"""" ইলিশ ইলিশ ইলিশ """"
---- নারায়ণ রায়
সেপটেম্বর শেষ হ'ল, এখনও কলকাতার বাজারগুলি ইলিশময়। বড় মৎস ব্যবসায়ীদের কথা ছেড়েই দিলাম, এমনকি মূল বাজারের বাইরে রাস্তায় সারা বছর যারা সামান্য দুটো গুলে, পুঁটি কিম্বা লইট্যা নিয়ে বসেন, তারাও দেখি দুটো সাড়ে চারশো গ্রাম ওজনের ইলিশ নিয়ে 'তিনশো টাকা' 'তিনশো টাকা' বলে চিৎকার করছে্ন।
আমার নিকটবর্তি বাজার বলতে বরানগর বাজার। এই বাজারের মৎস বিভাগটি বেশ বড় এবং অন্যান্য বাজারের ন্যায় আমাদের এই বরানগর বাজারটিও এখন বেশ ইলিশময়। এই বাজারে মৎস বিভাগের যেটি প্রবেশদ্বার সেটি পারতপক্ষে আমি এড়িয়ে চলি, কারণ ওই দ্বারের পরে প্রথম মাছের দোকানটিই হচ্ছে আমার অত্যন্ত অপ্রিয় একটি শুটকি মাছের দোকান।
অবশ্য এই ফেসবুকেই আমার অনেক বন্ধু আমাকে বলেছেন, 'তুমি আমার বাড়িতে এসো, তোমাকে শুটকি মাছ এমন ভাবে রান্না করে খাওয়াবো যে জীবনে ভুলতে পারবে না।' কিন্তু মুশকিল হচ্ছে দোকানের ঐ ভদ্রলোক তো আর রান্না করা শুটকি বিক্রি করেন না, বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে, আমার মত প্রবল শুটকির গন্ধ বিরোধী ব্যক্তি যখন ওই দোকান থেকে কুড়ি হাত দূর দিয়ে নাক টিপে যাচ্ছি, তখন কেমন অবলীলাক্রমে দোকানি তার দোকানে বসে বিড়ি ফুকে যাচ্ছেন। তার মাথার চতুর্দিকে ঝুলন্ত ঘুড়ির ন্যায় শঙ্কর মাছের সুটকি ঝুলছে। চিংড়ি-শুটকি থেকে ইলিশ-শুটকি সবই মেঝে থেকে দেওয়াল সর্বত্র থরে থরে সাজানো আছে তার দোকানে।
কিন্তু এহেন শুটকির দোকানটিও একদিন আমার বেশ প্রিয় হয়ে গেল, যেদিন দেখলাম ঐ দোকানি শুধু বিশ্রী শুটকি মাছই বিক্রি করেন না, তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয় নোনা-ইলিশ ও বিক্রি করেন।
এই নোনা ইলিশ বললেই আমার ছোটবেলার কথা মনে পরে। বাবার চাকরির সুত্রে আমরা তখন উত্তর চব্বিশ পরগনার ইছামতি তীরবর্তি তেঁতুলিয়া নামের একটি গ্রামে থাকতাম। সেই যুগে ওইসব প্রত্যন্ত এলাকায় মাছ সংরক্ষণের কোন সহজলভ্য ব্যবস্থা ছিল না। তাই মৎসজীবিরা ইলিশমাছ আঁশ ছাড়িয়ে খন্ড খন্ড করে কেটে কিছুটা হলুদ আর প্রচুর পরিমানে নুন মাখিয়ে একটি মাটির কলশিতে ভরে কলশির মুখটা প্রথমে কাপড় এবং পরে নদীর মাটি দিয়ে বায়ু নিরোধক করে মাছ সংরক্ষণ করে রাখতেন। পরে বাজার থেকে এই মাছ বাবা কিনে আনতেন এবং আমার মা-এর হাতের যাদুতে তা ঝাল, ঝোল ও অম্বলের অপূর্ব উপাদেয় এবং সুস্বাদু পদ হয়ে আমাদের পাতে পড়ত।
এই বরানগর বাজার থেকে গঙ্গার দুরত্ব খুব বেশি হলে অর্ধ কিলোমিটার। এখানে বাজার করতে গিয়ে আমি অনেকবারই একেবারে সদ্য ধরা টাটকা গঙ্গার ইলিশ দেখেছি। আমি জানতে চাইলেও আমার অতি পরিচিত দোকানি আমাকে ঐ ইলিশ বিক্রির ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখাতো না। একদিন আমি জোর করাতে দোকানি বলল, আমি আপনাকে মাত্র এক ঘন্টা আগে ধরা একটা টাটকা ইলিশ দিচ্ছি, এই গোটা মাছটি নিয়ে গিয়ে দু/তিন দিন আপনার ডিপ ফ্রিজে রেখে দিন। দুদিন পরে নিয়ে আসুন তখন আমি কেটে দেব। কারণ মানুষ টাটকা ইলিশ বলে পাগল হয়, আসলে সদ্য ধরা টাটকা ইলিশের কোন টেস্ট পাবেন না।
এই বরানগর বাজারের সামনে দিয়ে উত্তর-দক্ষিন বরাবর যে রাস্তা, তার দক্ষিনে মাত্র অর্ধ কিলোমিটার গেলেই ঠাকুরের 'উদ্যানবাটি', যেখানে ঠাকুর কল্পতরু হয়েছিলেন। আর তিন/চার কিলোমিটার গেলেই কাশিপুর হয়ে বাগবাজার অর্থাৎ বলরামবাটি, মায়ের বাড়ি, নিবেদিতার বাড়ি, গিরিষ ঘোষের বাড়ি। আর এই রাস্তাই উত্তর বরাবর গিয়ে মিশেছে আলমাবাজার মঠ হয়ে দক্ষিনেশ্বর। ভাবলে অবাক হয়ে যাই এই রাস্তা ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ, মা সারদা এবং স্বামী বিবেকানন্দের পদধুলি দ্বারা স্নাত।
তাই গঙ্গা পার্শ্বস্থ বরানগর বাজার এবং ইলিশ মাছ নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই আমার স্বামী বিবেকানন্দের কথা মনে পড়ে। এবার দেখা যাক স্বামী বিবেকানন্দের ইলিশপ্রীতি কেমন ছিল? স্বামীজি অন্যতম প্রিয় মাছ ছিল ইলিশ, সেটা আমরা তার জীবনে বার বার লক্ষ্য করেছি। স্বামীজি নিজে খেতে এবং খাওয়াতে ভালবাসতেন। নিজে রান্না করতেও ভালবাসতেন খুব। সে সব নিয়ে পরে একদিন আলোচনা করা যাবে।
একবার স্বামীজি স্টিমারে পদ্মা নদীতে গোয়ালন্দ যাচ্ছেন, এই সেই গোয়ালন্দ যা কিনা পদ্মার ইলিশের জন্য জগত বিখ্যাত। স্বামীজি স্টিমারের ডেকে দাঁড়িয়ে দেখলেন মৎসজীবিরা জাল ফেলে ইলিশ মাছ ধরছে। স্টিমারের নিকটেই একটা নৌকোয় জেলেরা ইলিশ মাছ জালে তুলছে। তাই দেখে স্বামীজি হটাৎ তার সঙ্গীদের বললেন, "বেশ ভাজা ইলিশ খেতে ইচ্ছে হচ্ছে।"
একথা শুনে স্টিমারের সারেং বুঝে গিয়েছে, স্বামীজির ইচ্ছে হয়েছে স্টিমারের সবাইকে নিয়ে পদ্মার ধারে একটু ইলিশ পিকনিক করার। দর করে জানা গেল, এক আনায় একটি--- তিন চারটিই যথেষ্ঠ। তবু স্বামীজি বললেন "তবে এক টাকার ইলিশ কেনো।" এক টাকায় বড় বড় ষোলটি ইলিশ এবং তার সঙ্গে আরও দুটি ফাউ।
পদ্মা নদীর তীরে একটি গ্রাম দেখে স্টিমার থামানো হল। স্বামীজি অমনি বললেন, "পুঁঁই শাক হলে বেশ হতো, আর গরম ভাত।" একটি দোকানে চাল পাওয়া গেল, কিন্তু সেখানে বাজার বসে না, কোথায় পুঁইশাক ? স্বামীজির সঙ্গীরা যখন ঐ গ্রামে তন্ন তন্ন করে পুই শাকের সন্ধান করছেন, তখন এক ভদ্রলোক দৌড়তে দৌড়তে এসে বললেন, "চলুন পুঁইশাক আমার বাড়ির বাগানে আছে। তবে আমার একটি শর্ত আছে।" একথা শুনে স্বামীজির সঙ্গীরা অবাক এবং বিরক্ত ! নগদ পয়সা দিয়ে পুঁইশাক কিনবো তার আবার শর্ত কি? সে কথা জানতে চাওয়ায় ভদ্রলোক বললেন, "আমার একটাই শর্তঃ- আমার বাগানে যত পুঁঁইশাক আছে সব আপনারা নিয়ে নিন শুধু আমাকে একবার, শুধু একবারের জন্য স্টিমারে উঠে স্বামীজিকে দর্শন এবং প্রণাম করার সুযোগ দিতে হবে।"
ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে পুঁঁইশাক স্বামীজির কতোটা প্রিয় ছিল শুনুন তাহলে। গোয়ালন্দের পথ স্টিমারে পুঁইশাক সরবরাহ করায় লোকটির প্রতি স্বামীজি এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে শুধু দর্শন এবং প্রণাম নয়, সেই দিনই ফিরবার পথে ঐ পুঁইবাগানের মালিককে তিনি দিক্ষা দিয়েছিলেন।
পরে সেই ভাগ্যবান ভক্তটি বলেছেন,"আমাকে কৃপা করবেন বলেই স্বামীজির সেদিন ঈলিশের মাথা দিয়ে পুঁইশাক খেতে ইচ্ছে হয়েছিল। স্বয়ং স্বামীজি আমাকে দিক্ষা দিয়েছেন। এই পৃথিবীতে আমার চেয়ে ভাগ্যবান আর কে আছে?"
পাঠককুল আমাকে মাফ করবেন, এই লেখার শেষ অংশটুকু লিখতে গিয়ে বারে বারে আমার চক্ষুদুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠছে।
৪ঠা জুলাই, ১৯০২, শুক্রবার। স্বামীজির পার্থিব জীবনের শেষ মধ্যাহ্ন ভোজন। কদিন ধরেই শরীরটা ভাল যাচ্ছে না, তার উপর গতকাল গিয়েছে একাদশীর উপবাস। তবে আজ সকাল থেকে শরীরটা বেশ ঝর ঝরে লাগছে। সকাল বেলায় বেলুড় মঠে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন, পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পতিতোদ্ধারিনী গঙ্গা। স্বামীজি দেখলেন, বর্ষার গঙ্গায় জেলেরা ইলিশ ধরছে। শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিনে স্বামীজির সারাদিনের সঙ্গী ছিলেন স্বামী প্রেমানন্দ। স্বামীজি প্রেমানন্দকে বললেন। কদিন ধরেই শরীরটা ভাল যাচ্ছে না, মুখে একদম রুচি নেই। তার উপর কালা সারাদিন একাদশীর উপোস গিয়েছে। আজ একটু ভাল কিছু খেতে ইচ্ছে করছে।
৪ঠা জুলাই, ১৯০২, শুক্রবার। স্বামীজির পার্থিব জীবনের শেষ মধ্যাহ্ন ভোজন। কদিন ধরেই শরীরটা ভাল যাচ্ছে না, তার উপর গতকাল গিয়েছে একাদশীর উপবাস। তবে আজ সকাল থেকে শরীরটা বেশ ঝর ঝরে লাগছে। সকাল বেলায় বেলুড় মঠে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন, পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পতিতোদ্ধারিনী গঙ্গা। স্বামীজি দেখলেন, বর্ষার গঙ্গায় জেলেরা ইলিশ ধরছে। শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিনে স্বামীজির সারাদিনের সঙ্গী ছিলেন স্বামী প্রেমানন্দ। স্বামীজি প্রেমানন্দকে বললেন। কদিন ধরেই শরীরটা ভাল যাচ্ছে না, মুখে একদম রুচি নেই। তার উপর কালা সারাদিন একাদশীর উপোস গিয়েছে। আজ একটু ভাল কিছু খেতে ইচ্ছে করছে।
বেলুর মঠের সবার জন্য সেই ৪ঠা জুলাই ১৯০২, বছরের প্রথম গঙ্গার ইলিশ কেনা হল। মঠের একজন পূর্ববঙ্গীয় সদস্যকে রসিকতা করে বললেন তোরা বাঙ্গালরা তো নতুন ইলিশ পেলে পূজো করিস। কি দিয়ে পূজো করতে হয়, ভাল করে তাই কর। সকালে কিছু ফল খেলেন তারপর সকাল সাড়ে ৮ টা নাগাদ ঠাকুরের ঘরে ধ্যানে বসলেন।
সাড়ে এগারটা নাগাদ সবার সঙ্গে একসঙ্গে পার্থিব জীবনের শেষ মধ্যাহ্ন ভোজন করলেন, ইলিশ মাছ ভাজা, ইলিসের ঝোল এবং অম্বল দিয়ে। রসিকতা করে সবাইকে বললেন গতকাল একাদশী করে ক্ষিদেটা এতোটাই বেড়েছিল যে মনে হচ্ছিল থালা ঘটি বাটি গুলোও চিবিয়ে খাই।
ঐদিন রাত্রি সাড়ে ৯ টায়, সবাই ছুটে এলেন ভাবলেন স্বামীজির সমাধি হয়েছে।রাত্রি সাড়ে ১০ টায় গঙ্গার ওপারে বরানগর থেকে ডাঃ মজুমদার এলেন। দেখলেন, হৃদযন্ত্র বন্ধ। কৃত্তিম উপায়ে ম্যাসেজ করে হার্ট চালু করার অনেক চেষ্টা করলেন। অবশেষে রাত্রি ১২ টায় ভা: মজুমদার অশ্রুসজল নয়নে ঘোষনা করলেন, স্বামীজি এই পার্থিব জগতের মায়া ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য রামকৃষ্ণ লোকে চলে গেলেন।
No comments:
Post a Comment