Friday, 21 December 2018

আমার কবিতা

”” জন্মদিনে “”””
মনে আছে তোমার?
আমাদের সেই পাগলামীর দিনগুলো....... ?
সেদিন ছিল তোমার জন্মদিন।
জন্মদিনে কিই বা দেব তোমায়?
বাউন্ডুলে ছেলেটার না ছিল রুজি, না ছিল রোজগার।
অথচ প্রাণে ছিল সাতসাগর ভরা ভালবাসা...।
তাই ঠিক করলাম বেলপাহাড়ির জঙ্গলে
একটা জ্যান্ত পাহাড় উপহার দেব তোমায়।
যেমন কথা তেমনি কাজ।
বেরিয়ে পড়লাম দুজনে, খালি হাতে।
তুমি বললে সেই ভাল,
কি হবে শহরের জঞ্জালগুলো বয়ে নিয়ে?
ধূমপানের ধোঁয়া চিরদিন অসহ্য ছিল তোমার কাছে;
সেই তুমিই কিনা বেলপাহাড়ির হাটে,
শরতের কাঁচা রোদমেখে বলেছিলে, ‘মহুয়া খাবো’,
কি যেন নাম ছিল মেয়েটার? চাঁদমনি সোরেন?
বাশের মাচার বেঞ্চিতে বসে শিশুর মত পা দোলাতে দোলাতে
সে পরম মমতায় ঢেলে দিচ্ছিল মহুয়া.
কলসি থেকে শালপাতার বাটিতে।
আর শহুরে ফুচকা খাওয়ার ঢঙ্গে ...
চুক চুক করে পান করে যাচ্ছিলে তুমি সেই সুধা রস।
সঙ্গে চালের রুটি আর হাঁসের মাংস।
না, কোন পাঁচতারা হোটেলে ক্যান্ডেল ডিনার নয়;
বাঁশের মাচায় বসে মহুয়ার সঙ্গে হাঁসের মাংস......।
পরে চাঁদমনিকে জড়িয়ে ধরে তোমার সে কি নাচ ......।
এই তুমিই নাকি বানীপুর ইস্কুলের রাসভারী অঙ্কের দিদিমনি?
আস্তে আস্তে বেলা পরে আসে।
আমি বলি এবার চল পাহাড় নেবে না ?
জড়ানো গলায় টালমাটাল পায়ে
তুমি আমার দুদিন চান না করা গায়ে......
বাসি জামার 'পরে মাথা রেখে বলেছিলে......,
‘তোমার গায়ে সিগারেট আর ঘামের গন্ধ মিলে কি সুন্দর সুবাস!’
আমি বললাম, ‘দূর পাগলী, ঘামের গন্ধ আবার সুবাস হয় নাকি?
তার চেয়ে ওই দেখ, দূরে দুটো পাহাড় কি সুন্দর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
ওর মধ্যে কোনটা তুমি নেবে বলো,
আমি এক্ষনি তোমাকে এনে দেব সেই পাহাড়টা।’
তুমি আমাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে বুকের ওপর মাথাটা রেখে
আমার মুখে হাত রেখে বললে......।,
‘শ্ শ্ শ্ শ্ চুপ, একদম কথা বলো না, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কোথায়?
দেখছ না...... ছোট পাহাড়টা বড় পাহাড়টাকে
কি সুন্দর ভাবে জড়িয়ে ধরে ওর বুকের উপর মাথা রেখেছে।‘
2)"””” ভালবাসার আতপ "”””
মন খারাপের ঠিকানায়
ঘর বেঁধেই আমার সুখ,
আকাশ জুড়ে রৌদ্রভুখ
মেঘের আনাগোনা।
আজ হৃদয় আমার ময়ুরের মত
বিভঙ্গে নারাজ।
পীড়িত দেহটাকে নিয়ে
স্থবির আমি পথ পরিক্রমায়।
তবুও ভালবাসার আতপ
পাব বলে যেতে চাই প্রণয় নগরে।
হাটতে চাই চাই হাজার বছরের
ম্যারাথন শুধু ভালবাসার তরে।
3)”””” দানা মাঝি “””””
বধ্যভূমিতে আমরা সবাই ভীত ছাগশিশু,
কারওবা চোখে মুখে কসাইএর লোলুপ হাসি।
বর্ণান্ধ এই চোখে সবই তো সাদা-কালো;
শুধু ক্ষুধার যন্ত্রনা ভুলি রক্তের লোহিত রঙে।
প্রতি মুহুর্তে বিক্রী হয়ে যায় ভালবাসা
অর্থের বিনিময়ে, অন্ধকারের গলি থেকে রাজপথে।
তবুও বুকে অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে বেঁচে আছি,
প্রানহীন এই কংক্রিটের জঙ্গলে বা বনস্পতিহীন গ্রামে।
তবে ভালবাসাহীন এই মৃত্যুর উপত্যাকায়
মেকী মুখোসের আড়ালে
আর কতদিন, আর কতকাল ?
দেখতে হবে তোমাদের অভিনয়?
ঠিক তখনই মনে পড়ে দানা মাঝি তোমার কথা;
তুমি, তোমার মেনকার দেহ কাঁধে নিয়ে
পাড়ি দিলে এক ভালবাসার দেশের উদ্দেশ্যে।
না, কাউকে কোপানলে ভস্মীভুত করতে নয়,
এক’শ কোটি মানুষের বিবেককে তুমিই
প্রথম অভয় দিলে। বোঝালে ভালবাসা অমর।
জানিয়ে দিলে ভালবাসার মৃত্যু নেই।
4)"""" পঞ্চ ইন্দ্রিয় """"
যখনই অন্তরে বাসনা হয়,
দুচোখ ভরে তোমার রূপসুধা পান করি
তখনই আমি অন্ধ হয়ে যাই।
তোমার কিন্নরী কন্ঠ
শুনতে চাইলেই,
কেমন যেন আমি বধির হয়ে যাই!
যখনই মনে করি তোমার শরীরের
সুবাসে আমোদিত হ'ব,
আমার সকল ঘ্রাণশক্তি লোপ পেয়ে যায়।
তোমার জিহ্বাতে কেন যে পাই না
সেই চুম্বনের স্বাদ !.........
শরীরেও জাগে না শিহরণ।
তোমার প্রতি অঙ্গ পরশেও
ত্বকে মোর জাগে না শিহরণ !
খেলে না বিদ্যুৎ কোষ থেকে কোষান্তরে।
তবু যে কেন হাজার বছর ধরে,
লালন করে গেছি তোমাকে,
আমারই মনের মনিকোঠায় ???
5)"""" অপেক্ষা """"
আমার জন্ম পর্যন্তও বাবা করেনি অপেক্ষা,
কি এমন তাড়া ছিল তার?
নিজের সন্তানকে একবারের তরে না দেখে,
যে কিনা চলে যায় এই দুনিয়া ছেড়ে;
আমার জন্মের আট মাস আগেই?
সেই অভিমান আজও আমাকে কুরে কুরে খায়।
তবে আমার মাও আর বেশীদিন করেনি অপেক্ষা,
গাঁয়ের লোকেদের 'কুলকলঙ্কিনী' অপবাদ নিয়ে
চলে গেল সে ট্রেনের তলায় কেমন নিশ্চিন্তে;
যে ট্রেনের ঘড়ি আধ ঘন্টা লেট থাকাই স্বাভাবিক
সে কেন সেদিন দশটা মিনিট করেনি অপেক্ষা?
সেই অভিমান আজও আমাকে কুরে কুরে খায়।
কুমারী মায়ের 'বেজন্মা সন্তান'
যার কুঁড়িতেই বিনষ্ট হওয়ার কথা ছিল,
হাজারও ঝড়-ঝাপটায়,সে আজ যৌবনে উপনীত ।
গ্রাম ছেড়ে চলেছি শহরের পথে জীবিকার সন্ধানে,
গাঁয়ে সেদিন কেউ করেনি অপেক্ষা আমাকে জানাতে বিদায়;
শুধু একজন-শুধু একজন, মাতৃহীনা কিশোরী করেছিল অপেক্ষা।
সঞ্চালী বলেছিল, আমাকে ছাড়া সে বাঁচবে না,
আমি বলেছিলাম, অপেক্ষা করো চাকরিটা হোক পাকা।
পাকা চাকরির খবর নিয়ে গাঁয়ে ফিরে চোখ পড়ল তার রঙ্গীন সিঁথিতে;
হাসি মুখে বললে, বাবা অপেক্ষা করল না।
আমি বললাম, বাবাকে তো বলিনি অপেক্ষা করতে!......,
সেই অভিমান আজও আমাকে কুরে কুরে খায়।
শহরের রাজপথে এক ব্যর্থ যুবক
পিতৃহীন, মাতৃহীন, পুত্র-কন্যা-কলত্রহীন এবং প্রেমহীন,
একইসাথে আজ সে শোকহীন, দুঃখহীন
যার জন্য কোনদিন কেউ করেনি অপেক্ষা
সে নিজেই আজ এক নিরন্তর মিলনের অপেক্ষায়
সে মিলন কি সত্যিই শ্যামও সমান?
চালহীন চুলোহীন সমাজ পরিত্যক্ত এক যুবক,
আজ 'বডি' হয়ে পরে আছে কলকাতার রাজপথে।
নাকে কাপড় দিয়ে চলে যায় একে একে, কেউ করেনি অপেক্ষা!
মর্গ থেকে শ্মশানে সই-সাবুদ করে হাত বদল হয় 'বডি'র।
'বডি'র লাইনে চার নম্বর...। ডোমরাজকে শুধায় সবাই--
কতক্ষন লাগবে 'বডিটা' পুড়তে? আবারও এক ঘন্টার অপেক্ষা ??
6)""" আমার ঠিকানা """
আজও খুজে চলি 'আমার নিজের বাড়িটা'...;
চারিদিকে এতো বাড়ি' এত ঘর, নতুন কিম্বা পুরানো...।
টালির কিম্বা দালান, একতলা, থেকে চারতলা...।
কোথাও পাই না খুজে আমার নিজের ঠিকানা...।
ছোট্টবেলায় অজয়ের ধারে কাশবনের মাঝে...
ছিল ছোট্ট একটা সুন্দর বাড়ি আমার...... থুড়ি, আমার বাবার,
ছুটির দিনে বাবা আর আমি আকাশ পানে দুহাত তুলে গাইতাম,
"বাড়ি আমার ভাঙ্গন ধরে অজয় নদের বাঁকে......।"
একদিন মায়ের সঙ্গে গেলাম তার 'বাপের বাড়ি'।
মামারা করলে অনেক খাতির, পুকুরের মাছ, গাছের আম আরও কত কি?
দাদু-দিদা বললে, - আর কটা দিন থেকে যা।
মা বললে,- 'শশুর বাড়ি' ছেড়ে কতদিন আর 'বাপের বাড়িতে' থাকব বলো?
তারপর এক শুভদিনে আমার-ও হ'ল বিয়ে;
হাজারও দুঃখের মধ্যে সেদিন হয়েছিলাম খুশি এটা ভেবে......
বাকী জীবনটা কলকাতায় হবে 'আমার নিজের বাড়ি'।
যে কলকাতাকে এতদিন শুধু দেখেছি স্বপনে।
এক ছুটির দিনে আমার শিশুর মত সরল স্বামীকে বললাম,
চল এবার পুজোয় যাই আমার 'বাপের বাড়ি'........
অজয়ের ধারে দাঁড়িয়ে দুজনে আকাশ পানে দুহাত তুলে গাইব
"বাড়ি আমার ভাঙ্গন ধরা অজয় নদের বাঁকে...।"
উচ্ছ্বাসে আমাদের গলায় ছিল না বাঁধন......।
পাশের ঘর থেকে শশুরমশাই তদোধিক চিৎকার করে উঠলেন,
বললেন, এটা 'আমার বাড়ি' .........
এ বাড়িতে এ কেমন বেলেল্লাপনা বাড়ির বৌ-এর ?
শশুর-শাসুড়ি-স্বামী সবাই নিয়েছেন একে একে বিদায়......
একমাত্র সন্তান থাকে বিদেশে।
একা নিঃস্ব বৃদ্ধা পাহারা দিয়ে চলেছি আমা্র ইটের পাঁজরকে.....।
এত দিনে পেয়েছি যে 'আমার নিজের বাড়ি'।
হটাৎ ছেলে এল বিদেশ থেকে, বললে-
এত বড় বাড়িটায় তুমি থাকো একা, তাই বড় দুশ্চিন্তা!
ভাবছি 'আমার বাড়িটা' দেব বিকিয়ে, তোমার জন্য কিনবো একটি ছোট্ট ফ্লাট।
আমি বলি-- "সেটাই ভাল......, কোথায় করতে হবে সই বলো ?"
ছেলে ফিরে যায় নিজের সংসারে বিদেশে...।
আমি শুধু নিরুদ্দেশে ঘুরে ফিরি 'আমার বাড়ি'র আশে,
উপেন পেয়েছে "বিশ্ব নিখিল" তারই দুবিঘার তরে,
আমি কি পাবোনা "ঠিকানা একটি" আমার নিজের করে ?
7)"""" বিবাহ বার্ষিকী """"
পিয়াজ দিয়ে পান্তা খেয়ে,
বেরিয়ে পরি লা'টি নিয়ে।
কোষ্টা ভর্তি লা'এ চরে,
বাঁশের গাদায় দখিন দাঁড়ে।
গাঙ্গের খোলে অনেক জল....,
মরদ বলে, ঐ জলকে চল।
মরদ যায় আমায় নিয়ে,
খুনসুটির সেই গানটি গেয়ে।
জালটি টানে শক্ত চোয়াল,
লাফিয়ে ওঠে একটি বোয়াল।
ফেরার সময়ে ভাটার পানে,
মরদ আমায় গুন-টি টানে।
হালটি আমি কষেই ধরি,
তার কান্ড দেখে হেসেই মরি।
দিনটি মোদের বড়ই জবর,
বিয়ের হ'ল তিনটি বছর।
আমি রানী সে মোর রাজা,
আজকে খাবো বোয়াল ভাজা,
কেমনে তে ভাজবো মীন,
রসুই আমার তৈল হীন।
তপ্ত ভাতের সুবাস ভরা
সঙ্গে বাড়তি বোয়াল পোড়া।
এক পাতেতে ভাতটি খেয়ে,
আঁধার করে পড়ি শুয়ে।
মরদের বুকে রেখে মাথা,
ফুরিয়ে গেল আমার কথা।
8)"""" ফটাস জল """
কেষ্টচন্দপুরে অন্ধমুনির মেলায়
কলার কাঁদির কি বাহার?
নিঃস্ব পিকলুর ইচ্ছে ছিল,
নিজের পয়সায় একটা কলা কিনে খাবে; মাত্র দু পয়সা দামে;
আর ঝন্টুকেও একটা খাওয়াবে।
ঝন্টু পিকলুকে একটা বড় সাদা বাতাসা কিনে খাইয়েছে।
মেলায় আর একটা জিনিস পিকলুকে খুব টানে......,
দশ পয়সার ফটাস-জল। কোনদিন সে খায়নি।
বোতল-টা খোলার সময়ে কেমন যেন ফটাস করে শব্দ হয়;
তারপর সাদা ফেনায় বোতলের মুখ ছাপিয়ে যায়।
লোকে খেয়ে ঢেকুর তোলে।
একদিন নিজের পয়সায় ওই ফটাস শব্দ শুনতে চায় সে।
বড়দের মত ঢেকুর তুলতে চায় সেও,
একদিন বাবা নিশ্চই দশ পয়সা দেবে।
সেদিন ও ফটাস জল খেয়ে ঢেকুর তুলবে।
সেদিন মেলায় বনানীর সাথে দেখা।
বনানীকে ওর বেশ ভালো লাগে।
মেলায় বনানীর দেয়া এক আনার লেবুঞ্চুসটার
কি দারুন স্বাদ!!
আর আট আনা দিয়ে একটা রবি ঠাকুরের ছবিও কিনল বনানী।
বল্লে ওর ঘরের দেয়ালে রাখবে সাজিয়ে।
পিকলুর তো নিজের কোন ঘরই নেই,
তা হোক, সেও একটা রবি ঠাকুরের ছবি কিনবে,
আর দেয়ালে রেখে দুহাত জোড় করে বলবে.........,
"অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে।
নির্মল করো উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে।
জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে।......"
ঠিক তখনই আর...। ঠিক তখনই
পিকলু দেখতে পেলে ওর বাবাকে,
আবদার করে,... বাবার কাছে সামান্য একটা টাকার...।
নিষ্ঠুর বাবা উত্তর দিলেন এক দুরন্ত চপেটিকায়।
ওর চোখে সেদিন ছিল না কোনো অশ্রু
শুধু মনে হল আঘাতের শব্দটা ঠিক যেন ফটাস জলের মত।
9)""" পলাশ বনে আমি একা """
মাদলের ঝংকারে, মহুয়ার নেশায়,
খোয়াইয়ের পলাশ বনে, তখন একলা আমি।
পলাশের রঙে রাতুল আকাশ, মাতাল বাতাস,
অলক্ত রঞ্জিত চরণে, তুমি এসেছিলে নীরবে।
শাল পলাশের বনে, যৌবনের তাড়নায়,
দৃষ্টিহীন আমি তখন, তোমায় পাইনি দেখিতে।
10)"""" ODD MAN OUT """"
মাঝে মাঝে মন খারাপের ঠিকানায়,
ইচ্ছে করে হারিয়ে যেতে।
গোধুলি গগনে ঘন মেঘ,
বৃষ্টিহীন আবছা আলোয় ধুসর গাছ,
নিভৃর্তি পরিশ্রমে ক্লান্ত পথিক দিগভ্রান্ত।
অবসন্ন বিহঙ্গকুল মেঘকজ্জলে বিলীন;
রাঙ্গামাটির কঙ্কর বিস্তৃত পথে
স্বজন হারা নিরুদ্দিষ্ট আমি একা।
11)"""" মাধুকর """"
শ্রাবন্তিপুরের হাটে দেখা হয়েছিল তোমার সাথে
বাউলের দলে মাধুকর হয়ে গেয়েছিলে একলা চলার গান।
তখনও চিনিনি তোমায়। আমি তখন নেশাগ্রস্থ,
উচ্চাশার সোপানে চড়ার নেশায়
এক বিদেশিনীর ঘেরাটোপে।
আমার চোখে রঙ্গীন স্বপ্নের ঘোর
দেয়নি, তোমাকে এক পলক দেখারও সময়।
রাত্রিভর অবুঝ বালকের ন্যায় রচেছি কত রঙ্গীন ফানুস!
বুঝিনি সময় হয়েছে বিষ্ফোরণের সে স্বপ্নের।
তাই আজ রক্তাক্ত শরীরে এসেছি তোমার দ্বারে,
জানিনা সে মোর কোন অধিকার !
তুমি তো এখনও আছো, হয়ে সেই মাধুকর ?
12)"""" বনপলাশীর কলমিলতা """"
কেমন আছিস, বনপলাশীর কলমিলতা ?
কতদিন তোর সঙ্গে, হয়নি কোনো কথা।
এখনো কি ভয় দেখাস, ভুত-পেত্নী সেজে !
মগডালেতে উঠে পরিস, ডাসা পেয়ারার খোজে?
কাঠ বেড়ালী পুষিশ নাকি, খাচার ভিতর ধরে !
ঘুরে বেড়াস যেখানেতে, পেরজাপতি ওড়ে?
কাচ পোকাটা ঘষে ঘষে, কপালে টিপখানি,
খোপায় গুজে বকের পালক, আজও সাজিস রানী?
পাকা কুল পাড়তে গিয়ে, দেখিস নাকি উঠে
বুলবুলিতে ডিম পেড়েছে, গন্ডা খানেক মোটে ?
ডুব সাতারে পার হয়ে যাস, এপার থেকে ওপার
মিনিট দশেক ডুবে থাকা, তেমনটা নয় ব্যাপার।
দত্ত বাড়ির লালির পিছু, ছুটিস নাকি আজও ?
সবাই বলে ডানপিটে-টার নেই কি কোনো কাজও
মানতি পিসি চেচিয়ে বলেন -- " ও ডানপিটে মেয়ে...
ঘরে তোকে নেবে না কেউ গলায় মালা দিয়ে...।"
তার পরেতে হয়নি দেখা, দশক তিনেক ধরে
তবু তোর নামটি সদা্‌ মনের মাঝে ঘোরে।
হটাৎ সেদিন ফেস বুকেতে, চমকে উঠি দেখে
কলমিতা সেন থাকেন, কানাডার কুইবেকে।
স্বামী সেথায় ব্যস্ত ভীষন, অধ্যাপনা নিয়ে,
বঙ্গ সমাজ ধন্য সেথা, তোকে মাথায় পেয়ে।
তোর কথা গাঁয়ের যেমন, সবার পড়ে মনে
বনপলাশী তোকে কি আর, তেমন তোকে টানে ?
13)"""""" বৃত্তের বাইরে """"""
একদিন সে চলে যাবে
বুক ভরা অভিমান নিয়ে বৃত্তের বাইরে,
অনেক খুজেও সেদিন পাবে না তারে।
বুক ভরা অভিমান তবু মুখে স্মিত হাসি
দুঃখের সাগরে কতদিন সে রবে সুচিস্মিত?
তার তুলিকা গেছে ভোতা হয়ে। রঙ হয়েছে বাসি।
কেমনে এঁকে যাবে যাবে নয়নে......
তোমাদের পছন্দের রেখা দিনের পর দিন ?
বলি-প্রদত্ত ছাগ শিশুর ন্যায় সে ভীত সন্ত্রস্ত,
চকিতে কম্পিত......... চকিতে ত্রস্ত।
থাক না অনুভুতি প্রবন মনটা আজ প্রদীপের আড়ালে !
বাইরের হর্ষেই পড়ুক যত আলো।
তার হৃদয়ের খবর থাকুক না আঁধারে
ভাবুক না সবাই তাকে কষ্ট বিলাশী ?
গোপনেই থাকুক তার সঞ্ছিত কষ্ট যত।
তোমাদের উপহাসের সহচরী হয়ে
একদিন সে তো চলেই যাবে বৃত্তের বাইরে !
14)"""" দুরত্ব """"
চলে যেতে চাই অনেক দূর......
জীবনের অসংখ্য জলছবির মনতাজ হয়ে... আরো অনেক দূরে।
চাইনা আমি জীবন্মৃত হয়ে থাকতে তোমার গৃহে,
তোমার ছলনার মিথ্যা অনুগ্রহে।
তোমার অনুরাগহীন উদর সর্বস্ব স্থূল শরীর,
হোকনা আমার স্মৃতির অতীত!
জেগে থাক আমার মনের আঙ্গীনায়,
শুধুই তোমার নিষ্ঠুর ক্লীব মন।
তোমার মুখোশ পরা মুখের আমি অননুরক্ত।
তবুও জানি আমি, যতই হই না কেন অন্ধ,
প্রলয় তাতেও হবে না কোনদিন বন্ধ।
মরুভুমির তপ্ত বালুকণায় লুকিয়ে মুখ
আজীবন খুজে বেড়াই এ কোন মরুদ্যান ?
পাথেয়হীন পথিক হয়ে আজি,
এ কোন পদাতিক আমি!
খুজে বেড়াই আঁধারের রাস্তা ?
কন্টকাকীর্ন পদযুগল আজ আমার চলৎশক্তিহীন;
কবিতাহীন মন আজ আমার দ্বার-রুদ্ধ।
15)""""""""রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।""""""""
সাত ফুট বাই আটফুট ঘর আমার
রেল লাইনের পাশে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
বাদল দিনে নৌক চলে ......,
শীতের দিনে কাঁপন তোলে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
বউ আমার ব্যস্ত থাকে নানান কাজে,
এক বাড়িতে ঘর মোছে, আর এক খানে বাসন মাজে;
মাঝে মধ্যে পর্টির কাজে সন্ধ্যাবেলায় ভীষন সাজে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
ছেলে আমার লায়েক বড়, পাড়ার দাদার প্রিয়তম
বোমা পিস্তল মেশিন বলো অনেকটা তার খেলনা সম।
সম বচ্ছর ছটি মাসে,
বাঁধাই আছে কারাবাসে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
মেয়ে আমার ষোলোয় প'ল।
তিনটিবার পোয়াতি হ'ল
শেষের সেবার সেই 'দাদা' এসে
হাসপাতালে নিয়ে শেষে;
সাদা কাপড়ে ঢাকা দিয়ে, কাঁচ গাড়ীতে ফিরে আসে।
কেঁদে কেটে দাদা বলে,
যে গেছে সে গেছে চলে।
দশ হাজারে রফা হল অবশেষে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
বউ এখন কমজোরি
আর ছেলের হ'ল যাবজ্জীবন।
বৃদ্ধ আমি একা বসে,
এত দিনে বুঝনু শেষে;
আকাশে ভরা মেঘ যে ভাসে।
মোর ঘরেতে আর কোনোদিন
চাঁদ না আসে, রোদ না হাসে।
16)"""""""" ভালোবাসা """"""""
সেদিন তুমি শুধালে............
'আমি কি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি ?'
আমি নিজেই কি জানি ........
এই বোহেমিয়ান জীবনের ভালোবাসার স্বাদ ?
তোমার কথায় একদিন.........
তোমার ঠোট ছুয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম
ধুমপান দেবো ছেড়ে... কিন্তু আমি পারিনি।
তুমি বললে ...... 'এই তোমার ভালোবাসা ?
আমার জন্য সামান্য একটা সিগারেটও পারো না ছাড়তে ?'
আমি বলি ধুস, আমার দ্বারা কিচ্ছুটি হবে না
আমি এক অকৃতী অধম...।
সামান্য একটা ধুমপানও পারিনা দিতে ছেড়ে.....
তোমার মত সুন্দরীর জন্য...
ধিক শত ধিক মোরে......।
সেদিন আমার চাকরীটা গেল চলে...।
হটাৎ তুমিও চলে গেলে অনেক দূরে
আর কোনদিন বলোনি সিগারেট দিতে ছেড়ে
তাই একদিন সিগারেট ছুয়ে করলাম প্রতিজ্ঞা
তোমাকেই দেবো ছেড়ে...।
কিন্তু তাই বা পারলাম কই?
আজ তুমি কত দূরে......
আমিও তো দিয়েছি ছেড়ে ধুমপান...।
তবু শয়নে স্বপনে কিবা জাগরনে
কেন 'তুমি'ময় আমার তনুমন ?
17)“””” বেঁচে থাকার নেশা “”””
মন ভালো নেই, দেহ ভালো নেই,
উপাধানে মাথা রেখে তাকিয়ে দেখি
দেয়ালে জেষ্ঠির বিচিত্র জগৎ।
তবু মনে হয়, ভালোই তো...
অফুরন্ত সময়, অবিরাম বিশ্রাম;
তিক্ত ভেষজের স্বাদে রিক্তোদরে
ঘুম আসে না।
দিবা স্বপ্নে দেখি, না-দেখা জলছবিরা
আমার চারিদিকে করে খেলা।
প্রিয়তমার কোমল হাত, আর ফনিমনসার দল,
অগ্রজের শাসন কিম্বা অনুজের অভিমান,
মিলে মিশে একাকার।
তবু নিন্দিত, তবু ধিকৃত,
তবু একরাশ অসমাপ্ত কাজের তালিকা।
কৃষ্ণ বর্ণ দুরাভাষ ডাক দেয় থেকে থেকে...
আর কতদিন ? আর কতদুর ?
এবার যে যেতে হ’বে... ?
তবু বেঁচে আছি......বেঁচে থাকি
জীবনের এক দুরন্ত নেশায়।
18)“তুমি আর আমি”
তোমার জন্য চায়ের কাপে, ঝড় ওঠে,
আমার জন্য তুচ্ছ হাসি, লাল ঠোটে।
তোমার জন্য হোঁচট খায়, ফুটপাতে,
আমার জন্য পথিক চলে, শান্ত পথে।
তোমার জন্য লক্ষ লোকের, দয়ার হাত,
আমার জন্য তারাই করে, কটাক্ষ পাত।
তোমার জন্য সেলফোন বাজে, রাত্রিদিন,
আমার জন্য ল্যান্ডফোনটা, শব্দহীন।
তোমার জন্য ফাইভ স্টারে, ডিনার করা,
আমার জন্য রাধুনী মাসীর পোস্ত বড়া।
তোমার জন্য সারা রাত জাগে, ঝাড়বাতি,
আমার জন্য নিভু নিভু শুধ্ মোমবাতি।
তোমার জন্য “আসুন ম্যাম, বসুন বসুন,”
আমার জন্য “আপনি দাদা, পরে আসুন।”
তোমার জন্য করপোরেটের, ইউরোপ ট্যুর,
আমার জন্য গিরিডি কিম্বা মধুপুর।
(তবু) তোমার জন্য দিনের শেষে, সেই আমি,
আমার জন্য দিনের শেষে, সেই তুমি।
19)"""" আমার দুগ্গা পিতিমের মত মা """"
আমি বলতাম,...... মা গো
বোসেদের দুগ্গা পিতিমের চোখদুটো ঠিক যেন তোমার দুটি চোখের মত।
তুমি বলতে,... ছি ! বলতে নেই,
আমি হলুম গিয়ে সাধারন মনিষ্যি, আর ওনারা দেবতা।
মহাষ্টমীতে বোসেদের বাড়িতে লুচি ভোগের কি মিষ্টি সুবাস...
নাঙ্কু, বুচকা, শিউলি ওরা আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে খায়...
আমি বলেছিলাম,... মা গো চাইনা আমার নতুন জামা
আমাকে দুটো ঘি-এর লুচি ভেজে খাওয়াবে...?
ঠিক যেমন বোসেদের নাঙ্কু, বুচকা আর শিউলিরা খায়
আর ছিড়ে ছিড়ে রাস্তার কুকুরকে খাওয়ায়?
আমিও কুকুর-কে খাওয়াবো মা......
তুমি বলেছিলে হ্যা বাবা,... নিশ্চই খাওয়াব......
আমি আর লুচি খেতে চাইনি কোনদিন তোমার কাছে।
মাঝ রাতে আমার মদ্যপ বাবা যখন,
তোমার ওপর উগড়ে দিত তার যত বেয়াদপি
তুমি অনেক কষ্টেও এতোটুকু কাঁদোনি,
তুমি জানতে তুমি কাঁদলে যে আমার কষ্ট হয় !
আমি-ও সেদিন কাঁদিনি মা।
বলেছিলাম,... আজ তো আমার বুক-টা খুব ছোট;
যেদিন আমার বুকটা হবে বাবার চেয়েও বড়...
সেদিন দেখো কেউ পাবে না সাহস তোমার গায়ে দিতে হাত...
এই বুক দিয়েই তোমায় রাখব আগলে মাগো।
একদিন সেই বাবাও গেল চলে আমাদের ছেড়ে,
সেদিন তুমি কেঁদেছিলে হাপুস নয়নে......
তারপর কি না করেছ তুমি... শুধু আমার মুখের দিকে চেয়ে ?
দু বেলা বাবুদের বাড়িতে বাসন মেজে.... রান্না করে
ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে মাঝ রাতে।
আমি তখন ঘুমিয়ে পড়েছি তোমার পথ চেয়ে;
তুমি আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে খাইয়ে দিয়েছ নিজের হাতে।
তারপর আস্তে আস্তে এলো সেই আলোর দিন,
একটা কাকু আসত আমাদের এই বস্তির টালির ঘরে...
আমার জন্য নিয়ে আসতো খেলনা, মিষ্টি, লেবুঞ্চুস...
কি ভাল যে লাগত আমার ঐ কাকুটাকে ...
ওনার কাছেই প্রাথম জানলাম রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষ......
আস্তে আস্তে তোমার মুখে ফুটল হাসি,
তুমিও কাজ দিলে অনেক কমিয়ে,
একদিন আমাকে লুচি ভেজে দিলে খাইয়ে;
শুনলাম উনি-ই নাকি হবেন আমার নতুন বাবা।
শুনে আমি খুব খুসি, এই বাবা-টা অনেক ভাল,
আমার আগের বাবার মতো চোখ লাল করা, গোমড়া মুখো নয়।
আস্তে আস্তে তোমার মুখে ফুটলো হাসি
তারপর একদিন ভর সন্ধ্যায় আমার নতুন বাবা যখন...
আমাকে পাশে বসিয়ে শোনাচ্ছেন......
"মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি আছ পাল্কীতে মা চড়ে
দরজা দুটো একটু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙ্গা ঘোড়ার পরে
টগ বগিয়ে তোমার পাশে পাশে
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙ্গা ধুলো মেঘ উড়িয়ে আসে।......"
আর তুমি করছিলে বাবার জন্য চা...
তখনই... ঠিক তখনই পাশের বাড়ির ঝন্টুর মা এল দৌড়ে......
চিৎকার করে পাড়ার সবাইকে ডেকে করলে জড়ো...
হেঁকে বললে...... "এটা ভদ্রলোকের পাড়া,
বেবুস্যেগিরি করার জায়গা এটা নয়।"
পাড়ার সবাই ভেঙ্গে তছ-নচ করলে আমাদের আসবাব হীন ঘরটা;
মেরে ধরে...... বের করে দিলে বাবাকে আর তোমাকে... ।
তার কয়েক ঘন্টা পরেই পাওয়া গেল তোমার ঝুলন্ত নিথর দেহটা...
অন্ধকারে দখিন পাড়ার কাঠাল গাছের ডালে ।
মাগো...... তোমার দুগ্গা পিতিমের মতো চোখ দুটো
তখনও যেন কাকে খুজে চলেছে ।
মাগো.... এখন আমার বুকটা হয়েছে অনেক বড়ো,
আমি এখন আমার বাবাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছি মা।
আর রথের মেলায় তোলা তোমার সেই ছবিটার দিকে
তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি
আজ ও যেন তোমার......দুগ্গা পিতিমের মত চোখ দুটো
কাকে যেন খুজে চলেছ ।
20)""""""""রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।""""""""
সাত ফুট বাই আটফুট ঘর আমার
রেল লাইনের পাশে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
বাদল দিনে নৌক চলে ......,
শীতের দিনে কাঁপন তোলে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
বউ আমার ব্যস্ত থাকে নানান কাজে,
এক বাড়িতে ঘর মোছে, আর এক খানে বাসন মাজে;
মাঝে মধ্যে পর্টির কাজে সন্ধ্যাবেলায় ভীষন সাজে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
ছেলে আমার লায়েক বড়, পাড়ার দাদার প্রিয়তম
বোমা পিস্তল মেশিন বলো অনেকটা তার খেলনা সম।
সম বচ্ছর ছটি মাসে,
বাঁধাই আছে কারাবাসে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
মেয়ে আমার ষোলোয় প'ল।
তিনটিবার পোয়াতি হ'ল
শেষের সেবার সেই 'দাদা' এসে
হাসপাতালে নিয়ে শেষে;
সাদা কাপড়ে ঢাকা দিয়ে, কাঁচ গাড়ীতে ফিরে আসে।
কেঁদে কেটে দাদা বলে,
যে গেছে সে গেছে চলে।
দশ হাজারে রফা হল অবশেষে।
রাতের বেলায় চাঁদ আসে,
আর দিনের বেলায় রোদ হাসে।
বউ এখন কমজোরি
আর ছেলের হ'ল জাবজ্জীবন।
বৃদ্ধ আমি একা বসে,
এত দিনে বুঝনু শেষে;
আকাশে ভরা মেঘ যে ভাসে।
মোর ঘরেতে আর কোনোদিন
চাঁদ না আসে, রোদ না হাসে।
20) """" সেলফি """"
ভোরবেলাতে মনের ভেতর উঠল জমে কবিতা
পূব গগনে ঠিক তখনি উঁকি দিচ্ছেন সবিতা।
বিট্টু তখন ছাদে উঠে বলে গলার হাঁক ছাড়ি
"কাছে আয় সবিতা তোকে নিয়ে সেলফি গড়ি।"
এমন সময়ে পাশের ছাদের কিশোরী সে ববিতা
নেচে নেচে গাইতে থাকে রবিবাবুর কবিতা।
বিট্টু যখন সেলফি তোলে,পশ্চাতে তার সবিতা
ফটোয় দেখে সূর্য্য কোথায় ? এ যে দেখি ববিতা

Wednesday, 14 November 2018

"""" মোহর কুঞ্জ """"

পটাইবাবু মানুষটি বড়ই শান্ত শিষ্ট । তুলোনায় পটাইবাবুর স্ত্রী সুরবালার মেজাজ কিঞ্চিত উর্দ্ধমুখি। তবে দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া না হলে সে জীবন বড়ই সাদা মাটা, আর এই আপ্তবাক্যটি পটাইবাবুরা দুজনে বিশেষ ভাবে মান্য করেন। অন্যান্য দিনের ন্যায় সেদিনও পটাইবাবুর সঙ্গে তার স্ত্রীর সক্কাল বেলাতেই একটু একটু করে কিছুটা অম্ল-মধুর শুরু হয়ে গেল। আসুন আমরা আমাদের কান দুটিকে পটাইবাবুর বাড়িতে পৌছে দেই।
সকালে মুড়ি আর ভেলিগুড় দিয়ে টিফিন সেরে বেশ আয়েশ করে খবরের কাগজটা নিয়ে পড়তে পড়তে পটাইবাবু তার স্ত্রী-কে বললেন, “গিন্নী আজ বিকেলে আমাদের ফেসবুকের বন্ধুদের একটা গ্রুপ মীট আছে আর তাতে আমাকে আজ যেতেই হবে.........।”
সুরবালা তখন তার বিখ্যাত শিল-নোড়ায় ঘটর ঘটর করে ধনে পাতা বাটছিলেন তাই পটাইবাবুর কথাটা ঠিক মত শুনতে না পেয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কি মী...ট ? না না ও সব খিট-মিটে যায়গায় যাওয়া চলবে না।”
“ না না খিট মিটে নয় গিন্নী, গ্রুপ মীট, ফেসবুকের গ্রুপ মীট...। দেখ গিন্নি ওখানে পাঁচজন ভালো ভালো লোক আসেন পাঁচ রকম ভালো ভালো বিষয় আশয় নিয়ে আলোচনা হয়...... গেলে একটু জ্ঞান গম্যি বাড়ে। তাছাড়া সারাজীবন তো সরকারের কেরানীগিরি আর তোমার খিদমতগিরি করেই জীবনটা কেটে গেল, তাই এই বয়সে এসে ভাবছি একটু বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা একটু জনসেবামূলক কাজ এইসব করেই সময় কাটাব। বুঝলে গিন্নী কথায় বলে, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ!” আসলে এই কথাটা উচ্চারন করার পরেও পটাইবাবু বুঝতে পারলেন না যে তিনি তার অজান্তে একটি চকোলেট বোমায় অগ্নি সংযোগ করলেন, এখন শুধু ফাটার অপেক্ষা।
“ও তার মানে তুমি বলতে চাইছো যে আমি তোমার অসৎ সঙ্গ, আর ওই মুখ পোড়া মেয়েগুলো তোমার সৎ সঙ্গ ? হায় হায় হায় বেঁচে থাকতে এ কথাও শুনতে হল আমাকে? ছি ছি এর চেয়ে আমার মরণ হ’ল না কেন?” রাগে কাঁপতে কাঁপতে সুরবালা তার ধনেপাতা বাটার গতি দুই-তিন গুন বাড়িয়ে দেন।
“ছি ছি তুমি কেন আমার অসৎ সঙ্গ হবে ? তুমিই হচ্ছ আমার একম অদ্বিতীয়ম, বউ, গিন্নী, সহধর্মিনী, অর্ধাঙ্গিনী, ইংরাজীতে যাকে বলে ‘বেটার-হাফ’ অর্থাৎ আমাদের দুজনের মধ্যে আমি শুধু গুড আর তুমিই হচ্ছ বেটার।... বুঝেছ গিন্নী।” একথা বলে পটাইবাবু তার ডান হাতটা বাড়িয়ে সুরবালার থুতনি-টা ধরে একটু আদর করতে যেতেই, তার হাতটিকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে সুরবালা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন...। “ওরে 'মুখ পোড়া মিনসে', মনে করো আমি কিছুই জানি না... কিছুই বুঝি না...... তাই না ? সেদিন ছেলে আমাকে সব দেখিয়েছে...। কম্প্যুটার খুলে আমাকে দেখিয়ে বলল, মা এই দেখ বাবার ফেরেন্ড লিস্ট......। হায় হায় হায়! আমি দেখে অবাক ...। একটাও পুরুষ মানুষ নেই গা। শুধু ধুমসো ধুমসো মেয়ে ছেলেতে ভর্তি ...। একজন আবার লিখেছে ...। "আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা আমি যে পথ চিনি না।" ছি ছি ছি, ছেলের সামনে আমি লজ্জায় মরে যাই...। এসো আজ তোমাকে আমি পথ চেনাচ্ছি !!! আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন !!! আজ থেকে তোমার ঐ কম্পুটার-এ বসা বন্ধ...... এই হক কথা বলে দিলাম... হ্যা...।” ঘটর ঘটর করতে করতে সুরবালা বলে চলেন।
পটাইবাবু, আমতা আমতা করে তার অর্ধাঙ্গিনীকে বোঝাবার চেষ্টা করেন, “গিন্নী, ওটা আমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা নয়, ওটা একটা বিখ্যাত গান। আর এই বয়সে আমার হাত আবার কে ধরতে যাবে ?” কিন্তু মনে মনে ভাবলেন .....( আহা তেমন যদি কাউকে পাওয়া যেত...... কি ভালই না হত? ) তবে মুখে বললেন, “গিন্নী, এখন ফেসবুকে একাউন্ট না থাকলে তুমি সেকেলে হয়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী সবার ফেসবুক একাউন্ট আছে, এমন কি প্রেসিডেন্ট ওবামার মেয়েরা পড়াশুনায় কতটা কি এগোল কিম্বা রানী এলিজাবেথ আজ কি দিয়ে ভাত খেলেন এ সবই তুমি ফেসবুক থেকে জানতে পারবে।”
“তা আর একজন যে লিখেছে ‘আমি তোমাকে চাই’ ঐ মেয়েছেলেটা কে ?” সুরবালা তার চোখ দুটি বড় বড় করে জানতে চান।
“কে আবার কাকে চাইবে ? ও কাউকে চায় না, ঐটাই ওর নাম, ফেসবুকে অনেকেই আসল নাম না দিয়ে, ওই ভাবে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজের নাম লেখে, যেমন ধর, ‘আমি তোমাকে চাই’, ‘কোথায় তোমাকে পাই’, ‘বৃষ্টি-ভেজা মন’ কিম্বা ‘ছাতার তলায় আমরা দুজন’ এই রকম আর কি ? তাহলে ঐ কথাই থাকলো, আজ বিকেলে আমি মোহরকুঞ্জে যাচ্ছি।” পটাইবাবু গিন্নীর মেজাজ সম্মন্ধে ষোলআনা নিশ্চিন্ত হয়ে বেশ অনায়াসে কথাটা বলে দেন সুরবালাকে। কিন্তু মুখের কথা আর হাতের ঢিল একবার বেরিয়ে গেলে আর তো ফেরানো যায় না। পটাইবাবু বুঝতে পারেননি যে তিনি মুখ ফসকে তার গিন্নীর হাতে একটি মারাত্মক বোমা তুলে দিলেন, এবং যথারীতি সেই বোমাটিও সঙ্গে সঙ্গে ফাটলো।
“কি......? কুঞ্জে যাবে? এত দু-র-র-র ? তার মানে একটি রাধিকেও যোগাড় হয়েছে দেখছি ? ও-ও-ও মা-আ-গো-ও-ও এ আমার কি সব্বোনাশ হ’ল গো......? তা সঙ্গে গোপিনীরাও আছেন নিশ্চয়। হায় হায় হায় ...। এই বুড়ো বয়সে এতো দূর ? আমি এখন আত্মীয় পরিজন সবার কাছে মুখ দেখাই কি করে গো ও ও ও ।... বলে কিনা কুঞ্জে যাবে? তাই দেখি আজকাল সারাদিন কুম্পুটারে ঘাড় গুজে থাকে কেন?” সুরবালার কান্নার সুর আরও উচ্চগ্রামে ওঠে।
“দুত্তোর...। আরে এ কুঞ্জ সে কুঞ্জ নয়...! এ কুঞ্জ হচ্ছে এই কলকাতা শহরের একটা পার্কের নাম...। বলি এই পৃথিবীতে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে কারও নাম শুনেছ ?” এতক্ষন কথাগুলো জোরে জোরে বলে পটাইবাবু এবার আস্তে আস্তে টিপ্পনি কাটেন ‘তা আর শুনবে কি করে? বাপের তো ছিলো কয়লার ব্যাবসা’।
“কি তুমি আমার বাপ তুললে...... ? তোমার এত বড় সাহস ?”... প্রায় লাফিয়ে ওঠেন সুরবালা।
“তোমার বাপকে কি আমি তুলতে পারি? আমার সে ক্ষমতাই নেই, জীবদ্দশায় তার ওজন ছিল চার মন, এখন স্বর্গে গিয়ে আদেঔ কিছু কমেছে কিনা কে জানে?” কথাগুলো মিন মিন করে আপন মনে বলেই গিন্নীকে শুনিয়ে জোরে জোরে বললেন, ”আচ্ছা তুমি মোহর বলে কারও নাম শুনেছো?”
“ ও ও ও তাকে এখনও ভোলনি দেখছি ! বিয়ের পর থেকেই তো দেখতাম, আমার পিসতুত বোন মোহরকে দেখলেই ‘ও আমার দুষ্টু শালী... মিষ্টি শালী’ বলে তার সঙ্গে তোমার কতই না ফস্টি নস্টি আর আদিখ্যেতা। আর ছুড়িটাও তেমনি, জামাইবাবু বলতে এক্কেবারে অজ্ঞান। ছি ছি তাকে এখনও ভোলোনি তুমি ? হায় হায় এই না হলে পুরুষ মানুষের চরিত্র... ?” হতাস গলায় বলেন সুরবালা।
“ আরে দুত্তোর, এ মোহর সে মোহর নয় ইনি হলেন একজন বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। সারাটা জীবন তো শুধু রান্নাঘর, শোয়ারঘর, আর আঁতুরঘর, এর বাইরে তো আর কিছু চিনলে না............ !”
পটাইবাবুর কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সদর দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ শুনে দরজাটা খুলতেই হই হই করে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করলেন পটাইবাবুর পারিবারিক বন্ধু সদা হাস্যময় চিরকুমার লাটাইবাবু।
“কি গো বৌঠান কি ব্যাপার ? আজ সকাল থেকে কি এমন হল যে দুজনেরই মুখে আষাঢ়ের ঘন মেঘমালা?” রসিক বন্ধুর উপস্থিতি দুজনকেই যেন নতুন করে ঝগড়ায় উস্কানি দিল।
“আর বলিস না রে, তোর বৌঠানের ধারনা আমাদের ঐসব গ্রুপ মীটগুলোতে শুধুই শ্রীকৃষ্ণের লীলা খেলা চলে। একটু বুঝিয়ে বল তো, ওখানে গিয়ে আমরা কি করি?” পটাইবাবুর কথা শেষ না হতেই সুরবালা ঝাঝিয়ে ওঠেন, “দেখ ঠাকুরপো, ঐ মুখ পোড়াকে সমর্থন করে একটাও কথা বলবে না বলে দিচ্ছি। ওর একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না, অবশ্য তোমরা দুজনেই তো চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।”
“কি যে বল বৌঠান? তুমি থাকতে আমি কখনও ঐ বাঁদর টাকে সমর্থন করি? ওর কথা ছেড়ে দাও, বরং ও যেখানে যাচ্ছে যেতে দাও, আর চল আমরাও দুজনে কোথাও একটু ঘুরে আসি, ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে চল ‘পেয়ার মে দিয়ানা’ সিনেমাটা দুজনে এই সুযোগে দেখে আসি।”
লাটাইবাবুর মুখে একথা শুনে একেবারে লাফিয়ে ওঠেন পটাইবাবু, “ কি? এত বড় কথা? তোর সাহস তো কম না ? আমি থাকতে তুই আমার বউকে নিয়ে যাবি সিনেমা দেখতে?”
“তা তুই যদি কুঞ্জে গিয়ে অন্যের বউদের সঙ্গে লীলে খেলা করতে পারিস আর আমি একটু তোর বউকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতে পারব না?” এ কথা বলে লাটাইবাবু তার বন্ধুর কাছে গিয়ে কি যেন ফিস ফিস করে বললেন, আর বাইরে ভাবখানা দেখালেন যেন, বৌঠান তো ঠিকই বলেছেন।
এদিকে তার উত্তরে পটাইবাবুও সবাইকে শুনিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ... “যা যা তোরা যেখানে খুশি যা ... আজ আমি কুঞ্জে যাবই কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না”।
আর এটাতেই মন্ত্রের মত কাজ হ’ল। প্রতি উত্তরে সুরবালাও দ্বিগুন গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, “ঠিক আছে ঠাকুরপো... চলতো, তাহলে আমিও সত্যি সত্যি আজ তোমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবই।"
সকালের ঝগড়ার মধ্য দিয়ে যা যা ঠিক করা হয়েছিল সেই অনুযায়ী বিকেলের কাজগুলো হ’ল। পটাইবাবু বেলা তিনটে নাগাদই মোহর কুঞ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছেন। আর বেলা চারটে নাগাদ সেজে গুজে লাটাইবাবু এসে হাজির। মধ্য পঞ্চাশের সুরবালাকে পটাইবাবু এর আগে অনেকবার ফেসবুকের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে যে চাইলেও তিনিই কখনো কোথাও যেতেই চাননি, কিন্তু সেদিন পটাইবাবুর ফ্রেন্ডলিস্ট দেখার পর থেকে তার মাথার ঠিক নেই...। ছি ছি এই বুড়ো বয়সে এসে এসব কি? আজ একটা হেস্ত নেস্ত করে তবে ছাড়বেন তিনি।
তাই অনেক সঙ্কোচ অনেক লজ্জা সঙ্গে নিয়েও বিবাহিত জীবনে প্রথম একজন পরপুরুষের সঙ্গে বাইরে বেরলেন তিনি। মেট্রোতে ময়দান স্টেশনে নেমে লাটাইবাবু বললেন, “চলো বৌঠান এই ফাঁকা ময়দানে দুজনে বসে একটু সুখ দুঃখের গল্প করি।” ঠিক সেই মুহুর্তে সুরবালার নিজেকে খুব আপরাধী বলে মনে হতে লাগল। লাটাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “না, গো আমার ভালো লাগছে না, চল আমারা বাড়ি ফিরে যাই।” "সে কী ? তাহলে ঐ বাঁদরটার প্রতি প্রতিশোধ নেবে না তুমি?" লাটাইবাবু বলে ওঠেন। "না না তুমি বাড়ি চল ঠাকুরপো" মিনতি করে ওঠেন সুরবালা। তখন লাটাইবাবু তার হাতের আসল তাসটি বার করলেন। সুরবালাকে একটু দূরে একটা আলো ঝল মলে জায়গা দেখিয়ে বললেন, “ঐ যে সাজানো গোছানো, আলো ঝলমলে পার্কটা দেখছো, ওটাই সেই মোহর কুঞ্জ, চল তো বাঁদরটা ওখানে কি করছে একবার দেখে আসি।”
এই কথা শুনেই আবার সুরবালা যেন তার আসল তেজ ফিরে পেলেন, “ওহ! তাই! চল তো, আজ মুখপোড়াটাকে একেবারে হাতে নাতে ধরবো।” দুজনে ভিতরে প্রবেশ করে কিছুটা এগিয়ে এক যায়গায় পৌছিয়েই অবাক হয়ে যায় সুরবালা। কি সুন্দর সাজানো গোছানো গাছ গাছালি ও ফুলে ফুলে ভরা একটা পার্ক। রঙ্গিন জলের ফোয়ারা, কত নারী-পুরুষ এবং ছেলে-মেয়েরা ঘোরা ফেরা করছে, কিম্বা বসে বসে গল্প করছে। কলকাতায় যে একটা এত সুন্দর যায়গা আছে, লাটাইবাবু আজ জোর করে না নিয়ে এলে তার জানাই হত না, সত্যি প্রেম করবার উপযুক্ত যায়গাই বটে, ইশ্ তারমানে এতদিন তাকে ফাঁকি দিয়ে পটাইবাবু এখানে এসে এইসব করে বেরাচ্ছে ছি ছি ছি।
হটাৎ সুরবালার নজরে পড়ে একটা জায়গায় একটা উঁচু বেদীর উপর প্রায় পঁচিশ ত্রিশ জন পনের ষোল বছরের ছেলে মেয়ে, আর তাদেরকে ঘিরে আট দশ জন বয়স্ক মহিলা ও পুরুষের মধ্যমনি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন পটাইবাবু। পিছনে একটা ব্যানারে লেখা “”ফেসবুক পথ-শিশু গ্রুপ””। ততক্ষনে উদ্বোধনী সঙ্গীত শুরু হয়ে গেছে। উদ্বোধনী সঙ্গীতের পরে পরেই এক ভদ্রমহিলা ঘোষনা করলেন “এই কলকাতা শহরে কয়েক লক্ষ লোক এক শোচনীয় পরিবেশে ফুটপাথে বাস করতে বাধ্য হয়, কিন্তু ঐ পরিবেশেও কত পদ্মফুল নীরবে ফোটে আমরা তার কতটুকুই খবর পাই? আজ আমাদের এই ফেসবুক পথশিশু গ্রুপের পক্ষ থেকে এমনই ত্রিশজনকে সংবর্ধনা জানিয়ে আমরা ধন্য হতে চাই। এইসব ছেলে মেয়েরা ফুটপাথের প্রতিকুল পরিবেশে বাস করেও এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনীতে পাশ করেছে। এবার এদের প্রত্যেকের হাতে পুষ্প স্তবক, পুস্তক-সামগ্রী ও একটি করে মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে সংবর্ধনা জানাবেন, আমাদের গ্রুপের প্রবীন সদস্য শ্রী পটাই চন্দ্র খাসনবীশ। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে আজকের এই পুরষ্কারের যাবতীয় খরচ বহন করেছেন আমাদের গ্রুপের গর্ব পটাইবাবু। লাটাইবাবু লক্ষ করলেন সুরবালার চোখদুটি কেমন যেন ছল ছল করছে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছনে শুধু পটাইবাবুর দিকে। ছোট্ট অনুষ্ঠান, আধ ঘন্টার মধ্যে শেষ হয়ে গেল। দুই বন্ধুর পূর্ব পরিকল্পনা মত পটাইবাবুও দূর থেকে সবই লক্ষ করেছেন কিন্তু যেন কিছুই দেখতে পাননি এমন ভাব দেখিয়ে সুরবালার পাশ দিয়ে যাবার সময়ে হটাৎ সুরবালা কে দেখে অবাক হওয়ার ভান করে, জিজ্ঞেস করলেন "আরে, তুমি এখানে কি করে এলে ?", সুরবালা জীবনে এই প্রথম প্রকাশ্যে পটাইবাবুকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে বলে উঠলেন, “শুনেছি ছোটবেলায় তুমি খুব ভাল ফুটবল খেলতে, কিন্তু তুমি যে এত বড় অভিনেতা, সেটা জানতাম না গো।”

Tuesday, 13 November 2018

"""" গঙ্গাপ্রসাদ """"

বাকুড়া জেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম পলাশ ডাঙ্গা, আর সেই গ্রামের ছোট্ট একটি ছেলে গঙ্গাপ্রসাদ মুখার্জি। দামোদরের একদিকে বাকুড়ার পলাশডাঙ্গা আর অপর প্রান্তে বধর্মান জেলার কাঁকসা। গঙ্গা বড়দের কাছে শুনেছে দামদর নদ পার হয়ে ওপারে গিয়ে ঐ কাঁকসা থেকে রেল গাড়ি চেপেই যাওয়া যায় কলকাতায়। তখনও বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন চালু হয়নি। বাষ্প ওড়াতে ওড়াতে সে ট্রেন যন্ত্রের সাহায্যে ছুটে চলে। সেটা বিংশ শতাব্দীর মাঝা মাঝি। তখন ভারত সবে স্বাধীন হয়েছে।
গঙ্গাপ্রসাদের গ্রামের যারা কলকাতায় থাকে তাদের মুখে সে শুনেছে যে কলকাতায় নাকি হাওয়ায় টাকা ওড়ে শুধু ধরে নিতে জানতে হয়।
সেই কলকাতায় যাওয়ার জন্য গঙ্গা প্রসাদের যেন আর তর সয় না । গঙ্গা প্রসাদ তার সমবয়সি বন্ধুদের বলে, “জানিস একদিন আমি ওই নদ পার হয়ে কলাকাতায় চলে যাব। তারপর অনেক অনেক টাকা রোজগার করব।” তবে তার এই কথায় সমবয়সি ইয়ার বন্ধুরা কেউ তেমন উৎসাহ দেয় না। বরং সবাই তাকে উপহাস আর বিদ্রূপের করে; তবে কথাটি যখন তার খেলার সাথী দশ বছর বয়সের সুলতাকে বলল, তখন সুলতা বলল, “সেই ভা্‌ তবে আমাকে কলকাতায় নিয়ে যাবে তো?” গঙ্গা গম্ভীর মুখে বলে, “দূর বোকা কলকাতায় মেয়েরা যায় না সেখানে শুধু পুরুষ মানুষরা যায়।” বারো বছর বয়সের গঙ্গা-র মুখে পুরুষ মানুষ শব্দটা শুনে সুলতারও কেমন যেন হাসি পেল। সুলতার মা তার বাবা-কে বলে, ‘পুরুষ মানুষ সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে লজ্জা করে না’? বাইরে বেরিয়ে কিছু কাজ কর্ম তো করলে পার? কিন্তু সুলতার দাদাকে তো কোনদিন ওর মা পুরুষ মানুষ বলে না ? তাকে বলে ‘ছেলেরা সংসারে কত কাজ করে আর তুই সারাদিন শুধু ঘুরে ঘুরে বেরাস’?
সেই গঙ্গা একদিন আরো বড় হল, গ্রামের পাঠশালার পাঠ শেষ করে বাবার কাছে কিম্বা খুড়োর কাছে তাদের পৈত্রিক চাষ বাস সংক্রান্ত কাজকর্ম শিখে নিলো এখন সে ষোল বছরের তরতাজা কিশোর। কিন্তু এখনও সে মাথায় সযতনে দুটি জিনিস পোষন করে চলেছে। এক নম্বর হচ্ছে যত দিন যাচ্ছে সুলতা যেন তার মাথায় আরও বেশী করে চেপে বসছে। এমন কোনদিন নেই ওর মাথায় সুলতার মুখ-টা ভেসে ওঠে না। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে কলকাতা যাওয়ার সেই সুপ্ত বাসনা, এবং দিন দিন দুটি বাসনাই যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ইতিমধ্যে সুলতার বয়স চোদ্দ বছর হল, সেই যুগে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঐ বয়সের পরেও কুমারী রাখা আর সমাজে একঘরে হয়ে যাওয়া প্রায় সমার্থক। শেষে একদিন গঙ্গা ঠিক করেই ফেলল, আপাতত সে কলকাতাতেই চলে যাবে এবং কিছু পয়সা উপার্জ্জন করে গ্রামে ফিরে আসবে। গঙ্গা প্রভুত অর্থের মালিক হলে সুলতা নিশ্চই সব কিছু মেনে নেবে। সুলতারাও ব্রাহ্মণ, দেখতে ভাল ওর বাবার গ্রামে বেশ প্রতিপত্তি আছে তাই গঙ্গার আশা দুই পরিবারের তরফ থেকে কোন রকম বাধা আসবে না। শুধু একটা বছর কোনরকমে সুলতার বিয়েটা আটকে রাখা।
একদিন গঙ্গার মনের কথা সুলতাকে বলতেই, সুলতা চোখের জলে তাকে একটাই উত্তর দিল..., “তুমি আমাকে কেনার জন্য কত টাকা দেবে গঙ্গা-দা ?” গঙ্গা উত্তেজিত হয়ে বলে, “ছি! সুলতা, এ কথা তুই কি করে বললি ? তোকে কি আমি টাকা দিয়ে কিনব বলেছি? তুই কি জানিস কোন মেয়েরা টাকার বিনিময়ে বিক্রী হয় ?” সুলতা তার উত্তরে খুব শান্ত ভাবেই বলল, “বিলক্ষন জানি, আর জানি বলেই তো আমার মনে এত শঙ্কা। তোমরা ছেলেরা প্রেম, ভালবাসার সঙ্গে টাকাকে বড্ড গুলিয়ে ফেলো। তোমাদের কাছে প্রেম ভালবাসা মানে শুধুই টাকা আর শরীর।”
একথা শুনে আরও উত্তেজিত হয়ে গঙ্গা বলল, “ছি সুলতা ছি ! তোর এত অবনতি? তুই কি বলতে চাস যে আমি তোর শরীরটা একদিন পাব সেই আসায় প্রতিদিন তোর কাছে আসি?” হটাত উত্তেজিত গঙ্গা কাপতে কাপতে বলল, “একমাত্র বেবুশ্যে মেয়েরাই এই ধরনের কথা বলে, তা এই ব্যবসা তুই কতদিন হল শুরু করেছিস?” কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যাবার পরই গঙ্গাপ্রসাদ বুঝতে পারল কি মারাত্মক কথা ওর মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু তার উত্তরে সুলতা এতটুকুও উত্তেজিত না হয়ে বলল, “এখনও শুরু করিনি তবে যদি কোনদিন শুরু করি , জানবে সেদিন তুমিই হবে আমার প্রথম খদ্দের।”
সারা রাত এক সুতীব্র অনুশোচনা যেন গঙ্গা প্রসাদের শরীর ও মনকে জ্বালিয়ে দিতে থাকল। সারা রাত্রি এক ফোটা ঘুম হল না। অন্ধকার থাকতেই ভোর বেলায় সবার অলক্ষে গঙ্গা কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তখন ভারত সবে স্বাধীন হয়েছে, সীমিত ক্ষমতার মধ্যেই সরকার দেশ গঠনের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। তার উপর ওপার বাংলা থেকে এসেছে লক্ষ লক্ষ শরনার্থী, তাদের পুনর্বাসন দরকার। বিভিন্ন উদবাস্তু ক্যাম্প গুলতেও প্রচুর কাজ হচ্ছে। এক কথায় ঠিকাদার দের তখন পোয়াবারো। গঙ্গা তেমনই একটি ঠিকাদার সংস্থায় সামান্য বেতনের চাকরিতে ঢুকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বেশ কয়েক বছর চাকুরিতে রত থেকে বেশ কিছু অর্থের মালিক হল।
মনের জোরে ইচ্ছে করেই এত দিন গ্রামে ফেরেনি। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেও ভাল ছিল না, গ্রামের তার পিতা মাতা এবং গ্রামের অন্যান্য সকলে গঙ্গা চিরকালের জন্য নিরুদ্দেশ ধরে নিয়েই তার প্রত্যাবর্তের আশা ত্যাগ করে দেয়। শুধু সুলতা বিবাহের পরেও আজও প্রতিদিন গঙ্গা নাম জপ করে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে চলেছে। তবে কলকাতা শহরে সে নিজেকে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করে প্রায় পাঁচ বছর পরে প্রথম বার বাকুড়ায় নিজের গ্রামে ফিরল এবং আত্মীয় পরিজন দের সঙ্গে সাক্ষাত করে সুলতার বিবাহের খবর শুনে কিছুদিনের মধ্যেই আবার কলকাতায় ফিরে এল। এবার যেন আরও বেশী করে কাজকর্মে ঝাপিয়ে পড়ল এবং স্বীয় ক্ষমতায় অল্পদিনে নিজেই একটি ঐরূপ একটি ঠিকাদরি সংস্থা খুলে ফেলল। কিছুদিনের মধ্যেই প্রচুর টাকা উপার্জ্জন করে সে কলকাতা উচ্চবিত্ত সমাজে তার স্থান পাকা করে নিল। কলকাতা শহরে তার তখন তিনটে বাড়ি দুটি গাড়ি।
এই ভাবে চলতে চলতে একদিন মধ্য চল্লিশের গঙ্গা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ করল তার মাথার চুলে পাক ধরেছে । চোখের কোনে শরীরের উপর অত্যাচারের লক্ষণ স্পষ্ট। অত্যাচার বলতে শুধু কাজ আর কাজ, আর সন্ধ্যায় ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে বসে একটু মদ্যপান। পলাশ ডাঙ্গার সেই কিশোর গঙ্গাপ্রসাদ আজ অনেক পরিণত। সারাদিন পরিশ্রম করে কোম্পানীর সকল কাজ এখন নিজে একাই দেখাশোনা করে। সেই সুবাদে বড় সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা করে ইংরাজীটাও এখন মোটামুটি ভালই শিখেছে।
সারাদিন খাটা খাটনির পর অবিবাহিত গঙ্গা ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপান করতে বসে, তবে ইদানিং সে একটা জিনিস লক্ষ করেছে, মনে মনে সে যেন কারও সঙ্গ কামনা করে। তার মনে এখনও কি সুলতার সেই নিষ্পাপ মুখটাই উকি দেয় ? বন্ধুদের কাছে এ কথা বলতেই তারা উপদেশ দিল...... মনের আর দোষ কি? এই বয়সে শরীর ও মন দুই ই তো সঙ্গ কামনা করবে...... আর সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও গঙ্গা যেন সবাইকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারে না। এ সঙ্গ ঠিক সেই সঙ্গ নয়। এটা ঠিক স্ত্রীর সঙ্গ নয়। কোন নারী সঙ্গ নয়। এ যেন সারাদিন খাটা খাটনির পর বাড়ির কোন আপনজনের সঙ্গ। যা থেকে গঙ্গা আজ দীঘর্দিন বঞ্চিত।
তবু বন্ধুরা তাকে বোঝায় সারাদিন খাটা খাটনির পর সন্ধ্যাবেলায় একটু নাচ গানের আসরে গেলে মনটা দুদিনে অনেক হাল্কা হয়ে যাবে। কথায় বলে যেখানে টাকা ওড়ে, সেখানেই সুন্দরীরা ঘোরে। কিছুদিনের মধ্যেই গঙ্গার এক ঘনিষ্ট বন্ধু কানাই খবর দিল বউবাজারে একজন বাঙ্গালী বাইজী এসেছে, তার যেমন রূপ তেমন-ই গানের গলা। বন্ধুদের পরামর্শে পরদিন সদলবলে গঙ্গা সেখানে গিয়ে হাজির। অত্যন্ত সুদৃশ্য এবং সুসজ্জিত একটি ঘরে গঙ্গা সবান্ধব বসল। গঙ্গার একটু অস্বস্তি হচ্ছে। এই প্রথম সে এই রকম একটা পরিবেশে এসেছে। সঙ্গীতের বাজনদাররা যে যার নিজের নিজের জায়গায় এসে বসল। সুসজ্জিত রেকাবে ও পানপাত্রে অতিথিদের খাদ্য এবং পানীও পরিবেশন করা হল। আর তার সামান্য পরেই এক পরমা সুন্দরী তার দুই সখীকে নিয়ে ওই ঘরে প্রবেশ করল। অষ্টাদশী পরমা সুন্দরী মেয়েটি ঠিক গঙ্গার মুখো-মুখি বসতেই গঙ্গার নজর গিয়ে পড়ল তার মুখের উপর। সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার সমস্ত শরীরে যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত হয়ে গেল। সেই মুখ, সেই চোখ, এমনকি গলার স্বরও ঠিক তার মত। কিন্তু তা কি করে সম্ভব? এর বয়স খুব বেশী হলে আঠারো-কুড়ি বছর হবে আর সে তো......। গঙ্গা কৌতুহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “মা তোমার নাম কি?” বন্ধুরা অবাক... একজন বাইজিকে মা বলে সম্বোধন ? উত্তরে বাইজিটি বলল, “হুজুর বোধ হয় এই লাইনে প্রথম, হুজুরের জানা নেই যে বাইজীদের আসল নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করতে নেই?” গঙ্গা সবাইকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল, “আমার শরীর খারাপ লাগছে আমি এখন-ই বাড়ি যাবো।” বাড়িতে ফিরে গঙ্গা তার চব্বিশ ঘন্টার কাজের লোক কানাই-কে বলল, “যে করেই হোক, যত টাকা লাগে লাগুক ... মেয়েটির আসল পরিচয় খুজে বের করতেই হবে। যতদিন না ওর আসল পরিচয় জানা যাচ্ছে ততদিন ও কোন কাজ করবে না। মেয়েটি বাইজী হিসেবে প্রতিদিন যে টাকা রোজগার করে সেটা ওকে আমি-ই দেব।
দুইদিনের মধ্যেই কানাই খবর নিয়ে এল, মেয়েটির আসল নাম বিজয়া, বাবার নাম যাদব ভট্টাচায্য বাড়ি বাকুরার সোনামুখি গ্রামে। বাবাটি বড়ই চরিত্রহীন স্ত্রী কন্যার প্রতি তার কোন নজর নেই। গঙ্গা উত্তেজনায় কাপতে কাপতে চিৎকার করতে থাকে ...। “নিকুচি করেছে ওর বাবার নাম ঠিকানায়...। ওর মায়ের নাম কি? মামার বাড়ি কোথায় সেই খবর নিয়ে এস।” কানাই বলল, “আমি তাও এনেছি, ওর মামার বাড়ি পলাশডাঙ্গা, আর মা সুলতা সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন।” একথা শুনেই গঙ্গা পাগলের মত হাত পা ছুড়তে ছুড়তে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বাড়ির যত পরিচারক, পরিচারিকারা তঠস্থ হয়ে এ ওর মুখ চাওয়া চায়ি করতে লাগল।
পদিন সক্কালে উঠে গঙ্গা একাই দৌড়ে গেল সেই বাইজী বাড়িতে। উদভ্রান্তের মত ছোটা ছুটি করে খুজে বের করল বাড়ির মালকীন মাসীকে। বলল, “কোথায় তোমার বিজয়া? আমার এখন-ই ওকে চাই।” মালকীন ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতে এক টাকা দু টাকা নয় দশ হাজার টাকা গুজে দিয়ে বলল, “বিজয়াকে এখন-ই আমার চাই।” মাসী জীবনে একশো টাকার বেশী কখনো দেখেনি। সেই যুগে দশ হাজার টাকায় একটা ছোটখাটো দোতলা বাড়ি হয়ে যেত। এত গুলো টাকা হাতে পেয়ে কেমন যেন ভয় পেয়ে গিয়ে তখনই সাজিয়ে গুজিয়ে বিজয়াকে গঙ্গার হাতে তুলে দিল। গঙ্গা বিজয়াকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, “কিরে আমাকে চিনতে পারিসনি তো? আমি গঙ্গা মুখুজ্জে, পলাশডাঙ্গার গঙ্গা। আমার একার সংসারে এত সম্পত্তি কে দেখবে বলতো? চল তাই তোকে নিতে এলাম...পারবি না তোর এই বুড়ো ছেলেটাকে শাসন করে সংসারের হাল ধরতে ? আর এই সারাদিন খাটা খাটনি, আর মদ মাংস এসব আর ভাল লাগে না রে ? চল আমি তোকে নিয়ে যেতে গাড়ি নিয়ে এসেছি। তারাতারি চল আমরা মা আর বেটায় মিলে নতুন করে সংসারটা সুরু করি।” বিজয়া তার মায়ের কাছে অনেকবার গঙ্গা মুখুজ্জের নাম শুনেছে... তাই গঙ্গা-কে চিনে নিতে তার অসুবিধা হল না। সে তার বুড়ো ছেলের সঙ্গে গাড়িতে গিয়ে উঠল। ওদিকে এই প্রথম কুঠির মানুষরা তাদের দোর্দন্ড প্রতাপশালী মাসীর চখে জল দেখলো।

"""" গাড়ি কিনলেন পটাইবাবু """"

পটাইবাবুর বাঙ্কে একটিই মাত্র একাউন্ট। সেটা না থাকলেই নয় কারণ ওই একাউন্টেই তার অফিসের বেতনের টাকা জমা হয়, এবং মাসের শেষে তার পাশবুকে নীট ব্যালান্স বড়জোর জমার ঘরে বিশ-পঁচিশ হাজার টাকা। দুনিয়ার আর কোথাও আর কোন বাঙ্কেই তার কোন একাউন্ট নেই। তবুও ভারতের সমস্ত সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলি কি করে যে পটাইবাবুর মত অতি সাধারণ ব্যক্তিদের নাম ধাম পেয়ে যায় কে জানে? দিন রাত্রি তারা এই বিশ হাজার টাকার মালিককে ফোন করে করে পাগল করে দেয়। তারা পটাইবাবুকে গাড়ি কেনার জন্য ঋন দিতে প্রস্তুত। বাড়ি করার জন্য ঋন দিতে তৈরী, এমনকি তার বিবাহিত মেয়ের বিয়ের জন্যও ঋন দিতে ব্যস্ত। এই ভারতবর্ষে তারা বোধ হয় কাউকে গরীব থাকতে দেবে না।
সেদিন পটাইবাবু মন দিয়ে অফিসে কাজ করছিলেন এমন সময়ে তার মুঠো ফোনটি বেজে উঠল, “হেললো মে আই টক টু মিস্টার পটাই……” বার বার এই একই প্রশ্ন শুনে শুনে ক্লান্ত পটাইবাবু সেদিন নিতান্ত বিরক্ত হয়েই ও প্রান্তের বক্তাকে তার বক্তব্য শেষ করতে না দিয়েই বলে দিলেন, “ আ হা হা হা ভেরি সরি পটাইবাবু তো জাস্ট গতকাল সন্ধ্যায় মারা গেছেন।”
তবু ভবি ভোলবার নয়। ও প্রান্ত থেকে আবার ভেসে এলো। “ওহ, ভেরি সরি, ভেরি সরি, স্যার তবু কই বাত নেহি, আপনি কাইন্ডলি ওনার বাড়ির এক্সাক্ট ল্যান্ড মার্কটা একটু দেবেন, আমরা ওনার মিসেসের সঙ্গে একবার দেখা করব, আসলে আমরা একটা নতুন লোন স্কিম লঞ্চ করেছি যেটা শ্রাদ্ধের ক্ষেত্রে খুব কাজে দেবে...এই লোনটা হচ্ছে কোন ব্যক্তি যত বছর বয়সে মারা গেছেন তত হাজার টাকা তক্ষুনি একেবারে স্পট লোন হিসেবে দিয়ে দেয়া হবে। আমাদের লোকেরাই প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র নিয়ে ওনাকে দিয়ে সই-সাবুদ করিয়ে নেবে। আর ঘাটের দিন গঙ্গার ঘাটে গিয়ে ২০%, শ্রাদ্ধের দিন মৃতব্যক্তির বাড়িতে ৩০% আর নিয়ম ভঙ্গের দিন নির্দ্দিষ্ট অনুষ্ঠান বাড়িতে বাকি ৫০% লোন একেবারে নগদে ওনার স্ত্রীর হাতে দেয়া হবে। প্রয়োজনে আমরা নাপিত, ব্রাহ্মণ এবং ক্যাটারার ইত্যাদির ব্যবস্থাও করে দেব, তার জন্য আলাদা কোন চার্জও দিতে হবে না। আমাদের এই স্কিমের ই এম আই ও খুব সহজ। ওনার মিসেস যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন আস্তে আস্তে শোধ দিতে পারবেন। এমনকি ওনার স্ত্রীর মৃত্যুর পরে আর শোধ না দিলেও চলবে সে ক্ষেত্রে লোনটা আপনা থেকেই পটাইবাবুর স্ত্রীর শ্রাদ্ধের লোন এডভ্যান্স হিসেবে এডজাস্ট করে টাকাটা মরেটরিয়াম লোন করে দেয়া হবে। তাই এই লোনের ক্ষেত্রে পটাইবাবুর স্ত্রী যত তারাতারি মারা যান ততই মঙ্গল।”
এই কথা শোনার পর পটাইবাবুর সারা শরীর রাগে রি রি করতে লাগলো এ ব্যাটাদের আমাকে মেরে আমার শ্রাদ্ধ করেও শান্তি নেই আবার আমার জলজ্যান্ত বৌটাকেও পর্যন্ত মেরে ফেলতে চাইছে। তবে এত কথা শোনার পরও পটাইবাবুর মনটা কিঞ্চিত বিগলিত হ’ল, মনে মনে ভাবলেন অন্তত ব্যাঙ্কের নামটা জেনে রাখা ভাল। প্রয়োজনে তার মৃত্যুর পর তার অকর্মন্য ছেলে অন্তত এই ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে তার শ্রাদ্ধটা একটু ধুমধাম করে করতে পারবে। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন “আজ্ঞে আপনার নামটা একটু বলবেন? আর আপনাদের ব্যাঙ্কের নামটা কি যেন বললেন?” ও প্রান্ত থেকে টেলিফোনে জবাব এলো "আজ্ঞে আমার নাম 'ঢোল গবিন্দ গড়গড়ি' আর আমাদের ব্যাঙ্কের নাম R K G P Bank."
“দেখুন আমি ICICI, IDBI, HDFC, বাঙ্কের নাম শুনেছি কিন্তু R K G P Bank? পুরো কথাটা কি বলুন তো?” পটাইবাবু শুধালেন।
আজ্ঞে “ঋনং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত ব্যাঙ্ক”, ও প্রান্ত থেকে উত্তর ভেসে এল। একথা শুনে পটাইবাবু এমন চমকে উঠলেন যে তার হাত থেকে মূঠো ফোনটা ছিটকে পড়ে গেল, তার মাথাটাও কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগল। পটাইবাবু চক্ষু বুজে এমন ভাবে ধপাস করে চেয়ার-এ বসে পড়লেন যে তার সহ কর্মীরা সবাই দৌড়ে এসে তার চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে বাতাস করতে লাগলেন এবং কিছুক্ষন পরে পটাইবাবুর জ্ঞান ফিরে এল।
আর পাঁচটা দিনের মত এদিনও অফিস থেকে ফেরার পথে বাসে পটাইবাবু বসার যায়গা পাননি। সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত পটাইবাবু কাধে ব্যাগ নিয়ে দুহাত তুলে রড ধরে যেতে যেতে জানালা দিয়ে দেখেন তার বাসের পাশ দিয়ে হুস হুস করে ঝা চক চকে রঙ বে রঙের গাড়িগুলো ছুটে যাচ্ছে। পটাইবাবু চোখ বুজে ভাবতে থাকেন তাদের ছোটবেলায় শুধু বড়লোকেদের বাড়িতে গাড়ি থাকতো। আর তার সবই এম্বাসাডর এবং মাত্র সামান্য কিছু ছোট ফিয়াট গাড়ি। অল্প কিছু বনেদী বড় লোকেদের বাড়িতে অবশ্য আরও পুরানো দিনের মরিশ কিম্বা অস্টিন গাড়ি দেখা যেত। কিন্তু গাড়িগুলির স্থাপত্যে এত সৌন্দর্য ছিল না। আর দুনিয়ার সকল প্রাইভেট গাড়ির একটাই রঙ ছিল, সেটা হল কালো। পরে অবশ্য কিছু কিছু এম্বাসাডর গাড়ি সাদা রঙের দেখা যেতে লাগলো। কিন্তু এখন গাড়িগুলি স্থাপত্যে কত সুন্দর দেখতে। আর কি সুন্দর সুন্দর সব লাল নীল সবুজ হলুদ বিভিন্ন রং-এর বৈচিত্র। হটাৎ একটা ঝাকানিতে পটাইবাবুর তন্দ্রা ভাবটা কেটে যায়। আজ বাসটা যেন বড্ড আস্তে আস্তে যাচ্ছে। পাশ দিয়ে কি সুন্দর সব প্রাইভেট গাড়িগুলি চলে যাচ্ছে। ঝক ঝকে কাঁচের জানালার আড়ালে এই শহরের আমজনতার প্রতি একটা অবজ্ঞার ভাব নিয়ে চলন্ত ঠান্ডা ঘরের আরাম কেদারায় বসে আছেন যেন এক একজন স্বপ্নপুরীর রাজপুত্তুর রাজকন্যেরা।
তখন পটাইবাবুর ব্যাঙ্কের সেই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি মনে মনে হিসেব করতে লাগলেন, তিনি কেটেকুটে হাতে যা পান তার থেকে মাসে চার পাচ হাজার টাকা জমে যায়। আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, তার যেহেতু মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেও কলেজ পাশ করে গেছে তাই প্রভিডেন্ট ফান্ডে প্রতিমাসের তার প্রদত্ত টাকার পরিমানটা যদি কিছুটা কমিয়ে দেয়া যায়! আর সেই টাকায় মাসে মাসে গাড়ির ই এম আই টা বোধ হয়......। প্রচন্ড গরমে ঘামতে ঘামতে কাধে ব্যাগ, দুই হাত তুলে পটাই বাবু স্বপ্ন দেখতে থাকেন সামনের মাস থেকে তিনি ঐরকম একটি কাঁচের জানালায় আড়ালে এক চলন্ত ঠান্ডা ঘরে বসে অফিস যাচ্ছেন। আর ছুটির দিন গুলোতে গিন্নী সুরবালাকে পাশে বসিয়ে আজ ডায়মন্ড হারবার নয় তো কাল টাকি। ইস ভাবতেই তার সারা শরীরে শিহরণ জাগছে। হটাত কন্ডাক্টরের চিৎকারে তার হুশ ফিরলো।
বাড়ি ফিরে এক কথা দু কথায় গিন্নী সুরবালাকে সে কথা বলতেই সুরবালা তার চার মণ ওজনের দেহটাকে দুলিয়ে চিৎকার করে বললেন, “সে কথা আর আমাকে বলতে হবেনা। আমি কদিন ধরেই লক্ষ করেছি তোমার কথা বার্তা যেন কেমন কেমন! তোমার মতিগতি আমার ভালো ঠেকছে না......। নিশ্চই পেটের গ্যাসটা আবার মাথায় চড়েছে, হ্যাগো নিশ্চই বাইরে উলটো পালটা কিছু খেয়েছো। যে লোক বছরে এক বারের যায়গায় দুবার ঈলিশ মাছ কিনতে গেলে সাত বার ভাবে সে কিনবে গাড়ি! সেকথা যদি বলতে হয় তাহলে দেখ পাশের বাড়ির সান্যালবাবুকে। শুধু গাড়ি কেনাই নয়; প্রত্যেক মাসে বউকে নিয়ে আজ দীঘা তো কাল দার্জিলিং ঘুরে আসছে।”
একে বলে একেবারে সরাসরি পুরুষ মানুষের আঁতে ঘা। তাই যখন পটাইবাবু কিছুতেই তার ত্রিশ বছরের সহ ধর্মিনীকে বোঝাতে সক্ষম হলেন না যে তিনি সত্যি সত্যি একটি গাড়ি কেনার কথা ভাবছেন, আর ঠিক সেই সময়ে তার স্ত্রী পাশের বাড়ির ঘুষখোর ভদ্রলোকের সঙ্গে তার তুলনা করায় তার পৌরষত্ব দপ করে জ্বলে উঠল।
পরদিন পটাইবাবু অফিসে গিয়ে প্রথমেই ঋণং কৃত্বা বাঙ্কের ঐ নম্বরে ফোন করতেই মিঃ গড়গড়ি এক গাল হেসে বললেন, “গুড মর্নিং স্যার, আমি জানি আপনি আমাকে রিং ব্যাক করবেন স্যার। আমি এক্ষুনি সব কাগজ পত্র দিয়ে আমার লোককে আপনার অফিসে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমার নাম গড়গড়ি, ধরেই নিন গাড়ি আপনি সামনের সপ্তাতেই পেয়ে যাচ্ছেন, আর তারপর নতুন গাড়িতে চেপে গড়গড়িয়ে বেরিয়ে পরুন স্যার।”
বাড়ি ফিরেই গাড়ির সকল কাগজ পত্র দেখিয়ে পটাইবাবু তার সহধর্মিনীকে আগের দিনের অপমানের জবাব দিলেন। কি সুন্দর সব রঙ্গীন গাড়ির ছবি! তদোধিক সুন্দর সেইসব গাড়ির সওয়ারিরা। যে সুরবালার সঙ্গে তার জীবনের সকল রোমাঞ্চ বিয়ের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে সেই সুরবালা তার বিশাল দেহখানি পটাইবাবুর গায়ে লেপ্টে দিয়ে বড়ই আদরের সুরে বলে ওঠেন, “ হ্যা গো সত্যিই তুমি গাড়ি কিনবে, আমার কেন জানি কিছুতেই বিশ্বাসই হচ্চছে না যে আমি ঐ রকম একটা সুন্দর রঙ্গীন গাড়িতে তোমার পাশে বসে ফুর ফুর করে ঘুরে বেড়াবো ?”
সে যাই হোক সাত দিনের মধ্যে পটাই বাবু একটি নতুন গাড়ির মালিক হলেন। নতুন গাড়ি কিনলে নিজেকে বেশ বড় লোক বড় লোক মনে হয়। একটা রবিবার দেখে পটাইবাবু স্ত্রী সুরবালাকে নিয়ে একটু লং ড্রাইভে বেরবেন ঠিক করলেন। যেমন কথা তেমনি কাজ, পাড়ার ছেলে ভোম্বলের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে যখন যেমন ডাক অড়বে ভোম্বল পটাইবাবুর ড্রাইভারের কাজটি করে দেবে।
সেই অনুযায়ী একটি শুভ দিন দেখে এক রবিবার সাত সকালে কলকাতা থেকে দুজনে নম নম করে বেড়িয়ে পরলেন কলকাতার কাছাকাছি একটা জায়গার উদ্দেশ্যে। গাড়িতে উঠে যেন তার বিশ্বাসই হতে চাইছিল না যে গাড়িটা তার নিজের। নিজেকে যেন অফিসের ডিরেক্টর বলে মনে হতে লাগলো, পটাইবাবুর মনে হল নিজের গাড়িতে বসলে মুখটা একটু গম্ভীর করে রাখতে হয়। পটাইবাবু বাইরে মুখ খানি গম্ভীর করে রাখলেও অন্তরের এক অন্তঃসলিলা আনন্দে ফুর ফুরে হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে বহুদিন পরে আজ স্ত্রীর পাশে বসে কোথাও চলেছেন। আজ যেন পটাইবাবু নতুন করে তার স্ত্রীকে আবিষ্কার করলেন। সত্যিই তো পাশে তার স্ত্রী থাকলে যে মনের মধ্যে অমন পুলক জাগে সেটা তো তিনি এতদিন খেয়ালই করেননি?
এইভাবে স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে মনের আনন্দে কিছুদুর চলার পর তার ফুর ফুরে মেজাজটা হটাৎ ধাক্কা খেল। এক জায়গায় এসে দেখলেন একটা বাঁশ আড়া আড়ি করে রেখে রাস্তাটা বন্ধ করে দেয়া আছে, কাছা কাছি আসা মাত্র কয়েকজন ছেলে গাড়িটাকে ঘিরে ধরে ড্রাইভারের হাতে একটা চাঁদার বিল ধরিয়ে দিল, ভোম্বলের হাত থেকে সেটা পটাইবাবুর কাছে পৌছতেই পটাইবাবুর তো ভিরমী খাওয়ার মত অবস্থা। "বাবলাতলা শ্রী শ্রী ছিন্নমস্তা মায়ের পূজো উপলক্ষে চাঁদা বাবদ পাঁচ হাজার টাকা ধন্যবাদের সহিত গৃহীত হইল।" পটাইবাবু বাড়ি থেকে মাত্র চার হাজার টাকা নিয়ে বেরিয়েছেন তার মধ্যে পাঁচ'শ টাকার তেল কিনেছেন হাতে আছে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা। অনেক তর্কা-তর্কি করে পটাইবাবু যেখানে পাঁচ'শ টাকার উপরে কিছুতেই উঠতে পারবেন না সেখানে বাবলাতলারা নতুন ঝা চক চকে গাড়ি দেখে চার হাজারের নীচে কিছুতেই নামবে না। যাই হোক অনেক দর-দস্তুর করে একহাজারে রফা হল, এবং পটাইবাবুর হাতে রইল মাত্র আড়াই হাজার টাকা।
এরপর আরও কিছুক্ষন চলার পর পটাইবাবু যখন ঐ হাজার টাকার শোক ভূলে যাওয়ার চেষ্টা করছে তখন আবার কয়েকজন ছেলে হাত দেখিয়ে আবার গাড়িটিকে দাঁড় করালো। আবার কি হল? উদ্গ্রীব পটাইবাবু জানালার কাচ নামিয়ে বাইরে মুখ রাখতেই কয়েকজন স্থানীয় ছেলে গাড়িটিকে ঘিরে ধরে যথারীতি আগের মতই আর একটি বিল ধরিয়ে দিল। পরের রবিবার এলাকার মাননীয় বিধায়ক শ্রী বিটকেল চাঁদ সতপতির উপস্থিতিতে হালদারপাড়া রক্তদান শিবিরের জন্য দুইহাজার টাকা ধন্যবাদের সহিত গৃহীত হইল। রক্তদান শিবিরের বিল দেখে পটাইবাবুর মুখ রক্তহীন হয়ে গেল। আগের বারের মত এবারেও অনেক দরাদরি করে হাজার টাকায় রফা হল, এবং অবশিষ্ট দেড় হাজার টাকা পকেটে নিয়ে পটাইবাবু তৃতীয় দফার যাত্রা শুরু হ'ল।
এখন আর পটাইবাবুর স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখতে ইচ্ছে করছে না। কিছুক্ষন ম্রিয়মান মুখে চলার পর পটাইবাবু একটা যায়গায় দেখলেন রাস্তার একধারে লাইন দিয়ে পাট কেচে শুকোতে দেয়া হয়েছে, তারই মধ্যে আবার রাস্তার আর একটি ধার বরাবর ধান শুকোতেও দেয়া হয়েছে। রাস্তার উপর এই ধান ও পাটের সাঁড়াসী আক্রমণকে মোকাবিলা করার জন্য ড্রাইভার যখন সব কিছুকে বাঁচিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পনে গাড়ি চালাবার চেষ্টা করে চলেছে, তখন পটাইবাবু দেখলেন, আর এক বিপত্তি। রাস্তার উপর যত্র তত্র একগাদা হাঁস, মুরগী, ছাগল ও গরু চরে বেড়াচ্ছে।
ঠিক এমন সময়ে তার সাধের নতুন গাড়িটি জোর ব্রেক করে থেমে যেতেই একটা মুরগী ক্ককর ক্ককর করতে করতে তাদের গাড়ির গা ঘেসে দ্রুত বামদিক থেকে ডান দিকে চলে গেল। ড্রাইভার গাড়ি থেকে নামতেই সঙ্গে পটাইবাবুও নামলেন। তখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লোক যার হাতের দড়িতে আবার একটি ছাগল বাঁধা। সেই লোকটি পটাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনারা খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন দাদা। পটাইবাবুও বললেন, হ্যা মুরগীটা খুব বাঁচা বেঁচে গেছে। তবুও লোকটি বলল, না না আপনারা খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন, অন্তত দু হাজার টাকার ধাক্কা।
ব্যাপারটার অর্থ বোধগম্য না হওয়ায় পটাইবাবু ফের জিজ্ঞেস করলেন, তার মানে ? তখন ঐ ছাগল হাতে লোকটি তাকে রাস্তা থেকে একটু দূরে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিল। তিনি দেখলেন বেশ কয়েকজন লোক পাঁচটা সাতটা দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন গাছের তলায় বসে তাদের দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। তিনি আরও জানলেন রাস্তার উপরে যেসব হাঁস মুরগী গরু ছাগল ঘুরে বেরাচ্ছে ঐ লোকগুলিই তাদের মালিক। ইচ্ছা করেই জীবগুলিকে রাস্তার উপর ছেড়ে দিয়েছে এবং কোন গাড়ি এলেই ওরা মনে প্রানে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে তার মনোবাসনা যেন আজ পূর্ন হয়। অর্থাৎ তার হাঁস, মুরগী, ছাগল কিম্বা গরুর একটি অন্তত যেন আজ গাড়ি তলায় চাপা পড়ে।
তাদের এইরকম একটি অদ্ভুত ইচ্ছা কেন একটু পরে সেই ব্যাপারটিও খোলসা হল। এই রাস্তায় কোন মুরগী, হাস, ছাগল বা গরু গাড়ি চাপা পরলে ঐ দূরে বসে থাকা লোকগুলি দৌড়ে এসে গাড়িটিকে ভাংচুর ও যাত্রীদের মারধোর করার ভয় দেখিয়ে তাদের মৃত বা আহত প্রিয় জীবটির জন্য ক্ষতিপুরন দাবি করবে। এবং তাদের দাবি না মানলে যথারীতি যাত্রীদের মারধোর ও গাড়ি ভাংচুর করতে শুরু করবে অথবা গাড়িটিকে আটকে রেখে যাত্রীদের ছেড়ে দেবে যাতে তারা পরিমান মত টাকা নিয়ে এসে গাড়িটি ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। আর এই স্বঘোষীত খাপ পঞ্চায়েতের বিচারের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তাদের বেঁধে দেয়া মূল্য অনুযায়ী প্রতিটি আহত অথবা মৃত মুরগী ২ হাজার, হাঁস ৩ হাজার, ছাগল ২০ হাজার ও গরু ৫০ হাজার টাকা হিসেবে কর দিতে গাড়ির মালিক বাধ্য থাকবে।
এসব কথা শোনার পর পটাইবাবুর মুখটি এবার সত্যি সত্যি বড়ই করুন হয়ে এল। পটাইবাবু অত্যন্ত ম্লান মুখে লোকটিকে শুধোলেন, কিন্তু যদি মানুষ চাপা পরে তাহলে কত টাকা দিতে হবে? লোকটি উত্তরে বলল, না না আমাদের এই গ্রামের লোকেরা অতোটা অমানুষ নয় যে, মানুষ চাপা পরার জন্য টাকা-পয়সা চাইবে। বরং তখন আমরাই চাঁদা তুলে আহত লোকটির সেবা-শুশ্রুসার ব্যবস্থা করে দিয়ে থাকি।
এ কথা শুনে পটাইবাবু অত্যন্ত চিন্তিত মুখে গাড়িতে উঠে বসলেন এবং ভোম্বলকে অত্যন্ত সন্তর্পনে গাড়ি ছাড়তে বললেন। ঠিক এক মিনিটও হয়নি গাড়ি স্টার্ট নিয়েছে, অতি সন্তর্পনে চালানো গড়ির গতি তখন কুড়ি কি মি ছাড়ায়নি, এমন সময়ে গাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া সেই ছাগল হাতে লোকটি তার ছাগলটাকে হটাৎ এমন ভাবে ঠেলে দিল যে ভোম্বল সাবধান হওয়ার কোন সুযোগই পেল না।
চোক্ষের নিমেষে এলাকার চেহারাটাই পালটে গেল। হৈ হৈ করে চতুর্দিক থেকে সবাই ছুটে আসতে লাগলো। জীবনে এই প্রথম পটাইবাবু এতটুকও ঘাবড়ালেন না। শুধু এইটুকু মনে ছিল যে ছাগল চাপা পড়লে কুড়ি হাজার, আর তার কাছে আছে মাত্র দেড় হাজার টাকা। তিনি কারও সঙ্গে ঝগড়া বা বিবাদে গেলেন না। গাড়িটিকে একজন মুরুব্বি গোছের লোকের হাতে দায়িত্ব দিয়ে শুধু নীরবে গাড়ি থেকে নেমে স্ত্রী এবং ড্রাইভারকে নিয়ে রাস্তার অপর প্রান্তে কলকাতা ফেরার বাসে ওঠার চেষ্টা করতে করতে ভাবতে লাগলেন যে ঋনং কৃত্বা ব্যাঙ্ক গাড়ি কেনার জন্য চার লাখ টাকা লোন দেয় তারা নিশ্চই গাড়িটা ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যও কুড়ি হাজার টাকা নিশ্চই দেবে।

"""" এপার ওপার """"

(কাহিনীটির স্থান ও কালঃ-পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনার বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া একটি মফস্বল শহর।)
তখনও চব্বিশ পরগনা জেলা উত্তর দক্ষিন ভাগ হয়নি। সেই জেলার উত্তরে স্বাধীনদের ছোট্ট শহরটার একপাশ দিয়ে কুল কুল করে বয়ে চলেছে সুভদ্রা নদী। নদীর পাড় বরাবর নদীর সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে গেছে কালো পিচের রাস্তা। আর রাস্তার অপর দিকে ছোট্ট শহর অজন্তা নগর। ওদের বাড়ি থেকে সামান্য কয়েক মাইল গেলেই পুর্ব পাকিস্তান সীমান্ত। ছোট্ট স্বাধীন বাবার কাছে শুনেছে আগে নাকি একটাই দেশ ছিল, এমনকি ওর বাবা এই বড়িতে থেকেই সাইকেলে করে যাতায়াত করে পাশের সাতক্ষীরার একটি স্কুল থেকে মাট্রিক পাশ করেছে, সেই সাতক্ষীরা এখন বিদেশ।
তখন জমি-জমার মালিকানা ব্যাপারটা স্বাধীন বুঝত না। তার ধারনা ছিল তাদের ছোট্ট শহরটার আসে পাশে যত খালি জায়গা জমি পরে আছে তার কোন মালিক নেই, যে কেউ ইচ্ছে করলেই ওখানে একটা ঘর করে নিয়ে থাকতে পারে । এর একটা কারণও ছিল। সুভদ্রা নদী আর তার সংলগ্ন রাস্তার মাঝ বরাবর একটা লম্বা চর ছিল। আর ঐ চরের জমিটাতেই মাঝে মাঝে কোন একটা পরিবার এসে একটা টালির চাল দেয়া ছিটেবেড়া ঘর তুলে নিয়ে থাকতে শুরু করত।
স্বাধীনেরও খুব ইচ্ছে হত বড় হয়ে সেও ওই নদীর ধারে একটা বাড়ি করবে তাহলে ওর ঘুড়ি ওড়াতে খুব সুবিধা হবে। কারন স্বাধীনদের বাড়িটা ছিল রাস্তার অপর পাড়ে নদী থেকে একটু দূরে দখিন পাড়ায়। ওদের পাড়ায় সব বাড়িই ছিল পাকা দেয়ালের তবে বেশির ভাগই টিন কিম্বা এসবেসটসের চাল। পাড়ায় যারা বড়লোক বলে পরিচিত ছিল একমাত্র তাদের বাড়িরই মাথায় ছিল পাকা ছাদ। তখন ঐসব পাকা ছাদ ওয়ালা বাড়িকে দালান বাড়ি বলা হত। আর একমাত্র স্বাধীনদের বাড়িটাই ছিল পাকা দেয়ালের উপর খড়ের চাল। তবে ওদের বাড়িটা ছিল অনেকটা জায়গার উপর এবং বাড়িতে আম, জাম, কাঁঠাল ও নারকেল গাছ ছিল।
স্বাধীন বাবার কাছে শুনেছে ঐ চরের উপর যারা বাড়ি করে তাদেরকে রিফিউজি বলে। ওরা নিজেদের দেশের দীর্ঘ দিনের বাড়ি ঘর ছেড়ে এপারে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। তবে একই এলাকায় বসবাস করলেও স্বাধীনরা যেহেতু ঐ গ্রামেরই পুরানো লোক দেশ ভাগ হওয়ার অনেক আগে থেকেই এখানে আছে তাই ওরা রিফিউজি নয়। আস্তে আস্তে ওদের মধ্যে অনেকে রাস্তার এপারে স্বাধীনদের পাড়ায় পাকা বাড়ি ঘর করে ওদের ঘনিষ্ট প্রতিবেশী হয়ে যেত। তখন ওদের সঙ্গে স্বাধীনদের কোন পার্থক্যই থাকতো না। তবে তার মাথায় এটা কিছুতেই ঢুকতো না যে একই রকম দেখতে, একই রকম খাওয়া দাওয়া, একই পোষাক পরিচ্ছদ তবুও ওদেরকে বাঙ্গাল আর স্বাধীনদেরকে ঘটি কেন বলা হয়? আর মোহনবাগান ক্লাব যত খারাপই খেলুকনা কেন স্বাধীনদের বাড়ির সবাই মোহনবাগানকেই সমর্থন করে আর একই রকম ভাবে ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাব অত্যন্ত জঘন্য খেললেও ওরা কেন ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাবকেই সমর্থন করে?
এমনকি মুখের ভাষা বা পুজা-পার্বণ, আচার লৌকিকতা ইত্যাদী কোন ব্যাপারেই এই পিচ রাস্তার দুই দিকে থাকা দুটি পাড়ার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য ছিল না। স্বাধীনদের এলাকায় রিফিউজি হিসেবে যারা আসতেন তারা প্রায় সবাই খুলনা কিম্বা যশোরের লোক, তাই চব্বিশ পরগনার লোকেদের মতই তাদের মুখের ভাষাও একই। তবে পরে সে লক্ষ্য করেছে যে অনেক রিফিউজির মুখের ভাষা বুঝতে ওর বেশ অসুবিধা হয়, শুনেছে ওরা নাকি নোয়াখালি, সিলেট, কিম্বা চট্টগ্রামের লোক।
এই কাহিনীর যখন শুরু তখন স্বাধীন দখিন পাড়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে ক্লাশ ফোরে পড়ে। স্কুলে তার অনেক বন্ধুর মধ্যে একজনের নাম ছিল হিমু। আর এই হিমু ছিল তার খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু। আসলে ওর ঐ নামটি ওর ভারী পছন্দ ছিল, হিমুর আসল নাম ছিল হিমালয় সেনগুপ্ত। স্বাধীন ঐ নামের কাউকে আজ এত বছর বয়স পর্যন্ত দ্বিতীয়টি পাইনি। হিমুর বাবাও একদিন ঐভাবে ঐ চরে একটা ঘরে তুলেছিলেন। আর তখনই সে হিমুকে দেখেছিল। ওদের দুজনেরই বয়স তখন নয় দশ বছর হবে। সেই থেকেই ওরা বন্ধু হয়ে গেল।
স্বাধীন হিমুর কাছে সুনেছে ওর ঠাকুরদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে এম এ পাশ করে ওদেরই গ্রামের স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তাই ওদের বাড়িটা এলাকায় মাষ্টার মশাইএর বাড়ি বলে পরিচিত ছিল। হিমুর সেই ঠাকুরদা অবশ্য মারা গেছেন। পরবর্তী কালে হিমুর বাবা পরেশবাবুও কলকাতার জে বি রায় আয়ুর্বেদ হাসপাতাল থেকে আয়ুর্বেদ-ডাক্তারী পাশ করে গ্রামে প্রাক্টিস শুরু করেন, এবং অচিরেই খুলনা শহরে চিকিৎসক হিসেবে তার বেশ সুনাম ছড়িয়ে পরে। তবে দেশ ছেড়ে এপার বাংলায় এসে অনেক চেষ্টা করেও তেমন কিছু সুবিধা করতে পারছিলেন না। অবশেষে ঐ ছোট্ট শহরে গৃহশিক্ষকতা করে কোন রকমে সংসার চালাতেন। আবার তারই মাঝে নতুন করে ডাক্তারী প্রাক্টিসের চেষ্টাও শুরু করেন।
হিমুদের এমনও কোন কোন দিন যেত যেদিন ঠিকমত দুবেলা খাবারও জুটতো না, কিন্তু হিমুর আত্মমর্যাদা ছিল এতোটাই প্রবল যে, সে কোন দিন সেটা কাউকে জানতেও দিত না। তবে স্বাধীন সেটা ওর চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারতো, আর তখন সে ওকে কিছু একটা বলে যেমন--আজকে আমার বাড়িতে চল, আমি কয়েকটা নতুন ডাকটিকিট পেয়েছি তোকে দেখাব, এসব কথা বলে ওদের বাড়িতে নিয়ে যেত। তখন স্বাধীনের মা সামান্য কয়েকটা চিড়ে বা মুড়ির নাড়ু ওকে এনে দিয়ে বলত, "এই নে মুড়ির নাড়ু তৈরী করছি, তুই এলি ভালই হল গরম গরম কয়েকটা খেয়ে দেখ তো কেমন হয়েছে?"
কথায় বলে "misfortune never comes alone"। একদিকে হটাৎ সব কিছু ছেড়ে একেবারে রিক্ত অবস্থায় নতুন পরিবেশে এসে হিমুদের সংসারের সব কিছু যেন কেমন উল্টো পাল্টা হয়ে যাচ্ছিল। দাদা সাগর পড়াশনায় তেমন সুবিধা করতে পারছিল না এদিকে আবার একটা দীর্ঘদিনের গোছানো সংসার ছেড়ে এসে নতুন পরিবেশে হিমুর ঠাকুমা রীতিমত মানসিক রোগী হয়ে গেল। মাঝে মাঝেই চিৎকার করে কেঁদে উঠত আর বলত- "আমার সব গেল আমার সব গেল আমার সাজানো বাগান শুখিয়ে গেল।" শুধু স্বাধীনকে বড় ভালবাসতো। ওকে পাশে বসিয়ে বলত- জানিস আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে এমনই এক নদী বয়ে গেছে তার নাম বেতনা নদী। এলাকায় আমাদের পরিবারের কত নামডাক ছিল। হিমুর ঠাকুরদা সেইযুগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ বলে কথা! সবাই কত মান্যি গন্যি করত...।, এই পর্যন্ত বলেই হটাৎ কাঁদতে শুরু করে দিত, "আমার সব গেল আমার সব গেল, আমার সজানো বাগান শুখিয়ে গেল।"
এসব কথা শুনে স্বাধীন অবাক হয়ে যেত! স্বাধীনের বাবা ঘটি কিন্তু পড়াশোনা করেছেন সাতক্ষীরা হাই স্কুলে। আবার হিমুর বাপ-ঠাকুর্দারা বাঙ্গাল কিন্তু পড়াশনা করেছেন কলকাতায়। তাহলে আসল ঘটি কে আর আসল বাংলা কে? ওর কেমন সব গন্ডগোল হয়ে যায়।
এদিকে স্বাধীনের বড় দাদা স্বরাজ সদ্য কলেজ পাশ করে বাবার ব্যবসায়ে বসেছে। কিন্তু তার যেন বাবার ব্যবসায় মন নেই। বরং বেলা দশটা এগারটা পর্যন্ত রাস্তায় ঘাটে ঘুরে বেরানোটাই যেন তার কাজ। ইতিমধ্যে স্বাধীন একদিন দূর থেকে লক্ষ্য করল, হিমুর দিদি তিস্তা স্কুলে যাওয়ার পথে হেলা বটতলায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক কি যেন খুঁজে চলেছে। স্বাধীন দেখে অবাক হয়ে গেল হটাৎ গাছের আড়াল থেকে তার নিজের দাদা স্বরাজ বেরিয়ে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা ছোট্ট ভাজ করা কাগজ তিস্তার হাতে দিল, আর তিস্তা একটু মুচকি হেসে সেটা বই-এর ফাকে লুকিয়ে রাখল। সেই বয়সে স্বাধীন ব্যাপারটা তেমন কিছু না বুঝলেও এটুকু বুঝেছিল যে এটার মধ্যে এমন একটা গোপনীয়তা আছে যেটা প্রকাশ্যে পাঁচ কান করা উচিত হবে না।
স্বাধীন যথারীতি নিজের বাড়িতে আর পাঁচটা কথার মত হিমুদের বড়ির কথাও গল্পের ছলে বাবা, মা এবং দাদার কাছে বলত। কিন্তু একটা জিনিস সে লক্ষ্য করত, ওর বাড়ির লোকেরা ব্যাপারটাকে তেমন পাত্তা দিত না। বাবা চুপ করে থাকলেও মা তো বলেই দিত, "ওসব বাঙ্গালদের সঙ্গে বেশী মেলা মেশা করিস না। হিমু দুই একবার এ বাড়িতে এলো কিম্বা তুই ওকে দুই একটা বই দিয়ে সাহায্য করলি সেই পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু তার বেশী নয়।" তবে স্বাধীন অবাক হয়ে গেল,ওর দাদার ব্যবহার দেখে। দাদা রীতিমত ওকে শাসিয়ে বলল, "তোর ওই বাঙ্গালদের বাড়িতে অত ঘন ঘন যাওয়ার কি দরকার?" সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনের সেদিনের হেলা বটগাছ তলার কথাটা মনে পড়ল। যে দাদা নিজে তিস্তা দিদির সঙ্গে...... না থাক।
দুদিন পরে স্বাধীনের অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল। যেদিন সে দেখল, তার দাদা স্বরাজ হিমুর তিস্তাদিদি কে নিয়ে নদীর ধারে একটা গাছের আড়ালে......।
এরই মধ্যে একদিন হিমুর বাবা পরেশবাবু স্বাধীনদের বাড়িতে এসে হাজির কারন স্বাধীনের বাবা হেমন্তবাবু কথা দিয়েছেন, ওদের বাইরের ঘরটা পরেশবাবুকে তার ডাক্তারীর চেম্বার করার জন্য ভাড়া দেবেন। তবে ভাড়া এখন তেমন কিছু দিতে পারবেন না পরে প্রাক্টিশের পশার হলে আস্তে আস্তে বকেয়া সমেত ভাড়া শোধ করবেন।
কিন্তু এই ঘর ভাড়া দেয়া নিয়ে বাড়িতে কম ঝামেলা হল না। স্বাধীনের মা কিছুতেই একজন বাঙ্গালকে ঘর ভাড়া দেবে না। কিন্তু হেমন্তবাবু এলাকায় একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি ভেবে দেখলেন বাইরের ঘরটা তো পরেই আছে। তাতে যদি একটি পরিবারের কিছু উপকার হয় তো ক্ষতি কি?
সেইমত হিমুর বাবা পরেশবাবু একদিন দুই একটা চেয়ার টেবিল আর কিছু ওষুধ পত্র নিয়ে সেখানে বসতে সুরু করলেন। প্রথম প্রথম বিফল মনোরথ হলেও আস্তে আস্তে দু-চারটে রোগী হতে লাগলো। তখন ঐরকম মফস্বলে এম বি ডাক্তার তো চোখেই দেখতে পাওয়া যেত না। একজন এল এম এফ ডাক্তার এলাকায় দীর্ঘদিন অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চিকিতসা করতেন। কিন্তু তার মৃত্যুরপর পুরো এলাকাটি চিকিৎসকহীন হয়ে পড়ল। আর আস্তে আস্তে পরেশবাবু সেই শুন্যস্থানটি পুরোন করলেন।
এই ভাবে দু-তিন বছর কেটে গেল। হিমুদের বাড়িতে স্বাধীনের এখন আর তেমন যাওয়া হয় না। যদিও ওদের বন্ধুত্ব তেমনই অটুট আছে। এদিকে স্বাধীনের বাবার শরীরটা কিছুদিন ধরেই একদম ভাল যাচ্ছে না। শরীরটা আস্তে আস্তে এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে দোকানে বসা অসম্ভব। অথচ বড় ছেলে স্বরাজের দোকানে বসার ব্যাপারে কোন মন নেই, ইদানিং স্বরাজের সঙ্গে তিস্তার মেলা মেশাটাও বেশ বেড়েছে। সেযুগে ছেলে মেয়েদের এমন অবাধ মেলা মেশার সুযোগ ছিল না। কিন্তু তারই মধ্যে দুজনকে একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যেতে লাগলো। যদিও তিস্তা স্কুল ফাইনাল পাশ করে একটা স্থানীও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরীও পেয়ে গেছে। পরেশ বাবুরও এখন হাতযশের গুনে তার পশার বেশ কিছুটা জমে উঠেছে।
হটাৎ দেখতে দেখতে তিন চার বছরের মধ্যে চাকাটা যেন কেমন তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরে গেল। হিমুর বাবা এখন সংসারটাকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছেন। এখন মাসে শ'দুয়েক টাকা আয় তার অবশ্যই হয়। মেয়ে তিস্তাও মাসে পঞ্চাশ টাকা মাইনে পায়। নিতুদের বাড়ির কাছেই এক হাজার টাকা দিয়ে দুকাঠা জায়গাও কিনেছেন। ভগবান নিশ্চই মুখ তুলে চাইবেন আর ইচ্ছে আছে আগামী দু-এক বছরের মধ্যে একটা ছোট পাকা বাড়িও করতে পারবেন।
উল্টোদিকে স্বাধীনদের অবস্থা দিন দিন কেমন যেন অগোছালো হয়ে উঠছে। ইদানিং হেমন্তবাবু প্রায়শই শয্যাশায়ী থাকেন। স্বরাজ মাঝে মাঝে দোকানে যায় কিন্তু নিয়মিত ব্যবসার খোজখবর না রাখার ফলে কর্মচারীরা তাকে সহজেই ভুল বোঝাতে পারে এবং ঠকায়। কর্মচারীরা চুরি করার পর যা হোক দশ বিশ টাকা স্বরাজের হাতে দেয়, সে সেটাই বাড়িতে এনে বাবার হাতে দেয়। তবে এরই মধ্যে সম্প্রতি পরেশবাবুর চিকিৎসায় হেমন্তবাবু যেন একটু স্বস্তি পেতে সুরু করলেন। তিনি আস্তে আস্তে একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকলেন। স্বাধীনের এখন সংসারের এসব ঝুট ঝামেলা বোঝার বয়স হয়েছে। তাই ওর বাবা যখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে হটাৎ বলে ওঠেন "আমার সাজানো বাগান শুখিয়ে গেল", তখন তার হিমুর ঠাকুরমার সেই আক্ষেপের কথা মনে পড়ে। কি অসম্ভব মিল? অথচ ওরা তো রিফিউজি নয়?
এর মাত্র কদিন পরেই সন্ধ্যা বেলায় স্বাধীন ফুটবল খেলে ফিরছে, সঙ্গে হিমুও রয়েছে, হটাৎ ওদের বাড়ির কাছে আসতেই শুনতে পেল, বাড়িতে কোন প্রচন্ড গোলমাল হয়েছে। একটু কাছে আসতেই কথাগুলো স্পষ্ট হ'ল। ওর মা চিৎকার করে বলছে, "কতোবার বলেছিলাম বাঙ্গালদের ঘর ভাড়া দিও না, খাল কেটে কুমির এ্নো না। এখন হল তো? ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এই ছিল আমার ভাগ্যে?"
ভয়ে ভয়ে স্বাধীন আর হিমু ঘরে ঢুকে দেখে অবাক হয়ে যায়। স্বাধীনের দাদা স্বরাজ আর হিমুর দিদি তিস্তা ঘরের এক কোনে মাথা নিছু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্বরাজের পরনে অতি সাধারন একটি ধুতি আর পাঞ্জাবি এবং তিস্তার পরনে একটি টুক টুকে লাল শাড়ি, মাথায় এক মাথা সিদুঁর। পাশেই পরেশবাবু মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। বাইরের ঘর থেকে দুই একজন কৌতুহলী রোগীও দরজায় এসে ভীড় করেছে। ঘরে ঢুকে স্বাধীন আর হিমু ভয় পেয়ে গিয়ে বোকার মত ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে রইল আর তখনও ওর মা চিৎকার করেই যাচ্ছে।
তখন হেমন্তবাবু কোনরকমে বালিশ থেকে মাথাটা একটু উঁচু করে বললেন, "যাক, যা হয়ে গেছে সে তো আর ফেরানো যাবে না, ওরা পরস্পরকে ভালবেসে কালী মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে এসেছে এখন আমরা মেনে না নিলে সমাজে সবাই আমাদেরকেই ছিঃ ছিঃ করবে।" কিন্তু তাতে শৈলবালার চিৎকার যেন আরও বেড়ে গেল। "খুব বড় বড় লেকচার তো দিচ্ছো তা একটা পরের বাড়ির মেয়েকে খাওয়াবে কি শুনি? এদিকে নিজেদেরই তো পেট চলে না।"
"পরের বাড়ি কেন বলছো? ও তো আজ থেকে আমাদের বাড়ির মেয়ে।" হেমন্তবাবুর মুখে একথা শুনে পরেশবাবুর সাহস হ'ল একটু মুখ খোলার। তিনিও বললেন, "দেখুন বেয়ান, সম্পর্ক যখন একটা হয়েই গেল তখন আর ওসব নিয়ে চিন্তা করার কি আছে। আমি বলে দিলাম দেখবেন স্বরাজের এবার থেকে নিয়মিত দোকানের বসার প্রতি মন বসবে। তিস্তাও তো একটা চাকরী করে আর আমারও তো এখন মোটা মুটি ভালই চলছে ...... সেই সময় আপনারা এই ঘরটা না দিলে আমিও কোথায় ভেসে যেতাম বলুনতো? তাই আসুন না সবাই মিলে আমরা নতুন করে আমাদের এই সংসার দুটোকে আবার সাজিয়ে তুলি? যা মা গুরুজনদের প্রণাম কর।"
একথা শুনে স্বাধীন আর হিমু দুজনে এক দৌড়ে বেড়িয়ে গেল হিমুর মা আর ঠাকুরমাকে ডেকে আনতে।

"""" বড়দিন """"


ঋভুর ছেলেবেলায় ডিসেম্বরের শেষ মানেই ক্লাশের বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ, তাছাড়া এই গ্রীষ্ম প্রধান দেশে ক্ষনস্থায়ী শীতকালকে উপভোগ করার আলাদা একটা আনন্দ অবশ্যই আছে। যেহেতু বাৎসরিক পরীক্ষা হয়ে গেছে, পড়ার কোন চাপ নেই তাই সারাদিন মাঠে তিনটে কঞ্চি পুতে ক্যাম্বিস বলে ক্রিকেট খেলা আর খেলা। আর খেলতে খেলতে নিজেরাই কমল ভট্টাচার্য্য কিম্বা অজয় বসুর কন্ঠ নকল করে সেই খেলার ধারাবিবরনী দিয়ে নিজেরাই হাসা হাসি করা। একই সঙ্গে আসেপাশে কার বাড়িতে পিঠে পুলি তৈরী হচ্ছে সেসব খবর জোগাড় করে সুযোগ মত তাদের বাড়িতে ঢুকে যাওয়া।
সেইযুগে এইসব মফস্বলে আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী হিন্দু পরিবারের মতই ঋভুদের বাড়িতেও বড়দিন পালন করার কোন রেওয়াজ ছিল না বা কেক খাওয়ারও কোন প্রচলন ছিল না। তখন ঐসব প্রত্যন্ত এলাকাতে বিদ্যুতই ছিল না তাই এযুগের মত ঘরে ঘরে টুনি বাল্ব জ্বালিয়ে খ্রিস-মাস ট্রি তৈরী করার তো কোন প্রশ্নই ওঠেনা। তবে ওদের গ্রামের পাশেই মোয়ার জন্য বিখ্যাত জয়নগর। ঋভুর আজও মনে আছে বড়দিনে ওর বাবা খুব ভাল পরিচিত কোন দোকান থেকে মোয়া কিনে আনতেন। সেই মোয়ার স্বাদ ঋভুর জিভে যেন আজও লেগে আছে। বাবা ঋভুকে প্রভু যিশু সম্মন্ধে অনেক গল্প বলতেন।
বাবা বলতেন, মধ্য প্রাচ্যের এক দেশে একদিন রাজাকে কর দেওয়া ও নাম লেখানোর জন্য হাজার হাজার মানুষ বেথেলহেমে্র পথে চলেছেন। মরিয়মকে গাধার পিঠে বসিয়ে যোসেফও রওয়ানা দেন সেই বেথেলহেমের পথে। পথেই মরিয়মের গর্ভবেদনা ওঠে। রাজ্যের মানুষের ভিড়ে বেথেলহেমের কোনো সরাইখানায় জায়গা হয় না তাঁদের। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে সন্তান জন্মদানের জন্য মরিয়মকে এক গোয়ালঘরে ঠাঁই নিতে হয়। সেখানেই জন্ম দেন পুত্র যিশুকে। এভাবেই মহা আশ্চর্যরূপে মা মরিয়মের কোলে খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বীদের মুক্তিদাতা প্রভু যিশুর জন্ম হয়। বাবা প্রভু যিশুর কত অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলতেন। বলতেন প্রভু যিশু একজন কুষ্ট রোগীর ক্ষতস্থানে হাত বুলিয়ে দিতেন আর তার রোগ সেরে যেতো। ঋভু অবাক হয়ে সেসব কথা শুনতো।
ঋভুদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে আনন্দপুর নামের একটা জায়গায় একটা চার্চ ছিল।যে কোন চার্চের ন্যায় ঐ চার্চটিও ছিল অনেকটা জায়গার উপর বিভিন্ন প্রকারের ফুল ও ফলের গাছ গাছালি দিয়ে সুন্দর করে কেয়ারি করে সাজানো। আর তার মধ্যে ফুট ফুটে সাদা রঙের একটি চার্চ বিল্ডিং। সেই কারণে ওই চার্চের ঐ পরিবেশটা ঋভুর খুব ভাল লাগতো।ও মমে মনে ভাবতো আমাদের মন্দিরগুলো কেন এমন সুন্দর হয় না? ভিতরে ঢুকলেই কেমন ছবিতে দেখা বিদেশের কাউন্ট্রি সাইড বলে মনে হত। আসলে ঋভুর ঐ চার্চে যাওয়ার আর একটা কারণও ছিল। খুব ছোটবেলা থেকেই ঋভুর পেন ফ্রেন্ড আর দেশ বিদেশের ডাকটিকিট জমানোর সখ ছিল । ওই চার্চের ফাদার 'লয়েজ দেমসা'র তাকে দেশ বিদেশের ডাকটিকিট দিতেন, আর -- কি ঋভু বাবু তুমি কেমন আছো ... বলে বিদেশী টানে বাংলায় তার সঙ্গে কত কথা বলতেন। তবে ঋভুর সব চেয়ে ভাল লাগতো কোন সুদুর যূগশ্লভিয়ার এক গ্রাম থেকে কি ভাবে এই সুন্দরবন এলাকায় এসেছিলেন সেই গল্প শুনতে।
ঋভু অবাক হয়ে শুনতো সেসব কথা। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। একজন শরনার্থী হয়ে কিভাবে প্রাণটুকু হাতে নিয়ে পরিবারের আর সকল সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কখনো হেটে কখনো গাড়িতে কখনো জলপথে বহু দেশ ঘুরে এই ভারতে এসে পৌছে ছিলেন ফাদার সেই কাহিনী শুনতে শুনতে শিহরিত হয়ে উঠতো বালক ঋভু। অবশেষে আর বাড়ি গিয়ে মানচিত্র খুলে দেখত কোথায় সেই পূর্ব ইউরোপের যুগোশ্লভিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া আর হাজার হাজার মাইল দূরে কোথায় এই ভারতের পশ্চিম বঙ্গের সুন্দর বন লাগোয়া এক অখ্যাত গ্রাম। পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে ফাদার কি করে আমেরিকা ইংল্যান্ড না গিয়ে এই অজ গ্রামে এসে থেকে গেলেন সে কথা ভেবে ঋভু অবাক হয়ে যেত। ঋভু মাঝে মাঝে খবরের কাগজে যুগোশ্লাভিয়া দেশটার নামও খুব দেখতে পেত। ঋভু তখন অতসব বুঝতো না...... কি সব জোট নিরপেক্ষ না কি যেন! প্রেসিডেন্ট টিটো ইত্যাদী। ওর খুব ইচ্ছে হত একদিন ঋভুও অন্তত জাহাজের খালাসির চাকরী নিয়েও যুগোশ্লাভিয়ায় চলে যাবে। আর নিজের চোক্ষে দেখে আসবে ফাদারের দেশটাকে।
চার্চের ফাদার 'লয়েজ দেমসার' যেমন ঋভুকে বিদেশি ডাক টিকিট দিতেন, বিদেশি চকলেট খাওয়াতেন, তেমনই প্রভু যিশুর কথাও বলতেন। নিষ্পাপ ঋভু সরল মনে ফাদারকে জিজ্ঞাসা করতো, তোমাদের যিশু যদি এ্তই ভাল তাহলে তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কেন?
একথা শুনে এতটুকু ক্ষুব্ধ হতেন না ফাদার, বলতেন, তোমাদের পরমহংসদেব যেমন বলতেন, এই তোকে যেমন দেখছি, ঠিক তেমনি আমি ঈশ্বরকেও দেখতে পাই, তিনি যেমন গিরিশ ঘোষকে বলেছিলেন -- দে আমাকে তোর সকল পাপের বকলমা দে......। ঠাকুর যেমন সকলের পাপ কন্ঠে ধারণ করেছিলেন বলে তার সেই নীলকন্ঠ কর্কট রোগাক্রান্ত হয়েছিল। ঠিক তেমনই প্রভু যীশু সকলের পাপ নিজের স্কন্ধে নিয়ে ক্রুশ বিদ্ধ হয়েছিলেন।
ঋভু এমনিতেই প্রায় প্রতি সপ্তাহে ফাদারের সঙ্গে চার্চে দেখা করতে যেত। কিন্তু প্রতিবছর ফাদার ঋভুকে বড়দিনের জন্য চার্চে বিশেষ ভাবে আমন্ত্রন জানাতেন। খৃষ্টান না হয়েও ক্যারোলে যোগদান করত ঋভু। সবার সঙ্গে সমবেত কন্ঠে ঋভুও গলা মেলাতো। ফাদার পিয়ানো বাজাতেন। ......"" স্বর্গের দুতেরা জানালো বারতা রাখাল বালকদেরে/ জন্মিল শোন রাজাধিরাজ এক ক্ষুদ্র গোয়াল ঘরে।""
সঙ্গীতের পর ফাদার, যীশুর বানী এবং কার্য-কলাপ পাঠ করতেন, ঋভু সেসব বানী খুব মন দিয়ে শুনতো প্রভু যীশু কিভাবে আর্তের সেবা করতেন, কি ভাবে তিনি নিজ হাতে কুষ্ঠ রোগীর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে দিতেন । তারপর ফাদার যিশুর বিচারের নামে প্রহসনের কথাও বলতেন।
ফাদার বলে যেতেন, বিচার শেষে যিশু একটি পাথরখন্ডের উপর বসলেন। স্বর্গীয় যুবকের বসার ধরনটিও অপূর্ব। পরনে দীর্ঘ শুভ্র বসন। ঈষৎ লালচে দীর্ঘ চুল। নীলাভ চোখ। মুখময় ঈষৎ লালচে শ্মশ্রু । ভিড়ের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে যিশু বললেন, শক্রকে ভালোবেস। আর, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে অযাথা উৎকন্ঠিত হয়ো না। উপস্থিত জনতার ভিড়ে গুঞ্জন উঠল। তারপর তাঁর জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি কাঁটা তারের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হ'ল তাকে। অতঃপর তিনি নিজের ক্রুশটিকে নিজেই কাঁধে করে নিয়ে এলেন বধ্য ভুমিতে। ক্রুশবিদ্ধ অবস্থাতেও তার মুখে কোন কষ্টের চিহ্ন নেই, তার মুখমন্ডল এক স্বর্গীয় আনন্দে উদ্ভাসিত, আর তিনি বলে চলেছেন, ঈশ্বর তুমি এদের ক্ষমা কোর। এই ভাবে এক সময়ে বিদ্যুৎহীন সেই গ্রামের ছোট্ট চার্চের বড়দিনের বিশেষ অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যেত।
তারপর ফাদার ঋভুকে বলতেন, আজ তোমার মনের সকল অকথিত অপরাধ এবং প্রার্থনা প্রভু যিশুর কাছে নিবেদন কর। প্রভু নিশ্চই তোমার সকল অপরাধ মার্জনা করে তোমাকে নতুন জীবন দান করবেন। চার্চের ভিতরে মোমবাতির আলোয় এক স্বর্গীয় পরিবেশে ঋভুর মনে হত যিশু ক্রোড়ে মাতা মেরীর চক্ষু দুটি অশ্রুসজল। হাতজোড় করে সেই স্বর্গীয় মুর্তির দিকে তাকাতেই তার নিজেরও চক্ষুদুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠত। বালক ঋভুর দুই কপোল সিক্ত হয়ে ওঠে তার অশ্রু ধারায়। ঋভু কিছুই বলতে বা চাইতে পারতো না। সবশেষে ফাদার ঐদিন তার শত ব্যস্ততার মধ্যেও ঋভুকে আলাদা করে কাছে ডেকে তার মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করে তাকে একটা সুন্দর কেক, মিষ্টি, চকোলেটের প্যাকেট ও নিজ হাতে শুভেচ্ছা লিখে একটি ডায়েরি উপহার দিতেন। মফস্বলের বিদ্যুৎ হীন এলাকার ছোট্ট চার্চ। বেলা থাকতে থাকতেই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যেত। তবে বাড়ি ফিরেও আর পাঁচটা দিনের চেয়ে ঐ দিনটা ঋভুর কছে হত সম্পুর্ণ অন্যরকম। এর রেশ থাকতো পরবর্তী বেশ কয়েকদিন। ওর মনটা এক সুন্দর স্বর্গীয় আনন্দে যেন ভেসে যেত।
গত তিন চার বছর ধরে এটাই ছিল ঋভুর বড়দিনের রুটিন। কিন্তু এবার কি আর যাওয়া হবে? বড়দিনতো এসেই গেল। কিন্তু গত কদিন ধরেই ঋভুর বেশ জ্বর, সর্দি, কাশি, ভীষন ঠান্ডা লেগেছে। কবিরাজ মশাই বলেছেন টাইফয়েড। খুব সাবধানে থাকতে হবে। সেই মুঠো ফোনহীন যুগে প্রায় দশ বারোদিন হয়ে গেল ফাদারের সঙ্গে দেখা হয়নি। বাবা একটা ছোটদের বিবেকানন্দ বই কিনে দিয়েছেন। মাঝে মাঝে বইটা উলতে পালটে পড়ে। কোন কিছুই যেন ভাল লাগে না, তেমন মন দিয়ে বইটা পড়তেও ইচ্ছে করছে না। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হটাত এক জায়গায় ওর চোখদুটো আটকে যায়। সদ্য পিতৃ হারা নরেন যতই ভাবে দক্ষিনেশ্বরের ওই বূড়োটার কাছে আর যাবে না। তবুও কেন না গিয়ে থাকতে পারে না? কি এক অমোঘ আকর্ষণে বার বার ছুটে যায় ঠাকুরের কাছে।
গত কদিন শরীরটা বেশ সুস্থ লাগছে। কবিরাজ মশাইও অভয় দিয়েছেন। বড়দিনের এখনও দুদিন বাকী আছে। এবারেও তাহলে নিশ্চই চার্চে যেতে পারবে। সেই রাত্রে ঋভু এক আশ্চর্য্য স্বপ্ন দেখলো। ফাদার দেমসার...... কি অপরূপ তার রূপ, দীর্ঘ, অত্যন্ত গৌর বর্ণের শ্বেত শুভ্র শশ্রু শোভিত, সমগ্র শরীর শুভ্র গাউনে আচ্ছাদিত। এক হাতে বাইবেল অন্য হাতটি ঋভুর মাথায় বোলাতে বোলাতে ফাদার বললেন, কেমন আছো ঋভু? আজ বাদ কাল বড়দিন তো এসেই গেল। তোমাকে তো যেতেই হবে চার্চে। তুমি না গেলে প্রভু রাগ করবেন যে!
ঋভু ফাদারকে দেখে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে তার হাত দুটি ধরে বলতে গেল- হ্যা ফাদার আমার যতই শরীর খারাপ হোক না কেন আমাকে যে যেতেই হবে। তুমি নিজে এসেছ আমাকে নিমন্ত্রণ করতে, এ আমার কি সৌভাগ্য ! কিন্তু স্বপ্নের ফাদার আর অপেক্ষা করলেন না। বললেন, আমি চলি আমার যে সময় হয়ে এসেছে, এ কথা বলেই তিনি অন্তর্হিত হলেন। ঋভুর ঘুম ভেঙ্গে গেল,... আমার যে সময় হয়ে এসেছে মানে? চোখ খুলে দেখল ভোর হয়ে গেছে। আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু হয়েছে।
ঋভুর শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছে। উঠে চোখে মুখে জল দিয়ে আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষন পরে একটু সকাল হতেই ওদের সদর দরজাটায় কে যেন কড়া নাড়া দিল। ঋভুর বাবা দরজা খুলতেই এক ভদ্রলোক হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই... ঋভু উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠল- আরে এ তো চার্চের বাদলদা। ...... কি খবর বাদলদা? জানো আজ ভোর রাত্রে আমি ফাদারকে স্বপ্নে দেখেছি......। ফাদার কেমন আছেন, বাদলদা? কি ব্যাপার ... তুমি চুপ করে আছো কেন?
বাদল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো বাদলদা----- ফাদার আর নেই দাদাবাবু। গত কাল সন্ধ্যার সময়ে অন্য দিনের মতই প্রার্থণা করার সময়ে হটাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। পাড়ার পরাণ ডাক্তার দেখে বললেন সব শেষ।
সঙ্গে সঙ্গে আমরা কলকাতার বড় চার্চে খবর পাঠাই। ওরা এসে দেহ নিয়ে চলে গেল। কলকাতায় কোন এক গোরস্থানে নাকি গোর দেবে। আর বলে গেলেন দুই-এক দিনের মধ্যেই নতুন ফাদার চলে আসবেন। ফাদার অনেকদিন তোমার কোন খবরর না পেয়ে
গতকাল মৃত্যুর মাত্র ঘন্টাখানেক আগে আমাকে এই প্যাকেটটা তোমার বাড়িতে পৌছে দিয়ে তোমার খবর নিয়ে যেতে বলেছিলেন। গতকাল আর আসতে পারলাম কই?
হটাৎ ঋভু যেন পাথর হয়ে গেছে, ও কান্না ভুলে গেছে। নিতান্ত অনিচ্ছায় হাতটা বাড়িয়ে বাদলদার কাছ থেকে প্যাকেটটা নিল। তারপর খুলে দেখলো অন্যান্য বারের মত এবারেও ওকে একটা ডায়েরি আর একটা পেন পাঠিয়েছেন ফাদার। আর তার প্রথম পাতায় পরিষ্কার সুন্দর হস্থাক্ষরে লিখে দিয়েছেনঃ- My beloved Rivu...No need to go to church for god, God is omnipresent.... make your neighbour and your parents happy to reach the god........ with blessings from Fr. Loize Demsar
ঋভুর হটাৎ মনে পড়ল, কদিন আগে ওর বাবা ওকে 'ছোটদের বিবেকানন্দ' নামে যে বইটা কিনে দিয়েছেন, তাতেও তো স্বামীজী ওই একই কথা বলেছেন-- "জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর"। ...... কি অদ্ভুত মিল।

Monday, 12 November 2018

""""" গরম রসগোল্লা এবং একটি রেল লাইনের মৃত্যু """""


যে কোন মৃত্যুই দুঃখের, তবে কোন কোন মৃত্যু কেমন যেন মনটাকে নাড়া দিয়ে যায়। সম্প্রতি তেমনই একটি মৃত্যুর খবর পেলাম সংবাদ পত্রে, তবে এটা কোন মানুষের মৃত্যু নয়। সকালের খবরের কাগজে আজ একটা বড় খবর "বধর্মান-কাটোয়া লাইট গেজ রেল লাইনটি চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হ'ল"। ১৯১৫ সালে-এ চালু হওয়া এই রেলপথটিকে ঠিক শতবর্ষের মাথায় বন্ধ করে দেওয়া হ'ল এবং যুগের সঙ্গে তাল রেখে এরপর এই লাইন হবে ব্রডগেজ। আর বনগাঁ কিম্বা ব্যান্ডেল লোকালের মত এখানেও চলবে বিদ্যুত চালিত ই এম ইউ কোচ। সেদিনেরর কত কথা আজ মনে পড়ে, কথায় বলে বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, আর কেড়ে নিয়েছে আবেগ...আজ মনে পড়ে ওই ট্রেন-এর সাথে আমার বাল্যকালের কত স্মৃতি কত আবেগ জড়িয়ে আছে।
চোখ বুজলেই আজও যেন পরিষ্কার সব দেখতে পাই।
সে আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। বাবার চাকরি সুত্রে আমরা তাখন উত্তর চব্বিশ পরগনার একটা মহকুমা শহরে থাকতাম। আর বছরে একবার করে আমাদের গ্রামের বাড়ি-তে যেতাম। সে এক দারুন উত্তেজনা ।.. তবে সেবার আমরা যাচ্ছিলাম আমার নিজের এক জেঠতুতো দাদার বিয়েতে, তাই আনন্দ আর উত্তেজনা অন্যবারের চেয়ে চারগুন বেশী। ভোর ৪টে নাগাদ ঘুম থেকে উঠে পোটলা-পু্টলি গুছিয়ে নিয়ে দিনের প্রথম বাস-টিতে উঠতাম। তখন কলকাতা শহর দেখবো, দোতলা বাস-এ চাপবো এসব ভেবেই শিহরিত হওয়ার বয়স। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন এখনকার মত প্রাইভেট বাসের কলকাতা শহরের ভিতরে প্রবেশ করার অধিকার ছিলনা, ঐ বাসগুলো শ্যাম বাজার খাল ধার পযর্ন্ত আসতো আর ওখান থেকে বাবা আমাদের ট্যাক্সি করে নিয়ে যেতে চাইলেও আমরা ভাই-বোনেরা দোতলা বাসে চাপার জান্য বায়না করতাম। আমাদের মত মফঃস্বলের ছেলেদের দোতলা বাসের দোতলায় চাপার আনন্দই ছিল আলাদা।
তখনো হাওড়া থেকে ই এম ইউ কোচ চালু হয়নি। বিশাল দৈত্যের মত দেখতে কানাডিয়ান ইঞ্জিন ভস ভস করে বাস্প ছেড়ে যাচ্ছে আর লাল রং-এর বগির থার্ড ক্লাসে চেপে শশা আর ঝাল মুড়ি খেতে খেতে আমরা বর্ধমান পৌছতাম। সেখানেও জানলার ধারে বসার জন্য আমাদেরর ভাই বোনেদের মধ্যে মারামারি হত। কিন্তু যে ইঞ্জিনের দিকে মুখ করে জানলার ধারে বসতো সে ভীষণ ভাবে ঠকতো..কয়লার ইঞ্জিন, ...তাই খুব ঘন ঘন কয়লার গুড়ো উড়ে এসে চোখে পড়ত...। অবশেষে রেল কাম ঝমা ঝম করতে করতে বেলা ১ টা নাগাদ আমরা বর্ধমান এসে পৌছতাম। সেখানে পৌছে আর এক প্রস্থ দৌড় দৌড়ি। ওভার ব্রিজ দিয়ে স্টেশনের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে আবার নতুন করে ছোট লাইন এর ট্রেন-এ চাপতে হ’ত। সে এক মজার রেলগাড়ি, খুব-ই সাধারন ছোট ছোট কাঠের তৈরি বগি আর লম্বা লম্বি ভাবে চার সারি বসার যায়গা । কাগজে কলমে টাইম টেবিল একটা আছে বটে কিন্তু ট্রেন চলে তার নিজের মর্জি অনুযায়ি। তাই বেলা দুটোয় ছাড়ার কথা থাকলেও বেলা তিনটে পযর্ন্ত্য আমাদের সবাইকে গলদঘর্ম করে তবে তিনি নড়তে শুরু করলেন।
ইতিমধ্যে ভীড়ও ভালই হয়েছে, বসার জায়গাগুলো সব ভর্তি। তবে যাত্রির চেয়ে মালপত্রই বেশী। ওইটুকু একটা কামরায় চতুর্দিকে যাত্রীদের লটবহরের ঠেলায় যাত্রীদের দম বন্ধ হওয়ার মতন অবস্থা।
এ গাড়ির সামনে ছোটার চেয়ে পাশা পাশি হেলা দোলা যেন বড্ড বেশী। ফলে ট্রেন চলার সাথে সাথে যাত্রীরা বার বার একজন আর একজনের ঘাড়ের উপর ঢলে পড়ছে। তখন গ্রমাঞ্চলে জাতপাতের বিভাজন ভীষন ভাবে চালু ছিল তাই মেয়েরা ওরই মধ্যে চেষ্টা করত ছোঁয়া-ছুই যতোটা সম্ভব এড়ানো যায়।কিন্তু সব চেয়ে বিরক্তিকর ওই পরিবেশে অনেকের বিড়ি ধরানো...। ওই রকম ধীর গতি-তে চলা ট্রেন এর ভীড়ের ভিতর বিড়ির ধোঁয়ায় ভর্তি কামরায় সে এক নারকীয় পরিবেশ, তার মধ্যে আমার কোলে একটা ঢাউস ব্যাগ ...।
এই বেঞ্ছটাতে আমাদের পরিবারের আমি একা, সাম্‌নের সীটে আমার দিকে পিছন ফিরে আমার বাবা-মা এবং ভাই বোনেরা বসে আছে। আমার সামনের সীটে আমার মুখো মুখি দুজন বয়স্ক মহিলা মেয়ের বিয়েতে কত টাকা পণ দিতে হয়েছে তাই নিয়ে গল্পে মশগুল। কিন্তু আমার সব চেয়ে সমস্যা আমার সামনে কে একজন একটা ছাগল রেখেছে...তার-ও ঐ পরিবেশটি মোটেই ভাল লাগছ না তাই থেকে থেকে সেও ব্যা ব্যা করে ডেকে চলেছে। বিড়ির ধোয়া আর ছাগলের গন্ধে আমার তখন অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার মত অবস্থা। যাত্রীরা প্রায় সকলেই পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত। তাই ..."কিরে ভ্যাবলা কোথায় গেসলি,... আরে এটা তোর বেটা নাকি ...। কত বড় হয়ে গেছে রে ?" কিম্বা, "আরে নন্দোদা যে অনেকদিন পর দেখা হল, তা এবার আলুর ফলন কেমন ? আমাদের গাঁয়ে তো সব ধসায় মেরে দিলে" এই ধরনের আলোচনায় মুখর।
চলন্ত ট্রেনের দরজায় ঠেস দেয়া এক ভদ্রলোক খুব ঘন ঘন আমার মাথার উপর র্যাকেতে রাখা মুখ বন্ধ একটা চটের থলের দিকে তাকাচ্ছে। ঠিক সেই সময় ঝুপ করে ঐ থলেটা আমার কোলে রাখা ব্যাগের উপর পড়ে আপনা থেকেই নড়া চড়া করতে লাগলো আর তাই দেখে আমি ভয় পেয়ে চিৎকার শুরু করে দিতেই দরজায় ঠেস দেয়া ভদ্রলোক দৌড়ে এসে আমার কোল থেকে ব্যাগটা নিয়ে খুলতেই তার ভিতর থেকে একটা জ্যান্ত মুরগি কক কক করে ডেকে উঠল। তাই দেখে কামরার সবাই হই হই করে হেসে উঠে ঐ লোক টাকে উদ্দেশ্য করে বললে, “কিরে কামাল শেষ কালে শশুর বাড়ি থেকে জ্যান্ত একটা মুরগি-ই চুরি করে নিয়ে চলে এলি?” কামাল বললো, “ছি ছি কি যে বলো, শালা দিলে তার ভাগ্নের জন্য... তাই......।” তবে তারপর সারা পথ ঐ কামালভাই থলেটা আর নিজের হাত ছাড়া করেননি, আর ঠিক সেই সময় আমাদের কামরায় একজন চেকার ঊঠলেন, ৩৫-৩৬ বছর বয়সের এক ভদ্রলোক, ধুতির উপর একটা কালো কোট গায়ে আর হাতে একটা সাড়াশির মত যন্ত্র।
ভদ্রলোক নিজে থেকে কাউকে টিকিট চাইলেন না, গোটা কামরায় আমরা ছাড়া কেউ টিকিট দেখালোও না, বরং তিনি সবার সঙ্গে হই হই করে গল্প করতে শুরু করলেন। “আরে ভজা তোর ছেলে কেমন আছে র্যা ? কি রে কামাল তোর জামাইবাবুর সঙ্গে সেদিন বদ্দমানে দেখা হ’ল।” এদিকে আমাদের তিনটে টিকিট আমার, বাবার আর মা’র, টিকিটগুলো আমার পকেটেই ছিল, আমি সেগুলো দেখাতেই অনেকটা বিরক্ত হয়েই আমার হাত থেকে টিকিট গুলো নিয়ে পাঞ্ছ করে আমার হাতে ফেরত দেবার সময় জানতে চাইলেন আর দুজন কোথায়?
আমি সামনে আঙ্গুল দেখাতেই দেখি আমার বাবা পিছন ফিরে ঐ চেকারবাবুর দিকে তাকিয়ে হাসছে। আর ঐ চেকারবাবু তো একেবারে লম্ফ দিয়ে বলে উঠলেন, “আরে তিনু দা যে? আর আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে, বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এ তোমার বেটা না কি গো ? তা অনেক বড় হয়ে গেছে ত? তা হাবলার বিয়েতে যাচ্ছ নিশ্চই...। তা বউদি কেমন আছ গো?” মা ঘাড় নেড়ে বললো, “হ্যা ভালো আছি তুমি ভালো আছো তো? প্রতিমা কেমন আছে?” বুঝলাম প্রতিমা ওই চেকারবাবুর বৌএর নাম। কিন্তু এবার ঐ চেকারবাবু সবার সামনে সেই মোক্ষম কথাটি বললেন, “তা জানো তো এই লাইনে তোমার গদাই ভাইটি আছে, তা টিকিট কাটার কি দরকার ছিল? আমি না থাকলেও আমার নাম বললেই তো যথেষ্ট। তোমাদের আশীর্বাদে এই বদ্দমান কাটোয়া লাইনে এই গদাই সামন্তকে সবাই মান্যি গন্যি করে। এখনো পযর্ন্ত একদিন গদাই না থাকলে রেলের চাকাও ঘুরবে না।“ বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হা হা হা করে হাসতে লাগলেন। এতক্ষনে বাবা মুখ খুললেন বললেন, “তা তোর মত আর দু চারটে চেকার থাকলে এই রেলের চাকা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।”
ইতিমধ্যে পরের স্টেশন এসে গেছে চেকার বাবুটি হা হা হা করে উচ্চশ্বরে চিৎকার করে বললেন, “তা হলে ঐ কথাই থাকল, বিয়ে বাড়ীতে দেখা হচ্ছে ।“ ভদ্রলোক নেমে যাওয়ার পরে জানলাম উনি আমার বাবার নিজের পিসতুতো ভাই। এবার ট্রেন স্টেশন ছেড়ে সেই যে দাঁড়াল আর নড়াচড়ার কোন লক্ষন নেই। দুটি স্টেশনের মাঝখানে দুদিকে ধানের জমি আর মাঝে মাঝে ঝোপ ঝাড় জঙ্গল। চলন্ত ট্রেন থেকে সব সময় আসে পাশের সব কিছু খুব সুন্দর দেখতে লাগে। সবুজ ধানের ক্ষেত, কত রকমের গাছ পালা। গরমে প্রায় ১৫-২০ মিনিট কষ্ট করার পর হটাত লক্ষ করলাম লাইন থেকে একটু দূরে একটা ঝোপের ভিতর থেকে আমার সদ্য পরিচিত গদাইকাকু এক হাতে একটা লোটা আর এক হাতে ধুতির কাছা-কোছা ঠিক করতে করতে একটা ঝোপের আড়াল থেকে পট্টি করে বেরচ্ছেন। কিছুক্ষনের মধ্যে আমরা আমাদের স্টেশনে পৌছে গেলাম। স্টেশনে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য গরু কিম্বা মোষের গাড়ি আসতো, আর আমরা তাতে চেপে আমাদের গ্রামের বাড়ি পৌছে যেতাম।
সে যুগের গ্রামের বিয়ে বাড়ির পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। সব কিছুই নিজেদের বাড়িতে পাড়ার লোকেরাই ব্যবস্থা করতেন। বৌভাতের দিন চারিদিকে আত্মীয় কুটুম লোক লশকরে ভর্তি। সকাল থেকেই পুকুরে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলা হচ্ছে , মিষ্টি তৈরীর ভিয়েন বসেছে, উঠনে ৫/৭ জন মিলে শুধু তরকারি কেটেই যাচ্ছে। আমরা ছোটরা কি করবো ভেবে পাচ্ছি না, এক সঙ্গে আমরা কত দিক সামলাবো? এই বোধ হয় সব চেয়ে বড় কাতলা মাছটা জালে ধরা পরে গেল তো, ওদিকে আবার উনোন থেকে বোঁদের কড়াই নামানো হয়ে গেল, কিম্বা গরম রসগোল্লাগুলো এত ক্ষনে নিশ্চই খাওয়ার মত ঠান্ডা হয়েছে আমরা শুধু দৌড়েই বেড়াচ্ছি। আবার তারই মধ্যে মাঝে মাঝে মহিলা মহলে আমাদের নতুন বৌদিকে দেখে আসছি। ইতিমধ্যে নাপিত বৌ এসেছে সে আমাদের মা কাকিমা, জেঠিমাদের পায়ে আলতা পরিয়ে দিচ্ছে। আর এক জনকে দেখলাম বিনা কাজে আমাদের চেয়েও ব্যস্ত তিনি হলেন আমার গদাইকাকু। আমাদের মত তিনিও সর্বত্র দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। আর মাছ ঠিক মত ভাজা হয়েছে কিনা টেস্ট করে যাচ্ছেন। কখনো বিজ্ঞের মত বলছে মাংসটা একটু নুন কম হয়েছে। গদাইকাকুর মেয়ে মিনুর সঙ্গে আমার বেশ ভাব হয়ে গেল। ও নাকি একটা ঝি ঝি পোকা পুষেছে, তাকে কচি জাম পাতা খেতে দেয়। তার নাম দিয়েছে পতঙ্গিনী। বাবা মাঝে মাঝে গদাইকাকুর পিছনে লাগছে,” কিরে গদাই, আজকে তোর রেলের চাকা ঘুরবে তো?” আর আড়ালে বাবা বলছে গদাইটা এখনো সেই দশ বছরের শিশুই রয়ে গেল।
আমার ঠাম্মি আমাদেরকে একটা পদ্ম পাতায় বেশ কয়েকটা গরম রসগোল্লা এনে খেতে দিল। শহরে অত সুন্দর রসগোল্লা পাওয়া যায় না। আমরা সবাই ভালো করে তাকাবার আগেই গদাই কাকু কোথা থেকে দৌড়ে এসে ছো মেরে পাতা থেকে কয়েকটা রসগোল্লা তুলে নিতে গিয়ে পুরো পাতাটাকেই উলটে দিলো মাটিতে। তাই দেখে আমাদের সে কি কান্না। ঠাম্মিও কাকুকে খুব বকলো। বাবাও বললো, “তুই কোনদিনই বড় হবি না।”
বৌভাতের পরদিন সকালে গোটা বাড়িটা কেমন যেন ছন্নছাড়া ভাব। সবার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ, জিনিস পত্র সব চারিদিকে ছড়ানো ছিটানো। একে একে আত্মীয় কুটুমরা বিদায় নিচ্ছে। গদাই কাকুও তার স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে একদিন পর বিদায় নিলেন। গদাইকাকু আর কাকীমা বয়স্কদের সবাইকে প্রনাম করে বার বার ওদের বাড়িতে আমাদেরকে একবার যাওয়ার জন্য বললেন। বাবাও বার বার ওদেরকে বাবার চাকরিস্থলে আমাদের বাড়িতে যেতে বললেন। যাওয়ার সময় মিনুতো রীতিমত কেঁদেই ফেললো।
দেখতে দেখতে পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে। ইতি মধ্যে আমরাও বাড়িঘর করে শহরেই থেকে গেছি গ্রামের সঙ্গে তেমন আর যোগাযোগই নেই। গদাইকাকুর সঙ্গে গত পঞ্চাশ বছরে মাত্র একবার বর্ধমান শহরে একটা অনুস্ঠানে দেখা হয়েছিল। আমার পরিচয় পেয়ে আশি বছরর বৃদ্ধ গদাই কাকু তার এই ষাট বছরের ভাইপোর হাত দুটি ধরে বলে ছিল, “একবার সবাইকে নিয়ে আমার বাড়িতে আয়, আমাদের মোংলি গাইটা এখন প্রতিদিন এক সের করে দুধ দিচ্ছে, বাড়িতে ছানা কেটে তোকে গরম রসোগোল্লা তৈরী করে খাওয়াব।” আমি বলেছিলাম, “তোমার ভাইপোর কি আর সেই বয়স আছে? এখন তেল, ঘি, মিস্টি সব খাওয়া বারন।” শুনালম কাকীমার শরীরটাও নাকি একদম ভালো যাচ্ছে না, মিনুর ছেলে গত সেপ্টেম্বরে আমেরিকা গেছে। মনে মনে ভাবলাম মিনুর কি এখনো সেই ঝি ঝি পোকাটা আছে? এখনো কি তাকে জামপাতা খাওয়ায়? গদাই কাকু সেদিন বেশীক্ষন বসেননি কারন বর্ধমান-কাটোয়া লাইন–এ এখন অনেক ভালো ভালো বাস রুট হওয়া সত্বেও কাকা এখনো সেই ছোট লাইন এর ট্রেনেই যাতায়াত করেন, আর রাত আটটাতেই লাস্ট ট্রেন।
ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। বললো আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে আমার এক ভাইপো ফোন করেছে......। ফোনটা ধরে হ্যালো বলতেই, অপর প্রান্ত থেকে আমার ভাইপো পুকাই উভয় পক্ষের সুসংবাদ লেনদেন করার পর বললো, কাকা তোমাকে একটা খবর জানাচ্ছি, আমাদের সেই গদাই দাদু গত কাল রাত্রে মারা গেছেন। শুনলাম ৮৬ বছরের মত বয়স হয়েছিল। দিদার শরীরটাও নাকি ভাল যাচ্ছে না। শুনেছি তোমারো তো শরীর ভালো যাচ্ছে না। তবু যদি পারো আগামী ২৪শে এপ্রিল শ্রাদ্ধের দিন একবার এসো। হটাৎ মনে পড়ল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের গদাই কাকার সেই কথা টা। “............তোমাদের আশীর্বাদে এই বদ্দমান কাটোয়া লাইনে এই গদাই সামন্তকে সবাই মান্যি গন্যি করে। এখনো পযর্ন্ত একদিন গদাই না থাকলে রেলের চাকাও ঘুরবে না।“
2