পটাইবাবু মানুষটি বড়ই শান্ত শিষ্ট । তুলোনায় পটাইবাবুর স্ত্রী সুরবালার মেজাজ কিঞ্চিত উর্দ্ধমুখি। তবে দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া না হলে সে জীবন বড়ই সাদা মাটা, আর এই আপ্তবাক্যটি পটাইবাবুরা দুজনে বিশেষ ভাবে মান্য করেন। অন্যান্য দিনের ন্যায় সেদিনও পটাইবাবুর সঙ্গে তার স্ত্রীর সক্কাল বেলাতেই একটু একটু করে কিছুটা অম্ল-মধুর শুরু হয়ে গেল। আসুন আমরা আমাদের কান দুটিকে পটাইবাবুর বাড়িতে পৌছে দেই।
সকালে মুড়ি আর ভেলিগুড় দিয়ে টিফিন সেরে বেশ আয়েশ করে খবরের কাগজটা নিয়ে পড়তে পড়তে পটাইবাবু তার স্ত্রী-কে বললেন, “গিন্নী আজ বিকেলে আমাদের ফেসবুকের বন্ধুদের একটা গ্রুপ মীট আছে আর তাতে আমাকে আজ যেতেই হবে.........।”
সুরবালা তখন তার বিখ্যাত শিল-নোড়ায় ঘটর ঘটর করে ধনে পাতা বাটছিলেন তাই পটাইবাবুর কথাটা ঠিক মত শুনতে না পেয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কি মী...ট ? না না ও সব খিট-মিটে যায়গায় যাওয়া চলবে না।”
সুরবালা তখন তার বিখ্যাত শিল-নোড়ায় ঘটর ঘটর করে ধনে পাতা বাটছিলেন তাই পটাইবাবুর কথাটা ঠিক মত শুনতে না পেয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কি মী...ট ? না না ও সব খিট-মিটে যায়গায় যাওয়া চলবে না।”
“ না না খিট মিটে নয় গিন্নী, গ্রুপ মীট, ফেসবুকের গ্রুপ মীট...। দেখ গিন্নি ওখানে পাঁচজন ভালো ভালো লোক আসেন পাঁচ রকম ভালো ভালো বিষয় আশয় নিয়ে আলোচনা হয়...... গেলে একটু জ্ঞান গম্যি বাড়ে। তাছাড়া সারাজীবন তো সরকারের কেরানীগিরি আর তোমার খিদমতগিরি করেই জীবনটা কেটে গেল, তাই এই বয়সে এসে ভাবছি একটু বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা একটু জনসেবামূলক কাজ এইসব করেই সময় কাটাব। বুঝলে গিন্নী কথায় বলে, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ!” আসলে এই কথাটা উচ্চারন করার পরেও পটাইবাবু বুঝতে পারলেন না যে তিনি তার অজান্তে একটি চকোলেট বোমায় অগ্নি সংযোগ করলেন, এখন শুধু ফাটার অপেক্ষা।
“ও তার মানে তুমি বলতে চাইছো যে আমি তোমার অসৎ সঙ্গ, আর ওই মুখ পোড়া মেয়েগুলো তোমার সৎ সঙ্গ ? হায় হায় হায় বেঁচে থাকতে এ কথাও শুনতে হল আমাকে? ছি ছি এর চেয়ে আমার মরণ হ’ল না কেন?” রাগে কাঁপতে কাঁপতে সুরবালা তার ধনেপাতা বাটার গতি দুই-তিন গুন বাড়িয়ে দেন।
“ছি ছি তুমি কেন আমার অসৎ সঙ্গ হবে ? তুমিই হচ্ছ আমার একম অদ্বিতীয়ম, বউ, গিন্নী, সহধর্মিনী, অর্ধাঙ্গিনী, ইংরাজীতে যাকে বলে ‘বেটার-হাফ’ অর্থাৎ আমাদের দুজনের মধ্যে আমি শুধু গুড আর তুমিই হচ্ছ বেটার।... বুঝেছ গিন্নী।” একথা বলে পটাইবাবু তার ডান হাতটা বাড়িয়ে সুরবালার থুতনি-টা ধরে একটু আদর করতে যেতেই, তার হাতটিকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে সুরবালা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন...। “ওরে 'মুখ পোড়া মিনসে', মনে করো আমি কিছুই জানি না... কিছুই বুঝি না...... তাই না ? সেদিন ছেলে আমাকে সব দেখিয়েছে...। কম্প্যুটার খুলে আমাকে দেখিয়ে বলল, মা এই দেখ বাবার ফেরেন্ড লিস্ট......। হায় হায় হায়! আমি দেখে অবাক ...। একটাও পুরুষ মানুষ নেই গা। শুধু ধুমসো ধুমসো মেয়ে ছেলেতে ভর্তি ...। একজন আবার লিখেছে ...। "আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা আমি যে পথ চিনি না।" ছি ছি ছি, ছেলের সামনে আমি লজ্জায় মরে যাই...। এসো আজ তোমাকে আমি পথ চেনাচ্ছি !!! আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন !!! আজ থেকে তোমার ঐ কম্পুটার-এ বসা বন্ধ...... এই হক কথা বলে দিলাম... হ্যা...।” ঘটর ঘটর করতে করতে সুরবালা বলে চলেন।
পটাইবাবু, আমতা আমতা করে তার অর্ধাঙ্গিনীকে বোঝাবার চেষ্টা করেন, “গিন্নী, ওটা আমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা নয়, ওটা একটা বিখ্যাত গান। আর এই বয়সে আমার হাত আবার কে ধরতে যাবে ?” কিন্তু মনে মনে ভাবলেন .....( আহা তেমন যদি কাউকে পাওয়া যেত...... কি ভালই না হত? ) তবে মুখে বললেন, “গিন্নী, এখন ফেসবুকে একাউন্ট না থাকলে তুমি সেকেলে হয়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী সবার ফেসবুক একাউন্ট আছে, এমন কি প্রেসিডেন্ট ওবামার মেয়েরা পড়াশুনায় কতটা কি এগোল কিম্বা রানী এলিজাবেথ আজ কি দিয়ে ভাত খেলেন এ সবই তুমি ফেসবুক থেকে জানতে পারবে।”
“তা আর একজন যে লিখেছে ‘আমি তোমাকে চাই’ ঐ মেয়েছেলেটা কে ?” সুরবালা তার চোখ দুটি বড় বড় করে জানতে চান।
“কে আবার কাকে চাইবে ? ও কাউকে চায় না, ঐটাই ওর নাম, ফেসবুকে অনেকেই আসল নাম না দিয়ে, ওই ভাবে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজের নাম লেখে, যেমন ধর, ‘আমি তোমাকে চাই’, ‘কোথায় তোমাকে পাই’, ‘বৃষ্টি-ভেজা মন’ কিম্বা ‘ছাতার তলায় আমরা দুজন’ এই রকম আর কি ? তাহলে ঐ কথাই থাকলো, আজ বিকেলে আমি মোহরকুঞ্জে যাচ্ছি।” পটাইবাবু গিন্নীর মেজাজ সম্মন্ধে ষোলআনা নিশ্চিন্ত হয়ে বেশ অনায়াসে কথাটা বলে দেন সুরবালাকে। কিন্তু মুখের কথা আর হাতের ঢিল একবার বেরিয়ে গেলে আর তো ফেরানো যায় না। পটাইবাবু বুঝতে পারেননি যে তিনি মুখ ফসকে তার গিন্নীর হাতে একটি মারাত্মক বোমা তুলে দিলেন, এবং যথারীতি সেই বোমাটিও সঙ্গে সঙ্গে ফাটলো।
“কি......? কুঞ্জে যাবে? এত দু-র-র-র ? তার মানে একটি রাধিকেও যোগাড় হয়েছে দেখছি ? ও-ও-ও মা-আ-গো-ও-ও এ আমার কি সব্বোনাশ হ’ল গো......? তা সঙ্গে গোপিনীরাও আছেন নিশ্চয়। হায় হায় হায় ...। এই বুড়ো বয়সে এতো দূর ? আমি এখন আত্মীয় পরিজন সবার কাছে মুখ দেখাই কি করে গো ও ও ও ।... বলে কিনা কুঞ্জে যাবে? তাই দেখি আজকাল সারাদিন কুম্পুটারে ঘাড় গুজে থাকে কেন?” সুরবালার কান্নার সুর আরও উচ্চগ্রামে ওঠে।
“দুত্তোর...। আরে এ কুঞ্জ সে কুঞ্জ নয়...! এ কুঞ্জ হচ্ছে এই কলকাতা শহরের একটা পার্কের নাম...। বলি এই পৃথিবীতে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে কারও নাম শুনেছ ?” এতক্ষন কথাগুলো জোরে জোরে বলে পটাইবাবু এবার আস্তে আস্তে টিপ্পনি কাটেন ‘তা আর শুনবে কি করে? বাপের তো ছিলো কয়লার ব্যাবসা’।
“কি তুমি আমার বাপ তুললে...... ? তোমার এত বড় সাহস ?”... প্রায় লাফিয়ে ওঠেন সুরবালা।
“তোমার বাপকে কি আমি তুলতে পারি? আমার সে ক্ষমতাই নেই, জীবদ্দশায় তার ওজন ছিল চার মন, এখন স্বর্গে গিয়ে আদেঔ কিছু কমেছে কিনা কে জানে?” কথাগুলো মিন মিন করে আপন মনে বলেই গিন্নীকে শুনিয়ে জোরে জোরে বললেন, ”আচ্ছা তুমি মোহর বলে কারও নাম শুনেছো?”
“দুত্তোর...। আরে এ কুঞ্জ সে কুঞ্জ নয়...! এ কুঞ্জ হচ্ছে এই কলকাতা শহরের একটা পার্কের নাম...। বলি এই পৃথিবীতে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে কারও নাম শুনেছ ?” এতক্ষন কথাগুলো জোরে জোরে বলে পটাইবাবু এবার আস্তে আস্তে টিপ্পনি কাটেন ‘তা আর শুনবে কি করে? বাপের তো ছিলো কয়লার ব্যাবসা’।
“কি তুমি আমার বাপ তুললে...... ? তোমার এত বড় সাহস ?”... প্রায় লাফিয়ে ওঠেন সুরবালা।
“তোমার বাপকে কি আমি তুলতে পারি? আমার সে ক্ষমতাই নেই, জীবদ্দশায় তার ওজন ছিল চার মন, এখন স্বর্গে গিয়ে আদেঔ কিছু কমেছে কিনা কে জানে?” কথাগুলো মিন মিন করে আপন মনে বলেই গিন্নীকে শুনিয়ে জোরে জোরে বললেন, ”আচ্ছা তুমি মোহর বলে কারও নাম শুনেছো?”
“ ও ও ও তাকে এখনও ভোলনি দেখছি ! বিয়ের পর থেকেই তো দেখতাম, আমার পিসতুত বোন মোহরকে দেখলেই ‘ও আমার দুষ্টু শালী... মিষ্টি শালী’ বলে তার সঙ্গে তোমার কতই না ফস্টি নস্টি আর আদিখ্যেতা। আর ছুড়িটাও তেমনি, জামাইবাবু বলতে এক্কেবারে অজ্ঞান। ছি ছি তাকে এখনও ভোলোনি তুমি ? হায় হায় এই না হলে পুরুষ মানুষের চরিত্র... ?” হতাস গলায় বলেন সুরবালা।
“ আরে দুত্তোর, এ মোহর সে মোহর নয় ইনি হলেন একজন বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। সারাটা জীবন তো শুধু রান্নাঘর, শোয়ারঘর, আর আঁতুরঘর, এর বাইরে তো আর কিছু চিনলে না............ !”
পটাইবাবুর কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সদর দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ শুনে দরজাটা খুলতেই হই হই করে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করলেন পটাইবাবুর পারিবারিক বন্ধু সদা হাস্যময় চিরকুমার লাটাইবাবু।
“ আরে দুত্তোর, এ মোহর সে মোহর নয় ইনি হলেন একজন বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। সারাটা জীবন তো শুধু রান্নাঘর, শোয়ারঘর, আর আঁতুরঘর, এর বাইরে তো আর কিছু চিনলে না............ !”
পটাইবাবুর কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সদর দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ শুনে দরজাটা খুলতেই হই হই করে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করলেন পটাইবাবুর পারিবারিক বন্ধু সদা হাস্যময় চিরকুমার লাটাইবাবু।
“কি গো বৌঠান কি ব্যাপার ? আজ সকাল থেকে কি এমন হল যে দুজনেরই মুখে আষাঢ়ের ঘন মেঘমালা?” রসিক বন্ধুর উপস্থিতি দুজনকেই যেন নতুন করে ঝগড়ায় উস্কানি দিল।
“আর বলিস না রে, তোর বৌঠানের ধারনা আমাদের ঐসব গ্রুপ মীটগুলোতে শুধুই শ্রীকৃষ্ণের লীলা খেলা চলে। একটু বুঝিয়ে বল তো, ওখানে গিয়ে আমরা কি করি?” পটাইবাবুর কথা শেষ না হতেই সুরবালা ঝাঝিয়ে ওঠেন, “দেখ ঠাকুরপো, ঐ মুখ পোড়াকে সমর্থন করে একটাও কথা বলবে না বলে দিচ্ছি। ওর একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না, অবশ্য তোমরা দুজনেই তো চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।”
“কি যে বল বৌঠান? তুমি থাকতে আমি কখনও ঐ বাঁদর টাকে সমর্থন করি? ওর কথা ছেড়ে দাও, বরং ও যেখানে যাচ্ছে যেতে দাও, আর চল আমরাও দুজনে কোথাও একটু ঘুরে আসি, ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে চল ‘পেয়ার মে দিয়ানা’ সিনেমাটা দুজনে এই সুযোগে দেখে আসি।”
লাটাইবাবুর মুখে একথা শুনে একেবারে লাফিয়ে ওঠেন পটাইবাবু, “ কি? এত বড় কথা? তোর সাহস তো কম না ? আমি থাকতে তুই আমার বউকে নিয়ে যাবি সিনেমা দেখতে?”
“তা তুই যদি কুঞ্জে গিয়ে অন্যের বউদের সঙ্গে লীলে খেলা করতে পারিস আর আমি একটু তোর বউকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতে পারব না?” এ কথা বলে লাটাইবাবু তার বন্ধুর কাছে গিয়ে কি যেন ফিস ফিস করে বললেন, আর বাইরে ভাবখানা দেখালেন যেন, বৌঠান তো ঠিকই বলেছেন।
“আর বলিস না রে, তোর বৌঠানের ধারনা আমাদের ঐসব গ্রুপ মীটগুলোতে শুধুই শ্রীকৃষ্ণের লীলা খেলা চলে। একটু বুঝিয়ে বল তো, ওখানে গিয়ে আমরা কি করি?” পটাইবাবুর কথা শেষ না হতেই সুরবালা ঝাঝিয়ে ওঠেন, “দেখ ঠাকুরপো, ঐ মুখ পোড়াকে সমর্থন করে একটাও কথা বলবে না বলে দিচ্ছি। ওর একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না, অবশ্য তোমরা দুজনেই তো চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।”
“কি যে বল বৌঠান? তুমি থাকতে আমি কখনও ঐ বাঁদর টাকে সমর্থন করি? ওর কথা ছেড়ে দাও, বরং ও যেখানে যাচ্ছে যেতে দাও, আর চল আমরাও দুজনে কোথাও একটু ঘুরে আসি, ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে চল ‘পেয়ার মে দিয়ানা’ সিনেমাটা দুজনে এই সুযোগে দেখে আসি।”
লাটাইবাবুর মুখে একথা শুনে একেবারে লাফিয়ে ওঠেন পটাইবাবু, “ কি? এত বড় কথা? তোর সাহস তো কম না ? আমি থাকতে তুই আমার বউকে নিয়ে যাবি সিনেমা দেখতে?”
“তা তুই যদি কুঞ্জে গিয়ে অন্যের বউদের সঙ্গে লীলে খেলা করতে পারিস আর আমি একটু তোর বউকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতে পারব না?” এ কথা বলে লাটাইবাবু তার বন্ধুর কাছে গিয়ে কি যেন ফিস ফিস করে বললেন, আর বাইরে ভাবখানা দেখালেন যেন, বৌঠান তো ঠিকই বলেছেন।
এদিকে তার উত্তরে পটাইবাবুও সবাইকে শুনিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ... “যা যা তোরা যেখানে খুশি যা ... আজ আমি কুঞ্জে যাবই কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না”।
আর এটাতেই মন্ত্রের মত কাজ হ’ল। প্রতি উত্তরে সুরবালাও দ্বিগুন গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, “ঠিক আছে ঠাকুরপো... চলতো, তাহলে আমিও সত্যি সত্যি আজ তোমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবই।"
আর এটাতেই মন্ত্রের মত কাজ হ’ল। প্রতি উত্তরে সুরবালাও দ্বিগুন গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, “ঠিক আছে ঠাকুরপো... চলতো, তাহলে আমিও সত্যি সত্যি আজ তোমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবই।"
সকালের ঝগড়ার মধ্য দিয়ে যা যা ঠিক করা হয়েছিল সেই অনুযায়ী বিকেলের কাজগুলো হ’ল। পটাইবাবু বেলা তিনটে নাগাদই মোহর কুঞ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছেন। আর বেলা চারটে নাগাদ সেজে গুজে লাটাইবাবু এসে হাজির। মধ্য পঞ্চাশের সুরবালাকে পটাইবাবু এর আগে অনেকবার ফেসবুকের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে যে চাইলেও তিনিই কখনো কোথাও যেতেই চাননি, কিন্তু সেদিন পটাইবাবুর ফ্রেন্ডলিস্ট দেখার পর থেকে তার মাথার ঠিক নেই...। ছি ছি এই বুড়ো বয়সে এসে এসব কি? আজ একটা হেস্ত নেস্ত করে তবে ছাড়বেন তিনি।
তাই অনেক সঙ্কোচ অনেক লজ্জা সঙ্গে নিয়েও বিবাহিত জীবনে প্রথম একজন পরপুরুষের সঙ্গে বাইরে বেরলেন তিনি। মেট্রোতে ময়দান স্টেশনে নেমে লাটাইবাবু বললেন, “চলো বৌঠান এই ফাঁকা ময়দানে দুজনে বসে একটু সুখ দুঃখের গল্প করি।” ঠিক সেই মুহুর্তে সুরবালার নিজেকে খুব আপরাধী বলে মনে হতে লাগল। লাটাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “না, গো আমার ভালো লাগছে না, চল আমারা বাড়ি ফিরে যাই।” "সে কী ? তাহলে ঐ বাঁদরটার প্রতি প্রতিশোধ নেবে না তুমি?" লাটাইবাবু বলে ওঠেন। "না না তুমি বাড়ি চল ঠাকুরপো" মিনতি করে ওঠেন সুরবালা। তখন লাটাইবাবু তার হাতের আসল তাসটি বার করলেন। সুরবালাকে একটু দূরে একটা আলো ঝল মলে জায়গা দেখিয়ে বললেন, “ঐ যে সাজানো গোছানো, আলো ঝলমলে পার্কটা দেখছো, ওটাই সেই মোহর কুঞ্জ, চল তো বাঁদরটা ওখানে কি করছে একবার দেখে আসি।”
এই কথা শুনেই আবার সুরবালা যেন তার আসল তেজ ফিরে পেলেন, “ওহ! তাই! চল তো, আজ মুখপোড়াটাকে একেবারে হাতে নাতে ধরবো।” দুজনে ভিতরে প্রবেশ করে কিছুটা এগিয়ে এক যায়গায় পৌছিয়েই অবাক হয়ে যায় সুরবালা। কি সুন্দর সাজানো গোছানো গাছ গাছালি ও ফুলে ফুলে ভরা একটা পার্ক। রঙ্গিন জলের ফোয়ারা, কত নারী-পুরুষ এবং ছেলে-মেয়েরা ঘোরা ফেরা করছে, কিম্বা বসে বসে গল্প করছে। কলকাতায় যে একটা এত সুন্দর যায়গা আছে, লাটাইবাবু আজ জোর করে না নিয়ে এলে তার জানাই হত না, সত্যি প্রেম করবার উপযুক্ত যায়গাই বটে, ইশ্ তারমানে এতদিন তাকে ফাঁকি দিয়ে পটাইবাবু এখানে এসে এইসব করে বেরাচ্ছে ছি ছি ছি।
হটাৎ সুরবালার নজরে পড়ে একটা জায়গায় একটা উঁচু বেদীর উপর প্রায় পঁচিশ ত্রিশ জন পনের ষোল বছরের ছেলে মেয়ে, আর তাদেরকে ঘিরে আট দশ জন বয়স্ক মহিলা ও পুরুষের মধ্যমনি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন পটাইবাবু। পিছনে একটা ব্যানারে লেখা “”ফেসবুক পথ-শিশু গ্রুপ””। ততক্ষনে উদ্বোধনী সঙ্গীত শুরু হয়ে গেছে। উদ্বোধনী সঙ্গীতের পরে পরেই এক ভদ্রমহিলা ঘোষনা করলেন “এই কলকাতা শহরে কয়েক লক্ষ লোক এক শোচনীয় পরিবেশে ফুটপাথে বাস করতে বাধ্য হয়, কিন্তু ঐ পরিবেশেও কত পদ্মফুল নীরবে ফোটে আমরা তার কতটুকুই খবর পাই? আজ আমাদের এই ফেসবুক পথশিশু গ্রুপের পক্ষ থেকে এমনই ত্রিশজনকে সংবর্ধনা জানিয়ে আমরা ধন্য হতে চাই। এইসব ছেলে মেয়েরা ফুটপাথের প্রতিকুল পরিবেশে বাস করেও এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনীতে পাশ করেছে। এবার এদের প্রত্যেকের হাতে পুষ্প স্তবক, পুস্তক-সামগ্রী ও একটি করে মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে সংবর্ধনা জানাবেন, আমাদের গ্রুপের প্রবীন সদস্য শ্রী পটাই চন্দ্র খাসনবীশ। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে আজকের এই পুরষ্কারের যাবতীয় খরচ বহন করেছেন আমাদের গ্রুপের গর্ব পটাইবাবু। লাটাইবাবু লক্ষ করলেন সুরবালার চোখদুটি কেমন যেন ছল ছল করছে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছনে শুধু পটাইবাবুর দিকে। ছোট্ট অনুষ্ঠান, আধ ঘন্টার মধ্যে শেষ হয়ে গেল। দুই বন্ধুর পূর্ব পরিকল্পনা মত পটাইবাবুও দূর থেকে সবই লক্ষ করেছেন কিন্তু যেন কিছুই দেখতে পাননি এমন ভাব দেখিয়ে সুরবালার পাশ দিয়ে যাবার সময়ে হটাৎ সুরবালা কে দেখে অবাক হওয়ার ভান করে, জিজ্ঞেস করলেন "আরে, তুমি এখানে কি করে এলে ?", সুরবালা জীবনে এই প্রথম প্রকাশ্যে পটাইবাবুকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে বলে উঠলেন, “শুনেছি ছোটবেলায় তুমি খুব ভাল ফুটবল খেলতে, কিন্তু তুমি যে এত বড় অভিনেতা, সেটা জানতাম না গো।”
No comments:
Post a Comment