““জ্যোতিষার্ণব ঘনাইশাস্ত্রী””
-- নারায়ণ রায়।
পটাইবাবুর বাড়ির রকে আমাদের চারজনের আড্ডাটা দিনে দিনে ভালই জমে উঠেছে, তবে ইদানিং ঘনাইবাবুকে আড্ডায় সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। টানা একমাস আড্ডায় ঘনাইবাবুর অনুপস্থিতি আমাদেরকে বেশ চিন্তায় ফেলল। ব্যাপারটা কি? জানার জন্য আমরা তিনজন অর্থাত আমি, পটাইবাবু এবং লাটাইবাবু, ঘনাইবাবুর বাড়ি যাওয়া মনস্থ করলাম। এতদিনের পুরানো বন্ধু, আমাদের অবশ্যই উচিত তাঁর খবরাখবর নেওয়া।
যথারীতি একদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে আমরা হাজির হলাম । কিন্তু এ আমরা কোন ঘনাইবাবুকে দেখছি? হটাৎ ঘনাইবাবু যেন কেমন পাল্টে গেছেন, আমাদের সেই আগেকার ঘনাইবাবু কোথায় গেলেন? ঘনাইবাবুর এ কি হ’ল? ঘনাইবাবু আমাদের দেখেও যেন চিনতে পারলেন না। মুখে অদ্ভুত সব কথাবার্তা। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলেই তার উত্তরে ওনার মুখ থেকে ‘কালসর্পযোগ’, ‘রাহুর বক্র দৃষ্টি’, ‘শনির সাড়ে সাতি’ এই ধরনের অবোধ্য সব শব্দ বেরোতে লাগলো। বেশ কিছুদিন ধরে চুল দাড়ি কাটা বন্ধ করে দিয়েছেন, কপালে বড় করে সিঁদুরের টিপ। গলায় ইয়া বড় একটা রুদ্রাক্ষের মালা আর পরনে গৈরিক বসন। ঘনাইবাবু ভীষন ভাবে জ্যোতিষ চর্চা শুরু করেছেন, বাড়ির বাইরের দেওয়ালে ইয়া বড় একটা সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন- ““জ্যোতিষার্ণব ঘনাইশাস্ত্রী—সন্তানের ভবিষ্যত? স্ত্রী কিম্বা স্বামী অন্যের প্রতি আসক্ত? মামলায় দুঃশ্চিন্তা?”” সকল সমস্যার সমাধনে—‘বাবা ঘনাই শাস্ত্রী’।””
বৈঠক খানা ঘরটিতে চেয়ার টেবিল সাজিয়ে চেম্বার খুলে বসেছেন। সঙ্গে কয়েকটি পুরানো পঞ্জিকা লগ্ন, রাশিফল ইত্যাদি বিচারের বই, একটি আতস কাঁচ আর রঙ্গীন কাঁচের মত দেখতে কয়েকটা টুকরো টুকরো পাথর। সহকারি এবং সর্বক্ষনের সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন পাড়ারই ছেলে কিচলুকে। কিচলু ঘনাইবাবুর কাছ থেকে বারোশ টাকা ধার নিয়েছিলেন তিন বছর আগে, সুদে আসলে সেটি এখন বত্রিশশো টাকার মত হয়েছে। বহু তাগেদা দিয়েও তাহা আদায় করতে ব্যর্থ হওয়ায় ঘনাইবাবু এখন ঠিক করেছেন কিচলুকে মাসে পাঁচশো টাকার বেতনের কর্মী হিসেবে রেখে মাসে মাসে তিনশো টাকা করে কেটে নেবেন। এমন সময়ে ঘনাইবাবুর অর্ধাঙ্গিনী ঘন্টুরানী আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
এ কি? ঘন্টুদেবীকে তো চেনাই যাচ্ছে না, মাত্র গত একমাসেই চেহারা অর্ধেক হয়ে গেছে। ইহার কারণ জিগ্যেস করায় জানা গেল, ঘনাইবাবুর অর্ধাঙ্গিনী দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপের রোগী, নিয়মিত তাকে দু’বেলায় পাঁচটি- করে ট্যাবলেট গলধঃকরন করতে হয়, কিন্তু Charity Begins at Home এই নীতি মেনে ঘনাইবাবুর নির্দেশে এক নিমেষে সেসব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে ঘনাইবাবু ঘন্টুরানীর সর্বাঙ্গে মোট সাতটি তাবিজ ও কবচ বেঁধে দিয়ে বলেছেন, “রাহু আর কেতু দুই শয়তানকেই এমন আষ্টে পৃষ্টে বেঁধে দিলাম যে কেউ আর তোমার কোন ক্ষতি করতে পারে না। বেটারা নিজেরাই এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে পালাবে।”
আমরা যখন ঘনাইবাবুর এই সব কীর্তিকলাপ দর্শনেব্যস্ত তখনই আমাদের মধ্যে উপস্থিত লাটাইবাবু সাহস সঞ্চয় করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘনাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনি এত বড় একজন জ্যোতীষ শাস্ত্রী হওয়ায় আপনার বন্ধু হিসেবে আমরা গর্বিত। তখন ঘনাইবাবু লাটাই বাবুকে জিগ্যেস করলেন ওনার রাশি ও লগ্ন কি? যখন জানলেন যে লাটাইবাবুর রাশি ‘কন্যা’ এবং লগ্ন ‘বৃশ্চিক’, অমনি গড় গড় করে বলে গেলেন, “আপনার রাশির অধিপতি বুধ, বর্তমান বছরটি আগের তুলনায় বেশ শুভ, আপনার আত্ম বিশ্বাস প্রবল থাকার ফলে যে কোনও অবস্থার সঙ্গে মোকাবিলা করার ক্ষমতা আপনার থাকবে।” একথা শ্রবন করে লাটাইবাবু নিতান্তই কাচু মাচু মুখ করে বললেন “কিন্তু আমি আত্মবিশ্বাসী ? একথা যে এই ভূভারতে কেহই বিশ্বাস করবে না” তখন ঘনাইবাবু বললেন “আপনি অবশ্যই আত্মবিশ্বাসী কিন্তু সেটি আপনার ভিতর হ’তে প্রকাশ পাচ্ছে না, আর এর জন্য চাই তিনরতি ক্যাটস্ আই কিম্বা সাত রতি গোমেদ। আর আপনার লগ্ন ‘বৃশ্চিক’ তাই লগ্নের অধিপতি মঙ্গল, এই লগ্নের জাতক-জাতিকারা সত্যবাদি ও নিষ্ঠাবান হয়ে থাকেন, অপরিসীম ইচ্ছা শক্তির বলে সব কাজেই অগ্রসর হয়ে থাকেন।” লাটাইবাবু আবার আমতা আমতা করে ক্ষীন স্বরে প্রতিবাদ করে বলেন-“বরং ঐ জিনিসটারই আমার জীবনে সর্বাপেক্ষা অভাব, আজ যদি আমার অপরিসীম তো দুরের কথা সামন্য একটু ইচ্ছা শক্তি থাকলেও থাকতো তাহলে আজ নিশ্চই আপনার মত প্রতিভাবান কেউ একটা হতাম।”
সে যাই হোক আমরা খবর নিয়ে জানলাম যে ঘনাইবাবুর প্রতিদিন দুই তিন জন করে খরিদ্দার হচ্ছে এবং দৈনিক দুই-তিন শত টাকা আমদানিও হচ্ছে।
তবে সেদিন একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, দুই একটি সৌজন্যমূলক বাক্য বিনিময় ছাড়া ঘনাইবাবুর বাড়িতে পুরো সময়টাই পটাইবাবু অদ্ভুত ভাবে শুধু নিশ্চুপ ছিলেন তাই নয়, ওনার চোখ মুখের মধ্যেও একটা অবিশ্বাস আর বিরক্তি ফুটে উঠছিল। যদিও ঘনাইবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার সময়ে রাস্তায় ব্যাপারটা পরিস্কার হ’ল।
আমরা তিনজনই বাঙালী তাই যথারীতি ফেরার সময়ে রাস্তায় নেমেই ঘনাইবাবুর নিন্দা সুরু হ’ল, আর এব্যাপারে পটাইবাবুই অগ্রনী ভূমিকা নিলেন। বললেন, “বুঝলেন রায়বাবু, জ্যোতিষী হওয়া মোটেই অতো সহজ ব্যাপার নয়, অনেক সাধ্য সাধনা এবং দীর্ঘদিনের তপস্যার দ্বারাই প্রকৃত জ্যোতিষী হওয়া যায়। ও ব্যাটা ভেকধারী জ্যোতিষী হয়ে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে, আর এই লাইনে এখন ইনকাম বেশ ভালই।” আমি পটাইবাবুর কথায় সম্মতি জানাতেই তিনি দ্বিগুন উৎসাহিত হয়ে বললেন, “তবে হ্যাঁ প্রকৃত জ্যোতিষী জীবনে আমি একজনকেই দেখেছিলাম, তিনি হলেন বাবা কনখলানন্দ মহারাজ!” এই কথা বলে পটাইবাবু দুইবার দুইহাত করজোর করে কপালে ঠেকালেন। আমি সভয়ে জিগ্যেস করলাম, “আপনি তার দেখা কেমন করে পেলেন?” উত্তরে পটাইবাবু বলে চললেন, “তিনি সুদুর হিমালয়ের কনখলে গভীর জঙ্গলে বর্হিজগৎ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একগুহার মধ্যে বসবাস করেন, আমি কৈশোরে একবার হিমালয় দর্শনে গিয়ে ঐ মহামানবের সাক্ষাত পাই এবং কেন জানিনা প্রথম দর্শনেই আমাকে বাবার খুব ভালো লেগে যায়।” আমি এবং লাটাইবাবু উভয়ে বললাম, “সত্যই তো এমন মহামানবের সাক্ষাত কয়জন পায়? আপনি প্রকৃতই ভাগ্যবান পটাইবাবু।” পটাইবাবু আরও বলে চলেন, “আমি বাবার কাছে কিছু না চাইতেই বাবা আমাকে বললেন, আমি তোর কপালে এক দেবজ্যোতি দেখতে পাচ্ছি, তুই একদিন এই পৃথিবীতে একটা বিরাট কিছু হ’বি। এবং আরও নির্দিষ্ঠ ভাবে বলেছিলেন বড় হয়ে আমি অবশ্যই একজন কেউকেটা হ’ব, হয় উত্তম কুমারের মত অভিনেতা কিম্বা ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের মত ডাক্তার, অথবা গোষ্ট পালের মত ফুটবল খেলোয়ার হবই হব। অত বড় একজন জ্যোতিষী তার কথা কখনো বিফলে যেতে পারে?”
আমরা আরও কৌতুহল প্রদর্শন করে পটাইবাবুর দিকে তাকাতেই পটাইবাবু এক গভীর তৃপ্তির হাসি হেসে বলে চলেন “এখন আমাকে দেখে আপনারা নিশ্চই বুঝতে পেরেছেন যে বাবা কনখলানন্দ মহারাজ কতবড় জ্যোতিষী ছিলেন। বাবা নিজেও বোধ হয় জানতেন না যে তার কথা এই ভাবে মিলবে, কারণ বাবা বলেছিলেন উপরের তিনজনের মধ্যে যেকোন একজনের গুন আমার মধ্যে বর্তাবে। কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা বাবার আশীর্বাদে এবং তাঁর শ্রী চরণের শ্পর্ষে উক্ত তিনজনের গুনই আমি পেয়েছি।” পটাইবাবুর একথা শ্রবণ করে আমি যার পর নাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যখন ভাবছি, তাহা কিরূপে সম্ভব? একজন মানুষ কি করে একই সঙ্গে বিধানবাবুর মত ডাক্তার, গোষ্টবাবুর মত খেলোয়ার আর উত্তমবাবুর মত অভিনেতা হবেন? আর তাছাড়া কনখলের গভীর জঙ্গলে বসবাস করে বহির্জগত থেকে সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন থেকে তিনি বিধান রায়, উত্তম কুমার কিম্বা গোষ্ট পালের মত বাঙালীদের চিনলেন কিরূপে? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে তাঁর মুখপানে তাকাতেই তিনি ব্যাপারটি খোলসা করলেন, “আসলে আপনারা নিশ্চই পারমিউটেশন-কম্বিনেশনের অংক করেছেন… ব্যাপারটা সেইরূপ। একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিলেই আপনার উত্তর পেয়ে যাবেন। আমি অবশ্যই উক্ত তিনজনের গুন পেয়েছি, তবে গুনগুলিকে সামান্য একটু ঘুরিয়ে নিলেই হবে। অর্থাত আমি উত্তম কুমারের মত ডাক্তার, বিধান রায়ের মত ফুটবলার এবং গোষ্ট পালের মত অভিনেতা অবশ্যই হয়েছি। ”
-- নারায়ণ রায়।
পটাইবাবুর বাড়ির রকে আমাদের চারজনের আড্ডাটা দিনে দিনে ভালই জমে উঠেছে, তবে ইদানিং ঘনাইবাবুকে আড্ডায় সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। টানা একমাস আড্ডায় ঘনাইবাবুর অনুপস্থিতি আমাদেরকে বেশ চিন্তায় ফেলল। ব্যাপারটা কি? জানার জন্য আমরা তিনজন অর্থাত আমি, পটাইবাবু এবং লাটাইবাবু, ঘনাইবাবুর বাড়ি যাওয়া মনস্থ করলাম। এতদিনের পুরানো বন্ধু, আমাদের অবশ্যই উচিত তাঁর খবরাখবর নেওয়া।
যথারীতি একদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে আমরা হাজির হলাম । কিন্তু এ আমরা কোন ঘনাইবাবুকে দেখছি? হটাৎ ঘনাইবাবু যেন কেমন পাল্টে গেছেন, আমাদের সেই আগেকার ঘনাইবাবু কোথায় গেলেন? ঘনাইবাবুর এ কি হ’ল? ঘনাইবাবু আমাদের দেখেও যেন চিনতে পারলেন না। মুখে অদ্ভুত সব কথাবার্তা। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলেই তার উত্তরে ওনার মুখ থেকে ‘কালসর্পযোগ’, ‘রাহুর বক্র দৃষ্টি’, ‘শনির সাড়ে সাতি’ এই ধরনের অবোধ্য সব শব্দ বেরোতে লাগলো। বেশ কিছুদিন ধরে চুল দাড়ি কাটা বন্ধ করে দিয়েছেন, কপালে বড় করে সিঁদুরের টিপ। গলায় ইয়া বড় একটা রুদ্রাক্ষের মালা আর পরনে গৈরিক বসন। ঘনাইবাবু ভীষন ভাবে জ্যোতিষ চর্চা শুরু করেছেন, বাড়ির বাইরের দেওয়ালে ইয়া বড় একটা সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন- ““জ্যোতিষার্ণব ঘনাইশাস্ত্রী—সন্তানের ভবিষ্যত? স্ত্রী কিম্বা স্বামী অন্যের প্রতি আসক্ত? মামলায় দুঃশ্চিন্তা?”” সকল সমস্যার সমাধনে—‘বাবা ঘনাই শাস্ত্রী’।””
বৈঠক খানা ঘরটিতে চেয়ার টেবিল সাজিয়ে চেম্বার খুলে বসেছেন। সঙ্গে কয়েকটি পুরানো পঞ্জিকা লগ্ন, রাশিফল ইত্যাদি বিচারের বই, একটি আতস কাঁচ আর রঙ্গীন কাঁচের মত দেখতে কয়েকটা টুকরো টুকরো পাথর। সহকারি এবং সর্বক্ষনের সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন পাড়ারই ছেলে কিচলুকে। কিচলু ঘনাইবাবুর কাছ থেকে বারোশ টাকা ধার নিয়েছিলেন তিন বছর আগে, সুদে আসলে সেটি এখন বত্রিশশো টাকার মত হয়েছে। বহু তাগেদা দিয়েও তাহা আদায় করতে ব্যর্থ হওয়ায় ঘনাইবাবু এখন ঠিক করেছেন কিচলুকে মাসে পাঁচশো টাকার বেতনের কর্মী হিসেবে রেখে মাসে মাসে তিনশো টাকা করে কেটে নেবেন। এমন সময়ে ঘনাইবাবুর অর্ধাঙ্গিনী ঘন্টুরানী আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
এ কি? ঘন্টুদেবীকে তো চেনাই যাচ্ছে না, মাত্র গত একমাসেই চেহারা অর্ধেক হয়ে গেছে। ইহার কারণ জিগ্যেস করায় জানা গেল, ঘনাইবাবুর অর্ধাঙ্গিনী দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপের রোগী, নিয়মিত তাকে দু’বেলায় পাঁচটি- করে ট্যাবলেট গলধঃকরন করতে হয়, কিন্তু Charity Begins at Home এই নীতি মেনে ঘনাইবাবুর নির্দেশে এক নিমেষে সেসব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে ঘনাইবাবু ঘন্টুরানীর সর্বাঙ্গে মোট সাতটি তাবিজ ও কবচ বেঁধে দিয়ে বলেছেন, “রাহু আর কেতু দুই শয়তানকেই এমন আষ্টে পৃষ্টে বেঁধে দিলাম যে কেউ আর তোমার কোন ক্ষতি করতে পারে না। বেটারা নিজেরাই এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে পালাবে।”
আমরা যখন ঘনাইবাবুর এই সব কীর্তিকলাপ দর্শনেব্যস্ত তখনই আমাদের মধ্যে উপস্থিত লাটাইবাবু সাহস সঞ্চয় করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘনাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনি এত বড় একজন জ্যোতীষ শাস্ত্রী হওয়ায় আপনার বন্ধু হিসেবে আমরা গর্বিত। তখন ঘনাইবাবু লাটাই বাবুকে জিগ্যেস করলেন ওনার রাশি ও লগ্ন কি? যখন জানলেন যে লাটাইবাবুর রাশি ‘কন্যা’ এবং লগ্ন ‘বৃশ্চিক’, অমনি গড় গড় করে বলে গেলেন, “আপনার রাশির অধিপতি বুধ, বর্তমান বছরটি আগের তুলনায় বেশ শুভ, আপনার আত্ম বিশ্বাস প্রবল থাকার ফলে যে কোনও অবস্থার সঙ্গে মোকাবিলা করার ক্ষমতা আপনার থাকবে।” একথা শ্রবন করে লাটাইবাবু নিতান্তই কাচু মাচু মুখ করে বললেন “কিন্তু আমি আত্মবিশ্বাসী ? একথা যে এই ভূভারতে কেহই বিশ্বাস করবে না” তখন ঘনাইবাবু বললেন “আপনি অবশ্যই আত্মবিশ্বাসী কিন্তু সেটি আপনার ভিতর হ’তে প্রকাশ পাচ্ছে না, আর এর জন্য চাই তিনরতি ক্যাটস্ আই কিম্বা সাত রতি গোমেদ। আর আপনার লগ্ন ‘বৃশ্চিক’ তাই লগ্নের অধিপতি মঙ্গল, এই লগ্নের জাতক-জাতিকারা সত্যবাদি ও নিষ্ঠাবান হয়ে থাকেন, অপরিসীম ইচ্ছা শক্তির বলে সব কাজেই অগ্রসর হয়ে থাকেন।” লাটাইবাবু আবার আমতা আমতা করে ক্ষীন স্বরে প্রতিবাদ করে বলেন-“বরং ঐ জিনিসটারই আমার জীবনে সর্বাপেক্ষা অভাব, আজ যদি আমার অপরিসীম তো দুরের কথা সামন্য একটু ইচ্ছা শক্তি থাকলেও থাকতো তাহলে আজ নিশ্চই আপনার মত প্রতিভাবান কেউ একটা হতাম।”
সে যাই হোক আমরা খবর নিয়ে জানলাম যে ঘনাইবাবুর প্রতিদিন দুই তিন জন করে খরিদ্দার হচ্ছে এবং দৈনিক দুই-তিন শত টাকা আমদানিও হচ্ছে।
তবে সেদিন একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, দুই একটি সৌজন্যমূলক বাক্য বিনিময় ছাড়া ঘনাইবাবুর বাড়িতে পুরো সময়টাই পটাইবাবু অদ্ভুত ভাবে শুধু নিশ্চুপ ছিলেন তাই নয়, ওনার চোখ মুখের মধ্যেও একটা অবিশ্বাস আর বিরক্তি ফুটে উঠছিল। যদিও ঘনাইবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার সময়ে রাস্তায় ব্যাপারটা পরিস্কার হ’ল।
আমরা তিনজনই বাঙালী তাই যথারীতি ফেরার সময়ে রাস্তায় নেমেই ঘনাইবাবুর নিন্দা সুরু হ’ল, আর এব্যাপারে পটাইবাবুই অগ্রনী ভূমিকা নিলেন। বললেন, “বুঝলেন রায়বাবু, জ্যোতিষী হওয়া মোটেই অতো সহজ ব্যাপার নয়, অনেক সাধ্য সাধনা এবং দীর্ঘদিনের তপস্যার দ্বারাই প্রকৃত জ্যোতিষী হওয়া যায়। ও ব্যাটা ভেকধারী জ্যোতিষী হয়ে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে, আর এই লাইনে এখন ইনকাম বেশ ভালই।” আমি পটাইবাবুর কথায় সম্মতি জানাতেই তিনি দ্বিগুন উৎসাহিত হয়ে বললেন, “তবে হ্যাঁ প্রকৃত জ্যোতিষী জীবনে আমি একজনকেই দেখেছিলাম, তিনি হলেন বাবা কনখলানন্দ মহারাজ!” এই কথা বলে পটাইবাবু দুইবার দুইহাত করজোর করে কপালে ঠেকালেন। আমি সভয়ে জিগ্যেস করলাম, “আপনি তার দেখা কেমন করে পেলেন?” উত্তরে পটাইবাবু বলে চললেন, “তিনি সুদুর হিমালয়ের কনখলে গভীর জঙ্গলে বর্হিজগৎ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একগুহার মধ্যে বসবাস করেন, আমি কৈশোরে একবার হিমালয় দর্শনে গিয়ে ঐ মহামানবের সাক্ষাত পাই এবং কেন জানিনা প্রথম দর্শনেই আমাকে বাবার খুব ভালো লেগে যায়।” আমি এবং লাটাইবাবু উভয়ে বললাম, “সত্যই তো এমন মহামানবের সাক্ষাত কয়জন পায়? আপনি প্রকৃতই ভাগ্যবান পটাইবাবু।” পটাইবাবু আরও বলে চলেন, “আমি বাবার কাছে কিছু না চাইতেই বাবা আমাকে বললেন, আমি তোর কপালে এক দেবজ্যোতি দেখতে পাচ্ছি, তুই একদিন এই পৃথিবীতে একটা বিরাট কিছু হ’বি। এবং আরও নির্দিষ্ঠ ভাবে বলেছিলেন বড় হয়ে আমি অবশ্যই একজন কেউকেটা হ’ব, হয় উত্তম কুমারের মত অভিনেতা কিম্বা ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের মত ডাক্তার, অথবা গোষ্ট পালের মত ফুটবল খেলোয়ার হবই হব। অত বড় একজন জ্যোতিষী তার কথা কখনো বিফলে যেতে পারে?”
আমরা আরও কৌতুহল প্রদর্শন করে পটাইবাবুর দিকে তাকাতেই পটাইবাবু এক গভীর তৃপ্তির হাসি হেসে বলে চলেন “এখন আমাকে দেখে আপনারা নিশ্চই বুঝতে পেরেছেন যে বাবা কনখলানন্দ মহারাজ কতবড় জ্যোতিষী ছিলেন। বাবা নিজেও বোধ হয় জানতেন না যে তার কথা এই ভাবে মিলবে, কারণ বাবা বলেছিলেন উপরের তিনজনের মধ্যে যেকোন একজনের গুন আমার মধ্যে বর্তাবে। কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা বাবার আশীর্বাদে এবং তাঁর শ্রী চরণের শ্পর্ষে উক্ত তিনজনের গুনই আমি পেয়েছি।” পটাইবাবুর একথা শ্রবণ করে আমি যার পর নাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যখন ভাবছি, তাহা কিরূপে সম্ভব? একজন মানুষ কি করে একই সঙ্গে বিধানবাবুর মত ডাক্তার, গোষ্টবাবুর মত খেলোয়ার আর উত্তমবাবুর মত অভিনেতা হবেন? আর তাছাড়া কনখলের গভীর জঙ্গলে বসবাস করে বহির্জগত থেকে সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন থেকে তিনি বিধান রায়, উত্তম কুমার কিম্বা গোষ্ট পালের মত বাঙালীদের চিনলেন কিরূপে? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে তাঁর মুখপানে তাকাতেই তিনি ব্যাপারটি খোলসা করলেন, “আসলে আপনারা নিশ্চই পারমিউটেশন-কম্বিনেশনের অংক করেছেন… ব্যাপারটা সেইরূপ। একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিলেই আপনার উত্তর পেয়ে যাবেন। আমি অবশ্যই উক্ত তিনজনের গুন পেয়েছি, তবে গুনগুলিকে সামান্য একটু ঘুরিয়ে নিলেই হবে। অর্থাত আমি উত্তম কুমারের মত ডাক্তার, বিধান রায়ের মত ফুটবলার এবং গোষ্ট পালের মত অভিনেতা অবশ্যই হয়েছি। ”
No comments:
Post a Comment