে তোর রেলের চাকা ঘুরবে তো?” আর আড়ালে বাবা বলছে গদাইটা এখনো সেই দশ বছরের শিশুই রয়ে গেল।
আমার ঠাম্মি আমাদেরকে একটা পদ্ম পাতায় বেশ কয়েকটা গরম রসগোল্লা এনে খেতে দিল। শহরে অত সুন্দর রসগোল্লা পাওয়া যায় না। আমরা সবাই ভালো করে তাকাবার আগেই গদাই কাকু কোথা থেকে দৌড়ে এসে ছো মেরে পাতা থেকে কয়েকটা রসগোল্লা তুলে নিতে গিয়ে পুরো পাতাটাকেই উলটে দিলো মাটিতে। তাই দেখে আমাদের সে কি কান্না। ঠাম্মিও কাকুকে খুব বকলো। বাবাও বললো, “তুই কোনদিনই বড় হবি না।”
বৌভাতের পরদিন সকালে গোটা বাড়িটা কেমন যেন ছন্নছাড়া ভাব। সবার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ, জিনিস পত্র সব চারিদিকে ছড়ানো ছিটানো। একে একে আত্মীয় কুটুমরা বিদায় নিচ্ছে। গদাই কাকুও তার স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে একদিন পর বিদায় নিলেন। গদাইকাকু আর কাকীমা বয়স্কদের সবাইকে প্রনাম করে বার বার ওদের বাড়িতে আমাদেরকে একবার যাওয়ার জন্য বললেন। বাবাও বার বার ওদেরকে বাবার চাকরিস্থলে আমাদের বাড়িতে যেতে বললেন। যাওয়ার সময় মিনুতো রীতিমত কেঁদেই ফেললো।
দেখতে দেখতে পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে। ইতি মধ্যে আমরাও বাড়িঘর করে শহরেই থেকে গেছি গ্রামের সঙ্গে তেমন আর যোগাযোগই নেই। গদাইকাকুর সঙ্গে গত পঞ্চাশ বছরে মাত্র একবার বর্ধমান শহরে একটা অনুস্ঠানে দেখা হয়েছিল। আমার পরিচয় পেয়ে আশি বছরর বৃদ্ধ গদাই কাকু তার এই ষাট বছরের ভাইপোর হাত দুটি ধরে বলে ছিল, “একবার সবাইকে নিয়ে আমার বাড়িতে আয়, আমাদের মোংলি গাইটা এখন প্রতিদিন এক সের করে দুধ দিচ্ছে, বাড়িতে ছানা কেটে তোকে গরম রসোগোল্লা তৈরী করে খাওয়াব।” আমি বলেছিলাম, “তোমার ভাইপোর কি আর সেই বয়স আছে? এখন তেল, ঘি, মিস্টি সব খাওয়া বারন।” শুনালম কাকীমার শরীরটাও নাকি একদম ভালো যাচ্ছে না, মিনুর ছেলে গত সেপ্টেম্বরে আমেরিকা গেছে। মনে মনে ভাবলাম মিনুর কি এখনো সেই ঝি ঝি পোকাটা আছে? এখনো কি তাকে জামপাতা খাওয়ায়? গদাই কাকু সেদিন বেশীক্ষন বসেননি কারন বর্ধমান-কাটোয়া লাইন–এ এখন অনেক ভালো ভালো বাস রুট হওয়া সত্বেও কাকা এখনো সেই ছোট লাইন এর ট্রেনেই যাতায়াত করেন, আর রাত আটটাতেই লাস্ট ট্রেন।
ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। বললো আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে আমার এক ভাইপো ফোন করেছে......। ফোনটা ধরে হ্যালো বলতেই, অপর প্রান্ত থেকে আমার ভাইপো পুকাই উভয় পক্ষের সুসংবাদ লেনদেন করার পর বললো, কাকা তোমাকে একটা খবর জানাচ্ছি, আমাদের সেই গদাই দাদু গত কাল রাত্রে মারা গেছেন। শুনলাম ৮৬ বছরের মত বয়স হয়েছিল। দিদার শরীরটাও নাকি ভাল যাচ্ছে না। শুনেছি তোমারো তো শরীর ভালো যাচ্ছে না। তবু যদি পারো আগামী ২৪শে এপ্রিল শ্রাদ্ধের দিন একবার এসো। হটাৎ মনে পড়ল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের গদাই কাকার সেই কথা টা। “............তোমাদের আশীর্বাদে এই বদ্দমান কাটোয়া লাইনে এই গদাই সামন্তকে সবাই মান্যি গন্যি করে। এখনো পযর্ন্ত একদিন গদাই না থাকলে রেলের চাকাও ঘুরবে না।“
2

"""""" বংশীলাল """"""


------- নারায়ণ রায়।
সে অনেকদিন আগের কথা। ষাটের দশকের মাঝামাঝি কোন এক বছরে দুর্গাপুজোর শেষ, আবার কালী পুজো শুরু হতেও এখনো কয়েকদিন বাকী। তেমন একটা সময়ে একদিন আমি আর আমার স্কুলের সহপাঠি বন্ধু বাপ্পা, ছুটির এই কটা দিন কি কি দুষ্টমি করে কাটানো যায়, তাই ভাবছি। এমন সময়ে বাপ্পা বললে, "চল যাই, তুই আর আমি দুজনে আমার মামার বাড়ি গিরিডিতে ঘুরে আসি ক'দিন।" আমিতো অবাক! বললাম, " বাহ! গিরিডি যেতে পারলে, সে তো ভীষণ মজা হবে, কিন্তু তা কি করে সম্ভব ? অত দূরে তোর সঙ্গে আমার বাবা মা আমাকে ছাড়বে কেন? আর তোর বাড়ি থেকেও কি তোকে একা যেতে দেবে?" বাপ্পা বললো, সে নাকি গত দু-তিন বছর ধরে একাই গিরিডি যায়। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন একজন সতেরো কিম্বা আঠারো বছরের ছেলের এখনকার ছেলেদের মত এতটা স্বাধীনতা ছিল না। যাই হোক বাপ্পার বাবা বাণেশ্বর কাকু আমার বাবার বিশেষ বন্ধু ছিলেন, তাই তাঁর পক্ষে আমার বাবাকে রাজী করাতে বিশেষ দেরী হল না।
অবশ্য বাপ্পার মামার বাড়িতে এখন আর তেমন কেউ থাকে না। ওর বড় মামা তার দাদুর অর্থাৎ বাপ্পার প্রমাতামহ'র তৈরী ওদের তিন পুরুষের ওই গিরিডির বাড়িটা দেখাশোনা করতেন। সেই মামা মারা গেছেন কয়েক বছর আগে, মামাতো দাদারা সবাই জীবিকার সন্ধানে সারা ভারতে ছড়িয়ে পরেছে। তবে বাপ্পার বড় মামীমা এখনও সেই বাড়ি ঘর সম্পত্তি সব আগলে রেখেছেন। আমি কখনও কলকাতার বাইরে অতদুরে কোনদিন যাইনি। আর বাবা-মাকে ছেড়ে একা যাওয়া্র তো কোন প্রশ্নই ওঠে না।
সেই যুগে মোবাইল ফোন তো দুরের কথা, আমরা যে এলাকায় থাকতাম সেই পাড়ায় ল্যান্ড লাইন ফোনও আমাদের গোটা পাড়াতে একজনেরও ছিল না। বাপ্পা বলল, "মামীমাকে চিঠি দিয়ে, তার উত্তর পেতে পেতেই দশ বারোদিন কেটে যাবে, তার চেয়ে চল হটাৎ গিয়ে মামীমাকে সারপ্রাইজ দেবো।"
যথারীতি অক্টোবর মাসের শেষ দিকে এক রবিবার দুপুর নাগাদ হাওড়া স্টেশনের আট নং প্লাটফর্ম থেকে ছাড়লো, আমাদের ট্রেন। কয়লায় চলা বিশাল কানাডিয়ান স্টিম এঞ্জিনের এক্সপ্রেস ট্রেন। সেই সময়ে ট্রেনের তিনটে ক্লাশ ছিল। ফার্স্ট, সেকেন্ড আর থার্ড ক্লাশ। আমরা অবশ্যই থার্ড ক্লাশের যাত্রী ছিলাম। নামেই এক্সপ্রেস ট্রেন, বসার জন্য খুবই সাধারণ মানের কাঠের আসন। তবে ট্রেনে তেমন ভিড় না থাকায় আমরা দুজন জানালার ধারে দুটো মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম। ট্রেনে জানালার ধারে বসার জায়গা পাওয়ার আনন্দই আলাদা। আবার জানালার ধারে বসার বিড়াম্বনাও ছিল যথেষ্ট, প্রতি মুহুর্তে কয়লার গুড়ো উড়ে এসে চোখে পড়ার ভয়। তবুও সেই বয়সে জীবনে প্রথম কারও শাসন ছাড়া একা বন্ধু সঙ্গে দূর ভ্রমণ। তাই এক অব্যক্ত আনন্দে কয়লার গূড়োর মত তুচ্ছ জিনিসকে উপেক্ষা করে দুজনে গল্প করতে করতে যাত্রা শুরু করলাম। তবে সঠিক সময়ে ছাড়লেও প্রথম থেকেই ট্রেনটি মাঝে মাঝেই কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ছিল।
অবশ্য সেকারনে আমার বিদেশ ভ্রমণের আনন্দের কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। বরং আমি এই মন্থর যাত্রাওটাকে বেশ উপভোগই করছিলাম। এই ভাবে ট্রেনটি থামতে থামতে ব্যান্ডেল, বর্ধমান, দুর্গাপুর পার হয়ে আসানসোল পৌছুতেই বেলা পাঁচটা, মানে বেশ সন্ধ্যে হয়ে গেল। আমার তো ভারি মজা। বাড়ি থেকে বেরোনর সময়ে বাবা আমাকে যাওয়া-আসার টিকিটের মুল্য ছাড়াও কুড়িটা টাকা দিয়েছিল, আর মা আমাদের দুজনের মত লুচি হালুয়া আর নারকোলের নাড়ু বেঁধে দিয়েছিল সঙ্গে। আমি আর বাপ্পা সেগুলির সদব্যবহার করতে শুরু করলাম। তবে আসানসোলের পরে গাড়ি আর যেন এগোতেই চায় না। একটা ছোট্ট অজানা স্টেশনে ট্রেনটা সেই যে দাঁঁড়ালো আর নড়াচড়ার যেন কোন লক্ষণই নেই। স্টেশনটিতে কোন উঁচু প্লাটফর্ম নেই। প্রত্যেকটা কামরার নীচে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে মানুষ জন উঠছে, নামছে।
এইসব স্টীম ইঞ্জিনের গাড়ি এক জায়গায় বেশিক্ষন দাঁঁড়ালে আস্তে আস্তে কামরার ডাইনামোর চার্জ যত কমতে থাকে গাড়ির আলোর তেজও ততই কমতে থাকে। একটা নির্জন স্টেশনে আধো-অন্ধকারে এই ভাবে বেশ কিছুক্ষন থাকার পর আমার কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। এইসব ছোট খাটো স্টেশনে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। প্লাটফর্মে মাত্র সাত-আট ফুট উচু কয়েকটা লোহার খুটির উপর কাঁচের বাক্স মত করা আর তার ভিতরে কেরসিনের আলোয় চারিদিকে আবছ যেটুকু যা দেখা যায়। বেলা পাঁঁচটা নাগাদ যেখানে ট্রেনটার মধুপুরে পৌছোনর কথা সেখানে বেলা সাড়ে পাঁঁচটা নাগাদ এই ছোট্ট স্টেশনে ঠায় দাঁড়িয়েই আছে।
এমন সময়ে লক্ষ্য করলাম আমাদের কামরা থেকে একজন বেশ লম্বা চওড়া ব্যক্তি প্লাটফর্মে নেমে একটি আলোর নীচে দাঁড়ালো। বাপ্পা লোকটিকে দেখেই এক গাল হেসে "আরে ও বংশীদা, বংশীদা ......" বলে চিৎকার করতে লাগলো। লোকটা যেন সে কথা শুনতেই পেল না। এক বারের জন্যও আমাদের দিকে না তাকিয়ে জয় সিয়ারাম জয় সিয়ারাম বলতে বলতে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের বাইরে কোথায় যেন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। লোকটার পরনে খাটো ধুতির উপরে অদ্ভুত একটা ঢল্লা মত জামা। আর মাথায় পশ্চিমের লোকেদের মত কান ঢাকা পাগড়ি থাকার জন্য লোকটার মুখটা ভাল করে দেখতেই পেলাম না।
বাপ্পা তারাতারি ট্রেন থেকে নেমে লোকটার দিকে দৌড়তে যাবে এমন সময় এতক্ষন ধরে অচল পাহাড়ের মত স্থবির থাকা ট্রেনটি একটি লম্বা টানা হুইসেল দিয়ে নড়ে উঠল। ট্রেন চলতে শুরু করতেই আমি বাপ্পার হাত ধরে টেনে কামরার ভিতরে ঢুকিয়ে নিলাম। আমাদের আসনে বসেই আমি বাপ্পাকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুই চিনিস ওকে...?" উত্তরে বাপ্পা বলল,"আরে, ও তো বংশীলাল।" তবে একটা বিষয়ে দুজনে খুবই অবাক হলাম সেটা হচ্ছে লোকটি এতক্ষন আমাদের কামরাতেই ছিল। কামরাতে তেমন কিছু ভিড়ও নেই অথচ ও আমাদের কারও নজরে পড়ল না কেন? আমি জিজ্ঞেস করি, "বংশীলাল আবার কে?"
বাপ্পা খুব ছোট্ট বয়সে ওর দাদুর কাছে শুনেছে, দাদুর বাবা অর্থাৎ বাপ্পার প্রমাতামহ নিবারণচন্দ্র সরকার ছিলেন বিশেষ ধার্মিক লোক। ভারতের এমন কোন তীর্থস্থান নেই যেখানে নিবারণচন্দ্র যাননি। নিবারণবাবু তাঁর যৌবন বয়সে একবার কুম্ভমেলায় পিতা মাতা বিচ্ছিন্ন এই বংশীলালকে কুড়িয়ে পান। তখন তার বয়স মাত্র আট-দশ বছর। তারপর তাকে এই গিরিডিতে নিয়ে এসে নিজ-সন্তান তুল্য মানুষ করেন। পরে বংশীলালের বিবাহ দিয়ে নিজের বাড়ির কাছা কাছি কিছুটা জমির উপর একটা ছোট্ট ঘর করে দেন এবং বংশীলালও গিরিডিতে বাপ্পার মামার বাড়ির পরিবারের তিন পুরুষ ধরে দেখভাল করতে করতে কখন যেন তাদের সংসারেরই একজন হয়ে ওঠে।
হাওড়া থেকে ট্রেনটি ছাড়ার পর থেকেই অনেক ভুগিয়ে অবশেষে আমাদের এক্সপ্রেস ট্রেন এতক্ষনে এক্সপ্রেসের মতই দৌড়তে আরম্ভ করল এবং নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুঘন্টা পরে সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ মধুপুরে পৌছালো। ট্রেন থেকে নেমে বেশ শীত শীত করতে লাগল। কলকাতায় এখন বেশ গরম কিন্তু বিহারের (এখন ঝাড়খন্ড) এইসব জায়গায়
অক্টোবরের শেষের আবহাওয়া বড়ই মনোরম। মধুপুর স্টেশনে বিদ্যুৎ আছে তবে অতি সাধারণ কয়েকটা বাল্ব, প্লাটফর্মে টিম টিম করে জ্বলছে। মধুপুরে ট্রেন পালটে গিরিডির ট্রেনে উঠতে হবে। পাশের প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে গিরিডির ট্রেন। আমরা যেই সেই ট্রেনে উঠতে যাবো, বাপ্পা হটাত থমকে গিয়ে, "আরে ও বংশীদা ... বংশীদা......" বলে চিৎকার করতে লাগলো। অমনি ঘাড় ঘুরিয়ে আমি দেখি আগের স্টেশনে দেখা সেই লোকটা...। পরনে খাটো ধুতির উপর অদ্ভুত একটা ঢল্লা মত জামা। আর মাথায় পশ্চিমের লোকেদের মত কান ঢাকা দেওয়া পাগড়ি। চক্ষের নিমেষে লোকটা দ্রুত
জয় সিয়ারাম জয় সিয়ারাম বলতে বলতে কোথায় যেন এক আধো অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
গিরিডির ট্রেনটি আমাদের এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল তাই ট্রেনে ওঠার এক দুই মিনিটের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিল। তবে পর পর দুবার ঐ লোকটিকে অমন অলৌকিক ভাবে দেখে বাপ্পা যেন কেমন ভীত ও বিমর্ষ হয়ে পড়ল। আমাকে বলল, "জানিস, আমি নিশ্চিত জানি ও বংশীলাল। সেই চেহারা, সেই পোষাক আর ঠিক তেমনই কথায় কথায় জয় সিয়ারাম বলা। অথচ ও আমাকে চিনতে পারছে কেন, সেটাই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। বংশীদা আমাকে অসম্ভব ভালবাসে। আমি গিরিডি আসবো শুনলেই ও আমাকে নিতে মধুপুর পর্যন্ত চলে আসে। আসার আগে, আমি গিয়ে খাব বলে দাদুর বাগানের গিরিডির বিখ্যাত সেরা পেয়ারা আর আতাগুলো আমার জন্য পেরে রেখে দেয়। পুকুরের মাছ ধরে রান্না করে রেখে দেয়। আর গিরিডির সবচেয়ে সেরা দোকানের প্যাড়া একদম অর্ডার দিয়ে তৈরী করে রাখে। কিন্তু এবার তো আমি মামিমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে কোন খবর না দিয়েই যাচ্ছি, তাহলে বংশীদা জানবে কি করে যে আমরা গিরিডি যাচ্ছি। তাছারা বংশীদা আমাকে চিনতে পারছে না কেন?"
মধুপুর থেকে গিরিডি মাত্র ঘন্টাখানেকের রাস্তা। আমাদের গল্প শেষ হওয়ার আগেই দেখলাম ট্রেন গিরিডি স্টেশনে ঢুকছে। এই ট্রেন আর যাবে না, আবার মধুপুর ফিরে যাবে, তাই সব যাত্রী এখানেই নেমে যাওয়ার ফলে ট্রেন খালি হয়ে গেল। সবাই প্রায় স্থানীয় লোক। খুব বেশী হলে পঞ্চাশ-ষাট জন যাত্রী হবে, তারা ট্রেন থেকে নেমেই হাটা শুরু করলো। এইসব এলাকায় রাত্রি আটটা মানে অনেক রাত।
মিনিট দশেকের মধ্যে গোটা স্টেশন চত্তর ফাঁঁকা হয়ে গেল। স্টেশন থেকে বেরিয়ে আমরাই শুধু দাঁড়িয়ে আছি একট রিক্সা বা টম টমের জন্য। হটাৎ একটু দূরে নজর পড়তেই আমরা দুজনে আবার চমকে উঠালাম। একটা ইলেক্ট্রিক পোষ্টের নীচে আবছা আলোয় একজন মাত্র রিক্সাওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে, আর সেই অদ্ভুত পোশাক পরা লোকটা তাকে কি যেন বলে চলেছে। বাপ্পা আবার বংশীদা বংশীদা বলে চিৎকার করে ডাকতেই লোকটি জয় সিয়ারাম জয় সিয়ারাম বলে অদৃশ্য হয়ে গেল। এবার সত্যি সত্যিই আমরা দুজনে খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর চলবে না তাই ঐ রিক্সাওয়ালা টাকে ডাকতে যাবো, এমন সময় আমাদেরকে আরও আশ্চর্য করে দিয়ে আমরা না ডাকতেই রিক্সাওয়ালাটি নিজেই আমাদের কাছে এসে, "ঊঠিয়ে বাবুজি, আপলোক তো কাছারীপাড়া সরকার ভিলা যানেওয়ালা হায় না?" বলে দাঁড়িয়ে গেল।
নিতান্তই ভয়ে ভয়ে দুজনে উঠলাম রিক্সাটায়, তবে রিক্সাওয়ালাটা ভারী মজার লোক ছিল, তাই মুহুর্তের মধ্যেই আমাদের ভয় কিছুটা হলেও উধাও। প্যাডেলের তালে তালে ... জী আপনা দিল, তু আওয়ারা... গাইতে গাইতে মাত্র আট-দশ মিনিটের মধ্যে বাপ্পার মামার বাড়ির সামনে পৌছে গেলাম। কিন্তু রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া মেটাতে গিয়ে আমরা আবার অবাক। রিক্সাওয়ালা "আপকা ভাড়া বনশীলালজী মিটা দিয়া" বলে রিক্সা ঘুরিয়ে নিয়ে জি আপনা দিল... গাইতে গাইতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
আবছা অন্ধকারে রিক্সা থেকে নেমে মামাবাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত যেতে যেতে বাপ্পা বলল, "দেখলি তো? আমি বললাম না ও বংশীদা না হয়ে যায় না! আসলে ও আজ কোন কাজে নিশ্চই আসানসোল গেছিল আর সেখানে আমাদের দেখতে পেয়ে ও আমাদেরকে সারপ্রাইজ দেবে বলে এতক্ষন আমাদের সঙ্গে নাটক করছিল।" বাপ্পার মুখে একথা শুনে আমি বললাম, "তার মানে তুই বলতে চাইছিস আগে থেকে খবর না দিয়ে এসে মামীমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে আসতে গিয়ে উল্টে আমরাই সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম? হা হা হা।"
যাইহোক এতক্ষনের একটা ভয়ের বাতাবরণ থেকে মুক্তি পেয়ে বাপ্পার মামার বাড়ির কড়া নাড়া দিতেই মামীমা নিজেই দরজা খুলে আমাদের দুই মুর্তিমানকে দেখে একেবারে আক্ষরিক অর্থেই অবাক। যাই হোক আমরা বাড়ি থেকে পালিয়ে আসিনি, নিতান্তই মামীমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য যে এই ভাবে না জানিয়ে আসা সেটা নিশ্চিন্ত হয়ে আমাদের প্রতি তার প্রাথমিক অভ্যর্থনা শেষ হতেই বললেন, "তাহলে বংশীর কথাই ঠিক হল।" এ কথা শুনে আমরা দুজনে অবাক হয়ে শুধাই, "বংশীদা তোমাকে কি বলেছে মামীমা?"
উত্তরে মামীমা বললেন, "আরে ওই পাগলটা নাকি স্বপ্ন দেখেছে যে আজ ওর বাপ্পা দাদাবাবু আসবেই, আর সেই জন্যই সকালে থেকে এক মুহুর্তের জন্য নিজের বাড়িতে পর্যন্ত যায়নি। সারাদিন ধরে গাছের পাকা আতা, পেয়ারা পেরে রেখেছে। এই তো বিকেলে পুকুরে মাছ ধরল। আর তোরা ঢুকছিস দেখেই রান্না ঘরে গিয়ে তোদের জন্য টিফিন করতে গেল। আমি আর কিছু বললাম না, আসলে এই বাড়িতে আমার চেয়ে তো ওরই অধিকার বেশি।" এ কথা বলে মামীমা জোরে জোরে হেসে উঠলেন।
আমি আর বাপ্পা সমস্বরে মামিমাকে জিজ্ঞেস করলাম, "বংশীদা কি আজ একবারের জন্যও বাড়ির বাইরে যায়নি?"
"না না ও তো সারাদিন আমার চোখের সামনেই রয়েছে," বলে উঠলেন মামীমা।
আর তখনই, বংশীদা দুই হাতে দুই প্লেট মিষ্টি হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলো আর আমাদের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল, " জয় সিয়ারাম, জয় সিয়ারাম, খা লিজিয়ে বাপ্পা ভাইয়া, আপ ভি খা লিজিয়ে।" তারপর মামীমার দিকে তাকিয়ে বলল, " হাম বোলা থা না মাইজি, আজ বাপ্পা ভাইয়া জরুর আয়েগা। আধি রাত কি স্বপ্না কভি ঝুট নাহি হোতা, হা হা হা।"

"""" উবাসুতে """"

(বিদেশী কাহিনী অবলম্বনে একটি ছোট গল্প।)

অষ্টাদশ শতাব্দীর জাপানের প্রত্যন্ত একটি পাহাড়ি এলাকা। দুর্গম এই
এলাকাটিতে প্রচন্ড খাদ্যের অভাব, তাই বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কঠিন জীবন
সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে মানুষগুলো কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠেছে। আর
এখানকার একটি বিভৎস স্থানীয় রীতি হ'ল 'উবাসুতে'। এই প্রথা অনুযায়ী কোন
মানুষের সত্তর বছর বয়স হলেই তার আর বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। সমাজ বা
সংসার আর তার কোন দায় বা দায়িত্ব নেবে না। তাকে 'উবাসুতে' যেতেই হবে।
দুশো বছরেরও বেশি আগে প্রচলিত এই 'উবাসুতে' আমাদের দেশের সহমরণের চেয়েও
ভয়াবহ, অকল্পনীয় এবং অত্যন্ত কদর্য একটি জাপানী প্রথা। এই রীতি অনুযায়ী,
গ্রামের কোন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার বয়স সত্তর হলেই তাকে একটি খাদ্য পানীয়হীন
দুর্গম এক পাহাড়ের মৃত্যু উপতক্যায় বসিয়ে দিয়ে আসা হবে এবং একজন বৃদ্ধের
পক্ষে সেই দুর্গম উপত্যকা থেকে কোনদিনই আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। বাড়ির
লোকেরা তাকে ঐ মৃত্যু উপত্যকায় বসিয়ে দিয়ে আসার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই
চারিদিকে চিল শকুনের মাঝে এবং তার পূর্বসুরীদের কঙ্কালের মধ্যে জল এবং
খাদ্যের অভাবে এক নিদারুন কষ্টের মধ্যে সে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। ঐ
মৃত্যুপুরীতে তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই চিল ও শকুনের দল তার উপর ঝাপিয়ে
পড়বে এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যেই একটি জীবন্ত মানুষ পরিনত হবে একটা ছিন্ন
ভিন্ন নর কঙ্কালে।
উত্তর জাপানের এক প্রত্যন্ত গ্রাম। নাম তোচিগি। এই তোচিগি গ্রামের বৃদ্ধা মিসাকিরও আর সত্তর হতে বেশি বাকি নেই। মিসাকি জানে এই পৃথিবীতে তার আয়ু আর মাত্র এক মাসও নয়। কিন্তু তার যে এখনো অনেক কাজ বাকি! আগামী শীতে ছেলে মেয়েদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করা হয়নি। সে 'উবাসুতে' গেলে তার ছেলে মেয়ে নাতি নাতনীরা এই শীতে খাবে কি? তাছাড়া ছোট ছেলেটি তো এখনও সংসারীই হল না। তার বিয়ে থা দিয়ে তাকে সংসারী করে যেতে হবে। এত সব কাজ বাকি, অথচ তার হাতে সময় বেশি নেই। এই সব কাজ মাত্র আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে শেষ করে যেতে হবে।
এই তো পাশের বাড়ির বৃদ্ধ আকিরাকে আজ তার ছেলেরা 'উবাসুতে' নিয়ে গেল।
যাওয়ার সময়ে বৃদ্ধের সে কি কান্না! কাঁঁদতে কাঁদতে বূড়োটা বলেই যাচ্ছে
যে, এখনও তার শরীরের জোর কম কিছু নেই। ছেলেদের সংসারের জন্যে সে সকাল
থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত খেটে তাদের খাদ্য সংগ্রহ করে দেবে, সংসারের সব কাজ
করে দেবে । সে তার ছেলেদের ক্রীতদাস হয়ে থাকবে। তবু রেহাই নেই...।
ভাবা যায়? জীবন্ত এবং সম্পুর্ণ একটি সুস্থ মানুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে
বলপূর্বক 'উবাসুতে' নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? সেইযুগে ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলে
মানুষের জন্ম তারিখ তো আর সেই ভাবে হিসেব নিকেস করা থাকতো না! বাড়ির
লোকেরা যখন মনে করত যে এই সংসারে বুড়োটার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, এই পরিবারে
সে আর কোন উপকারে আসবে না, তখনই ধরে নেয়া হত যে তার সত্তর বছর বয়স হয়েছে।
ইদানিং মিসাকিরও কাজে কর্মে খুব ভুল হচ্ছে, পরিবারের অনেকের কাছেই তাকে
খুব কথা শুনতে হচ্ছে। তাই মিসাকিও 'উবাসুতে' যাওয়ার জন্য নিজেকে মানসিক
ভাবে প্রস্তুত করে নিয়েছে। সে কাঁঁদবে না। আর মাত্র তো কয়েকটা তো দিন!
মিসাকি মনে মনে ভাবে ততদিনে নিশ্চই সংসারের সবার জন্য শীতের খাদ্য সংগ্রহ
করা হয়ে যাবে। ছোট্ট নাতিটা গত শীতে খুব কষ্ট পেয়েছে, ওর জন্য এবার একটা
মোটা দেখে কাঁথা বুনে দিয়ে যেতে হবে। আর মাত্র কয়েক দিন তার আগেই নিশ্চই
সব কিছু হয়ে যাবে।
মিসাকি নিজেই নিজের মনকে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে। যেতে যখন হবেই তখন সে নিজেও
উবাসুতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। আচ্ছা আজকে ওই বুড়ো আকিরার সঙ্গে চলে
গেলেই তো হত? মাত্র কয়েকটা তো দিন ! অন্তত মৃত্যুর আগে ওই মৃত্যু পাহাড়ে
বসে কয়েক ঘন্টা দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁঁদতে তো পারতো? আজ বুড়ো আকিরার জন্য মিসাকির বুকের ভিতরের কান্নাটা দলা পাকিয়ে বার বার গলা পর্যন্ত উঠে
আসছে।
কত কথা মনে পড়ে যায়। বৃদ্ধ আকিরার বউকে কিম্বা মিসাকির স্বামীকে অবশ্য
উবাসুতে যেতে হয়নি। বুড়ি নিজের বাড়িতেই হটাৎ একদিন বুড়োর কোলে মাথা রেখে
ডাং ডাং করে সোনার রথে চড়ে স্বর্গে গেল। ঠিক একই রকম ভাবে মিসাকির বরও
দুদিনের অসুখে নিজের বউ এর হাতে ভাত খেয়ে নাচতে নাচতে স্বর্গে চলে গেল।
পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে খাবার জল কিম্বা আগুন জ্বালানোর শুখনো কাঠ আনতে মিসাকি
যখন জঙ্গলে যেত, প্রায়ই একই কাজে বেরনো আকিরার সঙ্গে তার দেখা হয়ে যেত।
নিজের নিজের সংসার নিয়ে ওদের দুজনে কত সুখ দুঃখের গল্প হ'ত। আকিরা বলতো,
জানিস মিসাকি, তোর বরের মত আর আমার বউ এর মত ভাগ্য কি আর আমাদের হবে?
মিসাকি তার উত্তরে বলত, কি জানি, কি যে হবে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।
মাঝে মাঝে শুখনো কাঠ আর জল বইতে বইতে যখন দুজনে ক্লান্ত হয়ে পর'ত। একটা
পাহাড়ি মাপেল গাছের নীচে বসে দুজনে গল্প করেই যেত। তল্লা বাঁঁশের তৈরী
জল-পাত্র থেকে ঢক ঢক কয়েক ঢোক করে জল খেয়ে নেয় আকিরা, তারপর মিসাকিকে
বলে, অনেক ক্ষন বক বক করেছিস, নে একটু গলাটা ভিজিয়ে নে। এই বলে মিসাকি
যেই হাঁ করে মুখটা উচু করে ধরে, আকিরা তখন এক হাতে মিসাকির চিবুকটা ধরে
ওর মুখে আস্তে আস্তে জল ঢেলে দেয়। কিছুটা জল ছলকে পরে মিসাকির মুখ ও জামা
ভিজে যায়। আকিরার চোখে মিসাকিকে তখন কি সুন্দরীই না লাগে! মিসাকিও ইদানিং
লক্ষ্য করেছে, আকিরা মানুষটা বড্ড ভাল। ওর সঙ্গে বসে একবার গল্প করতে
শুরু করলে আর উঠতেই ইচ্ছে করে না।
এই তো সেদিন যখন পাহাড়ি রাস্তায় মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে হাটতে হাটতে খাড়াই
পথ ধরে নেমে আসছিল, তখন আর একটু হলে মিসাকি তো পা পিছলে পরেই যাচ্ছিল।
ভাগ্যিস আকিরা তখন ওর বলিষ্ঠ হাত দুটো দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছিল। নাহলে তো ও
পা পিছলে পরে মরেই যেত। এদিকে আকিরাও এখন একটা জিনিস লক্ষ্য করেছে যে
মিসাকিকে না দেখলে আকিরারও মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে। বলিষ্ঠ চেহারার
আকিরাকে কে বলবে তার সত্তর বছর বয়স হল। শুধু ডান পা টা একটু টেনে টেনে
হাটে। তাই রসিকতা করে মাঝে মাঝে মিসাকি তাকে বলে আমার "ল্যাংড়া আকিরা"।
আপন মনে এসব কথা ভাবতে ভাবতে হটাৎ মিসাকি লক্ষ্য করল, আকিরাকে নিয়ে ওর
ছেলেরা উবাসুতে চলে গেছে। মিসাকির দু চোখ বয়ে নেমে আসছে জলের ধারা। এই তো
মাত্র কয়েক মাস আগের কথা। শীত আগত প্রায়। চারিদিকে ধীরে ধীরে চেরী
গাছগুলো লাল হতে শুরু করেছে। আকিরা কয়েকটা চেরীফুল নিয়ে মিসাকির মাথায়
গুজে দিয়ে বলল, তোকে কি সুন্দর লাগছে, আর লাগবে নাই বা কেন? তোর নামটাই
তো কত সুন্দর 'মিসাকি' মানে 'সুন্দর ফুল'। জানিস মিসাকি, তুই কাছে এলেই
তোর শরীর থেকে একটা সুন্দর ফুলে গন্ধ পাই আমি। উত্তরে মিসাকিও বলে তোর
নামটা তো আরও সুন্দর, 'আকিরা' মানে, উজ্জ্বল। তুই আমার কাছে সত্যি সত্যিই
উজ্জ্বল হয়েই থাকবি।
অথচ সেই আকিরা আজ...। সকাল থেকেই আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। মাঝে মাঝেই
বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, সঙ্গে বৃষ্টি। কারও উবাসুতে যাওয়ার দিনে মেঘে ঢাকা
আকাশ মানেই নাকি সে খুব ভাগ্যবান। ধুস্ মৃত্যুমুখে পতিত একজন মানুষের
আবার ভাগ্য ! এত দুঃখেও মিসাকির হাসি পায়। মিসাকি ভাবতেই পারছে না তার
'গোপন প্রেম' আকিরা ওই দুরের মৃত্যু পাহাড়ে অনাহারে, পিপাসায় শিয়াল,
শকুনের খাদ্য হয়ে ...। ইসস্স্স্...। আবার মিসাকির দু চোখ বয়ে নেমে আসে
জলের ধারা। কিন্তু পরক্ষনেই মিসাকি নিজেকে সামলে নেয়। এখন ওর কান্নার সময়
নয়। ওর যে এখনো অনেক কাজ বাকি। হাতে আর অল্প কয়েকটা দিন মাত্র। তার আগে
ছোট ছেলে দাইসুকুকে সংসারি করে যেতে হবে। শীত আসার আগে পরিবারের জন্য
শীতের খাদ্য মজুত করে যেতে হবে। ওর প্রিয় ছোট্ট নাতির জন্য একটা কাঁথা
বুনে দিয়ে যেতে হবে।
আকিরাকে পিঠে নিয়ে প্রায় চার-পাচ ঘন্টার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে মৃত্যু
পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছে ওর ছেলে আর কয়েকজন আত্মীয় পরিজন। ভীষণ দুর্গম
সে পথ। ঘন মেঘে আচ্ছাদিত আকাশ, সকাল থেকে একটানা বৃষ্টি হয়েই চলেছে। যেমন
করে আমাদের দেশে পাহাড়ি তীর্থ ক্ষেত্রে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে দোলায় চাপিয়ে নিয়ে
যাওয়া হয়, ঠিক সেই ভাবে বয়ে নিয়ে আকিরাকে নিয়ে চলেছে তারই আত্মজ এবং
ঘনিষ্ট জনেরা। বৃষ্টির জোর যেন কমশ বেড়েই চলেছে, আর যেন কোনমতেই এগোন
যাচ্ছে না। প্রচন্ড খাড়াই রাস্তায় যেকোন মুহুর্তে পা পিছলে একটা দুর্ঘটনা
ঘটে যেতে পারে। এরপর সঙ্কীর্ণ পাহাড়ি রাস্তাটা এতটাই খাড়াই এবং বিপজ্জনক
ভাবে উপরের দিকে উঠে গেছে যে রাস্তা না শুকোলে এই বৃষ্টির মধ্যে কোনমতেই
ঐ উতরাই অতিক্রম করা সম্ভব নয়। অথচ এখনও প্রায় এক ঘন্টার পথ বাকি।
একটা গাছে তলায় সবাই কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর তারা ঠিক করলো, আকিরা কে
ওখানেই রেখে দিয়ে তারা চলে আসবে। বুড়ো নিশ্চই ওখান থেকে এই দুর্গম রাস্তা
হেঁঁটে আর বাড়ি ফিরে যেতে পারবে না। তাছাড়া 'উবাসুতে'র নিয়ম আনুযায়ী
একবার যাকে উবাসুতে দিয়ে আসা হয় কোনকারনে সে ফিরে এলেও তাকে আর কোনদিন সংসারে ফিরিয়ে নেয়া হয় না। সেইমত সবাই আকিরাকে ওখানেই একটা গাছ তলায় বসিয়ে দিয়ে বাড়ি ফেরার রাস্তা ধরল। আকিরার আজকের এই আত্মজ এবং ঘনিষ্ট
আত্মীয় স্বজনদের ব্যবহারের সঙ্গে সভ্য সমাজের আচার ব্যবহার কোনমতেই মেলে
না। অথচ এটাই ছিল সেকালের ওই এলাকার নিয়ম। এই নিয়মের অন্যথায় সেই
পরিবারকে সমাজে একঘরে হতে হবে।
আকিরা এখন আর কাঁদছে না। ওর সব কান্না যেন শেষ। ইতিমধ্যে বৃষ্টি অনেকটা
কমে এসেছে বলিষ্ঠ চেহারার আকিরা উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে হেটে এলাকাটা
ঘুরতে লাগলো। একটা শকুন ও দুটো চিল ঊড়ে এসে ওর মাথায় ঠোক্কর দিতে চাইলে ও
এক ঝটকায় তাদেরকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে লাগলো। আস্তে আস্তে দিনের আলো
শেষ হয়ে আসছে। একটা পাহাড়ি গুহা যদি পাওয়া যেত, অন্তত রাতটুকুর জন্য!
প্রচন্ড দুর্গম আবহাওয়ায় অতি সংকীর্ণ পাহাড়ি পথে কোনরকমে জীবনটাকে হাতে
নিয়ে আকিরা একটু আশ্রয়ের আশায় পাহাড়ি গাছের ডাল পালা ধরে ধরে হেঁটে যেতে
লাগলো। বেশ কিছুক্ষন হাটার পর একটা পাহাড়ি গুহার সন্ধান পেল। আশে পাসে
কয়েকটা সুস্বাদু ফলের গাছের সন্ধানও পেল সে। কিছু দূরে একটা পাহাড়ি
ঝর্ণারও শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সে কিছুটা নিশ্চিন্ত হল অন্তত আজকের রাতটুকু
কোনরকমে এই গুহাটাতে কাটানো যাবে। ইতিমধ্যে বেলা শেষ হয়ে অন্ধকার হয়ে
আসছে।
পরদিন সকালের গ্রাম আর পাঁচটা দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক। সবাই যে যার কাজ
নিয়ে ব্যস্ত। শুধু একজন, মিসাকি, সারা রাত নীরবে কেঁদে গেছে। সকালে সেও
আর পাঁঁচটা দিনের মতই পাহাড়ি জঙ্গল থেকে শুখনো কাঠ আর ঝর্ণার জল আনতে
বেরিয়ে গেল। তবে আজ সে সম্পূর্ণ একা, মনটাও খুবই খারাপ। বার বার মনের মধ্যে
শুধু উঁঁকি দিয়ে যাচ্ছে একটাই মুখ, 'আকিরা', 'আকিরা' আর 'আকিরা'। গত কালকের
ঘটনা মিসাকি সবই শুনেছে। বেচারা আকিরা হয়ত এখন উদ্ভ্রান্তের মত ওই লাল
পাহাড়তার চুড়োয় ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে একটু খাবারের জন্য, একটু জলের
জন্য। একবার আকিরা ওকে দেখিয়েছিল ঐ মৃত্যু উপত্যকায় যাওয়ার রাস্তাটা। ঐ
তো ডান দিকের ঝর্ণার পাশ দিয়ে পাহারি খাড়াই টা পার হলেই নাকি সেই রাস্তা।
তারপর চার পাচ ঘন্টা দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় শুধু হাঁটা আর হাঁঁটা।
মিসাকির আর বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। আচ্ছা, আর মাত্র কয়েকদিন পরেই
তো মিসাকিকে ছেলেদের কাঁঁধে চড়ে ঐ মৃত্য পাহাড়ে যেতেই হবে, তার চেয়ে ও
যদি আজ একাই হাটতে হাটতে জায়গাটাতে......। যেমন ভাবা ঠিক তেমনই কাজ। এক
ঝটকায় কাঁধ থেকে ছুড়ে ফেলে দেয় কুড়িয়ে আনা জঙ্গলের সব কাঠ আর ঝরণার জল।
তার জোরে জোরে পা ফেলে সে এক মনে এগিয়ে যেতে থাকে সেই মৃত্যু উপত্যকার
দিকে। মিসাকির আর পিছন ফিরে তাকাবার সময় নেই। বেলা বাড়তে বাড়তে তার পা
ব্যাথা হতে থাকে, তবু সে একবারের জন্যও পিছন ফিরে তাকায় না। সূর্য্য তার
লাল আভা ছড়িয়ে ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে। মিসাকির পায়ে ফোস্কা পরে গেছে।
তবু সে দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় গাছের ডাল পালা ধরে ধরে এগিয়ে চলে।
হটাৎ তার সমস্ত শরীর এক পরমানন্দে শীহরিত হয়ে উঠলো, মিসাকি স্পষ্ট দেখতে
পেল, কিছুটা দূরে একটি বলিষ্ঠ চেহারার লোক ঋজু ভঙ্গিমায় ডান পা টা টানতে
টানতে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। লোকটি মিসাকিকে দেখতে পেয়েই দৌড়ে এসে মিসাকিকে বুকে টেনে নিয়েই বলল... ঈশ্বর কি কখনও প্রকৃত প্রেমকে ব্যর্থ হতে দেয়? একথা বলেই দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না!