Monday, 12 November 2018

"""" পটাইবাবুর সিনেমা টু সিরিয়াল """"


সে অনেকদিন আগের কথা, পটাই তখনও পটাইবাবু হননি। পটাইদের সেই অল্প বয়সে একমাত্র বিনোদন ছিল, হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। তখন সব বন্ধুদলের মধ্যে এমন কয়েকজন থাকতো যারা যেন তেন প্রকারে ভোর বেলায় লাইন দিয়ে এমনকি মার-দাঙ্গা করেও শুক্রবারে রিলিজের দিন ছবিটি দেখবেই। তখন প্রথম দিনের দর্শকদের ঐ ছবিটির বিবরণ এবং অভিনেতাদের ছবিসহ একটা করে বুকলেট দেয়া হত, অনেকে সেটার লোভেও প্রথম দিনটা মিস করতে চাইত না।
আর এইসব প্রথন দিনের দর্শকরাই ছিল পটাইদের কাছে ঐ সিনেমাটির বিজ্ঞাপন। তাদের কথা অনুযায়ী পরবর্তি শনিবার কিম্বা রবিবার হোস্টেল ফাঁঁকা করে পটাইরা ভিড় জমাতেন হলটিতে। এমন কি কখনও কখনও লুঙ্গি পরে নাইট শো তেও।
সে ছিল পঁয়ষট্টি পয়সার কাঠের নড়বড়ে চেয়ারে পা তুলে সিনেমা দেখার দিন। কখনও মাথাটা নীচু করে বিড়িতে দুটান দিয়ে পাশের বন্ধুকে পাস করে দিতে দিতে সিনেমা দেখা। সে এক অনাবিল আনন্দের দিন। তার সঙ্গে আজকের আড়াইশো টাকার টিকিটে আইনক্সে বসে পপকর্ন আর কোল্ড ড্রিঙ্কস খেতে খেতে দেখা সিনেমার আনন্দের কোন তুলনাই হবে না। টিকিটের জন্যও কোন প্রবলেম ছিল না, কারণ কাছাকাছি প্রায় সব হলেই টিকিট কাউন্টারে কিম্বা গেটম্যানদের মধ্যে একজন করে ফিট করা থাকতো, শুধু আগের দিন তাকে একটু বলে দিয়ে তার প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিলেই হল।
তবে অনেক সময়ে প্রথম দিনের দর্শকের কথা শুনে হতাশ হয়েছেন এমন ঘটনাও অনেক ঘটেছে। দারুন ছবি শুনে দেখতে গিয়ে হলে পটাইবাবু ঘুমিয়ে পড়েছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে। ভাল লাগলে একই ছবি সাতবার দেখ আর ভাল না লাগলে হল থেকে বেরিয়ে এসো অথবা ছারপোকাদের সঙ্গী করে চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়।
তবে তখন ভালো হোক খারাপ হোক, একটা ব্যাপার অবশ্য পরিষ্কার ছিল, সেটা হল দর্শকদের মর্জিই শেষ কথা। তাই সত্যজিত বাবুর 'গণশত্রু'র মত অসাধারণ একটি ছবি মাছি তাড়িয়েছে কিন্তু তাঁরই 'গু গা বা বা' সেযুগের বাংলা ছবির সমস্ত রেকর্ড ভেঙ্গে একটানা এক বছরের বেশি চলেছিল। আবার 'বেদের মেয়ে জোছনা'র মত একটি 'প্যান পেনে সেন্টিমেন্টে'র ছবি 'গু গা বা বা'-র রেকর্ডও ভেঙ্গে দিয়েছিল।
'এক্ষনে সেই দিন গিয়াছে' এবং সেই পটাই এখন প্রবীন পটাইবাবু হয়েছেন। সেসব দিনের কথা মনে পড়লে পটাইবাবুর মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে ওঠে। ভাবেন, কোন দুঃখে যে বিয়ে করতে গিয়েছিলাম!
এ যুগে পটাইবাবুর ভালো লাগুক বা না লাগুক কুছ পরোয়া নেহি। যোগ ব্যায়াম থেকে সল্পবসনা নারীদের ফ্যাশন শো, মুরগীর মাংসের সুইডিশ চাটনি থেকে তালের আঁটির দো পিয়াজি। বিরাট কোহলি, রোনাল্ডো বা সানিয়া মির্জা থেকে ডবলিউ ডবলিউ এফ, সব কিছু এক বাক্সে হাজির। যাকে বলে এক্কেবারে 'অল ইন ওয়ান'। ছেলে দেখবে সানিয়া মির্জা তো মা দেখবে 'বিধবা বউ এর কুমারী শাশুড়ি'।
সেদিনও সন্ধ্যে বেলায়, আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত সংসারের ন্যায় সদ্য অফিস ফেরত পটাইবাবু এখন মিউ মিউ করে বলতে যান, "একটু খবরটা শোনার ইচ্ছে ছিল"! কিন্তু তাঁর 180/90 প্রেশারের পাঁঁচ ফুট এক ইঞ্চি হাইটের পঁচাশি কেজি ওজনের গিন্নী চিৎকার করে ওঠেন, "আহা, অতই যদি খবর শোনার সখ তো নিজের ঘরে আর একটা লাগাও না!...... আর খবরদার, আমার রিমোটে হাত দিয়েছো কি হুলুস্থুলুস কান্ড বেধে যাবে বলে দিচ্ছি, এখন আমাকে রাগিও না। একে তো আমার নায়ক এখন কোমায় চলে গেছে কখন কি হয় বলা যাচ্ছে না, এই সময় উনি এসেছেন খবর শুনতে?" বলেই পুরো সোফা সেটটা কাঁঁপিয়ে পাশ ফিরে বসলেন।
তাতেও কোন অসুবিধা নেই। একই বাড়িতে এখন তিনটে চারটে করে বোকা বাক্স। কোনোটা ডেস্কটপ তো কোনটা ওয়াল হাং। তাই নিত্য এই অশান্তি থেকে বাঁঁচার জন্য পটাইবাবুও অফিসের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে লোন নিয়ে বাইশ হাজার দিয়ে একটা ওয়াল হাং কিনেছেন মাত্র দুমাস আগে। তবে সেটি বাড়িতে ঢোকা মাত্রই তার ছেলের দখলে চলে গেছে। পাশের ঘরে ছেলে তার বন্ধুদের নিয়ে সেটিতে এখন ভারত-ওয়েষ্ট ইন্ডিজের ক্রিক্রেট কেরামতি দেখছে।
পটাইবাবু কি আর করবেন? প্রায় সব বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত বাড়িতেই বাড়ির কর্তারা এখন তৃতীয় শ্রেনীর নাগরিক। প্রথম শ্রেনীতে পড়েন একজনই। বলাই বাহুল্য তিনি বাড়ির গিন্নী। দ্বিতীয় শ্রেনিতে বাড়ির সন্তানেরা। আর হাতে রইল পেন্সিল। ততক্ষনে অফিস ফেরত কর্তাবাবুটির খিদেয় পেটে সুঁঁচোয় ডন দিচ্ছে কিন্তু সন্ধ্যার এই সিরিয়াল বেলায় তার 440 ভোল্টের বউকে সেকথা বলা চলবে না।
অগত্যা নিজেই ফ্রিজ থকে দু পিস ঠান্ডা পাউরুটি বের করে চিবোতে চিবোতে বউ এর পাসের সোফাটিতে বড়ই সঙ্কুচিত হয়ে বসলেন। ওদিকে গিন্নীর আতঙ্কিত চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে, টি ভির সিরিয়ালের নায়ক নয়, গিন্নীর ভাই কিম্বা বাবা কোমায় আছেন। যে কোন মুহুর্তেই যে কোন খারাপ খবর চলে আসতে পারে, তখন সময় পাওয়া যাবে না। তাই সময় থাকতে ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে রাখাই ভালো।
ওদিকে সিরিয়াল আরম্ভ হয়ে গেছে এখন মশা কামড়ালেও জোরে নিজের পায়ে নিজে শব্দ করে থাপ্পড় মারা যাবে না। সিরিয়ালের প্রতি গিন্নীর মনঃসংযোগে বিঘ্ন ঘটবে। ইচ্ছে না থাকলেও পটাইবাবুও সেই কোমায় চলে যাওয়া নায়কের পরিবারে ঢুকে গেলেন।
এ বড়ই অদ্ভুত হাসপাতাল। এখানে একজন পুরষ্কার পাওয়া বিশিষ্ঠ ডাক্তার আর এক হেড ডাক্তারের সঙ্গে গল্প করতে করতে হটাৎ অজ্ঞান হয়ে যান এবং চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই তিনি কোমায় চলে যান। আবার এ বড়ই মায়াবী হাসপাতাল। এখানে হেড ডাক্তার কোমায় চলে যাওয়া তার সহ কর্মীর চিকিৎসার চেয়ে তার বাড়ির লোকেদের ডেকে আই সি ইউ র দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রোগীর বাড়ির লোকেদের উচ্চগ্রামে পারিবারিক কলহ উপভোগ করাটাকেই একজন ডাক্তারের প্রকৃত দায়িত্ব বলে মনে করেন।
আই সি ইউর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কোমায় চলে যাওয়া ডাক্তারের মায়ের চিৎকার চেচামিচি ও রণচন্ডী মুর্তি দেখে কে বলবে যে তার ছেলের নাকি যেকোন মুহুর্তে খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে। হাসপাতালের বড় ডাক্তারবাবু চিকিৎসাা বিজ্ঞান ভুলে পাড়ার গুনীনের মত ছোট ডাক্তারের এই অবস্থার জন্য মা দায়ী না বউ দায়ী না বউএর দেওর দায়ী সেসব বিচার টিচার করতে লাগলেন, এবং ভগবানকে ডাকতে বললেন।
তবে এসব নিয়ে অবশ্য বেশিক্ষন কাউকে বিড়ম্বিত হতে হল না, কারণ হেড ডাক্তারবাবুর নির্দেশে কোমায় যাওয়া রোগী ডাক্তারের বউ আই সি ইউর ভিতরে যাওয়ার অনুমতি পেলেন এবং ভিতরে গিয়ে অনেক জ্ঞান গম্ভীর কথা টথা বলে রোগীর মাথায় ঠাকুরের ফুল ছোঁয়াতেই রোগী কোমা টোমা ঝেড়ে ফেলে উঠে বসে বউ এর সঙ্গে অনেক সুখ দুঃখের গল্প শুরু করে দিলেন।
পটাইবাবুর শরীরটা কদিন ধরে ভাল যাচ্ছে না। পেটে একটা ব্যাথা নাগারে চাগাড় দিয়ে যাচ্ছে। পাড়ার ডাক্তারবাবু বলেছেন একটা ভাল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ভাল করে কয়েকটা পরীক্ষা করতে হবে। আজকাল দুদিনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানেই তো লাখ টাকার ধাক্কা। তবে এই সিরিয়াল দেখার পর থেকেই পটাইবাবুর নিজেকে বেশ চাঙ্গা লাগছে। কারণ পটাইবাবু ঠিক করেছেন, কালকেই উনি ঐ সিরিয়াল কোম্পানীর অফিসে যাবেন হাসপাতালের ঠিকানাটা জোগাড় করতে।

No comments:

Post a Comment