Monday, 12 November 2018

ডাঃ ব্যোমকেশ গোস্বামী, এল এম এফ,

 আমার জীবনের কথা......।

( প্রতিবছর ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের জন্মদিন এলেই আমার বা আমার আত্মীয় পরিজনদের শারীরিক কারনে যে সমস্ত ডাক্তারবাবুদের সংস্পর্ষে আমি এসেছি তাদের মুখচ্ছবি গুলো চোখের সামনে কেমন যেন ভেসে ভেসে ওঠে। আজ ভোরে ঊঠেই তেমনি একজন আমার পরম শ্রদ্ধেয় ডাঃ ব্যোমকেশ গোস্বামীর কথাটা খুব মনে পড়ছে। )
পঞ্চাশের দশকের ঘটনা। বাবার চাকরীর সুত্রে তখন আমরা থাকতাম বসিরহাট শহরের ওপারে সংগ্রামপুর থেকে ৮/১০ মাইল দূরে তেঁতুলিয়া নামের একটা গ্রামে। একদিকে ইছামতী নদী আর অন্যদিকে স্বচ্ছতোয়া বিলবল্লীর খাল, আর তারই মধ্যে এক মনোরম পরিবেশে আমার বাবার সরকারি অফিস কাম কোয়ার্টার।
পাশেই বসিরহাট-স্বরুপনগর রস্তার ধারে একটা ছোট্ট সরকারি আউটডোর চিকিৎসা কেন্দ্র। দুটি মাত্র ঘর, একটি ছোট্ট ঘরে অতি সাধারণ এক কাঠের হাতল ভাঙ্গা চেয়ারে ডাক্তারবাবু বসেন। ডাক্তারবাবুর চেয়ারের পিছনেই একটা টুলের উপর জলভর্তি একটি টিনের ড্রাম, আর ড্রামের ঠিক নীচে আর একটা ছোট টুলে একটা এনামেলের গামলা। সাদা কাপড় ঢাকা দেয়া ডাক্তারবাবুর টেবিলে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা থাকতো তার স্টেথস্কোপ, একটা গ্লাসে ওষুধ জলে ডুবিয়ে রাখা থার্মোমিটার আর প্রেসকৃপশন লেখার জন্য হাসপাতালের নাম খোদাই করা রাবার স্টাম্প মারা পোষ্টকার্ড সাইজের এক গোছা সাদা কাগজ। ডাক্তারবাবুরর চেয়ারের ঠিক পাশেই রোগীর বসার জন্য একটা টুল রাখা থাকতো।
পাশের ঘরটিতে দুটি আলমারিতে বিভিন্ন শিশি বোতলে কিছু ওষুধপত্র সাজানো আর একজন কম্পাউন্ডার-কাম-ক্লার্ক-কাম-গ্রুপ ডি স্টাফ বসেন। কারন ঐ কম্পাউন্ডার ভদ্রলোকই সকাল সাতটার সময়ে এসে দরজা খুলতেন। হাসপাতাল ঝাঁট দিতেন এবং ডাক্তারবাবুর হাত ধোয়ার জন্য ড্রামে জল ভরে রাখতেন।
দুটি ঘর বরাবর সামনে টানা একটি লম্বা বারান্দায় গোটা দুয়েক নড়বরে কাঠের বেঞ্চে সকাল আটটা থেকে এক এক করে রোগীরা এসে বসতো, তবে তেমন কিছু ভীড় হত না। হাসপাতালের পাশেই ছিল আমাদের কুমিরডাঙ্গা, গোল্লাছুট, চোর-পুলিশ খেলার জায়গা। তাই সেই সাত/আট বছর বয়সে আমরা বাচ্ছারা কখনো কখনো খেলতে খেলতে ডাক্তারবাবুর ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে ডাক্তারবাবুর প্রশ্রয় মিশ্রিত বকা খেতাম। তখন অবাক হয়ে দেখতাম, গৌরবর্ণের শীর্ণকায় পঞ্চাশ উর্দ্ধ ধুতি এবং সাদা হাফ সার্ট পরা ডক্তারবাবু কেমন চোখ বুজে এক মনে রোগীর নাড়ি টিপে দেখছেন। তারপর চোখের তলায় হাত দিয়ে চোখটাকে টেনে দেখে নিলেন, কাউকে জিভ বার করতে বলতেন।
কারও বুকে পিঠে স্টেথো ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে বলতেন কিম্বা মুখে থার্মোমিটার গুজে দিতেন। কাউকে ধমক দিয়ে বলতেন ছেলেটার এই ১০৩ জ্বর, এই অবস্থায় ওকে এখানে নিয়ে এলি কেন? আমাকে বললেই পারতিস, বাড়ি যাওয়ার সময়ে দেখে যেতাম।
পরে জেনেছি ডাক্তারবাবুর নাম ডাঃ ব্যোমকেশ গোস্বামী।
কিন্তু সব চেয়ে ভাল লাগতো, কম্পাউন্ডার বাবুর ওষুধ তৈরী করা দেখতে। খল নুড়িতে খটর খটর করে কি সব গুড়ো করতেন তারপর টেবিলে একটা সাদা কাগজের উপর রেখে ৬টা বা ৮টা ভাগ করে ছোট ছোট পুরিয়া তৈরী করতেন। আবার শিশিতে লাল জলের মত ওষুধ ঢেলে শোলার ছিপি এটে বিজ্ঞের মত রোগীকে তা খাওয়ার পদ্ধতি বুঝিয়ে দিতেন। আমি সব চেয়ে অবাক হতাম শিশির গায়ে লেবেল তৈরীর পদ্ধতি দেখে। সরু লম্বা একফালি কাগজকে প্রথমে শিশির ওষুধের মাপ মত করে কেটে নিয়ে তারপর ডাক্তারবাবুর প্রেস্ক্রিপশন অনুযায়ী ৮টা বা ১০টা সমান ভাগে কাগজটা ভাজ করে কুচ কুচ করে চারটে কোনা কেটে নিতেন। তারপর কাগজটা খুলতেই একটা সুন্দর নকশা করা আট বা দশ ভাগের কাগজ হয়ে যেত এবং সেটা তিনি তখন আঠা দিয়ে শিশির গায়ে লাগিয়ে দিতেন।
বেলা একটা নাগাদ ডাক্তারবাবু হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়ে নিজের বাড়িতে চলে যেতেন। দিনের বাকি সময়টাতে জরুরী কোন প্রয়োজন হলে ডাক্তারবাবুর বাড়িতেই যেত সবাই, কিম্বা বিশেষ প্রয়োজনে ডাক্তারবাবুই সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পরতেন বিনা ভিজিটে রোগী দেখতে। ডাক্তারবাবুর নিজের বাড়িই ছিল পাশেই হটাৎগঞ্জ নামের একটা গ্রামে।
ঐ সময়ে হটাৎ একদিন সন্ধ্যে বেলায় আমার বেশ জ্বর। পরদিন জ্বর বাড়ে বই কমে না। সেই যুগে আমাদের বাড়িতে কোন থার্মোমিটার ছিল না। বাবা ভয় পেয়ে ডাক্তারবাবুকে বলতেই উনি সাইকেলে করে বাড়ি যাওয়ার পথে আমাকে দেখে গেলেন আর ওনার ব্যাগ থেকে কিছু ওষুধ বের করে দিয়ে পরদিন সকালে বাবাকে হাসপাতালে যেতে বললেন। পরদিন সকালেও আমার জ্বর কমেনি এই খবর পেয়ে উনি আবার আমাকে দেখতে এলেন এবং যথারীতি স্টেথো থার্মোমিটার এই সব দিয়ে আমাকে পরীক্ষা করে বাবাকে বললেন তিন ঘন্টা অন্তর জ্বরটা লিখে রাখতে।
আমাদের বাড়িতে থার্মোমিটার নেই শুনে ওনার কাছে একটা এক্সট্রা থার্মোমিটার ছিল সেটাই দিয়ে গেলেন, আর কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে গেলেন বসিরহাট থেকে কিনে আনার জন্য। সেদিনই সন্ধ্যের মধ্যে বসিরহাট থেকে আমার ওষুধ, হর্লিকস, কিছু ফল ও একটা নতুন থার্মোমিটার চলে এল। কিন্তু এর দু/চার দিন পরেও জ্বর কমার কোন লক্ষণ নেই। ডাক্তারবাবু বাবাকে বলে গেলেন মনে হচ্ছে টাইফয়েড। তাই আবার নতুন ওষুধ এল। ১০৪ এর বেশি জ্বর উঠলে ঠান্ডা জলে আমার মাথা ধুয়ে দেয়ার বিধান দিয়ে গেলেন। ডাক্তারবাবু যখনই আমাকে দেখতে আসতেন, একটা জিনিস লক্ষ্য করতাম, উনি যেন আমার একান্ত আপনজন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আমার সঙ্গে আমার ইস্কুলের গল্প আমার খেলাধুলোর গল্প করতেন।
প্রায় ১৫/২০ দিন পর থেকে জ্বর কমতে শুরু করল। তবে আর এক বিপদ শুরু হল। হিসি করতে গেলে প্রচন্ড জ্বালা করে। ডাক্তারবাবু পরদিন সকালের হিসিটা একটু ধরে রাখতে বললেন। সেযুগে এসব ব্যাপারে মধ্যবিত্ত পরিবারে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বেশ ছুতমার্গ ছিল। তাই একটা নারকেলের মালাই কে ভাল করে পরিষ্কার করে খুব ঘেন্না ঘেন্না করে উঠনের এক কোনে রাখা হল। ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মত সকালে উঠে আমি ওই নারকেলের মালাটিতে কিছুটা হিসি করলাম। সকালে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই ডাক্তারবাবু আমাদের বাড়িতে এলেন এবং পকেট থেকে একখন্ড কাগজ বের করে ওই হিসিতে ডুবিয়ে কাগজটাকে তুলে ভাল করে কি যেন দেখলেন। তারপর বাবাকে বিড় বিড় করে ইংরাজীতে কি যেন বললেন। আবার বসিরহাট থেকে নতুন ওষুধ এল, এবং দিন দশেক পরে মোটামুটি সম্পুর্ণ সুস্থু হলাম।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, এই যে ডাক্তারবাবু আমার আসুস্থতার কদিনে অন্তত দশ-বারো বার আমাকে দেখতে আমাদের বাড়িতে এসেছেন, এইরকম উনি প্রয়োজনে আরও অনেকের বাড়িতেই যান এবং বিনিময়ে কারও কাছ থেকে এক পয়সাও ফিস নিতেন না কোনদিন কারও কাছ থেকে।
এই ঘটনার বছর খানেক পরেই আমার বাবা তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে বদলি হয়ে বসিরহাট শহরে চলে আসেন। দেখতে দেখতে ষাট বছরেরও বেশি হয়ে গেল। তবুও আজও যেন চোখ বুজলে স্পষ্ট সেখতে পাই ...। ফর্সা, স্লিম ছোট খাটো চেহারার ডাক্তার ব্যোমকেশ গোস্বামী সাদা ধুতি আর সাদা সার্টের উপর সাদা সুতির কোট পরে আমাদের বাড়ির সামনে এসে বেল বাজিয়ে সাইকেল থেকে নেমে, হাঁক দিয়ে বলছেন, " রায়বাবু আছেন?......, নারায়ণ কেমন আছে......?"
ডাক্তারবাবু,...... আমার পক্ষে আপনাকে ভূলে যাওয়া কোনমতেই সম্ভব নয়। সেইযুগে কত শিশুই তো ঐরকম একটা অজ গ্রামে সামান্য অসুখে ওঝা গুনিনদের হাতে কিম্বা অশিক্ষিত চিকিৎসকদের হাতে ভুল চিকিৎসায় কিম্বা বিনা চিকিৎসায় অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু এই যে আমি আজও সত্তর বছর বয়সেও সুস্থ শরীরে আজ ডাক্তার দিবসে কিছু লেখালিখি করতে পারছি তার পুরো কৃতিত্বই তো আপনার।
তাই আজ এই পুণ্য ডাক্তার দিবসে আমার জীবন-দানকারী ডাক্তারবাবু আপনি যেখানেই থাকুন......... আপনাকে জানাই আমার শত সহস্র প্রনাম।
(যদি এই লেখাটি আপনাদের ভাল লাগে তবে ইচ্ছা আছে আমি জীবনে আরও যেসব চিকিৎসকদের সংস্পর্ষে এসেছি তাদের নিয়েও এমন করে লিখে যাওয়ার। )

No comments:

Post a Comment